শান্তিপ্রিয় আরামপ্রিয় বাঙালি চরিত্রকে খুব সুন্দর
ফুটিয়ে তুলেছেন কবিরাই—
"ভদ্র মোরা, শান্ত বড়ো,
পোষ-মানা এ প্রাণ।
বোতাম-আঁটা জামার নীচে
শান্তিতে শয়ান।"
স্বাধীনতা সংগ্রামের উত্তাল
দিনগুলোকে বাঙালি নিজের চরিত্র দিয়ে প্রমাণ করতে পেরেছিল এর সীমাবদ্ধতা। এরকম
একটি দিন ৮ই ডিসেম্বর, সালটা ১৯৩০। বাঙালি শৌর্য ও বীরত্বের একটা দিন যা যতদিন
বাঙালি থাকবে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। বড়সড় বাহিনী নয়, মাত্র তিন দামাল যুবক ব্রিটিশ সাম্রাজ্যকে কাঁপিয়ে দিতে
পেরেছিল। বলানেই, কওয়ানেই—হঠাৎ করেই তারা রাইটার্স বিল্ডিংয়ে হানা
দিয়েছিল। তাদের গুলিতে ঘায়েল হয়েছিল বড় বড় ইংরেজ কর্তারা। সামাল দিতে না পেরে
সেই সময়ে পুলিশকর্তা টেগার্ড অপারগ হয়ে পড়েন, ডাকা হয়
সেনাবাহিনীর গোর্খা রেজিমেন্টকে। এই বিরাট বড় রেজিমেন্টের বিপক্ষে ছিল কতজন? না,
মাত্র তিনজন। এটাই বাঙালির বীরত্বের চরমতম জয়গাথা। মৃত্যু
নিশ্চয় জেনেও আঘাত হানা—দেশমাতৃকার স্বাধীনতার জন্য হাজার হাজার সাধারণ মানুষের
অপমানের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার জন্য অক্লেশে আত্মবলিদান দেওয়া।
বিনয়-বাদল-দীনেশ—সে এক
ঐতিহাসিক অলিন্দযুদ্ধ। যা ইতিহাসের পাতায় সারা জীবনই স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। ওরা জানতেন নিশ্চিন্ত মৃত্যুর সঙ্গে রয়েছেন, তবুও ভীষণ স্বাভাবিক ছিলেন। অভিযানের আগের দিন বাদলকে নিয়ে
যাওয়া হয়েছিল অন্তত একবার রাইটার্স বিল্ডিং-এর হালহকিকত বুঝে নেওয়ার জন্য।
ফেরার পথে বাদল পৌঁছে যায় তার এক কাকার বাড়িতে। কাকার মেয়ের হাতে তুলে দেয়
একটি উপহার। পরের দিন সকাল থেকেই বাদল আর দীনেশ তাদের গুপ্ত ঠিকানায়
খাওয়া-দাওয়ায় ব্যস্ত। জমিয়ে খাওয়া হলো আর কয়েক ঘণ্টা পরেই তারা এক ঐতিহাসিক
অভিযানে যাবেন—মৃত্যুকে বরণ ছাড়া যেখান থেকে আর কোনো উপায় তাদের থাকবে না।
মৃত্যুর সামনে দাঁড়িয়েও আনন্দ-উল্লাস করা, এত খাওয়া দেখে সেই বাড়ির
সদস্যরা প্রত্যেকে অবাক হয়েছিলেন। বাড়ির মালিক ওদের জন্য ট্যাক্সি ডাকতে গেলেন। এসে দেখলেন
দীনেশ আপন মনে আবৃত্তি করে চলেছেন—
''যে মস্তকে ভয় লেখে নাই লেখা, দাসত্বের ধূলি আঁকে নাই কলঙ্কতিলক…. তার পরে দীর্ঘপথশেষে জীবযাত্রা-অবসানে
ক্লান্তপদে রক্তসিক্ত বেশে উত্তরিব একদিন শ্রান্তিহরা শান্তির উদ্দেশে দুঃখহীন নিকেতনে।''
আরেক বিপ্লবী বিনয় বসু
থাকতেন অন্য গুপ্ত জায়গায়। এখানেও যাবার আগে বড় আনন্দের সঙ্গে খাওয়া-দাওয়া
করলেন। আসন্ন বিদায় দেখে পরিবারের এক মহিলা সদস্য একটু ভেঙে পড়লে, বিনয় তাকে সান্ত্বনা দিয়ে বললেন—
"একি! তুমি না একজন বিপ্লবী, এ দুর্বলতা তো তোমার সাজে না!"
নিজেকে সংযত করে মহিলা এবার
ধীরে পায়ে এগিয়ে যান সদর দরজার দিকে। তাঁর পায়ের ধুলো নিয়ে দৃঢ় পদক্ষেপে
বেরিয়ে গিয়ে অপেক্ষমান ট্যাক্সিতে ওঠেন সেদিনের যুবক বিনয় বসু। একবারের জন্যও
পেছন ফিরে তাকালেন না। একটু পরেই গাড়িটি মিলিয়ে যায় দৃষ্টির আড়ালে। চোখে আঁচল
চাপা দিয়ে তাড়াতাড়ি ঘরে ঢুকে পড়েন তিনি। কান্না দেখলে প্রতিবেশীরা আবার কী
ভাববে!
