কাকলি ম্যাম জ্ঞানদীপ বিদ্যাপীঠের কনভেন্ট সেকশনের অঙ্ক ম্যাম। আজ দু’দিন ধরে সরল করা শেখাচ্ছেন ক্লাস থ্রিতে।
মনে রাখার জন্য বদমাস (BODMAS) সূত্রটির প্রতিটা লেটারের ফুল ফর্ম বোর্ডে লিখে
ছাত্রছাত্রীদের মনোযোগ পরখ করছেন। শিক্ষিকাদের শতভাগ চেষ্টা দিতে হয়। সবাই সিসি
ক্যামেরায় নজরবন্দী। তবু কমপ্লেইন বক্সে প্যারেন্টদের ঝুড়ি ঝুড়ি অভিযোগ পড়ে।
“স্টুডেন্টস, অ্যাটেনশন প্লিজ।” ম্যাম
একবার বোর্ডে ও ডেস্কে দৃষ্টি ফেলে বোঝাচ্ছেন। ম্যামের চোখ থিতু হল ফোর্থ বেঞ্চে।
তুতানের ডাগর চোখদুটো মোটা দেয়াল ভেদ করে কত দূরে কে জানে। ম্যাম চোখ পাকিয়ে
বললেন, “তুতান, উঠে দাঁড়াও।” তারপর গলা
চড়িয়ে আবার বললেন, “উঠে দাঁড়াও।” আহ্ণিক তুতানকে ঠেলা দিল। তুতান যেন দূর থেকে
ফিরে এল।
“ম্যাম, আমাকে কিছু বলছেন?”
“আজ্ঞে হ্যাঁ, তোমাকেই বলছি। বলো তো, বদমাসের ফুল ফর্ম কী?” তুতান ঠায় দাঁড়িয়ে।
পারল না তো। “আচ্ছা, শুধু ‘বি’ মিনস? কী হলো? পারবে না তো। পারবে কী করে? তুমি তো খুদে বিজ্ঞানী। দিনেরবেলা ক্লাসরুম থেকে রাতের আকাশ
দেখছিলে, তাই তো?” আহ্ণিক বলল, “বি ফর—”
“ম্যাম, বি ফর ব্র্যাকেট।”
“থ্যাংক ইউ, আহ্ণিক। সিট ডাউন।”
ছেলেরা বলল, “ম্যাম বোর্ডে লেখা আছে। তাও বলতে পারল না।” সবাই হো হো করে
হাসল।
ক্লাস শেষ হলে কাকলি ম্যাম
বললেন, “তুমি আমার সঙ্গে যাবে।”
“কোথায় যাব, ম্যাম?”
“তোমাকে সার্কাস দেখাতে নিয়ে যাব। হেডম্যাম তোমাকে সার্কাস
দেখাবেন।” বেচারা ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে। ম্যাম ক্লাস শেষ করলেন। তুতানের ডান হাতটা
ধরলেন, “চলো।”
হেডম্যাম অফিসে ছিলেন।
কাকলি ম্যাম সবিস্তারে তুতানের অস্বাভাবিক অমনযোগের ব্যাপার স্যাপার বললেন। “ম্যাম, ওর প্যারেন্টসকে কল করা দরকার। ওর কোনো ইমপ্রুভ নেই। ক্লাসে
পুরোপুরি আউট অব মাইন্ড। রেজাল্ট খারাপ হলে তো দায় আমাদের। আপনি যখন সিক লিভে
ছিলেন, টিফিন খেতে না গিয়ে নিলমকে নিয়ে বাবু তিন তলার দরজা খুলে
ওপরে চলে যায়।”
“সে কী? এ তো সাংঘাতিক ব্যাপার।
কিছু হলে দায় আমার উপর বর্তাবে। আমার অ্যাবসেন্সে আপনারা ইশকুল এভাবে চালান? আমাকে জানাননি কেন? দরজা খুলল কী করে? সুইপার কেন দরজা লক করে নি?”
