আবার শুনতে পেল, একটা ভারি অদ্ভুত গলায় কে
যেন বলছে, “ অংক গুলো তোমার জানা ছিল। মাস্টারমশাই অনেক বার করে তোমায়
অভ্যাস করিয়েছেন। বিজ্ঞানের উত্তর লেখার সময় তুমি জানলার দিকে হাঁ করে না
তাকিয়ে থাকলে ঠিক ঠিক উত্তর দিতে পারতে।”
"কে?
কে?"
বলে একটু জোরে চিৎকার করে উঠতেই পাশ থেকে ও দেখতে পেল একটা
লম্বা, ঢ্যাঙ্গা মতো, রোগাটেপানা লোক বেশ খানিকটা
উঁচু থেকে ওর দিকে তাকিয়ে আছে। পুকাই চট করে ঘাবড়ানোর ছেলে নয়। তাই দাঁড়িয়ে
লোকটার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, “তুমি কি ভূত? আমাকে ভয় দেখাতে এসেছো? কিন্তু আমি মোটেও ভয়
পাচ্ছি না। আর আমার লেখাপড়া করতে ভালো লাগেনা। সেই একই অংক, একই বাংলা পড়া, এসব করতে মোটেও ইচ্ছে করে
না।”
সেই লম্বাপানা লোকটা পুকাইয়ের দিকে তাকিয়ে বলল, “আমি ভূত ঠিকই, তবে ভালো ভূত। আমাকে সবাই
দেখতে পায় না। আর আমি সবাইকে ভয় দেখাতে চাই না। কিন্তু আজ দেখলাম তোমার মনটা
একটু খারাপ। তুমি দুঃখে আছো। যখন তোমার প্রাণের বন্ধু লাড্ডু তোমার থেকে অংকে
সাড়ে সাত নম্বর, ইংরেজিতে নয় নম্বর, আর বিজ্ঞানে পাঁচ নম্বর
বেশি পেয়ে গেল, তখন তোমার কিন্তু চোখের কোণে এক ফোঁটা জল আমি দেখতে
পেয়েছিলাম।”
পুকাই বলল, “মিছে কথা। আর লাড্ডু বেশি
পেয়েছে কারণ ও পাশে বসা ঝিনুকের থেকে খানিকটা দেখে দেখে লিখছিল। আমি কিন্তু কোন
চিটিং করিনি।”
ভালো ভূত বলল, “সে তো আমি সবই জানি। তোমার
বুদ্ধি আছে। তুমি যেটুকু নম্বর পেয়েছ তোমার নিজের দেওয়া উত্তরেই পেয়েছো, কিন্তু আমি জানি যে, তুমি কিন্তু চাইলেই লাড্ডুর
থেকে, বেশি নম্বর পেতে পারতে। কাল রাতে যে স্বপ্নটা দেখে তুমি
একটু ভয় পেয়েছিলে, সেটার কথাও আমি জানি।”
পুকাই একটু অবাক হয়ে বলল, “আমি কি স্বপ্ন
দেখেছি তুমি সেটা কী করে জানো? আমি তো কাউকে আমার স্বপ্নের
কথা বলিনি, এমনকি লাড্ডুকেও না। তাহলে?”
ভূতটা বলল, “আমি তো আসলে তোমার মনের
আয়নার থেকে তৈরি। তাই তোমার মনের ভেতরে কী হচ্ছে, তোমার মগজে কী
সব চিন্তা কিলবিল করছে, এগুলো সবই আমার জানা। আসলে তুমি একটা খাঁটি ছেলে। তবে মাঝে
মাঝে দু-চারটে মিথ্যে কথা তুমি মাকে, তোমার দিদিকে, বলে ফেলো ঠিকই, তবে সেটা খুব গুরুতর বিষয়
নয়।”
এসব শুনে পুকাই একটু যেন অন্যমনস্ক হয়ে গেল। আসলে দু চার
দিন আগে ও যখন স্নান করছিল তখন স্নান ঘরে একটা কালো, মোটা, টিকটিকি, এক দেওয়াল থেকে অন্য
দেওয়ালে একটা আরশোলা ধরার জন্য ঝাঁপ দিয়েছিল ওর ঘাড়ের ওপর দিয়ে। এই দুটো
প্রাণীকে পুকাইয়ের একদম ভালো লাগেনা। তাই প্রায় ভিজে গায়েই স্নান ঘর থেকে
বেরিয়ে স্কুলে চলে গেছিল। কিন্তু তারপর থেকেই মনের মধ্যে কেমন একটা খারাপ লাগা
তৈরি হয়েছে।
গতরাতে ঘুমের মধ্যে ও স্বপ্নে দেখতে পেয়েছিল যে, ওই স্নানঘরের টিকটিকিটা অনেক বড় হয়ে গিয়ে এটা কুমিরের মত
আকার ধারণ করেছে। আর ওর মাথায় একটা বেশ বড়সড়ো, ঝলমলে মণিমুক্ত
লাগানো সোনার মুকুট। দাঁত বার করে ওর দিকে তাকিয়ে হাসছে আর বলছে, “পুকাই, আমি হলাম গিয়ে তোমার
স্নানঘরের রাজা। তুমি আমাকে একবার লাঠি দিয়ে মারতে চেয়েছিলে। আজকে আমি দলবল
নিয়ে তার প্রতিশোধ নিতে এসেছি। আমার ডান পাশে আছে লেজটা কাটা গৃহগোধিকা। আজ থেকে
