তখন মাধ্যমিক দেওয়ার প্রস্তুতি চলছে। ক্লাস টেনে উঠে প্রথম টিউশন নিলাম। গ্রামেই উত্তম গোস্বামীর পাঠশালা। উত্তম গোস্বামী দূর সম্পর্কের আমার মামা। ক্লাস ফাইভ থেকে টেন পর্যন্ত সব ক্লাসের ছেলে মেয়ে পড়াশোনা করে। বলরাম বাড়ির আট চালায় বসত সেই পাঠশালা। গ্রামের মধ্যিখানে বলরাম ঠাকুরের মন্দির সংলগ্ন।
আলাদা আলাদা ক্লাসের ছেলে মেয়ে এক একটা জায়গা দখল করে বসতো।
সারা বছর এই জায়গা গুলো পার্মানেন্টলি ভিন্ন ভিন্ন ক্লাসের জন্য বরাদ্দ ছিল। তখন ব্যবহার ছিল না ইমারজেন্সি লাইটের। লোডশেডিং এ একমাত্র হারিকেনই ছিল ভরসা। ক্লাস টেন
এর ছাত্র ছাত্রীরা অর্থাৎ আমরা নাটমন্দিরের ভিতরে বসতাম। ওই জায়গাটা বেশ নিরিবিলি
ছিল। কোন হৈ হট্টগোল ওখানে পৌঁছাত না। পড়াশোনার কোন অসুবিধা যাতে না হয় তাই এ
ব্যবস্থা।
ক্লাস টেনের ছাত্র ছাত্রীদের মধ্যে কয়েক জন খুব ডানপিটে
টাইপের ছিল। তাদেরকে সামলাতে মামাকে প্রায়ই বেশ বেগ পেতে হত। ধৈর্য হারা হয়ে গেলে লাঠির বাড়ি পড়তো অনেকের পিঠেই। বদমাশী বুদ্ধি আমারও কম ছিল না। কিন্তু পড়াশোনা ভালো করার জন্য অনেক সময়ই রেহাই পেয়ে
যেতাম।
বিশুদা তো পড়াশোনার থেকে বদমাশী বেশি করতো। কয়েক বছর ফেল মেরে মেরে একই ক্লাসে থাকায়, আমরা তাকে ক্লাস টেনে গিয়ে ধরি।
আটচালায় জুতো পরে ওঠার নিয়ম ছিল না। নিচে খুলে রাখতে হতো। কোনোদিন দুটো জুতোয় দড়ি বেঁধে রেখে দিত, তাড়াহুড়ো করে জুতো পড়তে গেলে আছাড় খেয়ে পড়তো। বদমাশীর নিত্য নতুন কৌশল তাদের মাথা
থেকে বের হত। পড়াশোনা নামে মাত্র। তাদের না ছিল কোন টেনশন না ছিল কোন ভয়ডর। অবশ্য
যারা পড়াশোনা করার তারা ঠিক করে যেত।
আমিও এই রকম পরিবেশে নিজেকে মানিয়ে নিয়েছিলাম। সেই জোয়ারে
গা ভাসিয়ে দিয়ে বেশ মজাই লাগতো। এসব কথা মামার কানে পৌঁছালে যেই করে থাকুক। শাস্তির খাঁড়াটা ক্লাস টেনের সকল
ছাত্র দের উপর নেমে আসতো। গরু পেটানোর মত পেটাতো।
একদিন এক ঘটনা ঘটায় পাঠশালার মধ্যে এক আশ্চর্য রকম নীরবতা
নেমে এসেছিল। একটা পিন পড়লেও সেই শব্দ
যেন কানে এসে পৌঁছায়। রাত দশটা টা বাজলে অন্যান্য ক্লাসের ছুটি হয়ে যেত। শুধু
আমাদের ছুটি হতো মামার মর্জিতে। সেদিন এগারোটা বেজে গেলেও কারও সাহস হচ্ছিল না
মামাকে কিছু বলার। মামা মাঝে মধ্যে রেগে
বিড়বিড় করে বলেই যাচ্ছিল-- বাবা মায়ের পয়সাগুলো জলে দিতে এসেছে সব। সামনে পরীক্ষা
কারও মনে একটুও ভয়ডর বলে কিছু নেই?
