সুমন যেদিন প্রথম উনকোটিতে এসে পৌঁছাল সেদিনটা ছিল নরম আলোর দিন। পাহাড়ের গায়ে আলো পড়ে পাথরের মূর্তিগুলো সোনালি হয়ে উঠেছিল, আর ত্রিশ ফুট উঁচু কালভৈরবের মুখে এমন একটা আশ্চর্য আলোছায়ার খেলা যে দেখে মনে হচ্ছিল তিনি চোখ খুলতে চলেছেন।
পর্যটন দফতরে চাকরি পাওয়ার পর প্রথম পোস্টিং এখানে, কৈলাশহর থেকে আট
কিলোমিটার ভেতরে, জঙ্গলের মধ্যে, যেখানে পর্যটক
আসে বেশিরভাগ শীতের মরশুমে,
বাকি সময়টা পাখি
আর বানরই দর্শনার্থী।
সুমনের কাজ সোজা — পর্যটকদের ঘুরিয়ে দেখানো, কিংবদন্তি বলা, ছবি তোলার জায়গা
দেখিয়ে দেওয়া। কালু কুমারের গল্প — সে পার্বতীর ভক্ত, তারপর শিবের শর্ত
— এক রাতে এক কোটি মূর্তি শেষ করতে হবে, দেখতে দেখতে ভোর হয়ে গেল, এক কোটি মূর্তির চেয়ে একটি কম হল, শিব চলে গেলেন
কৈলাসে, কালু রয়ে গেলেন
পাথর হয়ে। গল্পটা সুমন মুখস্থ করে ফেলেছিল তিনদিনের মধ্যে।
কিন্তু চতুর্থ দিন ভোরে একটা অদ্ভুত জিনিস সে খেয়াল করল।
প্রতিদিন সকালে উনকোটির মূর্তিগুলোর গায়ে শিশির জমে। এটা
স্বাভাবিক — পাহাড়ি জায়গা, কুয়াশা নামে, জলকণার দরুন পাথর ঠান্ডা হয়ে যায়। কিন্তু সেদিন সুমন দেখল
— গণেশকুণ্ডের পাশে, সিঁড়ির শেষে, যে ছোটো অসমাপ্ত
মূর্তিটা আছে — না শিব, না বিষ্ণু, না গণেশ, কোনো দেবতা নয়, শুধু একটা
মানুষের অবয়ব, মুখটা অস্পষ্ট, যেন ভাস্কর শেষ
করতে পারেননি — সেই মূর্তিটার বুকে শিশিরের ফোঁটাগুলো একটা আকার নিয়েছে। বিন্দু
বিন্দু জল, কিন্তু সেই জলকণা
এলোমেলো নয়, তারা একটা অক্ষর
তৈরি করেছে।
সুমন কাছে গিয়ে হাঁটু গেড়ে বসল মূর্তিটার সামনে। সকালের
প্রথম আলো তখন পাথরে পড়েছে, আর সেই আলোয় শিশিরের অক্ষরটা ঝকমক করছে। অক্ষরটা বাংলা, কিন্তু চেনা
বাংলা নয়। পুরোনো, গোল, বাঁকা, প্রাচীন লিপির
মতো। সুমন ফোনে ছবি তুলে রাখল। একটু পরে রোদ উঠল, শিশির উবে গেল, অক্ষরটাও মিলিয়ে গেল।
পরদিন আবার। একই মূর্তি, একই জায়গা, কিন্তু অন্য অক্ষর। সুমন আবার ছবি তুলল। এবার সে নিশ্চিত —
ব্যাপারটা দৈবাৎ নয়, শিশির নিজে থেকে
তো অক্ষর বানায় না। কিন্তু কে বানাচ্ছে? রাতে কেউ আসে? সুমন মূর্তিটা পরীক্ষা করল — পাথরের গায়ে কোনো খোদাই নেই, কোনো খাঁজ নেই
যেখানে জল জমে এই আকার নিতে পারে। পাথর মসৃণ।
তৃতীয় দিন সুমন ভোর চারটেয় এসে বসে রইল মূর্তির সামনে।
অন্ধকার, টর্চ জ্বালাল না, চুপ করে বসে রইল।
শীতের ভোর, ভেতরে সোয়েটার
তার ওপরে পশমের জ্যাকেট, তবু ঠান্ডায়
