প্রতিদিন স্কুল থেকে ফেরার পর বিট্টু খাবার নিয়ে মাকে খুব যন্ত্রণা করে, তার রোজই পাতে চিকেন নয়তো ডিম চাই। বিট্টুর মা পিয়ালী ছেলেকে বোঝায় শুধু চিকেন আর ডিম নয়, তাকে মাছ আর সবজি এগুলোও খেতে হবে। বিট্টু নাছোড়বান্দা...
তার পছন্দের খাবার না হলে সে খাবেই না। তার বাবা ব্যবসা নিয়ে ব্যস্ত। সকাল ন’টার মধ্যে স্নান করে খেয়েদেয়ে দোকানে বেরিয়ে যায়, ফেরে রাত সাড়ে ন’টায়। তার আগেই, বিট্টু পড়াশোনা, টিউশন, খাওয়াদাওয়া শেষ করে ঘুমাতে যায়। তার স্কুল সকালে, তাই পিয়ালী তাকে তাড়াতাড়ি খাইয়ে শুতে পাঠায়। বিট্টু মায়ের মোবাইলে কিছুক্ষণ গেম খেলতে খেলতে ঘুমিয়ে পড়ে। পিয়ালী রান্নাঘর থেকে এক ফাঁকে এসে উঁকি দিয়ে দেখে ছেলেটা কখন ঘুমিয়ে পড়েছে। মা ছেলের কপালের চুলগুলো সরিয়ে আলতো করে চুমু খেয়ে ভাবে--তুই বড় হলে আমার আর কষ্ট থাকবে না।
বিট্টুর বাবার জন্য রাত্রে ভাত তরকারি আবার রান্না করতে হয়। পাতে গরম ভাত আর গরম তরকারি পরিবেশন করে পিয়ালীও একসাথে বসে খায়। খেতে খেতে সংসারের দরকারী টুকিটাকি কথা বলে নেয়। সারাদিন পিয়ালী একা হাতেই যাবতীয় কাজ করে। ঘর মোছা, রান্নাবান্না করা, বাসন মাজা, পুজো দেওয়া, জামাকাপড় ইস্ত্রি করা, ছেলেকে বাসস্ট্যান্ড থেকে আনা, টিউশনে নিয়ে যাওয়া সমস্ত কাজ একা হাতে করতে করতে সে নিজের দিকে তাকাতে ভুলে যায়। বদমেজাজী স্বামী, চুন থেকে পান খ’সার উপায় নেই। আগে শাশুড়ির ভয়ে অতটা সাহস পেত না। দু’বছর আগে ভালো মানুষ শাশুড়ি হঠাৎ মারা যাওয়ার পর থেকে বিট্টুর বাবা স্বমূর্তি ধারণ করেছে। তার উগ্র মেজাজ, মর্জি মাফিক চলতে গিয়ে পিয়ালী ভুলে গেছে সে-ও একটা রক্তমাংসের মানুষ। মা বাবা নেই, দিদার কাছেই মানুষ হয়েছে সে। অলোকের মায়ের সাথে দিদার গ্রাম সূত্রে পরিচয়। অলোকের মা পিয়ালীকে দেখেই মনস্থির করেছিলেন এই শান্ত মেয়েকেই তার বদমেজাজী ছেলের বউ করে আনবেন।
দিদা ইতস্তত করেছিলেন --আমার যে কিছু দেবার সামর্থ্য নেই গো।
অলোকের মা দিদার হাত জড়িয়ে বলেছিলেন-- আমার কিচ্ছু চাই না, শুধু মেয়েটাকেই নিতে চাই।
দিদার চোখে জল --এই মা বাপ মরা মেয়েটার একটা গতি হলে আমি শান্তিতে চোখ বুজতে পারব।
অলোকের মা মহাসমারোহে পিয়ালীকে এবাড়ির বউ করে এনেছিলেন। যতদিন তিনি বেঁচেছিলেন, পিয়ালীকে কন্যাস্নেহে আগলে রেখেছিলেন।
