গল্প ১ । আশ্বিন ১৪৩২



ভাড়াটে ভূত 











মনিভা সাধু

হুগলি, পশ্চিম বঙ্গ


 

ভোর চারটেয় মাঘমাসের কনকনে শীতের কুয়াশা মাখা ভোরে ধুতি পাঞ্জাবির  ওপর সোয়েটার আর মাথায় বাঁদুরে টুপি পড়ে  বছর সত্তরের হরিসাধনবাবু দক্ষিণ কলকাতার বাড়ির গেট খুলে রাস্তায় নামতেই সেই অতি পরিচিত গন্ধ   পেয়ে প্রশ্ন করেন, “গ্রাম ছেড়ে কলকাতায় এসেছিস কেন?”

 সাথে-সাথেই কানের কাছে ফিসফিসিয়ে উত্তর শোনেন, “কত্তা, এবারে জগার একটা হেস্তনেস্ত না করলে আর চলছে না।

হরিসাধনবাবু হাঁটতে হাঁটতেই বিরক্ত হয়ে বলেন, “তোরা সবাই মিলে এটুকু সামলাতে পারছিস না?”

যতই হোক, আপনি হলেন গিয়ে বাড়ির মালিক, আর আমরা ভাড়াটে। আপনার সামনেই ফয়সালা হলে ভালো।পেছনে খড়মের আওয়াজ আসে

দেখছি কি করা যায়, এখন পালা।হরিসাধনবাবু হনহন করে এগিয়ে যান। বর্তমানে  হরিসাধনবাবু কলকাতায় বসবাস করলেও মনোহরপুর গ্রামে পৈতৃক ভিটেয় নিয়মিত যাতায়াত করেন। স্ত্রী, পুত্র, পুত্রবধূ কিছুতেই এই অজ পাড়াগাঁয়ে আসতে চায়না, নাক সিঁটকোয়, স্ত্রী বলেন, ”মনোহরপুর মন হরণ করেনা, রাতদিন লোডশেডিং হয়, টিভির সিরিয়াল দেখতে পারিনা, ওখানে গিয়ে করবোটা কি?”

নামীদামী অফিসে কাজ করা পুত্র বলে, ”নেটওয়ার্ক থাকেনা, ল্যাপটপ চলবে না, ওয়ার্ক এট হোমও হবেনা।

ডাক্তার পুত্রবধূ বলে, ”চেম্বার ছেড়ে যাওয়া অসম্ভব, রুগীরা অপেক্ষায় থাকে।

হরিসাধনবাবু মনেমনে গজগজ করেন, ”আমিও যেন অফিস করিনি! আর চেম্বারে পসার নেই, তবু রুগীর জন্য নিত্যিদিন হাঁ করে বসে থেকে কি যে হয়!

আজকাল তাই কাউকে কিছু না বলেই নিজেই ভিটেবাড়িতে চলে যান। এবারেও যাওয়ার উদ্যোগ করতেই বছর বারোর ক্লাস সিক্সে পড়া একমাত্র নাতনি, ঝিমলি ঝলমলে মুখে বলে, ”দাদু, এখন আমার স্কুল ছুটি, আমি তোমার সাথে যাবো, বেশ এডভেঞ্চার হবে।