দাঁত কিড়মিড় করছিল। জঙ্গলের ভেতর থেকে কী যেন ডাকছিল — পাখি না পোকা, বোঝা গেল না।
কুয়াশা ঘন হয়ে পাহাড়ের ওপর থেকে গড়িয়ে নামছিল, দেখে মনে হচ্ছিল কেউ যেন সাদা কাপড় বিছিয়ে
দিচ্ছে উপত্যকা জুড়ে। সুমন দেখল — কুয়াশার মধ্যে থেকে জলকণা এসে বসছে পাথরের
বুকে, ধীরে ধীরে, একটু একটু করে, যেন কেউ অদৃশ্য
আঙুলে লিখছে। কখনো থামছে,
কখনো আবার শুরু
করছে, যেমন লেখক ভাবে
তারপর লেখে। কতক্ষণ কেটে গেল সেদিকে হুঁশ ছিল না সুমনের। ভোরের প্রথম আলো পড়তেই
অক্ষরটা স্পষ্ট হল — এটা আরেকটা, আগের দিনের থেকে আলাদা।
সুমনের মেরুদণ্ড দিয়ে একটা ঠান্ডা স্রোত নেমে গেল। এটা
প্রকৃতির খেলা নয়। এটা কেউ লিখছে।
চতুর্থ, পঞ্চম, ষষ্ঠ, সপ্তম দিন — প্রতিদিন একটা করে নতুন শব্দ। সুমন প্রতিদিন
ভোরে আসত, ছবি তুলত, খাতায় আঁকত।
ষষ্ঠ দিন সে লক্ষ করল — অক্ষরগুলো শুধু পাথরের একই জায়গায় ফুটছে, মূর্তির বুকে, ঠিক যেখানে
হৃদপিণ্ড থাকে। সাতদিনে সাতটা শব্দ উদ্ধার করা গেল তবে তাদের মর্মোদ্ধার করা গেল
না।
সুমন কাগজে লিখে রাখল। অক্ষরগুলো চেনা হরফে নয় — বাংলা বলে
মনে হচ্ছে, কিন্তু আজকের
বাংলা নয়, অন্য কোনো
সময়ের। সুমন গুগলে সার্চ করল — 'প্রাচীন বাংলা লিপি', 'পুরোনো বাংলা অক্ষর' — কিছু ছবি এল, কিছু মিলল, বেশিরভাগ মিলল না। চেনা পরিচিত কাউকে ফোন করেও কোনো সমাধানে
আসা গেল না। তবে কয়েকজন কৈলাশহরে তরুণবাবুর সঙ্গে দেখা করার উৎসাহ দিল। তরুণবাবু।
কলেজে বাংলার অধ্যাপক, অবসরের
দোরগোড়ায় এখন। সুমন তাঁকে চেনে সামান্যই — একবার উনকোটিতে কলেজের ছাত্রদের নিয়ে
এসেছিলেন, সুমন গাইড করেছিল, তরুণবাবু শুনতে
শুনতে মাঝে মাঝে মাথা নাড়ছিলেন, শেষে বলেছিলেন, "গল্পটা বেশ বলো, কিন্তু আসল ইতিহাসটা আরও অদ্ভুত।" সুমন
তখন আর কথা বাড়ায়নি। আজ সেই কথাটা মনে পড়ল।
তরুণবাবুর বাড়ি কৈলাশহর পুরনিগমের আট নম্বর ওয়ার্ডে, মূল রাস্তা থেকে
একটু ভেতরে ঢুকে হাতের বাঁদিকে। ছোটো বাড়ি, সামনে একটা বাগান। বারান্দায় বইয়ের স্তূপ। ঘরেও তাই। সুমন
গিয়ে দেখল তরুণবাবু বারান্দায় বসে চা খাচ্ছেন, কোলে একটা খাতা, যেটায় কিছু লিখছিলেন।
সুমন পরিচয় দিয়ে কুশল বিনিময় করে কাগজটা বের করতেই
তরুণবাবু হাতের চায়ের কাপটা নামিয়ে রাখলেন। চশমা ঠিক করলেন। তারপর কাগজটা হাতে
নিয়ে অনেকক্ষণ চুপ করে তাকিয়ে রইলেন। এদিকে সুমনের অস্বস্তি বাড়ছে। ভাবল হয়তো
পড়তে পারছেন না, বলবে এটা আমার
চেনা নয় — কিন্তু তরুণবাবু চুপ করে আছেন অন্য কারণে।
অবশেষে বললেন, "এটা কোথায় পেলে?"
