akkharbarta

অক্ষরবার্তা - একটি কিশোর বার্তা উদ্যোগ... আমাদের মূল লক্ষ্য উচ্চ মানের বই পাঠকের হাতে পৌঁছে দেওয়া... যোগাযোগ করুন - akkharbarta@gmail.com | www.akkharbarta.in

গল্প ৪ । চৈত্র ১৮৩২


কালো বেড়াল












জহর দেবনাথ

ধলাই, ত্রিপুরা



 

রাত তখন সাড়ে দশটা। জানলার বাইরের বাতাসে দুলছে তালপাতার ছায়া। দূরে কোথাও কুকুরের হালকা ডাক ভেসে আসছে।

টেবিলের ওপর ছড়ানো অঙ্কের খাতা, ক্যালকুলেটর, আর পাশে এক কাপ ঠান্ডা হয়ে যাওয়া চা

সুমন মাথা চুলকিয়ে বিরবির করে বলল— “কাল সকালেই পরীক্ষা! একটাই চিন্তাওই ক্যালকুলাসের প্রশ্নগুলো ঠিকঠাক হবে তো!”

ওর মা ঘর থেকে বললেন—“খোকা, একটু দুধ খেয়ে ঘুমিয়ে পড় বাবা না হলে মাথা ব্যথা করবে ঠিক মতো ঘুম হলে পরীক্ষাও ভালো হবে

কিন্তু সুমনের মন শান্ত নেই গত দুই দিন ধরে এক অদ্ভুত ঘটনা ঘটছে তার সঙ্গে

 

স্যে   শু রু -

......

প্রথম দিন সকালে স্কুলে যাওয়ার সময় রাস্তা পার হওয়ার মুখে একটা কালো বেড়াল হঠাৎ দৌড়ে গেল তার সামনে দিয়ে সুমন থমকে দাঁড়িয়ে গেল মনে পড়ে গেল দাদুর কথা

কালো বেড়াল মানে অশুভ লক্ষণ, তার পরদিন কিছু না কিছু বিপদ হবেই

সেই দিনই স্কুলে হঠাৎ গণিতের শিক্ষক অসুস্থ হয়ে ক্লাস টেস্টটা এগিয়ে দিলেন সুমন একদম প্রস্তুত ছিল না তবু যেভাবে হোক প্রশ্নপত্র দেখে সব লিখে ফেলেছিল কিন্তু বাড়ি ফিরে তার মনে হচ্ছিল সবই কি সেই কালো বেড়ালের অভিশাপ?

          পরদিন সকালে আবারও সেই একই ঘটনা! গলির মুখে একইরকম কালো বেড়াল রাস্তা পার হলো এবার মনে হলো, যেন তার দিকে তাকিয়ে হাসছে! চোখ দুটো যেন জ্বলজ্বল করছে সুমনের গা শিউরে উঠলো নিজেকে বোঝাতে চেষ্টা করল— “না, এটা নিশ্চয়ই কাকতালীয় একটা ঘটনা!”

কিন্তু মন যে ওর কিছুতেই মানছিল না

স্কুলে পৌঁছে সে বন্ধু জয়ন্তিকে বলল— “জানিস জয়ন্তি, কালো বেড়ালটা আবারও আমার সামনে দিয়ে গেল কেমন অদ্ভুত লাগছে না?”

জয়ন্তি হেসে বললএইতুইও না! আরে বুদ্ধু, এগুলো তো শুধু গল্পগাঁথা বিজ্ঞান পড়ার পরও তুই কুসংস্কারে বিশ্বাস করিস?”

সুমন চুপ করে গেল ঠিকই, কিন্তু ওর মনটা কেমন যেন দমে গেল

 

লি   ভে রে   স্য -

......

স্কুল শেষে বিকেলে যখন ওরা বাড়ি ফিরছে, ঠিক তখনই স্কুলের দেওয়ালের পাশে সেই একই কালো বেড়াল আবারও ওদের সামনে এসে দাঁড়াল এবার বেড়ালটার গলায় একটা ছোট লাল ফিতা বাঁধা ছিল, যা আগে কখনো দেখা যায়নি

সুমন অবাক হয়ে বলল— “ওটাকে কি কেউ পোষ মানিয়েছে?”

