অরিন্দম বলেন, “এনেছি দাদুভাই। ওটাকে ছাদে নিয়ে গিয়ে ওড়াবে না কিন্তু। রিমোটের নিয়ন্ত্রণ রাখতে না পারলে কার্নিশের বাইরে চলে গিয়ে তলায় ছিটকে পড়বে।”
পাশ থেকে নন্দিতা বলে ওঠে, “ঘরে ওড়াতে গেলে দেওয়ালে ধাক্কা লাগবে বাপি। পাখা দুমড়ে যাবে।”
অরিন্দম সত্য কি তা উপলব্ধি করেও না মেনে নেওয়ায় ভঙ্গি
করেন, “ছাদে ওড়ানোর ঝুঁকি আছে।
হেলিকপ্টার মাটিতে পড়লে বিট্টু
কার্নিশে উঠে পড়তে পারে। তলায় চোখ রাখতে গিয়ে যদি মাথা ঘুরে যায়! তার চেয়ে
ঘরের ভেতরে নিরাপদ।”
বিট্টুর বিপদের কথা ভেবে নন্দিতা চুপ করে যায়। সন্তান
সুরক্ষার অধীনে থাকাই শ্রেয়। তেমনটি মনে হতে বলে, "ঠিকই বলেছো তুমি। যাও, নিজের বেডরুমে গিয়ে কাপড় বদলে ফ্রেশ হয়ে এসো। দশ ঘন্টার জার্নি, ট্রেনে অনেক ধকল গেছে। তোমাদের বিশ্রাম দরকার। আমি চা তৈরি
করছি তোমার আর মায়ের জন্যে।”
চা জলখাবার খেয়ে অরিন্দম শরীর ছেড়ে দিয়েছিলেন বিছানায়।।
দু'চোখ বন্ধ। হঠাৎ তাঁর মনে হল পায়ের কাছে খাটের গায়ে কেউ
এসে দাঁড়িয়েছে। চোখ খুলতেই দেখেন বিট্টু। বিট্টু ততক্ষণে দাদুর বয়ে আনা
ব্যাগটার চেন খুলে উঁকি মারতে শুরু করেছে ভেতরে। তার এখনই হেলিকপ্টার চাই।
তন্দ্রাচ্ছন্ন ভাবখানা উবে যেতে অরিন্দম বিছানায় উঠে বসে দেখেন বিট্টু ব্যাগের ভেতর হাত ঢুকিয়ে ঘাঁটতে শুরু করেছে তার ঠাকুমার সাধের পানদানিটা। তিনি কৃত্রিম ধমক লাগান, “ব্যাগের ভেতরে হাত ঢোকাবে না। ওখানে মাঘি পোকা আছে। কামড়ে দেবে।”
পানদানিতে ভরা আছে জর্দার কৌটো, চুন-সুপারি, খয়ের। আছে পান। এক চিমটে জর্দাও যদি মুখে পুরে নেয় ছেলেটা বমি করে
অসুস্থ হয়ে পড়বে। দৃশ্যটা দু'চোখে ভেসে উঠতে
তিনি খাট থেকে নেমে ব্যাগের চেন বন্ধ করে বিট্টুর পিঠে হাত রেখে আদুরে গলায় বলেন, “আমার বন্ধু প্রশান্ত বলেছিল, ট্রেনে যাচ্ছিস, দুটো মাঘি পোকা যদি ব্যাগের ভেতরে নিয়ে যেতে পারিস কেউ হাত ঢোকাতে সাহস পাবে
না। এদের দাঁত খুব ধারালো। কামড়ালে রক্ত বের করে দেয়। তাইতো সাথে করে নিয়ে
এসেছি এদের।”
বিট্টুর চোখে-মুখে কৌতূহল। আগ্ৰহভরে জিজ্ঞেস করে, “মাঘি পোকা তোমাকে কামড়েছে কখনও?”
“হ্যাঁ, গত পরশুই তো
কামড়েছিল।” বলেই অরিন্দম তাঁর ডান হাতের বুড়ো আঙুলের ক্ষয়ে যাওয়া চামড়ার একটা
কাটা অংশ দেখিয়ে বলেন, “অনেক রক্ত
ঝরেছিল। ওরা অবিশ্যি ঘুমিয়ে পড়লে কামড়ায় না কাউকে। তখন ওদের হুঁশ থাকে না।”
বিট্টু বলে, “ওরা কখন ঘুমোয়?”
