akkharbarta

অক্ষরবার্তা - একটি কিশোর বার্তা উদ্যোগ... আমাদের মূল লক্ষ্য উচ্চ মানের বই পাঠকের হাতে পৌঁছে দেওয়া... যোগাযোগ করুন - akkharbarta@gmail.com | www.akkharbarta.in

গল্প ৫ । চৈত্র ১৮৩২




জেঠার তুঙ্গে বৃহস্পতি

সত্যব্রত  চক্রবর্তী

উদয়পুর, ত্রিপুরা



 

কথায় বলে বৃহস্পতিবারের বারবেলা - ও নাকি যাচ্ছেতাই রকমের অলুক্ষুণে ব্যাপার। কপাল খারাপ থাকলে ভূত-প্রেত, দৈত্য-দানব, খুন-খারাপির সম্মুখীন হতে হয়, পদে পদে বিপদ অপেক্ষা করে থাকে। 

সেই বৃহস্পতিবারেই সহপাঠী ননী-সহ আমরা বেশ ক’জন বন্ধু মিলে শঙ্কু জেঠার হয়ে ভোট প্রচারে বেরোব! শুরুতে আমি মোটেও রাজি ছিলাম না। ননীর খপ্পরে পড়ে ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়াতে গিয়ে অনেকবার আঙুল পুড়িয়েছি। কিন্তু এক্ষেত্রে অনিচ্ছাসত্ত্বেও না বলতে পারলাম না!

একটু বিশদে বলি। ননীর শঙ্কু জেঠা সেবার আমাদের এলাকায় পঞ্চায়েত ভোটে দাঁড়িয়েছেন  সামনেই ভোট। তা তিনি দাঁড়াতেই পারেন, জীবনভর নিজের স্টুডিওতে লোকের ছবি তুলে তুলে জেঠা হয়ত হতোদ্যম হয়ে পড়েছেন। ননীর অনুরোধ, যেভাবেই হোক তার জেঠাকে ভোটে জেতাতেই হবে। ননীর কাতর আবেদনের সামনে না বলতে বাধ সাধল। স্কুল ছুটি, তার উপর শত হলেও শঙ্কু জেঠা আমাদেরই পাড়ার লোক। এলাকার সমস্ত অন্নপ্রাশন থেকে বিয়ে, শ্রাদ্ধশান্তি, জন্মদিন, কনে-দেখা, ফটো তোলায় উনিই সবেধন নীলমণি!

জেঠা প্রতিদিনই কাঁধে ক্যামেরা ঝুলিয়ে সাইকেলে চেপে যাতায়াত করেন, যেন মিলিটারি বন্দুক কাঁধে টহল দিচ্ছে ক্যামেরাটা মেশিনগানের মতো কপালের দিকে তাক করে ফটো তোলেন মড়ার মত তাকিয়ে থাকতে হয় ক্যামেরার লেন্সের দিকে, নট নড়নচড়ন উনিশ-বিশ হলেই জেঠা ক্ষেপে বোম্ এহেন মানুষ ভোটে দাঁড়াবেন না তো কে দাঁড়াবে? আর ননীর মতে, জীবনভর এন্তার রোজগারের শেষে জেঠার একটু জনসেবার খিদে চাগাড় দিয়েছে

জেঠা ‘’আমরা সবাই’’ দলের হয়ে ভোটে দাঁড়িয়েছেন শুনে আমরা একটু ভড়কে গেলেও, ননী লোভ দেখিয়ে ঠিক আমাদের ম্যানেজ করে নিল

বৃহস্পতিবার সাত-সকালেই দীপক কাকার মিষ্টির দোকানে হাফ ডজন গরম পুরি রসগোল্লার সিরায় ডুবিয়ে খেয়ে দিয়ে, শেষে দুপিসডেডবডিমিস্টি চিবিয়ে আধমগ জল টেনে পিত্তিরক্ষা করলাম উহুঁ, দীপক কাকাকে একটা পয়সাও দিতে হয়নি ননীই বলে দিল যে, তার জেঠা নাকি ভোট উপলক্ষে দোকানে বাকি-খাতা খুলেছেন তা যাই হোক, একটা রিকশা ভাড়া করে পাঁচজন মিলে তাতে চেপে রওনা দিলাম জেঠার বাড়ির উদ্দেশ্যে আমরা সবাই এক পাড়াতেই থাকি, রিকশাটা ভাড়া নেয়া হয়েছে ভোট প্রচারের জন্য পাঁচজন মিলে কী করে একটা রিকশায় চাপলাম, সেসব বিস্তারিত বর্ণনা করে চাপ বাড়াতে চাই না

