akkharbarta

অক্ষরবার্তা - একটি কিশোর বার্তা উদ্যোগ... আমাদের মূল লক্ষ্য উচ্চ মানের বই পাঠকের হাতে পৌঁছে দেওয়া... যোগাযোগ করুন - akkharbarta@gmail.com | www.akkharbarta.in

গল্প ৪ । জ্যৈষ্ঠ - আষাঢ় ১৪৩৩








ময়ুরপঙ্খী- কথা











শুভাশিস

চৌধুরী

আগরতলা, ত্রিপুরা

বিঙ্কি এর আগেও বেশ কয়েকবার আসাম গেছে। যেতে তো হবেই, ওখানেই গৌহাটিতে ওর দিদা থাকেন। ঝালুকবাড়ি ছিল তখন ওদের একান্নবর্তী বিরাট পরিবার। দিদা হলেন বিন্তির মায়ের দূর সম্পর্কের অর্থাৎ মায়ের খুড়তোতো দাদার শ্বাশুড়ি মা। এই সব জটিল সম্পর্ক বুঝতে পেরেছে মাত্র ক’দিন আগে, নাইন পাশ করে যখন টেনে উঠল। সেও গিয়েছিল এক মাসির বিয়ে উপলক্ষে।

মামা বাড়ি ভারি মজা কিল চড় নাই এই ক্ষেত্রেও ঠিক তাই ওদের বাড়িতে অনেক লোক ছোটোবেলায় যখন ওই বাড়ি যেতো বড়োরা সবাই ওর মামা নয়তো মাসি মা বাবার হাত ধরে শুধু ওদের বাড়িতে পৌঁছনো, এরপর কোলে কোলে কেটে যেত বাকি কিছুদিন মা বাবার সাথে অনেক সময় রাতেও তখন দেখা হতো না এতো লোকের মাঝে শুধু বাচ্চা আর বাকি সবাই বড়ো এরপর কয়েকবার ওই একদিন বা দুদিনের জন্য গেছে মামা-মাসিদের বিয়ের অনুষ্ঠানে সেও মিটে গেছে ছোটো থাকতেই

এই করে ছেলেবেলা কাটলেও বড় হতে হতে পড়া বাড়তে থাকলো, বেড়ানো কমতে থাকলো সে বাড়িতেও যাতায়াত কমতে কমতে পাঁচ ছয় বছরের ব্যবধান হয়ে গেল তবুও আসামের কাজিরাঙা, দুলিয়াজান, তিনসুকিয়া, জোড়হাট এই রকম বেশ কিছু জায়গা ওর বেড়ানো হয়ে গেছে, ওদের সঙ্গেই যেহেতুকামাখ্যাওদের কাছের রেল স্টেশন তাই ওই মন্দিরে যাওয়া ছিল মা বাবার যেন রুটিন ওয়ার্ক এটা ঠিক বেড়ানোর মধ্যে পরতো না

যতই বেড়ানো হোক, ধীরে ধীরে বড়ো হতেই ওর কাছে ব্রহ্মপুত্র খুব আপন হয়ে উঠেছে এক অজানা টান সে অনুভব করে এই নদের কাছে এলে কিশোরী বয়সে মনে মনে একটা প্রশ্ন বিঙ্কিকে খুব ভাবাতো, সে হলো, ব্রহ্মপুত্র নদ কেন? যদিও ইস্কুলের ভূগোল বইতে পড়েছে কেন ব্রহ্মপুত্র নদী নয় নদ, তবুও মনের সঙ্গে সবসময় ঠিক মেলাতে পারে না আসলেই দীর্ঘ খরস্রোতা আর ভয়াবহ বিস্তৃতি বলেই এটা পুরুষ? আর দীর্ঘ হয়েও কেবল কোমল গতির জন্যই গঙ্গা হয়ে গেল নদী? হয়তো বা তাই না কি ব্রহ্মার পুত্র থেকেই এই নদের নামাকরণ?

