সকালের আলো ফুটবে ফুটবে। আমি মিত্তিরদের বাগানের পেছনের পাঁচিলে বসে দেখছি ওদের ভোঁদো লম্বা জিভ হ্যা-হ্যা করতে করতে সামনের দরজার দিকে চলে গেল। এবার সামনের পা দুটো ছড়িয়ে বসে বসে হাঁফাবে। মনিবরা জাগলে দেখাতে হবে তো, কাজ করেছে। আমায় দেখলেই ও যে কেন তেড়ে আসে!
আমি সেই কবে একদিন ওর
মনিববাড়ি মাছের সন্ধানে গেছিলাম। অনেক কষ্টে কার্নিশ বেয়ে উঠেছিলাম। ভোঁদোটা
কোত্থেকে গন্ধ পেয়ে হাজির হয়ে গেল। আবার জানলা গলে খুব কষ্ট করে কার্নিশে নামি।
যদি পড়ে যেতাম পা ফসকে! সেই থেকে মিত্তিরবাড়ির অন্দরে আর যাই না।
ওর নাম ভোঁদো। কিন্তু আমি যে বেড়াল সেই বেড়াল। কোন আদুরে
নামধাম নেই। সেই কত্ত বছর আগের কথা হঠাৎ মনে এলো।
খুদে একটা বোন আর একটা
ভাইয়ের সাথে মায়ের গা ঘেঁষে দুধ খাচ্ছি। সবে চোখ ফুটেছে আমাদের। মা ঘাড়টা আলতো করে
কামড়ে ধরে এ বাড়ি ও বাড়ি করেছে বেশ কয়েকবার। কখনও ব্যাবহার না হওয়া কলঘরে, কখনও চিলেকোঠার ঘরে বা বাতিলে বোঝাই ব্যালকনিতে। মাঝপথে
কুকুরের তাড়া, মানুষের জুতো সহ্য করেও মা আমাদের অবশেষে চোখ ফুটিয়েছিল।
একদিন মায়ের অগোচরে একটা লোক আমাদের ব্যাগে ভরে সাইকেলে চেপে এ গলি ও রাস্তা পার
হয়ে ছেড়ে দিয়ে গেল সিংহরায়দের পুরনো বাড়ির বাগানে। সেই ইস্তক আমরা মা হারা। দিন
গড়ালো, বছর গড়ালো, ফ্যা ফ্যা করে ঘুরে ফেলে
দেওয়া খাবার, এঁটো কাঁটা বেছে খেতে শিখে গেলাম। তিনজন একজোট থাকার চেষ্টা
করতাম।
একদিন বন্ধ থাকা সিংহরায়
বাড়ির তালা খুলল কেয়ারটেকার। ঝাড়পোঁচ হল। মনিব সপরিবারে বিদেশ থেকে এলেন সম্পত্তি
দেখভালে। সাথে নাতনি টুলটুলি। আমাদের তু তু করে ডেকে আদর করল। খেতে দিল। ফেরার সময়
আমার ভাইটাকে নিয়ে গাড়িতে চেপে বসল টুলটুলির কাছে ও হয়ত ভালোই আছে।
বোনটাও হয়ত ভালোই আছে, ছানাপোনা নিয়ে ঘরকন্যা করছে। আসলে আমিই সিংহরায়পাড়া ছেড়ে
ভিন পাড়ায় আসতে বাধ্য হয়েছিলাম গুল্টির জন্য। নির্জন বাগানে ও টিয়া ছানা চুরি তালে
গেছিল। কাকের ঠোক্কর খেয়ে ধপাস করে গাছ থেকে পড়ে। লেগেছিল, বেশি নয়। গাছতলায় বসে পায়ে হাত বোলাতে বোলাতে আমার উপর ওর
নজর পড়ে। আমিও আশায় আশায় ছিলাম – যদি কোন ভাবে একটা পাখির ছানা পাই! কিন্তু
দুর্ভাগ্য।
গুল্টি, “আই বাপ! কী সাদা রে তুই। খয়েরি রঙটা পুরো টিপের মত লাগছে”