অরিন্দম বলেন, “খুব কম ঘুমোয়। খাবার খেয়ে কিছুক্ষণের জন্য নেতিয়ে পড়ে
থাকে ব্যাগের এক কোণে। ঘুম ভাঙ্গলে চিৎকার শুরু করে দেয়। তখন মিঘ মিঘ বলে ডাকতে
থাকে।”
বিট্টু জিজ্ঞেস করে, “ওরা এখন ঘুমিয়ে আছে?"
অরিন্দম বলেন, "হ্যাঁ। এইতো খাবার দিলাম ওদের।"
বিট্টু বলে, "কি খায় ওরা?”
“স্রেফ বেদানার দানা। ওদের গায়ের রং বেদানার দানার মতো
গোলাপী।” অরিন্দম দাদুভাইয়ের গাল টিপে দেয়।
বিট্টু বলে, "আমায় দেখাবে পোকাদুটোকে?”
অরিন্দম হেসে বলেন, “নিশ্চয় দেখাব। এখন রাত হয়ে গেছে দাদুভাই। এখন ওদের বিরক্ত
করব না। আগামীকাল যখন তুমি স্কুল থেকে ফিরবে ওদের দেখা পাবে। ওরা ঘুমিয়ে পড়লে
ব্যাগের ভেতর থেকে তুলে আনব বাইরে। আমার খিদে পেয়েছে দাদুভাই। যাও মা'কে গিয়ে বলো খেতে দিতে।”
বিট্টু বলে, “আমার হেলিকপ্টারটা দাও।”
অরিন্দম বলেন, “দিচ্ছি। আগে ডিনার করে নিই। বেশিক্ষণ ওড়াবে না কিন্তু।”
বিট্টুর স্কুলের বাস আসে সকাল সোয়া সাতটায়। নন্দিতার
সাতটায়। প্রতিদিন বিট্টুকে ঘুম থেকে জাগানো বড় পরিশ্রমের কাজ। কোনও এক চমক
জড়ানো কথা না শোনালে তার ঘুম ভাঙ্গেনা। বিছানা ছেড়ে উঠতে চাইছিল না বিট্টু।
নন্দিতা তাকে ঠেলা মেরে বলে, “দাদু তোর জন্যে
হেলিকপ্টার ছাড়াও আরও একটা দারুণ জিনিস নিয়ে এসেছে।”
বিট্টুর চোখ খুলে যায় তৎক্ষণাৎ। মায়ের পানে পলকহীন দৃষ্টি
মেলে বলে, “কি এনেছে?”
“একটা গল্পের বই। রেড ক্যাট ব্লু ক্যাট।”
“লাল বেড়াল নীল বেড়াল?”
“হ্যাঁ। জেনি ডেসমন্ডের লেখা। ছোটবেলায় আমি পড়েছি।”
বিট্টু বিছানায় উঠে বসে বলে, “বইটা দাও।”
নন্দিতা বলেন, “সোয়া ছ'টা বাজছে। আগে
ব্রাশ করে হালকা ব্রেকফাস্ট করে স্কুলের পোশাক পরে নে। বইটা খাবার টেবিলে রাখা
আছে। একবার চোখ বুলিয়ে রেখে দিবি। স্কুল থেকে ফিরে দুপুর বেলায় পড়বি।”
বিট্টু বলে, “জানো আজ দুপুরে দাদু আমাকে মাঘি পোকা দেখাবে।”
নন্দিতার ভ্রু কুঁচকে বলে, “কি দেখাবে?”
“মাঘি পোকা। দাদু ব্যাগে ভরে নিয়ে এসেছে। তুমি দাদুর ব্যাগে
হাত ঢোকাবে না। পোকাটা কামড়ে দেবে।”
নন্দিতা যা বোঝার বুঝে গিয়েছে। ছেলের হাত ধরে টেনে খাট
থেকে নামিয়ে দিয়ে বলে, “তুই ব্যাগের
চেন খুলিসনি তো?”