যতো বড়ো হচ্ছে ততই মনে যুক্তির বহর বাড়লেও কল্পনাতেও পিছিয়ে নেই বাড়িতে বিঙ্কির ঠাকুর্দা বিঙ্কিকে বলতো, “বনু! মনে যদি কল্পনার রঙ না থাকে তবে যে রোবট হয়ে যাবি বই তো পড়তেই হবে, ইস্কুলের পাঠ্য পড়ার বাইরে যদি গল্প -কবিতা না পড়িস, যদি মনে গানের সুর না বাজে, তবে যে বড়োই হতে পারবি নে বনু দেহে নয় মনে হতে হয় বড়ো! নইলে রাজপুত্তুর তোকে নেবেই বা কেন?” বিঙ্কি লজ্জা পেলেও ঠাকুর্দার এইসব কথাতে মনে স্বপ্ন বোনে

এখন গেলে ব্রহ্মপুত্রের পাড়ে বসে মনপবনের নৌকো ভাসায় আপনমনে ভাবে যদি আমাকে কেউ একলা ঘোরার জন্য একটা নৌকা দিত! যে নৌকা নাবিক ছাড়া আমার কথা মতো চলবে সত্যিই কি এই রকম নৌকা ছিল? যেটা বয়ে দূর দেশে যেতে পারতো কেউ একাই! ঠাকুর্দার আর একটা কথা বিঙ্কির আজ খুব মনে হচ্ছে, “বোনু! আমাদের এই দেশের যেখানেই বেড়াতে যাবি, সব সময়ই চেষ্টা করবি সেখানকার জাদুঘর দেখতে, যাকে বলে মিউজিয়াম কেননা ওখানেই এই জায়গার ইতিহাস সংরক্ষিত থাকে, মানে সেখানকার অতীতকে ধরে রাখে হয়তো সবার ভাল লাগে না, কিন্তু এটা খুব দরকার তুই তো আর আমার সাথে যাচ্ছিস না, যার সঙ্গে বা যখন একা যাবি তখন চেষ্টা করিস দেখতে

মাধ্যমিকের পর একবার এক মাসির বিয়ে উপলক্ষে ঝালুকবাড়ি গিয়েছিল তখন ব্রহ্মপুত্রের পাড়ে গিয়েছিল বাড়ির এক মামার সঙ্গে মামা একজন মাষ্টারমশাই তিনি গল্পের ছলে এক ময়ুরপঙ্খী নৌকার কথা বলেছিলেন, যে নৌকাতে বসে অনেক লোক একসাথে গান করতে করতে মাঝ নদীতে চলে যেতো সেই ভাদ্রমাসের একাদশী তিথিতে বিঙ্কির প্রশ্নের জবাবে আরও বলেছিল তখন তারা প্রয়াত পিতৃপুরুষের উদ্দেশ্যে পিন্ডদান করার জন্য আরতি করতে করতে ওখানে যেতো আর যারা যেতে পারতো না তারা বসে থাকতো তীরে সে উপলক্ষে বসত মেলা খুব ধুমধাম করে হতো সেই মেলা, সে আমি শুনেছি, দেখি নি

বিঙ্কি মনে মনে ভাবে ইস্! একদিন যদি সেই নৌকাটা দেখতে পেত, তবে তো এখন অনায়াসে মোবাইলে ছবি তুলে নিতো এইবারও মাসির বিয়ে মিটতেই মা বাবার সঙ্গেই ফিরে এলো আগরতলায়, নিজের বাড়িতে

মাধ্যমিকের ফল বেরুলো ভর্তি হলো সায়েন্স নিয়ে ইস্কুল, প্রাইভেট টিউশন, সব মিলিয়ে জেরবার হলো দু বছর তারপর একে একে বিভিন্ন জয়েন্ট চলল দীর্ঘদিন একটা জয়েন্ট পরীক্ষার সিট পরলো গৌহাটিতে এটাই ছিল সর্বশেষ জয়েন্ট পরীক্ষা পরীক্ষা শেষে গেল ঝালুকবাড়ি ইতিমধ্যেই সেই দিদা, বাড়ির ঠাকুর্দা, একে একে চিরতরে চলে গেলেও রয়ে গেল কতো কথা এবার বাড়িতে এসে পেল শুধু এক মামা আর মামিকে বাকি সবাই যে যার ঠিকানা বদলে নিয়েছে কাজের সূত্রেই বিঙ্কির মনটা কেমন খারাপ হয়ে গেল বড়ো একা একা লাগছিল বুঝতে পারল মামা মামিও বিঙ্কির বাবা বললো, “চল এবার তোকে এক জায়গায় নিয়ে যাবোবিঙ্কি জায়গার নাম জানতে চাইলে বাবা বললো, “গেলেই দেখতে পাবি তোর পছন্দ আমি জানি