সুমন বলল পুরো ঘটনাটা — শিশির, অক্ষর, প্রতিদিন নতুন, কুয়াশার লেখা।
বলতে বলতে নিজেরই মনে হচ্ছিল পাগলের প্রলাপের মতো শোনাচ্ছে, কিন্তু তরুণবাবু
মন দিয়ে শুনলেন সব।
শুনে বললেন, "এটা প্রাচীন বাংলা। চর্যাপদের ভাষা। সন্ধ্যা
ভাষা — আলো আঁধারির ভাষা,
খানিক বোঝা যায়, খানিক বোঝা যায়
না।"
"কী লেখা আছে এতে
বলুন না?"
তরুণবাবু আবার তাকালেন। "সাতটা শব্দ মিলিয়ে একটা
বাক্য হচ্ছে। পুরোটা বোঝা যাচ্ছে না, কিন্তু মোটামুটি দাঁড়াচ্ছে — 'পাখানে তরু তলে, অসমাপ্ত ভণই জাণ'।" তরুণবাবু
থামলেন। "মানে — পাথরের গাছের তলায়, অসমাপ্ত যে আছে, তাকে জানো।"
"পাথরের গাছ?"
"পাথরে খোদাই করা
গাছ হতে পারে। উনকোটিতে তো অনেক খোদাই আছে।"
সুমন সেদিন যখন আলোচনা সেরে ফিরল তখন দুপুর গড়িয়ে বিকেল।
তরুণবাবুর গিন্নি কিছুতেই অতিথিকে ভাত না খাইয়ে ছাড়বেন না। আর এর ফাঁকে ফাঁকে
আলোচনা চলল। পরদিন পুরো এলাকাটা চষে বেড়াল সুমন। মূর্তি আছে অসংখ্য — শিব, গণেশ, দুর্গা, নন্দী — কিন্তু
গাছ? পাথরে খোদাই করা
গাছ কোথায়? প্রত্নতত্ত্ব
বিভাগের বোর্ডে লেখা তথ্যগুলো পড়ল। কোথাও গাছের কথা উল্লেখ নেই।
তিনদিন খুঁজল সে, এমন কিছুই নজরে পড়ল না। এদিকে শিশিরের লেখা থামেনি। রোজই
নতুন শব্দ লেখা হয় মূর্তির বুকে — হয়তো অন্য বাক্য, আর তাতে অন্য
কিছু বার্তা। সুমন ধারণা করল — প্রথম বাক্যটা ছিল ঠিকানা, এখন যা আসছে সেটা
অন্য কিছু। কিন্তু পাথরের গাছ না খুঁজে পেলে এই নতুন কথার মানে কী করে বুঝবে? না কি রোজ
লেখাগুলো আবার তুলে রাখবে?