আশ্চর্য ব্যাপার---
আমরা এর ওর দিকে চাওয়া-চাওয়ি করতে করতেই বইয়ের দিকে তাকিয়ে মনে মনে পড়ার চেষ্টা করছিলাম। হঠাৎ একটি শব্দে হতচকিত হয়ে গেলাম। ভালো করে বোঝার জন্য কান পেতে রইলাম। হাল্কা
ঠান্ডা আবহাওয়ায় চারিদিকে নিস্তব্ধ রাত বিরাজ করছে। শুধু ঝিঁঝিঁ পোকার আওয়াজ ছাড়া
আর কিছু কানে আসছে না। বেশ কিছুক্ষণ বাদ আবার একই শব্দ। এবার একটু জোরেই মনে হলো।
স্পষ্ট ঘুঙুরের শব্দ। মামার কানেও গেল। মামা ঝেড়েমেরে উঠে দাঁড়াতেই, আমরা সবাই উঠে দাঁড়িয়ে এদিক ওদিক দেখতে লাগলাম। হারিকেনের
আলোয় কিছুই তেমন দেখা গেল না। আমার পকেটে একটি টর্চ থাকতো সবসময়। পিসেমশাইয়ের
দেওয়া গিফট। টর্চ জ্বেলে ও কিছু দেখতে পেলাম না। মামা ছুটির কথা বলতেই আমরা যে যার
বাড়ি চলে গেলাম সে দিন কার মত।
পরের দিন এই সামান্য ঘটনা গ্রামে প্রায় সবার কানে কানে
ছড়িয়ে পড়লো। গ্রাম বাংলায় এখনো কোনো কথা উঠলেই তা এ কান ও কান করে সারা গ্রামে
ছড়িয়ে পড়ে মিডিয়ার মতো। কেউ নিছকই ঘটনা মনে করে এড়িয়ে গেল। কেউ আবার এটাকে
আধ্যাত্মিক ঘটনা ভেবে বলরাম ঠাকুরের মাহাত্ম প্রচারে নেমে পড়লো। তার ফল স্বরূপ নাট
মন্দিরের ভিতরে বসে পড়াশোনা বন্ধ করতে হলো। আমার মনে নানারকম প্রশ্নের উদয় হতে লাগলো। আকাশ পাতাল
চিন্তায় পড়াশোনার উপর প্রভাব পড়লো। নিজের প্রশ্নের উত্তর নিজেই খুঁজতে লাগলাম। আমার ছোটো থেকেই কোনো ভয়ডর ছিল না।
এখনো নেই। ভূতের ভয় আমাকে কোনোদিন পেয়ে বসেনি।
দু-চার দিন অন্তর পড়ার শেষে হারিকেন নিয়ে মন্দিরের চারিপাশে
একাই ঘুরতে লাগলাম। ফুলের বাগান সাজ ঘর নাটবাংলা রান্নাশালা আটচালা ও বহু পুরানো
বকুল গাছের তলা। আমার সহপাঠীরা ও অন্যান্য ছাত্রছাত্রীরাও ভয় পেয়ে গিয়ে ছিল। শুধু
মাত্র আমার কথার যুক্তি মেনে আমার বন্ধু ও ক্লাসফ্রেন্ড সুশান্ত আমার সাথে ছিল। ছোট থেকে অনেক
গোয়েন্দা গল্প রহস্য উপন্যাস পড়ে পড়ে মানুষের রটনা নিয়ে বিশ্বাসী ছিলাম না। ফেলুদা
কাকাবাবু ও পাণ্ডব গোয়েন্দার বাবলু ছিল আমার প্রিয় চরিত্র।
সুশান্ত কে নিয়ে আমার মিশন শুরু হলো। এর জন্য গ্রামের অনেক
মানুষের কাছ থেকে ধমকানিও কম শুনতে হয়নি। আমার বাবা ছিল প্রচণ্ড সাহসী মানুষ।
ক্র্যাচ নিয়ে হাঁটলেও অসম্ভব মনের জোর ছিল তার মধ্যে। তাই বাবা কিছু না বললেও মা
সাবধান করেছিল। একটি মাত্র ছেলে, কোথা থেকে কি
হয়ে যায় কেউ কি বলতে পারে!