শঙ্কু জেঠার চেহারাটা বেশ লম্বাটে, মুখখানা নোড়ার মত লম্বা, ধনেশ পাখির ঠোঁটের মত নাক, মাথায় তেল জবজবে চুল পরিপাটি করে আঁচড়ানো রোগাটে গড়ন, পরনে দামি পাঞ্জাবি, কাঁধে কাশ্মীরি শাল ভাজ করে রাখা সাদা ফকফকে ট্রাউজারে জেঠাকে বেশ মানিয়েছে

আমাদের দেখেই হাত তুলে আশ্বস্ত করে জেঠার অভয়বাণী - “খরচাপাতি নিয়ে চিন্তা করিস না তোদের ক্রিকেট ফুটবল খেলার, যাবতীয় পিকনিকের সমস্ত খরচা আমার শুধু এবারের ভোটটা উতরে দে!”

ততক্ষণে জেঠার চ্যালা ধনাদা একটা পোস্টার এনে রিকশার পেছনে ঝুলিয়ে দিয়েছে পোস্টারে জেঠার হাতজোড় করা ছবি, নীচে নির্বাচনী প্রতীক, ক্যামেরা এদিকে ননী টপাটপ একটা চোঙা মাইক রিকশার হ্যান্ডেলে বেঁধে ফেলল শঙ্কু জেঠা রিকশায় চেপে বসলেন আমাদের ডেকে নীচু স্বরে বললেন - “দুপরের খাবার তোরা পেটচুক্তি করে বাজারের গঙ্গার হোটেলে খাবি পাঁঠার মাংস আর গরম ভাত

এদিকে জেঠিমা এসে বিরক্ত মুখে আমাদের কর্মকাণ্ড দেখে গেট লাগিয়ে ভেতরে চলে গেলেন আগেই বাড়ির গার্জেনদের কানাঘুষায় বুঝেছিলাম, শঙ্কু জেঠা নিজের বাড়ির লোকজনের অমতে ভোটে দাঁড়িয়েছেন ব্যাপারটা এবার কিছুটা স্পষ্ট হলো

একটু পরেই জেঠার বৃদ্ধা মা, আমাদের সকলের হরি ঠাকুমা কাঁপা কাঁপা গলায় পুত্রের উদ্দেশ্যে বলে গেলেন - “কতবার বলেছি তুই রাজনীতির ভেতরে ঢুকিস না, এখন আবার বৃহস্পতিবারে মিটিং মিছিল শুরু করেছিস

এবার ব্যাপারটা পুরোপুরি জলের মত স্পষ্ট হলো

বৃহস্পতিবার বেলা দশটায় শুরু হল আমাদের ভোট প্রচার সে এক দেখার মত জিনিস, যেন রাজসূয় যজ্ঞ চলছে আর সেই যজ্ঞের হোতা ননী হাতজোড় করে আশেপাশের সবাইকে অনুরোধ করে চলেছে ক্যামেরা চিহ্নে ভোট দেবার জন্য ধনাদা হেঁড়ে গলায় জেঠাকে জেতানোর জন্য মাইকে চিৎকার করে চলেছে, আমরাও সমস্বরে গলা মেলাচ্ছি পাড়া প্রতিবেশীরা দৌড়ে যার যার বাড়ির গেটের সামনে জড়ো হচ্ছেন সে এক এলাহি ব্যাপার!

যদিও জেঠা আর ধনাদা ছাড়া আমরা কেউই ভোটার নই, সবে ক্লাস টেনে পড়ি কিন্তু তাতে কী, জেঠাকে জেতানোর জন্য মরণপণ চিৎকার করতে লাগলাম আমাদের মত আরও কিছু বেকার ছেলেও পদযাত্রায় যোগ দিল দেখতে দেখতে মিছিলের লোকসংখ্যা জনা কুড়ির কাছাকাছি গিয়ে দাঁড়ালো আর যদি জন্তু-জানোয়ার নিয়ে হিসেব করি তবে ত্রিশের কম হবে না পাড়ার কোন কুকুরই আমাদের পিছু ছাড়ল না

পাড়াগাঁয়ের ভোট, তাও পঞ্চায়েত, মেরেকেটে -দুয়েক ভোটার হবে কিন্তু অমন অভিনব শহুরে জমজমাট প্রচার এদিকের কেউ কস্মিনকালেও দেখে নি জেঠা হাতজোড় করে হাসিমুখে এদিক ওদিক তাকাচ্ছেন, আর আমরা ধনাদার হেঁড়ে গলার স্লোগানে সঙ্গত দিয়ে চলেছি লোকজনের বেশ সাড়া পাচ্ছি এবার আর জেঠাকে আটকানো অসম্ভব, জয় শুধু সময়ের অপেক্ষা বলেই মনে হচ্ছে 

