নুরজামান শাহ



 ভবানীপ্রসাদ মজুমদারকে যেভাবে চিনেছি 









নুরজামান শাহ 






 

ভবানীপ্রসাদ মজুমদারকে প্রথম চিনিছিলাম ক্লাসের বইয়ে তাঁর কবিতা পড়ে। ষষ্ঠ শ্রেণীতে পড়াকালীন বাংলা "আনন্দপাঠ"  পাঠ্যপুস্তকে তাঁর "বাঘড়ম্বর" নামে মজাদার কবিতাটি পড়ে তার লেখার প্রতি অনুরোধ জন্মায়। পরবর্তীকালে দৈনিক গণশক্তি পত্রিকার "নতুন পাতা" বিভাগে প্রায় তাঁর কবিতা প্রকাশিত হত, সে সব কবিতা গোগ্রাসে পড়তাম। এখনও বেশ মনে আছে ২০০৭ সালের চীনের অলিম্পিক গেমস নিয়ে তাঁর চমৎকার একটি কবিতা গণশক্তির "নতুন পাতা" বিভাগে প্রকাশিত হয়েছিল। বলাই বাহুল্য, কবিতাটি এখনও আমার সংগ্রহে রয়েছে। কবিতাটি ছিল এরকম - 

 

বেজিং চলো, বেজিং চলো 

মোটকা - রোগা, ফর্সা - কালো

লম্বু -বেঁটে, মন্দ - ভালো 

সবাই মিলে বেজিং চলো 

 

বেজিং চল বেজিং চলো 

অলিম্পিকের মশাল জ্বালো

আঁধার রাতে রাঙিয়ে আলো 

সবাই মিলে বেজিং চলো 

 

ধনী - গরিব, শ্রমিক -কিষাণ

পুড়িয়ে বাজি, উড়িয়ে নিশান

সাজিয়ে মিছিল বাজিয়ে বিষাণ

হাত পা ছুঁড়েই চেঁচিয়ে বলো 

বেজিং চলো বেজিং চলো

সবাই মিলে বেজিং চলো। 

 

    ৫৬ লাইনের এই কবিতাটি অলিম্পিককে কেন্দ্র করে আশা- আকাঙ্খা, সৌভ্রাতৃত্ব, সংহতি সবকে তিনি নির্বিশেষে ফুটিয়ে তুলেছেন এই কবিতাটিতে। 

    এছাড়াও তাঁর আরও একটি বিখ্যাত কবিতা "ঐতিহাসিক জলসা" ছোটবেলাতেই পড়েছিলাম। বড় হওয়ার পর বুঝি ভবানীপ্রসাদ মজুমদারের কবিতার জনপ্রিয়তা এখনও আকাশ ছোঁয়া। বিখ্যাত সব আবৃত্তি শিল্পীদের কন্ঠে "দুর্গা হাসেন, দুগ্গা কাঁদে ", "বাংলাটা ঠিক আসে না"  কবিতাগুলি এখনও স্বমহিমায় পরিবেশিত হয়। তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে তাঁর ছড়াচর্চা তাঁকে শ্রেষ্ঠ আসন দিয়েছেন এবং তিনি ছিলেন অপ্রতিদ্বন্দ্বী ছড়াশিল্পী। 

    তাঁর প্রথম ছড়ার বই "মজার ছড়া" প্রকাশিত হয় ১৯৮০ সালে। এছাড়াও তাঁর বেশ কিছু বিখ্যাত ছড়ার বই হল - "জীবন সূর্য বাজায় তূর্য", "ডাইনোছড়াস", "শিকল ভাঙার শব্দ" প্রভৃতি। এছাড়াও তিনি বিষয়ভিত্তিক অনেকগুলো ছড়ার বই লিখেছেন যেগুলি ছোটদের জ্ঞানচর্চার বিকাশ ঘটাতে অবশ্যই পড়া দরকার। পাখি নিয়ে লেখা "মিঠেকড়া পাখির ছড়া", মাছ নিয়ে লেখা "মিঠেকড়া মাছের ছড়া", পশু নিয়ে লেখা "মিঠেকড়া পশুর ছড়া" প্রভৃতি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুকাজী নজরুল ইসলাম, সুকুমার রায়, সত্যজিৎ রায় প্রমুখদের নিয়ে লেখাও তাঁর আস্ত কবিতার বই রয়েছে

তিনি স্বনামে ছাড়াও বেশ কিছু ছদ্মনামেও লেখালেখি করেছেন। তাঁর মধ্যে "সবুজবুড়ো" তাঁর সর্বাধিক পরিচিত ছদ্মনাম। এছাড়াও ভবানন্দ ভারতী, কেনারাম কাব্যতীর্থ, মোল্লা হাসিরুদ্দিন তাঁর অন্যান্য ছদ্মনাম। 

ভবানীপ্রসাদ মজুমদার অনেক বড় মাপের ছাড়া শিল্পী হয়েও ছোট বড় সব কাগজে তিনি অনায়াসে লেখা দিতেন। কোনো পত্রিকাতেই তাঁর লেখা দিতে ছুঁৎমার্গ ছিল না। তাঁর জনপ্রিয়তাকে তিনি লেখালেখির ক্ষেত্রে কখনোই অপব্যবহার করেননি। নিরহংকারী মনোভাব তার ব্যক্তিত্বের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল। আমাদের মুর্শিদাবাদ জেলার অধুনালুপ্ত ছোটদের ছড়ার পত্রিকা "ছড়াবৃষ্টি"র তিনি সভাপতি ছিলেন। প্রথম সংখ্যা থেকেই তিনি নিয়মিত লিখতেন। এছাড়াও এ জেলার আরও অন্যান্য পত্রিকা  সূর্যসেনা, কাকলি, ছড়ার মুলুক, ইচ্ছেফড়িং, ছোটদের কলরব, অসৃক প্রভৃতি পত্রিকায় তিনি লিখেছেন। মুর্শিদাবাদ জেলার  সূর্যসেনা প্রকাশনী থেকে তাঁর লেখা "ছড়ায় ছড়ায় হৃদয় নড়ায়" বইটি প্রকাশিত হয়েছে

ভবানীপ্রসাদ মজুমদার তাঁর  লেখার গুণে বাংলা শিশু কিশোর সাহিত্যে চির অমর হয়ে থাকবেন ভণিতা ছাড়াই তা স্বীকার করা যায় । 

  

<