হরিসাধনবাবু ঝিমলির কথায় হাসেন, ডাকাবুকো এই মেয়ে অনেকটাই তার স্বভাব পেয়েছে

গ্রামের বাড়িতে থাকে প্রায় নব্বই বছরের অকৃতদার গোবিন্দ। হরিসাধনবাবু গোবিন্দর কোলেপিঠে বড় হয়েছেন।স্টেশনে ট্রেন থেকে নেমে দুবার বাস পালটে নৌকোয় নদী পেরিয়ে অটোয় চেপে আসতে আসতে ঝিমলির অজস্র প্রশ্নের উত্তর দিতে হয়েছে। মাঝবয়েসী বিধবা, নি:সন্তান বেলা হরিসাধনবাবুর গ্রামের বাড়িতে রাঁধুনির কাজ করে। বেলা চটজলদি দুপুরের আর রাতের খাবারদাবার করে  বাড়ি চলে গিয়েছে। খেয়েদেয়ে ঝিমলি বিরাট বাড়িতে ঘুরেফিরে লাইব্রেরি রুমে এসে আলমারি থেকে নিজের পছন্দমতো বই নিয়ে দোতলায় ঘরে যায়। খানিক পরেই শীতের বেলা শেষ হতে না হতেই ঝুপ করে অন্ধকার নেমে আসে। হরিসাধনবাবু বৈঠকখানা ঘরে আরামকেদারায় হেলান দিয়ে চোখ বন্ধ করে বসে ছিলেন। অনেকক্ষণ আগে কারেন্ট চলে গিয়েছে, গোবিন্দ  হারিকেন জ্বালিয়ে ঘরের একপাশে রেখে দিয়েছে। ঝিমলি দোতলার ঘরে বিছানায় শুয়ে শুয়ে লন্ঠনের আলোয় গল্প বই পড়ছিল। গোবিন্দ নড়বড়ে শরীর নিয়ে তার কাছে এসে বসে, ”ঝিমলি সোনা কিসের গল্প পড়ছে?”

ঝিমলি বইয়ের পাতায় চোখ রেখেই উত্তর দেয়, ”ভূতের।

তেনারা তো এবাড়ির বাগানেই আছেন।

এইবার ঝিমলি বই রেখে গোবিন্দর দিকে ফেরে, ”ধুর! ভূত বলে কিছু আছে নাকি? সে তো গল্পেই।

কে বলেছে নেই? তোমার দাদু তো তেনাদের হাতেই এ বাড়ির দায়িত্ব দিয়ে নিশ্চিন্তে কলকাতায় থাকেন। এই বয়েসে আমি কি আর কিছু করতে পারি?”

ঝিমলির এবার একটু গা ছমছম করে, ”গোবিন্দদাদু, তুমি আমায় ভয় দেখাচ্ছো?”

বেশ, বিশ্বাস না হয়, রাতের বেলা খাওয়াদাওয়া হয়ে গেলো দেখো। তোমার দাদুর সাথে তেনাদের আলোচনা হবে, ঘুমিয়ে পড়োনা, কিন্তু।

রাতে খেতে খেতে ঝিমলি তার দাদুর দিকে চায়, ”তুমি ভূতেদের সাথে মিটিং করো?”

হরিসাধনবাবু  চমকে যান, ”তুই কিকরে জানলি?”

আমি বলেছি।গোবিন্দ জানায়

গোবিন্দকাকা, কেন বলতে গেলে? এরপর ঝিমলিও এখানে আর আসতে চাইবে না। কলকাতায় ফিরে সব জানালে ওরা আমাকেও আর আসতে দেবেনা।

ঝিমলি ততক্ষণে খেয়ে উঠে হাত ধুয়ে এসেছে, ”সব জেনে আমি আসবো না, এরকম ভাবছো কেন? আমি কি ভীতু নাকি?”

হরিসাধনবাবু নাতনির দিকে সস্নেহে তাকান, ”বেশ, শুনে শান্তি পেলাম। আসলে ভূতেদের থাকার জায়গার অভাব তাই এখানে আস্তানা গেড়েছে, ভাড়াটে হিসেবে থাকে। ভাড়ার টাকা দেওয়ার বদলে ঘরদোর পরিষ্কার করে রাখে, বাগানের গাছের যত্ন করে, ফল হলে পেড়ে বস্তায় রেখে দেয়, ঝাঁট দিয়ে পাতা জড়ো করে রাখে, পুকুরের মাছ ধরে জল ভর্তি মাটির জালায় রেখে দেয়।

ওদের কেমন দেখতে?” ঝিমলির আগ্রহ হয়

সে যে যেমন ভাবে দেখতে চায়। আসলে অনুভব করতে হয়। বিশ্বাসে মিলায় বস্তু তর্কে বহুদূর।হরিসাধনবাবু দোতলার  ঘরে ঘুমোতে যান। 

গোবিন্দ ফোকলা মুখে মিটিমিটি হাসে, ”কি গো ঝিমলিরানি, বিশ্বেস হলো?”