আমি কিছুতেই দমবার পাত্র নই। জানার কৌতূহল আমাকে পাগলের মত
পেয়ে বসলো। পড়াশোনায় অন্যমনস্কতা দেখে মামা বলেছিল- ''ভালো করে পড়াশোনা কর। বড় হয়ে বাবার মত মাস্টার হতে হবে।
সমাজের বুকে মাথা তুলে দাঁড়াতে হবে''। শব্দ গুলো কান ভেদ করলেও মন ভেদ করতে পারে নি।
প্রায় দিনই সুশান্ত কে নিয়ে খোঁজাখুঁজি করতে লাগলাম। কোথা
থেকে সেই ঘুঙুরের শব্দ আসে।
পৌষ মাসের রাত। এবারে ঠান্ডাটা বেশ জেঁকে বসেছে। রাত সাড়ে
দশটায় পড়ার ছুটি হয়ে গেল। সামনেই মাধ্যমিক পরীক্ষা। তবুও সুশান্ত আমি বসে রইলাম আজ
একটা হেস্তনেস্ত করেই ছাড়তে হবে। অনেকক্ষণ বসে আছি। আস্তে আস্তে গোটা পাড়া তখন
ঘুমিয়ে পড়েছে। আমরা দুজনে জেগে আছি দুটি হারিকেনের মিটমিটে আলোয়। দুজনে রীতিমতো
বসে বসে কাঁপছি। জানিনা আজ আমাদের কপালে কি আছে। সত্যই কি বলরাম নুপুর পায়ে
ফুলবাগানে ঘুরে বেড়ায়, না কোনো ভূতুড়ে কাণ্ড ঘটে সেটাই দেখার।
আমরা নাটবাংলার ভিতরে গিয়ে বসলাম। এখানে ঠান্ডা টা একটু কম
চারদিক ঘেরা থাকার জন্য। ভিতরে ভিতরে একটা চাপা উত্তেজনা অনুভব করছি। ভয়ও হচ্ছে
একটু একটু। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নিস্তব্ধতা বেড়েই চলেছে।
ঘুঙুরের আওয়াজ পেলাম মনে হচ্ছে না?
সুশান্ত বললো- কই শুনতে পাই নি তো। আসলে তোর মনের মধ্যে সব সময় ঘুঙুর বাজছে। চল আজ বাড়ি
যাই। শুধু শুধু বকাবকি শুনতে হবে বাড়িতে।
আমার মন বলছে আজ রাতেই ঘটবে কিছু একটা। বলতে না বলতেই আবারও
ঘুঙুরের ওয়াজ। এবারে সুশান্তের কানেও গেল। শব্দটা বাগানের ভিতর থেকে এলো মনে হল। হারিকেন দুটো কমিয়ে দিলাম। পকেট থেকে টর্চটা বের করে বললাম
চল বাগানের ভিতরে ঢুকি।
সুশান্ত ভয় পেল। ওখানে সাপের আড্ডা।
আমি বললাম- চল না কিছু
হবেনা তুই আমার পিছনে থাকবি। শীতকালে সাপের উপদ্রব থাকে না। ও ভয় পেয়ে আমার হাতটা
শক্ত করে চেপে ধরলো। অতি সন্তর্পণে
পা টিপে টিপে বাগানের ভিতর ঢুকলাম। অন্ধকার আকাশে শুধু একফালি চাঁদ জেগে আছে। মাঝে
মধ্যে অনেক দূরের দু-একটা কুকুরের ডাক শুনতে পাচ্ছি। এই অবস্থায় আমাদের কেউ দেখে
ফেললে সেই হয়তো ভয় পেয়ে যাবে।
আবার ঘুঙুরের শব্দ। এবার সত্যিই ভয় পেলাম। হাত পা ভয়ে
কাঁপছে। শিরদাঁড়া দিয়ে যেন একটা ঠান্ডা তরল পদার্থ নেমে গেল। কাঁপা কাঁপা হাতে
টর্চটা ধরে রাখলাম। যেদিক থেকে শব্দটা এলো মনে হল সেদিকে তাক করে টর্চ জ্বালালাম।
গন্ধরাজ গাছের গোড়ায় কি ওটা?
সুশান্ত এগিয়ে এসে বললো- ওটা তো নেউল। সম্ভবত কারও পোষা ছোট্ট নেউল।
শরীরের সমস্ত উত্তেজনা নিমেষে উধাও হয়ে গেল। গলায় ঘুঙুর বাঁধা নেউল বাচ্ছাটা টর্চের আলোর দিকেই তাকিয়ে আছে ভয়ে।