পরদিন সকাল এগারোটা নাগাদ উবের করে সোজা গিয়ে নামল গৌহাটি স্টেট মিউজিয়ামে টিকিট কেটে গেটের ভেতরে ঢুকেই একটু ক্ষণ স্থির হয়ে দেখল বড়ো ইমারতটার দিকে, যার গায়ে ইংরেজিতে লেখা আসাম স্টেট মিউজিয়াম অবশ‍্য অসমের ভাষাতেও লেখা আছে ভেতরে ঢুকেই ভুল বসত মূল মিউজিয়ামে না ঢুকে চলে গেল ডানদিকে একটা ঘরে, ওটাও মিউজিয়ামেরই একটা ঘর কিন্তু ওখানে গিয়ে ভুল বুঝতে পারলেও মিউজিয়ামে কর্তব্যরত লোকটি বললেন, এসেই যখন পড়লেন দেখে যান ভেতরে ঢুকেই বিঙ্কি তো অবাক! একি! ঘর জুড়ে দেখে সুন্দর কারুকাজ করা এক বিরাট ময়ুরপঙ্খী নৌকা যেন ওকে নেওয়ার জন্য বসে আছে তারপর মামার কথামতো সবই লেখা আছে ফলকে কিন্তু এইখানে মামা কখনও আসেননি বলে আর তাকে খুঁজে পাননি প্রায় ৫৫ ফিট লম্বা এবং ফিট প্রস্থের এই নৌকায় মাঝখানে লোকজন বসে যে কীর্তন গাইতে পারতো সে তো সহজেই অনুমান করা যায় কী সুন্দর তার কারুকাজ! চোখ ফেরানো দায় বিঙ্কি যে কখন আপনমনে সেই নাও ভাসিয়ে ব্রহ্মপুত্রের বুকে চলে গেছে, সে তা মনেও করতে পারছে না অপলক তাকিয়ে আছে নৌকার দিকে বাবা ওদের অনুমতি নিয়েই মোবাইলে ছবি তুলছেন বিঙ্কির চটকা ভাঙল বাবার ডাকে

এবার মিউজিয়ামের কর্মীর দেখানো পথে গেল মূল ঘরে ঘুরে ঘুরে অতীতের আসামকে যেন একটা ঘরের মধ্যেই পেয়ে গেল প্রতিবারই প্রায় বিঙ্কি আসাম গেছে বিমানে চড়ে প্রতিবারই মনে হয়েছে এই যে লোকপ্রিয় গোপিনাথ বরদলৈ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর লেখা, কে এই লোকটি? একবার যদি তাঁকে অবয়বে দেখতে পেতাম! বই এর পাতায় তো আর সবার কথা থাকে না গুগলে ঠিকঠাক সব পাওয়াও যায় না এইখানে এসে পেয়ে গেল অবয়বে যেন ইতিহাস কথা কয় ১৯৪৬-১৯৫০ পর্যন্ত অভিভক্ত আসামের তিনিই ছিলেন প্রথম মুখ্যমন্ত্রী শিক্ষক, লেখক, স্বাধীনতা সংগ্রামী কত দিকে তাঁর ব্যাপ্তি আসামের রাজ্যপাল জয়রাম দাস দৌলতরাম তাঁকেলোকপ্রিয়উপাধিতে ভূষিত করেন ১৯৯৯ সালে তাঁকে মরণোত্তরভারতরত্নসম্মানেও ভুষিত করা হয়েছিল আশ্চর্য ১৯৫০ সালেই তিনি প্রয়াত হন এইসব দেখতে দেখতে কখন সকাল দুপুর গড়িয়ে বিকেল হল, টেরই পেল না ওরা বাপ-বেটি বেড়িয়ে এসে বাবার প্রিয় মশালা ধোসা খেয়ে, আবার উবের ধরে চলল ঝালুকবাড়ির পথে

এতদিন পরও এইসব জানতে পেরে একদিকে যেমন ভালো লাগছে, তেমনই খারাপ লাগছিল ঠাকুর্দার কথা ভেবে গাড়িতে বসে ভাবছে বাবা তো নিজের অফিস নিয়েই ব্যস্ত, ঠাকুর্দার সঙ্গে এলে হয়তো আরও অনেক আগেই এইসব দেখতে পেত সে যাক গে, এটাই তো অনেক প্রাপ্তি এবার ফিরে গিয়ে বন্ধুদের বেশ বলা যাবে ময়ুরপঙ্খীর কথা

 

সূচিপত্র