আজ দিদা বেঁচে নেই, দুই বছর হল শাশুড়িও স্বল্প রোগ-ভোগের পর মারা গেছেন। এদের দু’জনের মৃত্যুতে তার মনে হয়েছিল মাথার ওপর থেকে দুটো বিরাট বটগাছ যেন সরে গেল! ঠাকুমার মারা যাবার কয়েকমাস পর থেকে বিট্টুর বাবার মধ্যে অনেক পরিবর্তন দেখা গেল। দেরি করে বাড়ি ফেরা, ছুটির দিনে কাজের অজুহাতে বেরিয়ে যাওয়া, মায়ের সাথে রুক্ষ ব্যবহার করা, ছেলের প্রতি অমনোযোগ, এসব তার মধ্যে দেখা গেল। প্রথমটায়, এসবে পাত্তা না দিলেও যখন বিট্টুর বাবার মধ্যে তা প্রকট হয়ে উঠলো, পিয়ালীর পক্ষে আর মেনে নেওয়া কষ্টকর হয়ে দাঁড়ালো। নিজেকে পরিবর্তিত পরিস্থিতির সাথে মানিয়ে নিতে অনেক চেষ্টা করল ছেলের মুখ চেয়ে, পারলো না। সহায়সম্বলহীন পিয়ালী একমাত্র অবলম্বন ছেলেকে আঁকড়ে ধরে বাঁচতে চাইলো। বয়স কম হলেও, মায়ের অসহায়ত্ব বিট্টুর চোখে পড়ে সবই। বাবা আর আগের মত তাকে ডেকে কথা বলে না, আদর করে না, ছুটির দিনে বেড়াতে নিয়ে যায় না, মা’কে বলে না স্পেশাল কোন রান্না করতে।
পিয়ালী কিছুতেই বুঝে উঠতে পারে না মানুষটার হঠাৎ করে এ কি হল। যতক্ষন বাড়িতে থাকে, গম্ভীরমুখে পত্রিকা নিয়ে বসে থাকে, খাবার সময় খায় চুপচাপ। ছেলের পড়াশোনা কেমন চলছে, তা-ও জানতে চায় না। তবে ইদানীং একটা ফোন আসছে রোজ আর ফোনটা এলেই লোকটার মুখে হাসি ফোটে, অনেকক্ষণ ফোনে কথা বলে, তারপর ফোন রেখে দিলে আবার গুণগুণ করে গান গায়। পিয়ালীর সাহস হয় না জিজ্ঞেস করতে কার ফোন ছিল।
একদিন রাতে বিট্টু একটা ভয়ানক স্বপ্ন দেখল। সে দেখল তার বাবা মা’কে গলা টিপে মেরে ফেলছে। ভয়ে আতঙ্কে বিট্টুর ঘুম ভেঙে গেল। সে দেখল তার মা পাশেই ঘুমিয়ে আছে। সে ঘুমন্ত মা’কে জড়িয়ে ধরলো। মায়ের যদি কিছু হয়ে যায়, তবে তার কী হবে! তার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়লো। মা’কে সে আর স্বপ্নের কথা বলল না।
তার বেশ কিছুদিন পর, বিট্টু স্কুলে গেছে। একলা ঘরে রান্না করতে করতে হঠাৎ পিয়ালী বুকে তীব্র ব্যথা অনুভব করলো, চারদিক যেন অন্ধকার হয়ে গেল তার। কোন কিছু বুঝে ওঠার আগেই পিয়ালী অচেতন হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়লো। কতক্ষণ সে এই অবস্থায় পড়েছিল, তা কেউই জানতে পারেনি। বিট্টুর বাবা কোনদিন এই সময়ে বাড়ি আসে না, আজকে কোন একটা দরকারে সে এসেছিল। এসে দরজায় ধাক্কা দিল, অনেক ডাকাডাকি করল পিয়ালীকে। কোন সাড়া না পেয়ে তার মেজাজ আরো গরম হয়ে উঠলো। দরজা ভেঙেই ঘরে ঢুকতে হবে! অনেকক্ষণের প্রচেষ্টায় দরজা ভেঙে ঘরে ঢুকলো অলোক আর ঢুকেই চমকে উঠলো। পিয়ালী মেঝেতে পড়ে আছে অচেতন অবস্থায়, মুখ দিয়ে ফ্যানা বেরোচ্ছে। হতচকিত অলোক আশেপাশের লোকজনের সাহায্যে পিয়ালীকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে গেল।