হেডমিসট্রেস রীতিমতো থ।
“ম্যাম, আপনি যান। আমি ওর সঙ্গে কথা বলব।” হেডম্যাম তুতানের হাত ধরে
একটি টুলে বসালেন।
“জানো তো তুতান, তোমার মতো আমারও পড়তে ভালো
লাগত না। সবসময় পড়তে কার ভালো লাগে? কিন্তু ম্যাম যখন
বোঝাচ্ছিলেন তুমি কী ভাবছিলে বলো তো? আমি যখন ছোট ছিলাম তোমার
মতো কত কিছু ভাবতাম। আমারও কল্পনা করতে বেশ লাগত। আজ তুমি কী ভাবছিলে, আমাকে বলো।”
“ম্যাম, আমার একটা সাইকেল আছে। আমি
যদি সাইকেলের চাকায় হিলিয়াম গ্যাস ভরে দিতে পারি, তাহলে ইচ্ছেমতো
যেখানে খুশি উড়ে যেতে পারি। আমি স্বপ্নে প্রায়ই উড়ে বেড়াই।”
“তাই নাকি? তুমি হিলিয়াম গ্যাসের কথা
জানলে কী করে?”
“আমার দিদি তো ক্লাস টেনে পড়ে। ফিজিক্সের স্যার দিদিকে
পড়াতে আসেন। আমার কোনো স্যার নেই। দিদির পাঁচজন স্যার। আমার খালি একজন ম্যাম। তাই
আমি স্যারদের পড়ানো শুনি।”
“তা বেশ। তুমি তো খুব সুন্দর ভাবতে পারো। আর কী কী ভাবনা
তোমার মনে আসে?”
“ম্যাম, আমি বাবাকে বলেছিলাম, আমাকে কিছু যন্ত্রপাতি কিনে দিতে। যা দিয়ে আমি কিছু
সায়েন্স মডেল বানাতে চাই।”
“কী মডেল বানাতে চাও?”
“যেমন ড্রোন, রকেট, এরোপ্লেন ইত্যাদি।”
“সে তো খুব ভালো কথা।”
“কিন্তু বাবা বলে, এখন তুমি ছোট। এসব নিয়ে
ভাবতে হবে না। ম্যাম, আমি যাই বলি, আমার কথা কেউ শুনতে চায়
না।”
“আমি তোমার কথা শুনব। তুমি আমার কথা শুনবে তো?”
“হ্যাঁ, ম্যাম।”
“যদি তুমি সায়েন্স মডেল বানাতে চাও, তোমাকে ধাপে ধাপে ম্যাথস, সায়েন্স পড়তে
হবে। জানতে হবে। সায়েন্স হল সম্যক জ্ঞান। সেই জ্ঞানকে ঠিকঠাক জেনে প্রয়োগ করতে
হবে। একটা কথা বলি, এ বছর ক্লাস থ্রি ও ফোরের জন্য মডেল কম্পিটিশন হবে। তোমার
যে হাতে-কলমে বিজ্ঞান বইটা আছে, সেখান থেকে একটা মডেল
বানাবে। নিজে বানাতে হবে কিন্তু। তারপর পিচবোর্ডে সাদা কাগজ চিটিয়ে পরিচ্ছন্ন করে
লিখবে। বিচারকদের কাছে যে সবচেয়ে ভালো বিশ্লেষণ করতে পারবে, সে পুরস্কার পাবে। এভাবে বিজ্ঞানকে জেনে বুঝে প্রয়োগ করলে, বড় হলে তুমিও বিজ্ঞানী হবে।”
তার আগে ক্লাসের যা যা পড়া, সব মন দিয়ে শোনা চাই। রেগুলার হোমওয়ার্ক করা চাই। আর তুমি
তো ম্যামদের তোমার জন্মদিনে চকোলেট খাইয়েছ। তার মানে তুমি ম্যামদের ভালোবাসো।
তাহলে ম্যামদের পড়ানো না শুনলে, ওনারা মনে কষ্ট পাবেন।
তাছাড়া ভালো করে পড়াশোনা না করলে, তোমার বাবা-মাও কষ্ট পাবেন।
তুমি রেজাল্ট খারাপ করলে,
তোমার প্যারেন্টস ম্যামদের নামে কমপ্লেইন করবেন। সেটা কি
ঠিক হবে? আচ্ছা, সেদিন নিলমকে নিয়ে ছাদে
গেছিলে কেন? নিশ্চয়ই কিছু খুঁজছিলে?”