বেড়ালটা ধীরে ধীরে কয়েক পা এগিয়ে এল, আবার আচমকাই পাশের গলিতে ঢুকে পড়ল জয়ন্তি কৌতূহলী হয়ে বলল— “চল তো, একটু দেখে আসি! আমার মনে হচ্ছে ব্যাপারটা বেশ মজার হবে

গলির পথ ধরে ওরা দুজনে এগিয়ে গেল জায়গাটা খুব পুরোনোভাঙাচোরা বাড়ি, শ্যাওলা ধরা দেওয়াল, আর বাতাসে স্যাঁতসেঁতে গন্ধ

একটা পরিত্যক্ত বাড়ির সামনে এসে বেড়ালটা থেমে গেল চোখে তখনও সেই আগুনের মতো জ্যোতি

সুমন ফিসফিস করে বলল— “ বাড়িটা তো বহু বছর ধরে বন্ধ

জয়ন্তি বলল— “চল তো ভিতরে ঢুকে দেখি, হয়তো কেউ বেড়ালটা পুষছে

দরজাটা আধখোলা ঠেলে ঢুকতেই ধুলো উড়ল

দেয়ালের কোণে পুরোনো বই, ছেঁড়া কাগজ, আর মাকড়সার জাল

মেঝেতে কিছু অদ্ভুত ছাপযেন পশুর পায়ের মতো, আবার পুরোপুরি নয়ও

হঠাৎ বেড়ালটামিঁয়াওকরে উঠল, তারপর এক লাফে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে গেল হাজারো কৌতূহলনিয়ে সুমন জয়ন্তি খুব সাবধানে পিছন পিছন যেতে থাকে

 

প্র ফে   ক্র র্তী -

......

উপরতলায় এক ছোট ঘরে গিয়ে তারা দেখলএকজন বয়স্ক মানুষ, ধবধবে দাড়ি, পুরোনো জামা পরে বসে আছেন চারপাশে বইয়ের স্তূপ

তিনি বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন—“তোমরা কে? এখানে কিভাবে এলে?”

জয়ন্তি সাহস করে বলল— “আমরা বেড়ালটাকে অনুসরণ করে এখানে এসেছি ওর গলায় লাল ফিতা আছে ওটা কি আপনার পুষ্য বেড়াল?”

বৃদ্ধ মানুষটি মৃদু হেসে বললেন— “হ্যাঁ, আমার প্রিয় সঙ্গী নামকালি কারও ক্ষতি করে না, বরং রক্ষা করে

তারপর উনি নিজের পরিচয় দিলেনপ্রফেসর অনিরুদ্ধ চক্রবর্তী, এক সময়ের বিখ্যাত গণিতবিদ এখন তিনি একা থাকেন এই পুরোনো বাড়িতে

আমি একসময় বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াতাম,” বললেন তিনি, “কিন্তু এক দুর্ঘটনায় আমার স্ত্রী সন্তানকে হারাই তারপর থেকে এখানেই আছি, গবেষণার কাজে

সুমনের চোখে-মুখে তখন অজানা ভয় আর বিস্ময় প্রফেসর হেসে বললেন—“আমি বুঝতে পারছি, কুসংস্কার তোমাদের মন দখল করেছে, তাই না?”

সুমন মাথা নাড়ল প্রফেসর বললেন— “বহু বছর আগে আমার এক ছাত্রও এমন কুসংস্কারে ভুগত পরীক্ষার দিন কালো বেড়াল সামনে দিয়ে চলে গিয়েছিল বলে সে আর ভয়ে পরীক্ষাতেই বসেনি

কিন্তু আমি বুঝিয়ে দিয়েছিলামসফলতা বা ব্যর্থতা বেড়াল নয়, নির্ভর করে নিজের মনের দৃঢ়তার ওপর

সুমন মনোযোগ দিয়ে শুনছিল প্রফেসর মৃদু হেসে একটা ছোট লাল পাথর তার হাতে দিয়ে বললেন— “এটা কোন সৌভাগ্যের তাবিজ নয়, বরং মনে রাখার চিহ্নতোমার সাফল্য তোমার নিজের হাতে

দ্ভু   রা -

......