---মেজর হার্ট এটাক! আপনারা ওনাকে আনতে দেরী করে ফেলেছেন, কর্তব্যরত ডাক্তার গম্ভীরমুখে বললেন।
পিয়ালীকে হাসপাতালে ভর্তি করানো হল কিন্তু পিয়ালীর আর বাড়ি ফেরা হল না, অন্ধকারে হারিয়ে গেল। মায়ের এভাবে হঠাৎ চলে যাওয়া বিট্টুকে ভীষণ আঘাত করলো। এভাবে হঠাৎ করে তার সুস্থ মা অসুস্থ হয়ে পড়ে শেষ পর্যন্ত মারা যাবে, সেটা কেউই মেনে নিতে পারছে না। মায়ের যে এত শরীর খারাপ ছিল, তা সে কেন এত কাছে থেকেও বুঝতে পারলো না! মা-ও তো কোনদিন বলেনি যে তার এত শরীর খারাপ! আজ বাবা ছাড়া তার আর কেউই রইল না কিন্তু বাবার সাথে তার অনেক দূরত্ব। কেন বাবা তাকে এত দূরে সরিয়ে রাখে, তার উত্তর সে আজো পায়নি।
মায়ের মৃত্যুর মাসখানেক পর একদিন বাবা তাকে ডাকলো--- বিট্টু, দেখে যাও তো এখানে। সে ভয়ে ভয়ে বাবার কাছে গেল, দেখল একজন অচেনা মহিলা বাবার পাশে দাঁড়িয়ে আছে।
---ইনি তোমার পিসি হন, এখন থেকে এখানেই থাকবেন। প্রণাম করো।
বিট্টু মহিলাকে প্রণাম করতে যেতেই মহিলা বাধা দিল--থাক্, থাক্। আপনার এত বড় ছেলে আছে, জানতাম না তো!
--ক্লাস ফাইভে পড়ে, বাবা উত্তর দিল।
মহিলার বলার ভঙ্গী তার ভাল লাগলো না। সে জানে, তার বাবার কোন বোন নেই। কোনদিন শোনেই নি। তবে ইনি কে? মা মারা যাবার পর কোত্থেকে এলেন? মহিলার সাথের বাচ্চা মেয়েটি বিট্টুকে অবাক চোখে দেখছে। বিট্টু চলে গেল মায়ের ঘরে। এই ঘরটাতে ঢুকলে মায়ের গন্ধ পায়, মায়ের জিনিসপত্রে মায়ের স্পর্শ লেগে আছে। এই মহিলা এখন থেকে এই বাড়িতে থাকবে! মায়ের জায়গায়!
বাবার ব্যবহার আস্তে আস্তে আরো বদলে গেল। বাড়ির চাবি বাবা ওনার হাতে তুলে দিয়েছে। বিট্টু যতক্ষণ স্কুলে থাকে, ভাল থাকে। বাড়িতে ঢুকলেই নি:সীম শুন্যতা আর মন খারাপ লাগে। মা চলে যাবার পর সে একা একাই স্কুলের জন্য তৈরি হয়, বাসস্ট্যান্ডে চলে যায় একা, ফেরেও একাই। এখন আর তাকে যত্ন করে কেউ টিফিন বানিয়ে দেয় না। টিউশনেও একাই পড়তে যায়। বাবা বলে দিয়েছে তাকে সব কাজ একাই করতে হবে। স্কুল থেকে ফিরেই নিজেই ভাত নিয়ে খায়, পিসি তখন টিভিতে সিরিয়াল দেখায় ব্যস্ত। বিট্টু নিজের এঁটো থালা, গ্লাস নিজেই মেজে রেখে দেয়। চিকেন খাবার বায়না আর কার কাছে করবে? তার সামনে দিয়ে পিসি তার মেয়ের জন্য দুধ নিয়ে যায়, বিট্টুর মনে পড়ে মা তাকে দুধ খাবার জন্য কত অনুরোধ করত। এই কয়েক মাসের মধ্যে সব হারিয়ে গেছে তার। সে যে একটা মানুষ বাড়িতে আছে, তার অস্তিত্বও যেন এরা ভুলে গেছে।