“ম্যাম, আমাদের একতলা ঘর। আকাশ অনেক
দূরে। ভূগোলের ম্যাম বলেছিলেন আকাশ পর্যবেক্ষণ করে লিখতে। তিন তলায় উঠলে আকাশকে
অনেক কাছে থেকে দেখতে পাব। তাই নিলমকে নিয়ে তিন তলার ছাদে উঠেছিলাম।
নিলমের তো ছাদ দেওয়া ঘর নেই। ছাদ থেকে কোনোদিন আকাশ দেখেনি। নিলম আমার প্রিয়
বন্ধু। বন্ধুকে অজানা কিছু জানাতে হয়। আপনারা তো বলেন।”
হেডম্যাম হাসি চাপলেন।
তুতান একটু ভেবে বলল, “ম্যাম, এবার থেকে আমি মন দিয়ে
ক্লাস শুনব।”
তুতান একদিন খুঁড়িয়ে
বাড়ি ফিরল। ওর বাবা-মা ওকে তলব করে জানতে পারলেন কারণটা। ছুটির পর তুতান সেকেন্ড
ট্রিপে বাড়ি আসে। ক্লাস ফোরের মৃন্ময় ওর পায়ে ক্যারাটে মার টেস্টিং করেছিল।
বেচারা পায়ে ব্যথা নিয়ে গাড়ি থেকে নামতে গিয়ে পড়ে যায়। ডাক্তার বললেন, পায়ের পেশিতে খুব চোট পেয়েছে। বেচারা চারদিন ঠিকমতো
হাঁটাচলা করতে পারল না। তুতানের বাবা হেডম্যামকে ফোন করে জানালেন।
হেডম্যাম বললেন, “দেখুন, দুজনেই ছোট। আমরা দুঃখিত।
আগে তুতান সেরে উঠুক। তুতান যেদিন স্কুলে আসবে, ওদের রেখে আমরা কথা বলব।”
তুতানের বাবা তুতানকে আনতে
গেলেন। ছুটির পর বাচ্চারা চলে গেছে। গেটের কাছে আসতেই তুতান মৃন্ময়ের হাত ধরে এল।
“বাবা, প্লিজ মৃন্ময় দাদাকে বকবে
না। দাদা আমাকে কত খেলা শেখায়। দাদার কাছ থেকে ক্যারাটে শিখেছি। ক্যারাটে
আত্মরক্ষার জন্য দরকার। ও বাবা, হেডম্যামের কাছে দাদাকে
নিয়ে যাবে না। কথা দাও। দাদা আমাকে ‘সরি’ বলেছে।”
মৃন্ময় রঙন গাছের আড়ালে
কাচুমাচু দাঁড়িয়ে ছিল। তুতান ডাক দিল, “মৃন্ময় দা এসো, বাবা বকবে না।” মৃন্ময় মাথা নিচু করে এগিয়ে এল। “সরি
আঙ্কল, ভুল হয়ে গেছে।”
তুতানের বাবা পকেটে হাত
ঢুকিয়ে দুটো ক্যাডবেরি বের করলেন। দুজনের হাতে দিলেন। ওরা হাত ধরে আবার খেলতে চলে
গেল।
হেডম্যাম শুনে ধন্যবাদ
জানালেন তুতানের বাবাকে। তিনি তুতান ও মৃন্ময়কে ডেকে অনেক আদর করলেন।
বিদ্যাপীঠের বার্ষিক
অনুষ্ঠান ও পুরস্কার বিতরণে অতিথিবৃন্দ সব ক্লাসের পুরস্কার প্রাপকদের হাতে
পুরস্কার তুলে দিলেন। পুরস্কারপ্রাপকরা খুশিতে উজ্জ্বল। তুতান কোনোদিন পুরস্কার
পায়নি, তাই বাবা-মা’র মন খারাপ ছিল।
হেডম্যাম মাইক্রোফোন হাতে
নিলেন—
“একটি গুরুত্বপূর্ণ পুরস্কার আমরা এ বছর থেকে চালু করলাম।
সেটি হলো 'প্রাইজ ফর ইনোভেটি থট, গুড ম্যানার, এণ্ড
ফ্রেণ্ডশিপ'। এ বছর এই
পুরস্কার পাচ্ছে ক্লাস টু থেকে তুতান জানা।”
দর্শকাসন হাততালিতে গমগম
করে উঠল। তুতান মঞ্চ থেকে দেখতে পেল তার বাবা-মাকে। তারা সবার সঙ্গে হাততালি
দিচ্ছেন, চোখে আনন্দাশ্রু।