বলেই আমায় ধরে ফেলেছিল। বাধ্য হয়েই আমার রংপাড়ায় আসা। সিংহরায় বাড়ি থেকে অনেকটা
রাস্তা, তা বুঝেছিলাম রাস্তায় চারচাকা, অটোর ভিড় দেখে।
গুল্টির মা আমাকে সুনজরে
দেখল না। গুল্টি প্রথমে আমাকে খাটের তলায় লুকিয়েছিল, কিন্তু খিদের
চোটে মিউ মিউ করা ছাড়া আর কোন উপায় ছিল না। ব্যাস! গুল্টির মা খুঁজে পেয়ে উঠোনে
ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে দরজা বন্ধ করে দিল। সেই থেকে চড়ে খাচ্ছি নতুন পাড়ায়। গুল্টির
সাথে মাঝে মাঝে দেখা হয়, আদর টাদর করে, তবে ঘরে ডাকতে সাহস করে না।
তিনবেলা কলপাড়ে বা পুকুর
ধারে চোখ রাখলে পেট ভরানোর মত জুটেই যায়। তারপর একটু আধটু বদবুদ্ধিও রাখি। হয়ত
দত্তগিন্নী মাছ কেটে উঠে বঁটি সরিয়ে কোমরটা ছাড়াচ্ছেন। এই অমনোযোগের সুযোগ নিয়ে
গামলা থেকে একপিস কাতলা নিয়ে সুরুৎ করে ঢুকে গেলাম কলতলা আর কলঘরে মাঝের সরু নালির
ফাঁকে। দত্তগিন্নীর সাধ্য কি আমার নাগাল! হতচ্ছাড়া হুলো, বলে যতই গাল দিক, ধরতে তো আর পারবে না।
তারপর ধরো কানাইলাল শর্মার
মেয়ে সুইটির কথা। সে এমনিই ভুলো। গয়ালা দুধ দিয়ে গেছে, আর ও দুধের বাটি টেবিলে রেখে বন্ধুর সাথে ফোনে গল্প করতে
করতে ছাদে চলে গেল। মোটাসোটা শর্মা গিন্নী থপথপিয়ে আসার আগেই আমার দু চুমুক খাওয়া
হয়ে গেছে। এখন গেলাস ছুঁড়ুক কি বাটি, আমি সটান লাফে বাইরে এসে
বসে থাকি রান্নাঘরের নালার ধারে। বাকি দুধটা ফেলে দিলে ওখানেই পেয়ে যাবো।
আবার গিরিবালা ঠাকুমা
ডেকেডুকেই ছানাটা পায়েসটা দেয়। বিড়বিড় করে বলে – মা ষষ্টীকে বলিস বাবা, আমার নাতনিটার যেন ছেলেপুলে হয়।
পাড়ার কিছু বাচ্চা আছে, ওদের স্বভাব আমি জানি। কেউ কাছে এসে গলাতে, লেজে হাত বোলায় – হাতে নাড়ু কি বিস্কুট থাকে, ভেঙ্গে দেয়। আদর খেতে সবারই ভালো লাগে।
আর এক ধরণের বাচ্চা আছে, দেখলেই তাড়া করে, ঢিল ছোঁড়ে, ঘুমিয়ে থাকলে মেরে জাগায়। ওগুলোকে আমি মোটেই সহ্য করতে পারি
না। ইচ্ছে হয় কামড়ে দি। কিন্তু আমি কামড়াই না। মাঝে মাঝে অন্য হুলো জ্বালাতে এলে
মারামারি কামড়া-কামড়ি হয়। ওতে ব্যাথা লাগে। ভালো লাগে না, তাই মানুষকেও কামড়াতে চাই না।
ইতিমধ্যে একটা নতুন শব্দ
হাজির হল – লকডাউন। কয়েকদিনের মধ্যে দেখলাম আশেপাশের জগৎটা বেশ বদলে গেছে। ছোট