বিট্টু এক মুহুর্ত অন্যমনস্ক হয়ে যায়। পরক্ষণে বলে, “খুলেছিলাম তো। চেন খুলতে দাদু রেগে গেল। তখনই বলল ব্যাগে
দুটো মাঘি পোকা আছে।”
স্কুল ছুটির পর বিট্টু ফিরে এসেছে বাড়িতে। প্রায় একই
সময়ে নন্দিতাও ফিরে এসেছে। চান করে দুপুরের আহার সেরে নিয়েছিল বিট্টু। প্রতিদিন
খাওয়া শেষে সে টিভিতে চোখ রাখে। কিছুক্ষণ টিভি দেখার পর ঘুমিয়ে পড়ে। আজ ঘুম উবে
গেছে। হাত ধুয়ে সটান গিয়ে হাজির হয় দাদুর কাছে।
অরিন্দম ভাত-ঘুম দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। দাদুভাইকে
দেখে মন খুশিতে ভরে ওঠে তাঁর। আবার সংশয়ও জাগে মনে, কে জানে দাদুভাই কি আবদার করে বসে। বিট্টুর গাল টিপে দিয়ে বলেন, "আমার সাথে ঘুমোবে দাদুভাই?”
বিট্টু বলে, “আমাকে মাঘি পোকা দেখাবে না? কই দেখাও।”
অরিন্দম এখন মাঘি পোকা কোথায় পায়। তিনি কথা ঘোরান, “পোকা দুটোকে কোথায় পেয়েছিলাম শোনো। গতবছর মাঘ মাসে, সময়টা জানুয়ারি, কাঁসাই নদীর তীরে আমরা বন্ধুরা পিকনিক করতে গেছিলাম। তখন দেখি গোলাপী রঙের
অনেকগুলো পোকা বালিতে হেঁটে বেড়াচ্ছে। তখন আমার বন্ধু অঞ্জন বলল এদের মাঘ মাসে
দেখা মেলে, তাই মাঘি পোকা নাম। অঞ্জন দুটো পোকা ধরে বলল...
অরিন্দম কথা শেষ করতে পারে না। বিট্টু তাঁর হাঁটুতে ঠেলা
মেরে বলে, “মাঘি পোকা দেখাও?”
অরিন্দম বলেন, “ওরা জেগে রয়েছে তো। এখন ব্যাগে হাত ঢোকানো চলবে না।”
“তবে যে বলেছিলে আমি স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার সময় ওদের
খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে রাখবে?”
“হ্যাঁ, বলেছিলাম।
অনেকক্ষণ আগে ওরা মিঘ মিঘ বলে চিৎকার জুড়েছিল। খিদে পেয়েছিল হয়ত। বেদানার দানা
খাইয়ে দিতেই ওরা ঘুমিয়ে পড়ল। এখন দেখি উঠে পড়েছে। এবার ভাবছি পোকা দুটোকে ওদের
মায়ের কাছে রেখে আসব।"
বিট্টু বিস্মিত গলায় বলে, “কেন রেখে আসবে?”
অরিন্দম বলেন, “এবারও কাঁসাইয়ের তীরে পিকনিক করতে গেছিলাম। তখন ওদের
মায়ের সাথে দেখা হয়েছিল। আমি যে ওর বাচ্চা দুটোকে সাথে করে নিয়ে এসেছি ও জানত।
আমাকে বলল, “কি খেতে দাও আমার সোনাদের?”
বললাম, “বেদানার দানা
খায়।”
পোকা দুটোর মা রেগে গিয়ে বলল, “ওরা চিৎকার করে?”
আমি বললাম, “হ্যাঁ, করে। মিঘ মিঘ বলে চেঁচায়।”
দেখি ওদের মা কাঁদতে শুরু করেছে। কাঁদতে কাঁদতে বলে, “ওরা আমাকে ডাকে। মিঘ মানে মা। আমার দুই সন্তান কে তুমি
বাঁচতে দেবে না। ওরা ঝিনুক খায়। মরা চিংড়ি মাছ খায়। বেদানার দানা খেয়ে বাঁচবে
না ওরা। দয়া করো। ওদের ফিরিয়ে দাও আমার কাছে।
তাই ভাবছি দাদুভাই এবার গিয়ে দুটোকে রেখে আসব ওদের মায়ের
কোলে।”
বিট্টুর নিজের মায়ের আদুরে মুখখানা মনে পড়ে যায়। সে
কান্না জড়ানো গলায় বলে, “ওদের নিয়ে এলে
কেন? মা'কে দেখতে পায় না তাইতো ওরা মিঘ মিঘ বলে মা'কে খোঁজে।”
অরিন্দম মাথা নেড়ে বলেন, “তুমি ঠিক বলেছ দাদুভাই।”
অরিন্দম ততক্ষণে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন বিকেলবেলায়
বাজারে গিয়ে একটা ছোট তালা কিনে আনবেন। সারাক্ষণ তালা দিয়ে রাখবেন ব্যাগে।