জেগে থাকতে চেয়েও ঝিমলি সারাদিনের ক্লান্তিতে কখন যেন ঘুমিয়ে পড়েছিল, রাতদুপুরে আচমকা ঘুম ভেঙে যেতেই ঝিমলি তার পাশে শুয়ে থাকা হরিসাধনবাবুকে দেখতে না পেয়ে দোতলার ঘর থেকে নেমে আসে। কোথাও তাকে খুঁজে না পেয়ে ডাকে, ”দাদু, কোথায় তুমি?” ঝিমলির আওয়াজে চাদর জড়িয়ে গোবিন্দ তার ঘর থেকে বেরিয়ে আসে, ”সে তো পুকুরপাড়ে।

আমিও যাবো।

এ তো সত্যিই ডাকাবুকো মেয়ে! যাওয়ার আগে এই চশমাটা পড়ে নাও।

গোবিন্দ ফতুয়ার পকেট থেকে গোল ফ্রেমের কালো কাঁচের চশমা ঝিমলির কানের দুপাশে ঝুলিয়ে দেয়।ভেজানো খিড়কির দরজা খুলে দুজনে চুপিচুপি পুকুরপাড়ের দিকে এগোয়। 

হরিসাধনবাবু তখন পুকুরের ধারে অশ্বত্থগাছের চারপাশে ঘেরা সিমেন্টের চাতালে বসেছিলেন। ঝিমলির হাত ধরে গোবিন্দ এক ঝোপের আড়ালে দাঁড়ায়, ”আওয়াজ করবে না। চুপ করে থাকবে।

ওদিকে অশ্বত্থগাছের সবচেয়ে উঁচু আর মজবুত ডাল থেকে ব্রহ্মদৈত্য হাজির হতেই আশেপাশের বড়সড় গাছ থেকে অন্যান্য বিভিন্ন বয়সী ভূত-পেত্নীরা সব দলেদলে সেখানে এসে হাজির হয়

ঝিমলি রাতদুপুরেও ব্রহ্মদৈত্যর সাদা ধুতি আর ঝুলন্ত দুপায়ে খড়ম স্পষ্ট দেখতে পায়। হরিসাধনবাবুর চারপাশে বিভিন্ন আকারের দলা দলা কুয়াশার মতো আবঝা কিসব ভেসে বেড়াচ্ছে। ঝোপের আড়ালে গোবিন্দ ঝিমলির দুকানের গর্তে নরম জেলির মতো কি যেন ঠুসে দেয়, ”ভূতেদের কথা পরিষ্কার শুনতে পাবে।

হরিসাধনবাবু গলা খাঁকারি দেন, ”কারুর কিছু বলার আছে?”

ব্রহ্মদৈত্যর গম্ভীর গলা শোনা যায়, ”কলকাতায় গিয়ে আপনাকে জগার কথা জানিয়েছিলাম।

হরিসাধনবাবু গায়ের চাদরটা ভালোভাবে জড়িয়ে নেন

ওদিকে কে যেন সমানেখক খককরে অনবরত কেশে যাচ্ছে, ব্রহ্মদৈত্য বিরক্ত হয়, ”বাগানে বাসক পাতার গাছ তো আছে, গন্ধ শুঁকে নিলেই তো হয়।” 

কাশতে কাশতেই সে-ই ভুত বলে ওঠে, ”মরার পর থেকে শুঁকছি। মানুষ জন্মে রস করে গিলতাম আর এখন শরীর নেই, অশরীরী তাই গন্ধেই যেটুকু হয়। যা  দূষিত বাতাস! টিকে থাকাই  দায়। যদ্দিন এই বাগানের সামনের রাস্তা দিয়ে গাড়ি যেতো না, বাতাস কি শুদ্ধ ছিল! আহা! দিনে কতবার যে কতরকম বাতাস খেয়েছি, বর্ষার জলে ভেজা বাতাস, বসন্তের এলোমেলো সুগন্ধি বাতাস, শীতের হিম মেশানো বাতাস, গ্রীষ্মের গরমাগরম বাতাস, হেমন্তের পাকা ধানের গন্ধ মেশানো বাতাস, আরও কত! কি তার সোয়াদ! আর এখন! শুধুই ডিজেল আর পেট্রোলে মেশানো বাতাস!