ঘণ্টা তিনেক একই পাড়ায় চার চক্কর কেটে আমাদের ভোট বাহন রিকশা বাজারের গঙ্গা হোটেলের সামনে দাঁড়াল সূর্য তখন ঠিক মাথার উপর হন্যে হয়ে চিৎকার করতে করতে সকালের টিফিনে খাওয়া পুরি, ‘ডেডবডিসেই কোন কালেই হজম হয়ে গেছে কথামত, সুড়সুড় করে গঙ্গা হোটেলে ঢুকে পড়লাম

 

এদিকে আরেক বিপত্তি, শঙ্কু জেঠার নাকি মানত আছে তিনি ফলমূল ছাড়া কিছুই খাবেন না অগত্যা বাজার থেকে খোঁজাখুঁজি করে নগদ তিরিশ টাকায় এক কাঁদি চাঁপাকলা কেনা হল জেঠা রিকশায় বসে পায়ের উপর পা তুলে কলা খেতে লাগলেন, আমরা পাঁঠার ঝাল ঝাল মাংস দিয়ে ভাত খেতে শুরু করলাম দশ জনের অগ্রিম অর্ডার দেওয়া ছিল, খেতে বসলাম জনা পঁচিশেক হোটেল মালিক গঙ্গা কাকা শুরুতে ট্যাঁ ফোঁ করছিলেন কিন্তু ননীর পরাক্রমের সামনে তিনি গুটিয়ে গেলেন খাচ্ছি আর ভোটের চুল চেরা বিশ্লেষণ করে চলেছি পাড়ার মানুষের যা হাল হকিকত বুঝলাম, কম করেও দেড়শো ভোট জেঠার ঝুলিতে আসবেই আর অমন তেড়েফুঁড়ে প্রচার যদি আরো দিন তিনেক করতে পারি, তবে কোন ভোটই আর অন্যদিকে যাবে বলে মনে হয় না ভরপেট খেয়ে দেয়ে সবে টিউবওয়েল চেপে হাতমুখ ধুচ্ছি, ঠিক তখনই বাইরে থেকে চিল-চিৎকারের শব্দ কানে এল

দৌড়ে বাইরে বেরিয়ে এসে দেখি আমাদের ভোট-বাহন রিকশা কাত হয়ে পড়ে আছে রিকশা চালক অরুণ কাকা হোটেল সংলগ্ন নিমগাছে উঠে পড়েছেন এলাকার কুখ্যাত এবং তেড়িয়া ষাঁড় কালু রিকশার পাশে দাঁড়িয়ে অম্লানবদনে খোসাসমেত চাঁপাকলা চিবুচ্ছে

          কিন্তু, জেঠা কোথায় গেলেন? চতুর্দিকে তাকিয়েও তাঁর কোন হদিস পেলাম না হোটেল থেকে একটা চ্যালা কাঠ জোগাড় করে কালুকে কোনমতে তাড়ানো হল ব্যাটা গোটা কলার কাঁদিটাই সাবড়ে ফেলেছে কিন্তু জেঠার পাত্তা নেই

আমাদের দেখে সাহস পেয়ে রিকশা চালক অরুণ কাকা নিম গাছ থেকে নেমে রিকশাটা টেনে তুলতেই জেঠাকে আবিষ্কার করা গেল মুখভর্তি কলা নিয়ে তিনি রিকশা চাপা পড়েছিলেন

তা যাই হোক গে, বৃহস্পতিবার বারবেলার এই অঘটনের পর আমরা আর ভোটপ্রচারে বেরোইনি ননী অনেক অনুরোধ উপরোধ, এমনকি লোভ দেখিয়েও আমাদের টানতে পারেনি আশার কথা, কালুর শিংয়ের গুঁতোয় রিকশা উল্টে গেলেও জেঠার তেমন গুরুতর চোট আঘাত লাগেনি

ইচ্ছে থাকলেও, বাড়ির চাপে শঙ্কু জেঠাও আর ভোট-প্রচারের সাহস পাননি! যথাসময়ে ভোট হয়েছিল রেজাল্টও বেরিয়েছিল শঙ্কু জেঠা এগারো খানা ভোট পেয়ে আবার স্ব-স্থানে, মানে স্টুডিওতে ফিরে গেছিলেন” 

 

   

সূচিপত্র