তবে পাথরের গাছ
মাথার ভেতর গজগজ করছে। এদিকে আরও তিনদিন গড়িয়ে গেল খুঁজতে খুঁজতে।
অবশেষে চতুর্থ দিন, মূল মন্দির এলাকা থেকে অনেকটা দূরে, জঙ্গলের ভেতরে, একটা বড়ো পাথরের
চাঙড়ের গায়ে দেখল — অস্পষ্ট, শ্যাওলায় ঢাকা, কিন্তু খোদাই করা আছে — একটা গাছ। শাখা, প্রশাখা, পাতা, এমনকি ফল — সব
পাথরে কাটা, কিন্তু শত শত
বছরের ক্ষয়ে প্রায় মুছে গেছে।
গাছটার তলায় — ঠিক তলায় — মাটি অন্যরকম। নরম, সুমন কৌতূহলবশত
মাটিতে হাত দিতেই নরম অনুভব হল, বাকি জায়গার মতো শক্ত পাহাড়ি মাটি নয়। হাত দিয়ে পচা
পাতা, ডালপালা সরাতেই
একটা ফাটল দেখা গেল, কিন্তু ভেতরে কী
আছে কিছু বোঝা যায় না।
পরদিন একটা ছয় ব্যাটারির টর্চ আর দড়ি নিয়ে এল সে। ফাটলটা
বড়ো যথেষ্ট — একজন মানুষ গলে যেতে পারে। সুমন ঢুকল।
প্রায় পঞ্চাশ মিটারের মতো বুকে হামাগুড়ি দিয়ে এগিয়ে গেল
সুমন। তারপর ভেতরে একটা গুহা। ছোটো, একটা ঘরের সমান, তবু ঢুকতেই একটা অন্যরকম গন্ধ পেল সে — সাপের আঁশটে গন্ধ, ইন্দ্রিয় সজাগ
হল তার। একটা হিসহিস শব্দ খুব কাছেই। টর্চের আলো গুহার এক কোণায় পড়তেই দেখে —
কেউটে। সে স্থির দাঁড়িয়ে রইল। হিসহিস করতে করতে ফনা মেলে সাপটা এদিকেই আসছে। মনে
মনে ইষ্টদেবতার নাম জপতে লাগল সে। তারপর কী মনে হতে সে সাপটার চোখে আলো ফেলল, সাপটা আর এগোল
না। এভাবে কেটে গেল প্রায় কুড়ি মিনিট। দু-তিনবার আলোর উৎসের দিকে ছোবল মেরেছে
সাপটা, কিন্তু
লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়েছে। এবারে কায়দা করে সাপের চোখে আলো ফেলে রেখে সুমন একটু সরে
গেল জায়গা থেকে। মানুষের ভারী পায়ের কম্পন সাপটা টের পেল ঠিকই, সে মাথা ঘোরাল।
এদিকে টর্চের আলো ম্লান হয়ে আসছে। সুমনের মনে পড়ল মধুসূদন স্যারের কথা। টর্চের
ব্যাটারি সারাক্ষণ জ্বালিয়ে না রেখে একটু নিভিয়ে জ্বালালে ব্যাটারি বেশিদিন
যায়। একথা ভেবে এক মুহূর্তের জন্য টর্চ নেভাতেই সাপটা ফনা সংবরণ করে পালাতে চাইল।
আবার টর্চ জ্বালাতেই সুমন দেখল সাপটা বেরিয়ে যাচ্ছে গুহাপথ ধরে। এবারে ভালো করে
লক্ষ করল সে সাপটাকে। প্রায় পনেরো ফুট হবে, আর একটা পূর্ণবয়স্ক সুপুরি গাছের মতো মোটা। সাপটা বেরিয়ে
যেতেই তার চারপাশটা ভালো করে দেখে নিল সে।
এবারে টর্চের আলোয় দেয়াল উজ্জ্বল হয়ে উঠল — পুরো দেয়াল
জুড়ে খোদাই। মূর্তি নয়,
অক্ষর। সেই একই
প্রাচীন লিপি, সেই সন্ধ্যা ভাষা, সারি সারি, ওপর থেকে নিচ, বাঁদিক থেকে
ডানদিক। কোথাও অক্ষর গভীর,
স্পষ্ট, যেন ভাস্করের
বাটালি জোরে পড়েছিল, কোথাও হালকা, যেন হাত কাঁপছিল, যেন আলো কম ছিল, যেন ক্লান্তি
এসেছিল। কেউ এই গুহার দেওয়ালে কিছু লিখে গেছে — কত শত বছর আগে?