উপস্থিত সবাই দীর্ঘশ্বাস ফেলে। ব্রহ্মদৈত্য বলে, ”কলকাতা গিয়ে গাড়ির ধোঁয়ায় আমিও ধোঁয়াটে হয়ে গিয়ে নাজেহাল হয়েছিলাম।

হরিসাধনবাবু বলেন, ”মানুষ বড় যান্ত্রিক হয়ে যাচ্ছে।

সে আর বলতে! আজকালকার ছেলে বুড়ো সব রাতদিন মোবাইল নিয়ে থাকে, রাতেরবেলাও জেগে থাকে, শহরে ভূতেদের থাকাই দায়। সেইজন্যই তো এখানে এসে আস্তানা করলাম।আরেক ভূত বলে

হরিসাধনবাবু দীর্ঘশ্বাস ফেলেন, “মোবাইলের দাপটে মানুষ এখন ভূতের মতো জেগে থাকে। চারদিকে জলাজমি, পুকুর, খালবিল বুজিয়ে শুধু ফ্ল্যাটবাড়ি উঠছে, টাটকা সবজি মাছের দেখা পাওয়াই ভার, হাটে-বাজারে যেসব বিক্রি হয় তাতেও কীটনাশক মেশানো। এবারে গ্রামের ফাঁকা জায়গায় প্রোমোটারদের নজর পড়েছে। কে জানে এই পুকুরও না বুজিয়ে ফেলতে হয়। জগা তো নিত্যি পেছনে পড়ে আছে।

মেছোভূতের কাঁদোকাঁদো গলার আওয়াজ শোনা যায়, ”আমরা তাহলে যাই কোথায়! খাই কি? মাছ ছাড়া মেছোভুত হয়?”

ঠিক সেইসময় হাঁফাতে হাঁফাতে স্কন্ধকাটা এসে হাজির, ”হুজুর, এইমাত্র মেট্রোরেলের সামনে দুজন আত্মহত্যা করেছে।

তুই সেথায় আবার গিয়েছিলি?” ব্রহ্মদৈত্য প্রশ্ন করে

স্কন্ধকাটা কাঁচুমাচু হয়ে বলে, ”কত্তা, ভুল করে রাগের মাথায় রেললাইনে মাথা দিয়ে মরেছিলাম, সে-ই থেকে মাথা ছাড়া ঘুরে বেরাচ্ছি, নিজের মাথা না থাকলে খুঁজতে তো হয়, তাই না?”

সবাই খিকখিক করে হেসে ওঠে। ঝিমলিও মুখে হাত চাপা দেয়

দিন দিন ভূতের সংখ্যা বাড়ছে। আর এদিকে গাছপালা সব কেটেকুটে ফেলছে, পোড়োবাড়ি ভেঙে দিচ্ছে। এরপর থাকবো কোথায়!গেছোভুত দীর্ঘনিশ্বাস ছাড়ে

পাঁচিল দেওয়া আছে বলে এই বাগানের গাছে কোপ পড়েনি, নইলে জগা কবে সব সাফ করে দিতো, এবারে জগার সাথে একটা হেস্তনেস্ত করতেই হবে, নিত্যি এ ঝঞ্জাট আর পোষায় না।হরিসাধনবাবু জানান

কত্তা, আপনি জগাকে সন্ধ্যেবেলায় নেমতন্ন করুন, তারপর দেখি কি করতে পারি!ব্রহ্মদৈত্যর কথায় হরিসাধনবাবু জিজ্ঞেস করেন, ”কি করবি? জগার ঘাড় মটকে রক্ত চুষবি নাকি? ওসব খুনখারাপি চলবে না।