এগারোটা নাগাদ মহাকরণের
সামনে এসে গাড়ি থেকে নেমে এলেন তিনজন। ধীরে সুস্থে এগিয়ে গেলেন। রাস্তা পেরিয়ে
চলে এলেন পশ্চিম গেটের সামনে। সান্ত্রীরা কোনো প্রশ্ন করলো না। তাঁদের সাহেবি
পোশাক এবং চলনবলন দেখে কারো মনে কোনো সন্দেহ জাগেনি। মাথায় সুন্দর টুপি, গলায় ঝোলানো মাফলার। ইউরোপীয়দের মতো গটগট করে ঢুকে গেলেন।
বিল্ডিংয়ে ঢোকামাত্রই তাঁদের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠলো। চোখের দৃষ্টিতে প্রতিশোধের
আগুন। অলস ভঙ্গি নিমেষে উধাও। তড়িৎগতিতে সিঁড়ি পেরোতে লাগলেন। তাঁদের লক্ষ্য বড়
বড় আমলাদের ঘরের দিকে। অ্যাকশনের জন্য তিন বিপ্লবী প্রস্তুত।
‘রাইটার্স বিল্ডিং’-এর একটি কক্ষে কারা বিভাগের সর্বময়
কর্তা ইন্সপেক্টর জেনারেল কর্নেল এস. এন. সিম্পসন তাঁর কাজকর্ম পরিচালনা করছেন।
তাঁর ব্যক্তিগত সহকারী জ্ঞান গুহ পাশে দাঁড়িয়ে আলোচনা করছেন। বেলা ঠিক ১২টা।
বিলাতি পোশাকে তিন বাঙালি যুবক কর্নেল সিম্পসনের সাক্ষাৎ পেতে আগ্রহ প্রকাশ করলেন।
তাঁরা সহকারীকে ঠেলে কামরার ভিতরে প্রবেশ করলেন। হঠাৎ পদধ্বনি শুনে কর্নেল তাঁদের
দিকে তাকালেন। বিস্ময়-বিমূঢ় চিত্তে দেখলেন সম্মুখে তিন বাঙালি যুবক হাতে রিভলভার
তাঁর সামনে দণ্ডায়মান। মুহূর্তের মধ্যে বিনয়ের কণ্ঠে ধ্বনিত হল— "Pray
to God, Colonel. Your last hour has come."
কথাগুলো উচ্চারণের সঙ্গে
সঙ্গে তিনটি রিভলভার থেকে ছয়টি বুলেট সিম্পসনের দেহ ভেদ করে বের হয়ে গেল।
সিম্পসনের নিথর দেহ লুটিয়ে পড়লো মেঝের উপর।
দ্রুত তিনজন বেরিয়ে এলেন
করিডরে। একের পর এক অফিস লক্ষ্য করে গুলি। এগিয়ে এলেন ইন্সপেক্টর জেনারেল ক্রেগ।
হাতে পিস্তল। চলল গুলি। গর্জে উঠল বিনয়-বাদল-দীনেশের পিস্তলও! ফোর্ড, জোনস... একের পর এক অফিসারকে অনায়াসে পরাস্ত হতে হচ্ছে
গুলির যুদ্ধে। রণে ভঙ্গ দিলেন তাঁরা। ব্রিটিশ পুলিশকে লজ্জা দিয়েই এই তিন দামালকে
ঠেকাতে সেদিন ডেকে আনতে হয়েছিল গোর্খা সেনাবাহিনীকে। কিন্তু ইতিমধ্যে গুলি শেষ
হয়ে যাওয়ার কারণে তিনজনই আত্মহত্যা করার সিদ্ধান্ত নেন। বাদল গুপ্ত সেখানে মারা
গেলেন। বিনয় বসুকে আহত অবস্থায় হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা হয়। বিনয় নিজের
ক্ষতস্থানে হাত চালিয়ে মৃত্যুকে ত্বরান্বিত করেন। দীনেশকে শেষ পর্যন্ত বাঁচিয়ে
রাখা হয় এবং বিচারের নামে প্রহসন করে তার ফাঁসির আদেশ জারি হয়।
অন্য ধাতুতে গড়া দীনেশ
বন্ধু হিসেবেই ভাবতে পেরেছিলেন মৃত্যুকে।
এক চিঠিতে লিখছেন—
"মৃত্যুটাকে আমরা এত বড় করিয়া দেখি বলিয়াই সে আমাদেরকে
ভয় দেখাইতে পারে। এ যেন ছোট ছেলের মিথ্যা জুজুবুড়ির ভয়। যে মরণকে একদিন সকলেরই
বরণ করিয়া লইতে হইবে, সে আমাদের হিসাবে দুই দিন
আগে আসিল বলিয়াই কি আমাদের এত বিক্ষোভ, এত চাঞ্চল্য? যে খবর না দিয়া আসিত, সে খবর দিয়া
আসিল বলিয়াই কি আমরা তাহাকে পরম শত্রু মনে করিব? ভুল, ভুল। 'মৃত্যু' মিত্ররূপেই
আমার কাছে দেখা দিয়াছে। আমার ভালোবাসা ও প্রণাম জানিবে।"
এদের মহা আত্মত্যাগ
বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে যাচ্ছে।