সেই রাতে সুমনের ঘুম এল না ঘড়িতে তখন একটা বেজে গেছে

হঠাৎ জানলার বাইরে একটা ছায়া! সে উঠে দেখেজানলার ধারে সেই কালো বেড়ালটা বসে আছে চোখে আগুনের মতো দৃষ্টি, কিন্তু এবার মনে হলো সে যেন হাসছে

সুমন দরজা খুলে বাইরে বেরোল, কিন্তু বেড়ালটা পলকে উধাও

মাটিতে শুধু দেখা গেলপ্রফেসরের দেওয়া লাল পাথরটা হালকা আলো ছড়াচ্ছে সে বুঝে গেল, এটা ভয় পাওয়ার নয়, বরং প্রেরণার ইঙ্গিত ফিরে গিয়ে বই খুলল, আর শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতিতে মন দিল

 

রী ক্ষা   দি -

......

সকালে স্কুলে যাওয়ার সময় রাস্তার মুখে আবারো সেই কালো বেড়ালটা পার হলো

সুমন থামল না নিজের মনে মনে বলল— “আজ আমি আর কোন রকম কুসংস্কারে বিশ্বাস করবো না আজ আমি নিজের ওপর বিশ্বাস রাখব

পরীক্ষার হলে বসে সে প্রফেসরের কথা ভাবল প্রশ্নপত্র কঠিন, কিন্তু তার হাত থামল না প্রতিটি প্রশ্ন সে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে করল দুঘণ্টা পরে বুঝলসে আজ সত্যিই ভয়কে জয় করেছে

 

ত্য  ঘা -

......

পরের দিন সুমন আর জয়ন্তি আবারো সেই পুরোনো বাড়িতে গেল প্রফেসরের সঙ্গে দেখা করতে কিন্তু পৌঁছে দেখেবাড়ি একদম ফাঁকা! দরজায় তালা ঝুলছে, জানালা বন্ধ

কিছুটা দূরে ছোট একটা মুদির দোকানের এক বৃদ্ধ বললেন

ওই বাড়িতে কেউ থাকে না মা বহু বছর আগে এক প্রফেসর থাকতেন, কিন্তু তিনি তো মারা গেছেন আজ প্রায় দশ বছর আগে!”

সুমন হতবাক—! ফিস ফিস করে বলেতাহলে আমরা যাকে দেখেছি?”

জয়ন্তি ধীরে বলল—“হয়তো তাঁর আত্মার মতো কোনো ছায়া, যে চেয়েছিল তুই ভয় কাটিয়ে উঠিস

মাটির নিচে তারা খুঁজে পেল ছোট্ট লাল পাথরটাএখনো ঝকঝক করছে! সুমন সেটি হাতে তুলে নিয়ে মৃদু হেসে বলল

হয়তো এটাই তাঁর আশীর্বাদ আর আজ থেকে আমি কখনো কুসংস্কারে বিশ্বাস করবো না

 

সা ল্যে   চা বি কা ঠি -

......

ফল প্রকাশের দিন স্কুলে আনন্দের হুল্লোড় সুমন গণিতে প্রথম হয়েছে

খবর পেয়ে জয়ন্তি দৌঁড়ে আসে - “কি রে দেখেছিস তো! কালো বেড়াল তোর কিছুই করতে পারেনি তোর পরিশ্রমই তোর জয় এনে দিয়েছে

সুমন হাসল, জানলার বাইরে তাকিয়ে দেখলদূরে একটা কালো বেড়াল ছাদের ওপর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে সূর্যের আলোয় তার চোখে ঝিলিক

সুমন মনে মনে বলল— “ভয় নয়, যুক্তি আর প্রস্তুতিই সাফল্যের চাবিকাঠি

আর দূরে কোথাও, যেন হাওয়ায় ভেসে এল প্রফেসর চক্রবর্তীর কণ্ঠ

মনে রাখিস, অন্ধ বিশ্বাস মানুষকে থামায়, কিন্তু জ্ঞান মানুষকে এগিয়ে নিয়ে যায়।”

সূচিপত্র