আর গুহার মাঝখানে — একটা মূর্তি। অসমাপ্ত। একটা মানুষ বসে
আছে, পা ভাঁজ করা, হাতে কিছু একটা
ধরা, সামনে পাথরের
একটা চাঙড়। মুখটা — এবারও অস্পষ্ট, শেষ হয়নি। সুমন কাছে গিয়ে টর্চটা ধরল — মূর্তির গায়ে সেই
সাপের শরীর ঘষে যাওয়ার দাগ স্পষ্ট। সাপটা এই মূর্তির গায়ে জড়িয়ে থাকত বোঝা
যায় — যেমন মন্দিরের নাগ পাহারা দেয় গুপ্তধন।
সুমন প্রথমে ভাবল — কোনো দেবতা হবে, শিবের অন্য কোনো
রূপ, হয়তো বাইরের
মূর্তিগুলোর মতোই। কিন্তু দেবতাদের মুকুট থাকে, গহনা থাকে, বাহন থাকে — এখানে কিছুই নেই। তাহলে কোনো সাধক? কোনো শিষ্য? টর্চটা আরও কাছে
ধরতেই দেখল — মূর্তির হাতে জপমালা নয়, ত্রিশূল নয় — বাটালি। পাথর কাটার বাটালি। আর সামনের
চাঙড়টা — সেটাও বেদি নয়,
সেটাও একটা
অর্ধগড়া মানুষের আকার, একই ভঙ্গিতে বসা, যেন আয়নায়
প্রতিবিম্ব।
সুমন অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। ভাস্কর নিজের মূর্তি
গড়ছিলেন। নিজের হাতেই নিজেকে খুঁজছিলেন পাথরে। আর শেষ করতে পারেননি।
সুমনের বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল। টর্চটা হাত থেকে প্রায়
ফস্কে যাচ্ছিল, সামলে নিল সে।
কিন্তু সেই মুহূর্তে টর্চের আলো গুহার এক কোনায় পড়ল — এবং
সুমন থমকে গেল। পেছনের দেওয়ালটা দেওয়াল নয়। একটা পথ। সরু, ঢালু, নিচের দিকে নেমে
গেছে অন্ধকারে। টর্চের আলো ছুড়ে দিল সেদিকে — আলোটা গিলে নিল অন্ধকার, কোথায় গিয়ে শেষ
হয়েছে দেখা গেল না। শুধু সেই পথের দুপাশের দেওয়ালেও খোদাই — অক্ষর নয়, এবার মূর্তি।
ছোটো ছোটো, সারি দিয়ে, যেন কোনো
শোভাযাত্রা নেমে যাচ্ছে মাটির নিচে। আর সেই পথ থেকে ভেসে আসছে একটা গন্ধ —জলের।
ভেজা পাথরের গন্ধ, যেন অনেক গভীরে
কোথাও জল আছে। পথটার মুখে বাতাসের একটা টান টের পাওয়া যাচ্ছিল।
সুমন আর এগোল না। পেটের ভেতরটা কেমন করে উঠল। ছয় ব্যাটারির
টর্চ ইতিমধ্যে অনেকটা খরচ হয়ে গেছে সাপের সঙ্গে যুঝতে গিয়ে, দড়ি আছে তিরিশ
ফুটের, কিন্তু এই পথ
কতদূর নেমে গেছে কে জানে। একলা ঢোকা বোকামি হবে এবার। সে ফিরে এল।
বাইরে তখন বিকেলের আলো ফিকে হতে শুরু করেছে। গুহার মুখে বসে
সুমন একটা চুইংগামের র্যাপার খুলে মুখে পুরল — চুইংগাম চিবোলে তার বুদ্ধি বাড়ে।