নতুন ক্লাসে ওঠার পর বাবা তাকে স্পষ্ট জানিয়ে দিল তার পক্ষে আর বিট্টুকে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে পড়ানো সম্ভব নয়। যদি পড়তে চায়, তাহলে তাকে এখন কাছাকাছি কোন সরকারী স্কুলে ভর্তি করানো হবে। তাই করা হল। প্রাইভেট টিউশনে যাওয়াও বন্ধ হয়ে গেল। তাকে নিয়ে যাবার সময় কারোর নেই। বিট্টুর চোখ জলে ভরে উঠলো। সে জানে প্রতিবাদ করে কোন লাভ হবে না, বাবা তার পড়াশোনা বন্ধ করে দেবে। ওই মহিলা যেমন বলবে, বাবা তা-ই করবে। বাবা সকালে বেরিয়ে গেলে ওই মহিলা সারাদিন দরজা বন্ধ করে রাখে। বাবা আসার সময় হলে ঘর থেকে বেরোয়। এভাবে থাকতে থাকতে বিট্টুর যেন দম বন্ধ হয়ে আসে। মহিলা নিজের মেয়েকেও বিট্টুর কাছে ঘেঁষতে দেয় না, নিজেও দরকার ছাড়া কথা বলে না। বিট্টুকে এখন ঘরের অনেক কাজ করতে হয়-- বালতি দিয়ে ফিল্টারে জল দেয়া, টবের ফুলগাছে জল দেয়া, ঘর ঝাঁট দেয়া, পূজার ফুল তোলা, এসব।
এভাবে থাকতে থাকতে একসময় বিট্টুর শিশু মন বিদ্রোহী হয়ে উঠলো। সে ঠিক করলো, এই বাড়িতে আর থাকবে না। যেখানে তার মা নেই, যেখানে তার কোন প্রয়োজন নেই, সেখান থেকে সে চলে যাবে একেবারে, যেদিকে দু’ চোখ যায়।
মায়ের ছবিটার সামনে বসে সে অনেকক্ষণ কাঁদলো। তারপর উঠে, তার স্কুল ব্যাগে কিছু শার্ট প্যান্ট, মায়ের ছবিটা আর তার জমানো পকেটমানির ব্যাগটা ভরলো। এটুকুই সম্বল করে সুযোগ বুঝে একদিন খুব সকালে সে সবার অজান্তে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়লো। তার গন্তব্য স্টেশন। সে শুধু জানে, বাঁচতে হলে তাকে অনেক দূরে পালাতে হবে। আর একবার যে কোন একটা ট্রেনে উঠে পড়লে নিশ্চিন্ত। দ্রুত পায়ে সে হাঁটতে থাকলো যেন চেনাজানা কারোর নজরে না পড়ে। স্টেশন খুব একটা দূরে নয়। সে স্টেশনে পৌঁছে দেখল লোকজনের ভিড়। সে টিকিট কাটবে না। সে জানে না কোথায় যাবে, কোন্ ট্রেন আসছে, তা-ও জানা নেই। ভিড়ের মধ্যে সে মিশে গেল। বুকটা ধরফর করছে যদি বাবা জানতে পারে! তাহলে মেরেই ফেলবে।
বিট্টু মনে মনে চাইছে এখনি যেন কোন একটা ট্রেন চলে আসুক। সিগন্যাল দেখা যাচ্ছে। তার মানে একটা ট্রেন আসছে। ঠিকই একটা ট্রেন এসে থামলো আর প্ল্যাটফর্মে দাঁড়ানো লোকজন হুড়মুড়িয়ে ট্রেনে উঠে পড়লো। যাত্রীদের সাথে সেও এক ধাক্কায় একটা কামরায় উঠে পড়লো। এভাবে ভিড় ঠাসা ট্রেনে জীবনে সে প্রথম উঠেছে, তাও একা। তার দু’চোখে জল এলো। সে জানে না কোথায় যাচ্ছে, কী আছে তার কপালে, কে জানে! মায়ের মুখটা মনে পড়লো-- মা গো!
ট্রেন কু-ঝিকঝিক করে ছুটে চলেছে আর বিট্টু এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে চলেছে।