আমাদের গল্প — কিশোর বার্তার যাত্রা
রজত বরণ চক্রবর্তী, সম্পাদক - কিশোর বার্তা
ত্রিপুরার সাহিত্যজগতে ‘কিশোর বার্তা’ নামটি আজ শুধু একটি পত্রিকার পরিচয় নয়, এটি এক অনন্য সাহসিকতার প্রতীক। সপ্তম শ্রেণির এক ছাত্রের হাতে গড়া এই পত্রিকা আজও বাংলা ও ইংরেজিতে ওয়েব মাধ্যমে নিয়মিত প্রকাশিত হয়, তাও সম্পূর্ণ বিনামূল্যে। এই দীর্ঘ যাত্রাপথে রয়েছে সংগ্রাম, সৃষ্টিশীলতা এবং এক অদম্য স্বপ্ন।
স্কুলজীবনে দেওয়াল পত্রিকা ‘অঙ্কুর’-এর দায়িত্ব পেয়ে যে সৃজনশীলতার বীজ রোপিত হয়েছিল, সেটিই পরে অঙ্কুরিত হয় ‘কিশোর বার্তা’ নামে। স্কুলের ঠিকানাতেই শুরু হয় এই রাজ্যের কিশোর সাহিত্য পত্রিকার অভাব পূরণের প্রয়াস। তখনকার দিনে ইন্টারনেট, ইউটিউব, গুগল বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ছিল না—সবকিছুই করতে হতো হাতে-কলমে, নিজের চেষ্টায়।
স্টুডিওতে গিয়ে ছবি তুলে সরকারি প্রেসে জিঙ্কের দুটো ব্লক বানিয়ে এনেছিলাম—একটা এই ছবি আর অন্যটা লোগো। তখন সবে মাত্র সীসা দিয়ে ব্লক বানানোর মেশিন এসেছিল।
অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও ‘সুবর্ণ প্রেস’-এর মালিক শ্রী প্রিয় ভট্টাচার্যের সহযোগিতায়, সপ্তম শ্রেণির এক কিশোর নিজ হাতে ম্যানুয়াল ট্রেডেল প্রিন্টিং মেশিন চালিয়ে ‘কিশোর বার্তা’ ছেপেছে। প্রেস বন্ধ হওয়ার পরও চলত পরীক্ষা-নিরীক্ষা। দ্বিতীয় সংখ্যাতেই সরকারি বিজ্ঞাপন শুরু হয় (১৯৮৭), কারণ এটি ছিল একটি নিরপেক্ষ কিশোর সাহিত্য পত্রিকা—রাজনীতির গন্ধহীন।
তখনকার মন্ত্রী শ্রী রতন চক্রবর্তী নিজে এগিয়ে এসে উৎসাহ দেন। তিনি ভাবতেই পারেননি যে ‘কিশোর বার্তা’র সম্পাদক একজন হাফ-প্যান্ট পরা বালক! তাঁর “আছি তোমার পাশে” আশ্বাস বাস্তবেই রূপ নেয়। সাহিত্যিক এবং মন্ত্রী শ্রী অনিল সরকারও ছিলেন সহায়তায় সদা প্রস্তুত। দুই ভিন্ন রাজনৈতিক মতের মানুষ, কিন্তু কিশোর সাহিত্যের প্রতি তাঁদের ভালোবাসা ছিল অভিন্ন।
১৬–১৭ বছর বয়সে ‘দেব সাহিত্য কুটির’-এ যোগ দিয়ে শুরু হয় পেশাগত যাত্রা। ১৮ বছর বয়সে সত্যজিৎ রায়ের নজরে আসা, হাতে আঁকা তাঁর পোর্ট্রেট ‘নবকল্লোল’-এর প্রচ্ছদে প্রকাশ, এবং পরে ‘সন্দেশ’ পত্রিকায় কাজের সুযোগ—সবই এক কিশোর শিল্পীর প্রতিভার স্বীকৃতি। এরপর ‘রাষ্ট্রীয় সাহারা’, ‘হিন্দুস্থান টাইমস’, ‘ডাউন টু আর্থ’, ‘বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড’, ‘ফরচুন ইন্ডিয়া’, ‘বিজনেস টুডে’-র মতো প্রথম সারির পত্রিকায় গুরুত্বপূর্ণ পদে কাজ।
সব ছেড়ে ফিরে আসা নিজের রাজ্যে—ত্রিপুরায় শিশু-কিশোরদের জন্য কিছু করার স্বপ্নে। প্রিন্টিং প্রেস দিয়েও ব্যবসায়িক মনোভাবের সঙ্গে তাল মিলিয়ে টিকিয়ে রাখা সম্ভব হয়নি। শিল্পীর মন ব্যবসার চাহিদা মেটাতে পারে না। তাই বড় বড় মেশিন স্ক্র্যাপে দিয়ে দেওয়া হয়। লক্ষাধিক টাকার চাকরি, একাধিক প্রপার্টি বিক্রি করে ফিরে আসা মানুষটি আজও বিশ্বাস করেন—সাহিত্যই তাঁর পথ।
আগরতলা থেকেই কাজ চলছে ‘হারপারকলিন্স’, ‘ইকনমিক টাইমস’, ‘আউটলুক’, ‘দ্য পাইওনিয়ার’-এর মতো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে। তবুও ‘কিশোর বার্তা’ ছাড়েননি। প্রতি মাসে বাংলা ও ইংরেজিতে প্রকাশিত হয় ২৪টিরও বেশি ম্যাগাজিন। বহুজন বন্ধ করার পরামর্শ দিয়েছেন, চেষ্টা করেছেন থামাতে। কিন্তু থামেননি। কারণ উদ্দেশ্য একটাই—ত্রিপুরায় একটি সাহিত্য পত্রিকা।
সহযোগিতা পেলে ‘কিশোর বার্তা’কে আরও বিস্তৃতভাবে, আরও গুণগত মানে প্রকাশ করা সম্ভব। তাই প্রতীক্ষা রইল আপনাদের আন্তরিক সহায়তার।
সবচেয়ে আনন্দের বিষয়—পাঠক সংখ্যা। এমন সব দেশের নাম থেকে পাঠক আসে, যেগুলোর নাম পর্যন্ত আগে শোনা হয়নি। প্রতিটি সংখ্যার জন্য তাঁরা অপেক্ষা করেন। এই ভালোবাসাই ‘কিশোর বার্তা’র প্রকৃত প্রাপ্তি।
ছবি ও স্মৃতি