প্রায় দেড় মাস আগে তুমি ওর দিকে শক্ত সাবানটা ছুঁড়ে মেরে ছিলে। ভয়ে বেচারা লেজটা
কোনরকমে খসিয়ে পালিয়ে গিয়েছিল। আজকে ও তোমার ওপরে প্রতিশোধ নিতে চায়। আর ওই যে
দূরে দেখছো! দেখো শয়ে শয়ে সব আরশোলা কেমন চিৎপাত হয়ে গেছে। আমরা ওদের শুঁড়
গুলোকে সংগ্রহ করে একটা গালিচা বানাবো। আমি জানি, তুমি আসলে এসব
ভালোবাসো না। আরশোলাদেরকেও তুমি স্প্রে দিয়ে মেরে ফেলো। আমাদের খাদ্য নষ্ট করার
জন্য তোমার উচিৎ শাস্তি হওয়া প্রয়োজন। ওই বিষাক্ত স্প্রের গন্ধে আমাদেরও অনেক
বাচ্চা ডিম ফুটে বের হতে পারেনি। অনেকে মারা গেছে। এটা মোটেও ভালো কথা নয়। এর ফল
আমরা তোমার ওপরেই প্রয়োগ করবো। শুধু তাই নয়, তোমার ওই দুর্গন্ধযুক্ত
বিষাক্ত স্প্রের জন্য আমাদের খাবারের যেমন অভাব হচ্ছে, তেমনি আরো অন্যান্য পোকামাকড় গুলোও হারিয়ে যাচ্ছে। এটা
মোটেও উচিৎ কথা নয়। তাই আজকে আমরা তোমাকে “আতঙ্ক দণ্ড” দেবো।” পুকাই স্বপ্নের
মধ্যে দেখলো যে, ওই রাজার মত টিকটিকিটা, আর তার সাঙ্গোপাঙ্গরা ওর
দিকে বান্ডিল বান্ডিল আরশোলার থোকা ছুঁড়ে দিচ্ছে আর আরশোলাগুলো ওর গায়ের উপরে
উঠে, তার চোখে মুখে মাথায়, সব নৃত্য করছে। আর বলছে, “দেখ্ কেমন মজা! দেখ, কেমন মজা!” এটা দেখেই ভয়ে
ওর স্বপ্নটা ভেঙে গেছিল, তারপর আর ভালো করে ঘুম আসেনি। এই দৃশ্যটা মনের মধ্যে উঠে
আসতেই ও ভালো ভূতের সামনে অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিল।
ভালো ভূত আবার বলল, “দেখেছ, পোকারা অন্যের ক্ষতি করে ওরা খারাপ, এটা সর্বদা ঠিক নয়। বিশেষ করে খাদ্য-খাদকের সম্পর্কগুলো
নষ্ট করা একদমই উচিত নয়। তুমি যদি আমার কথা মানো, তাহলে প্রতিদিন
সকালে আর সন্ধ্যায় পড়তে বসার সময় আমি তোমাকে একটা জাদু আয়না দেব। আয়নাটা তুমি
দেখতে পাবে না। কিন্তু যে অংক গুলো তুমি ঠিক বুঝতে পারো না, করতে পারো না, বিজ্ঞানের যেটা তোমার
অসুবিধা হয়, সেটা ওই জাদু আয়নাকে বললেই ও তোমাকে সহজ করে ব্যাপারটা
বুঝিয়ে দেবে। কিন্তু জাদু আয়নাকে অন্যভাবে কাজে লাগালে ও কিন্তু আর কাজ করবে না, বরঞ্চ তাতে তোমার ক্ষতিই হবে। তুমি জাদু আয়নার সাহায্যে
তোমার পড়া তৈরি করতে পারবে, লিখতে পারবে। আর এটা যদি
তোমার আয়ত্তের মধ্যে চলে আসে তাহলে দেখবে নিজে নিজেই সব করতে পারছো। আর পরীক্ষাতে
ভালো নম্বর পাচ্ছ। লাড্ডুর থেকেও বেশি।”
পুকাই জিজ্ঞেস করল, “কখন দেবে আমাকে জাদু আয়না? দাও তাহলে এখনি, জাদু আয়নাটা আমি বাড়ি
নিয়ে যাই।
ভালো ভূত বললো, “জাদু আয়না ঠিক সময়ে তুমি
পেয়ে যাবে। এখন আইসক্রিমটা শেষ করে দ্রুত বাড়ি চলে যাও। গিয়ে হাত মুখ ধুয়ে, খাওয়া দাওয়া করে পড়তে বসো। নিজেই বুঝতে পারবে কখন জাদু
আয়না তোমাকে সাহায্য করছে। মনে রেখো, জাদু আয়না যদি একবার বুঝতে
পারে যে তুমি কোন অসৎ উপায়ে অবলম্বন করছো, তাহলে কিন্তু ওটা চিরতরে
হারিয়ে যাবে। তাই খুব সাবধান। নিজের কাজ নিজে করবে। দেখবে জাদু আয়না ঠিক তোমার
সঙ্গে আছে আর তোমাকে সাহায্য করছে।”
এই বলেই ভালো ভূত হঠাৎই কোথায় যেন মিলিয়ে গেল, আর পুকাই দেখল ও বাড়ির একদম কাছে চলে এসেছে। জাদু আয়নার
কথা মনে গেঁথে গিয়েছিল। তাই আর দেরি না করে জাদু আয়নার কেরামতি দেখার জন্য ও
দ্রুত পড়তে বসে গেল।