তরুণবাবুকে জানাতে হবে, কিন্তু তার আগে
নিজে একটু বুঝে নিতে চাইল — সে ঠিক কী দেখেছে, কতটুকু বাস্তব আর কতটুকু অন্ধকারে চোখের ভুল।
সেই রাতে তরুণবাবুকে ফোন করল সুমন। রাত এগারোটা বাজে তখন, তরুণবাবু
ঘুমাচ্ছিলেন, কিন্তু সুমনের
গলার স্বরে অস্বাভাবিক কিছু বুঝে উঠে পড়লেন। সুমন সংক্ষেপে সব জানালো — গুহা, দেয়াল লিখন, একটা অসমাপ্ত
মূর্তি, আর একটা পথ যেটা
নিচে নেমে গেছে। তরুণবাবু কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন, "কাল সকালে আসছি।
তুমি ওই পথে একা ঢুকো না।"
পরদিন সকালে তরুণবাবু এলেন। সঙ্গে একটা নোটবই, নিজের একটা
পুরোনো হ্যারিকেন, সুনীতিকুমার
চট্টোপাধ্যায়ের একটা বই যেটায় চর্যাপদের ভাষাতত্ত্ব নিয়ে আলোচনা আছে, আর কৈলাশহরের
হার্ডওয়্যারের দোকান থেকে কেনা দুটো নতুন টর্চ ও চারটে অতিরিক্ত ব্যাটারি সেট।
সুমন দেখে একটু অবাক হল — তরুণবাবু তৈরি হয়ে এসেছেন, শুধু বই নিয়ে
বসার মানুষ তিনি নন। বোঝাই যাচ্ছিল রাতে তিনিও ঘুমাতে পারেননি।
গুহায় ঢোকার আগে তরুণবাবু ফাটলের মুখে দাঁড়িয়ে ওপরের
পাথরের গাছটা দেখলেন অনেকক্ষণ। আঙুল দিয়ে শ্যাওলা সরিয়ে খোদাইয়ের রেখা ছুঁয়ে
দেখলেন। বললেন, "এটা অশ্বত্থ।
পাতার আকৃতি দেখো — বোধিবৃক্ষ।" সুমন তাকাল — ক্ষয়ে যাওয়া পাতাগুলোর মধ্যে
একটা চেনা আকার আছে বটে, লম্বাটে, ডগা সরু।
হামাগুড়ি দিয়ে দুজনে ঢুকলেন। তরুণবাবুর বয়স ষাটের কাছে, হাঁটুতে ব্যথা, কিন্তু তিনি
চিরতরুন। শুধু একবার থামলেন — গুহার মুখে সাপের খোলস পড়ে ছিল, শুকনো, সাদাটে, প্রায় তিন ফুট
লম্বা একটা টুকরো। তরুণবাবু সেটা দেখে বললেন, "বড়ো সাপ। সাবধানে এগোও। সাপ সামনে পড়লে
নড়বেনা।" সুমন বলল,
"গতকালেরটা পনেরো ফুটের কম হবে না।" তরুণবাবু কিছু বললেন না, শুধু এগিয়ে
চললেন।
গুহার ভেতরে ঢুকে তরুণবাবু দেওয়ালের সামনে দাঁড়িয়ে
অনেকক্ষণ চুপ করে রইলেন। তাঁর হাত কাঁপছিল — উত্তেজনায়, না ভয়ে, সুমন বুঝতে পারল
না। তারপর একটা অদ্ভুত কাজ করলেন — চশমা খুলে দেওয়ালের কাছে গেলেন, আঙুল দিয়ে
খোদাইয়ের খাঁজ ছুঁয়ে দেখলেন, যেমন অন্ধ মানুষ ব্রেইল পড়ে। চল্লিশ বছর বইয়ের পাতায় এই