ছেলেমেয়েগুলো সকাল থেকে বকাঝকা খেয়ে পড়তে যেত, এসে না এসেই নাকে মুখে
গুঁজে ইস্কুলে যেত, ফিরে এসে বল পিটিয়ে বা গান শিখে বই নিয়ে বসে ঢুলত। বড়োরা
ভোর থেকে হুটোপাটি করে রেঁধে খেয়ে ট্রেন বাস ধরতো, বাজার দোকান, অফিস করতো। তারা কাজকর্ম ছেড়ে ঘরে বসে পড়ল। খায় দায়, টিভি দেখে, ঘুমিয়ে যায়।
তবে একটা ব্যাপারে আমার খুব
মজা হল। কোনো কোনো বাড়িতে খাওয়ার বাড়বাড়ন্ত হল। হইচই করে ভালো ভালো মাছ, আইসক্রিম, কেক বানানো শুরু হলো। আমিও
কিছু পেলাম।
এরই মধ্যে একটা অদ্ভুত
অন্যরকম অভিজ্ঞতার সামনাসামনি হলাম। রাদু নামে একটা ছেলে আছে পাড়ায়, ছেলেটার বাবা লোকাল ট্রেনে সাজের সামগ্রী বিক্রি করত। এখন
কাজ নেই, তাই দিনমজুরির খোঁজে ঘোরে। ওর মা কয়েকটা বাড়ি রান্না করত।
তার মধ্যে শুধু ঘোষ বাড়ির বুড়ো-বুড়ির রান্নাটাই আছে। লোকে না কি বাইরের কাউকে এখন
ঘরে ঢোকাচ্ছে না। সব কাজ নিজেরাই করছে। রাদুদের খাওয়া পরার বেশ কষ্ট চলছে। ইস্কুল
বন্ধ। নিজেই বই নিয়ে বসছে আর পড়া বুঝতে না পাড়লে মনমরা হয়ে থাকছে। খেলাধুলোও বারণ
এখন। তাই রাদু আমাকে নিয়ে পড়েছে। আমি খাবারের আশায় ওদের বাড়িতে যেতাম না। যেতাম
নিরালায় থাকার আশায়। আর ওদের ঘিঞ্জি রান্নাঘরটায় বেশ কিছু আরশোলা, টিকটিকি আর ইঁদুর তো অবশ্যই আছে। ওদের পিছনে ধাওয়ার খেলাটা
আমার দারুণ লাগে।
এখন রাদু আমায় আদর করে কোলে
নেয়। নিজের ভাত থেকে আমার জন্য একমুঠো তুলে রাখে। কিন্তু সবসময় আমি রাদুর কাছে
যেতে পারি না। তার একমাত্র কারণ কুমু।
কুমুদের তিনতলা বাড়িটা
রাদুদের বাড়ির উলটোদিকে। রাদুর মাকে ডাকলেই রাদুর মা কুমুদের চাল বাছা, ডাল বাঁটা, মুড়ি ভাজার কাজে ছুটে যায়
দুটো উপরি রোজগারের আশায়।
কুমু এতদিন বান্ধবীদের সাথে
বিকেলে ঘুরে বেড়াতো। এখন অনলাইন ক্লাস করে, একা একা গান শোনে, আয়নার সামনে বসে বসে সাজে।
একদিন আমাকে চোখে পড়ল যখন
দুই বাড়ির মাঝে চালতা গাছের নিচে আমি বসে ঝিমোচ্ছিলাম, রাদু আমার গলায় হাত বোলাচ্ছিল। রাদু এখন আমায় লাট্টু বলে
ডাকে। আমার খুব আনন্দ হয়েছিল শুনে। ভোঁদোর মত আমারও নাম আছে। আমিও রাদুর গায়ে মাথা
ঘষি। পায়ে আলতো করে লেজের ঝাপটা দিই। চোখ বুজে গলা তুলে আদরের সম্মান দিই।
কুমু এসে বলল, “তোর পোষা?”
রাদু বলল, “ওই আর কি! ও কি ভোঁদো, যে চেন দিয়ে বেঁধে রাখব?”