ভাষা পড়েছেন, আজ প্রথম ছুঁলেন।
তারপর ধীরে ধীরে পড়তে শুরু করলেন — ভাঙা ভাঙা, থেমে থেমে, কারণ ভাষাটা
পুরোপুরি বোঝা দুষ্কর, হাজার বছরের
পুরোনো শব্দ, অর্থ বদলে গেছে, কিছু অক্ষর
ক্ষয়ে গেছে। মাঝে মাঝে বই খুলে মেলাচ্ছিলেন, কখনো মাথা নাড়ছিলেন, কখনো নোটবইয়ে টুকে রাখছিলেন। সুমন চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিল, হ্যারিকেন ধরে।
কিন্তু যতটুকু বোঝা গেল, তাতে একটা গল্প দাঁড়াল — আর সেই গল্পটাই সুমনকে অস্থির করে
দিল।
ভাস্কর একা ছিলেন না। তাঁর সঙ্গে ছিলেন বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্যরা
— তাঁরা এই পাহাড়ে ধ্যান করতেন, সাধনা করতেন। ভাস্কর মূর্তি গড়তেন, তাঁরা পদ রচনা
করতেন — সেই পদ এই দেওয়ালে খোদাই করা। মূর্তি আর অক্ষর পাশাপাশি জন্মেছিল এই
পাহাড়ে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মূর্তি টিকে গেল, অক্ষর হারিয়ে
গেল। পাথর রইল, ভাষা হারিয়ে
গেল।
ভাস্কর তাঁর শেষ কাজ হিসেবে নিজের মূর্তি গড়তে বসেছিলেন এই
গুহায়, আর দেওয়ালে
খোদাই হচ্ছিল শেষ পদটি — কিন্তু কোনোটাই শেষ হয়নি। মূর্তিও না, পদও না। দুটোই
অসমাপ্ত।
তরুণবাবু শেষ যে কটা শব্দ পড়তে পারলেন, সুমন লিখে রাখল:
"কাআ তরু সিলা, ভণই চীএ জাণ —
রূপ দেহি পরকে, আপণ অজাণ।"
তরুণবাবু বললেন, "মোটামুটি অর্থ দাঁড়ায় — শরীর পাথরের গাছ, মন বলে জানো —
অন্যকে রূপ দিয়েছি, নিজেকে চিনি
না।"
টর্চের আলোয় দেখা যাচ্ছে অসমাপ্ত মূর্তি — ভাস্কর, যিনি এক কোটির
কাছাকাছি মূর্তি গড়েছেন,
কিন্তু নিজের মুখ
গড়ে উঠতে দেননি কখনো। হয়তো পারেননি, হয়তো জানতেন — নিজেকে গড়া সবচেয়ে কঠিন কাজ।
"আর ওই পথটা?" সুমন জিজ্ঞেস
করল। "ওটা কোথায় গেছে?"
তরুণবাবু ঘুরে তাকালেন। টর্চের আলো ফেললেন সেই সরু পথের
মুখে। দেওয়ালের খোদাই মূর্তিগুলো দেখলেন — ছোটো ছোটো মানুষের আকৃতি, সারি দিয়ে নেমে
যাচ্ছে, কারো হাতে বাটালি, কারো হাতে প্রদীপ, কারো হাতে পুঁথি।
তারপর একটু পিছিয়ে এলেন।
"দেওয়ালে যা লেখা
আছে — শেষের দিকে — পুরোটা পড়তে পারছি না," তরুণবাবু বললেন। গলার স্বর বদলে গেছে।
"কিন্তু একটা শব্দ বারবার আসছে — 'অধোলোক'।"
"অধোলোক?"