কুমু বলল, “আমায় একটু দে।”
তারপর ঝুপ করে আমায় কোলে
তুলে নিয়ে বাড়িতে ঢুকে পড়ল। রাদু ডাকছে, “লাট্টু, লাট্টু।” ও শুনলই না। সেই থেকে মাঝে মাঝেই আমি কুমুর খপ্পরে
পড়ি। ও আমাকে দরজা আটকে রেখে দেয়। অবশ্য, সন্দেশ, দুধ,
দই,
এইসব মাঝে মাঝেই দেয়। রান্নাঘরে নিয়ে এসে মাছ-মাংস খাওয়ায়।
পাহারা দিয়ে বাথরুমে নিয়ে যায়। বিছানায় শুলেও আপত্তি করে না। কিন্তু বাইরে যেতে
দেয় না। ফোনে আমার ছবি তুলে বন্ধুদের দেখায়। আদর টাদর যতই করুক, আটকে থাকা আমার পোষায় না। ওদের ঘরে টিকটিকি আরশোলাও দেখি না
যে লাফালাফি করে একটু ব্যায়াম করব।
ওর মা মাঝে মাঝে চারিদিকে
লোম উড়ছে বলে ওকে বকে। ও মাকেও খুব একটা পাত্তা দেয় না। আমিও তক্কে তক্কে থাকি।
দরজা একটু খোলা পেলেই পাঁচিল টপকে অনেকটা দূরে পালাই। রাদুর সঙ্গেও ভয়ে দেখা করতে
যাই না।
কালো মেনিটা একদিন আমায়
আমাদের ভাষায় গোঁফ নেড়ে যা বলল, তার অর্থ, ভালোই আছ। ভালোমন্দ খাচ্ছ।
আরে সে আমার কপাল। তোর কী? যাক গে, ঝগড়া করতে ইচ্ছে করল না।
ঘুঘু পাখিটা উড়তে উড়তে এসে জবার ডালে বসছে, আবার উড়ছে। ওটা থাকে
রাদুদের ঘুলঘুলিতে। সকলে বলে ঘুঘু রাখতে নেই। রাদু ওকে কিছুতেই তাড়াতে দেয় না।
আমারও একটুও ইচ্ছে নেই ওকে তাড়া করার। পেট ভরা। নিরাপদে আছে ভেবে কথা পাড়ল, “জানো, রাদু তোমার জন্য কান্নাকাটি
করে?”
আমি অবাক! "কেন?”
“ওর বেড়াল নাকি বড়োলোকের মেয়ে কুমু ছিনিয়ে নিয়েছে। তুমি ভালো
খাবার পাও বলে নাকি আর ওর কাছে যাও না।”
জেনে মনটা খারাপ হয়ে গেল।
আমাকে দেখতে পেলেই কুমু আটকে দেয়। তাই দূরে দূরে থাকি। ওদের বাড়ির বারান্দা, ছাদ থেকে রাদুদের ঘরদোর সব দেখা যায়। ঘুঘুটা উড়ে যেতেই
রাদুদের বাড়ির দিকে পা বাড়ালাম। রাদু ছোট্ট উঠোনে ওর লাগানো চারাগাছের পরিচর্চা
করছিল। মুখটা শুকনো, চোখ ছলছলে।
শুনলাম চাপা গলায় ওর মা
গজগজ করছে, “তোর এতো মন খারাপ করার কোন দরকার আছে? আরে,
ওদের সঙ্গে কি আমরা ঝগড়া করতে যাবো? এলে আদর করবি, খেতে দিবি। না এলে কিছু
করার নেই। মিটে গেল। ইস্কুলটা খুলে গেলে, প্রাইভেটে যেতে হলে আর সময়
পাবি? সবাই কাজের তালে ছুটব। ঘরে থাকবেটা কে? পেটের চিন্তায় মরছি সর্বদা। তোর এই লাট্টু লাট্টু করে
ঘ্যানঘ্যান ভালো লাগে না!”
এমন সময় তুলসী মঞ্চের পিছনে
আমার ওপর চোখ পড়তে কি আনন্দ রাদুর চোখে! চিৎকার করে, “মা,
লাট্টু এসেছে।”
রাত পর্যন্ত ওদের
বারান্দাতেই ছিলাম। শেষ রাতে বসেছি মিত্তিরদের পাঁচিলে। আমার মত নামহীন বেড়ালের
জন্য একজন চোখের জলও ফেলতে পারে! আমি কি রাদু আর কুমুর থেকে অনেক দূরে চলে যাবো? এই এলাকাটা আমার চেনা। পশুপাখি, মানুষজনও। দূরে গেলে আবার নতুন করে মানিয়ে নিতে হবে।
হিজিবিজি ভাবছি, ভোঁদো ভুক করে ডেকে উঠল। একটা প্যাঁচা নিচু নিয়ে উড়ে যেতেই
ভোঁদোর পাহারাদার মন জেগে উঠেছে। হালকা লয়ে ছুটে আসছে পাঁচিলেরই দিকে।
লাট্টু, চল বাবা, রাদুদের বাড়ির দিকে টুকটুক
করে। নিজেকেই বলে ঝুপ করে এক লাফ দি রাস্তার উপরে। ইস্কুল কলেজ খুলুক তাড়াতাড়ি।
তখন আমি স্বাধীন হব।