"নিচের জগৎ। মাটির
নিচে।" তরুণবাবু থামলেন। "লেখা আছে — ভাস্কর শুধু ওপরে মূর্তি গড়েননি।
নিচেও গড়েছেন। কিন্তু নিচের মূর্তি দেবতাদের নয়।"
"তাহলে কাদের?"
তরুণবাবু উত্তর দিলেন না। দেওয়ালের দিকে আবার তাকালেন, ভুরু কুঁচকে কিছু
পড়ার চেষ্টা করলেন, তারপর নোটবইয়ে
টুকে নিলেন। বললেন শুধু,
"আজ নয়। এই লেখা আমাকে সময় নিয়ে পড়তে হবে। আর ওই পথে এখন ঢোকা ঠিক হবে না —
তৈরি হয়ে আসতে হবে।"
দুজনে যখন বেরিয়ে এলেন বাইরে তখন বিকেলের সোনালি আলো।
পাহাড় দাঁড়িয়ে আছে প্রশান্ত ভঙ্গিমায়, তার গায়ে শত শত মূর্তি, তাদের চোখে পাথরের দৃষ্টি, মুখে পাথরের নীরবতা। কিন্তু সুমনের মনে হল — এই
পাহাড় নীরব নয়। এত বছর ধরে এই পাহাড় কথা বলতে চাইছিল, সেই ভাস্করের
ভাষায়, সেই প্রাচীন
সন্ধ্যা ভাষায়, কিন্তু কেউ
শোনেনি, কেউ পড়তে
পারেনি।
শিশির ফুটে উঠত প্রতিদিন, মুছে যেত রোদে।
সেদিন রাতে সুমন ঘুমাতে পারল না। বারবার মনে হচ্ছিল সেই সরু
পথটার কথা, যেটা নিচের দিকে
নেমে গেছে। সেই ভেজা বাতাসের টান, সেই জলের গন্ধ। আর মনে পড়ছিল — এক কোটিতে একটি কম। সবাই
ভাবে সেই একটা মূর্তি ভাস্করের নিজের, অসমাপ্ত। কিন্তু যদি হিসেবটাই অন্যরকম হয়? যদি ওপরে যত
মূর্তি দেখা যায়, তার বাইরেও
মূর্তি থাকে — মাটির তলায়,
অন্ধকারে, যেখানে কেউ
কোনোদিন খোঁজেনি?
পরদিন ভোরে সুমন আবার গেল সেই অসমাপ্ত মূর্তিটার কাছে
—যেটায় শিশির জমত। আজও সেখানে একটা অক্ষর লেখা হয়ে আছে শিশিরে। নতুন শব্দ হয়তো।
সুমন ছবি তুলে রাখল।
কিন্তু আজ আরেকটা জিনিস দেখল যেটা আগে দেখেনি।
শুধু এই মূর্তিতে
নয় — আরও দুটো মূর্তিতে শিশির জমেছে অক্ষরের আকারে। একটা নন্দীর পাশে, ছোটো একটা খোদাই
— সেটার বুকে। আরেকটা মূল সিঁড়ির ধারে, একটা অর্ধেক মাটিতে প্রোথিত থাকা মূর্তির কপালে। তিনটে
আলাদা মূর্তি, তিনটে আলাদা
অক্ষর।
পাহাড় কথা বলতে শুরু করেছে।
সুমন দাঁড়িয়ে রইল সিঁড়িতে। নিচে পর্যটকদের একটা দল উঠে
আসছে — ক্যামেরা, সেলফি স্টিক, হাসির গুঞ্জন।
সুমন ঘুরে দাঁড়াল, কালু কুমারের
গল্প বলার জন্য তৈরি হল — কিন্তু আজ গল্পটা বলতে গিয়ে তার গলায় একটু আটকাবে, সে জানে।
কারণ গল্পটা শেষ হয়নি। গল্পটা হয়তো এখনও লেখা হচ্ছে —
প্রতিদিন ভোরে, শিশিরের অক্ষরে।