ব্রহ্মদৈত্য সঙ্গে সঙ্গে বলে ওঠে, ”ছি ছি, আপনি এদ্দিন ধরে এই জানলেন! গল্পে ভূতেদের নিয়ে যতই উল্টোপাল্টা লিখুক, আসলে ভূতেরা নাকিসুরে কথাও বলেনা, রক্ত চুষেও খায়না। ভূতেদের থাকা খাওয়া সবই হাওয়াতেই।

জগাকে ভালোভাবে নরমে গরমে বোঝাতে হবে। ব্যাটাচ্ছেলে রসগোল্লা আর জলভরা সন্দেশ খেতে খুব ভালোবাসে বলে নিয়েও এসেছি। এবার উঠি, নাতনিটা একা আছে।হরিসাধনবাবু ঘরে ঢোকার আগেই গোবিন্দ খুব সাবধানে ঝিমলিকে নিয়ে বাড়িতে ঢুকে পড়ে। হরিসাধনবাবু খিড়কির দরজায় তালা দেন। সেই ফাঁকে ঝিমলি আর গোবিন্দ নিজেদের বিছানায় শুয়ে পড়ে

পরদিন সন্ধ্যেবেলায় সিড়িঙ্গে চেহারায় লাল রঙ করা চুলে বছর পঁয়ত্রিশের জগা জিন্সের প্যান্ট, গেঞ্জির ওপর পুরো হাতা সোয়েটার, গলায় মাফলার ঝুলিয়ে এবাড়িতে এসেই হরিসাধনবাবুকে পেন্নাম করে,” দালালির কাজে সম্মান নেই কিন্তু পেটের জন্য করতেই হয়।

তুই চাইলে আমি তোর অন্য কাজের ব্যবস্থা করে দিতে পারি।

বৈঠকখানা ঘরের গদি আটা চেয়ারে বসে জগা গদগদভাবে বলে, ” তাহলে তো উপকার হয়। আর বাড়ি বিক্রি করতে চাইলে বসকে জানিয়ে কাগজপত্র ঠিক করার ব্যবস্থা করি, শুভকাজে দেরি করা উচিত নয়। পুকুর বুজিয়ে ঝাঁ চকচকে শপিংমল খুললে এ গাঁয়ের চেহারাই বদলে যাবে আর আপনিও পায়ের ওপর পা তুলে বাকি জীবন কাটিয়ে দিতে পারবেন।

দাদু তো বরাবর পায়ের ওপর পা তুলেই থাকে।ঝিমলির কথায় জগা ভুরু কুঁচকায়, “বড়দের কথায় ছোটদের কথা বলতে নেই।” 

দাদুও তো বয়েসে বড়, আপনি কেন তার অনিচ্ছে সত্ত্বেও বারবার এবাড়ি বিক্রির কথা বলেন?” ঝিমলি কোমরে হাত দিয়ে জগার সামনে এসে দাঁড়ায়, “জগাকাকু, এবাড়ি যে আমারও বাড়ি! কলকাতার বাড়িতে এরকম বাগান নেই, ফুল নেই, পাখি নেই আর তেনারাও নেই।

তেনারা আবার কারা?”

ঝিমলি ফিক করে হাসে, ”তেনারা মানে এবাড়ির ভাড়াটেরা।

জগা হাঁ করে থাকে, ঝিমলি বলে, ”দাদু তোমার জন্য রসগোল্লা আর সন্দেশ এনেছে। খাবে?”

প্লেটে সব গুছিয়ে রেখেছি, কেউ নিয়ে গেলে ভালো হয় ঠান্ডায় শরীর আর চলছে না।গোবিন্দ বলতে না বলতেই শূণ্যে প্লেট ভেসে আসে, জগার চোখ কপালে ওঠে, “এসব আবার কি?”

ঝিমলি ফিক করে হাসে, ”এবাড়ির ভাড়াটেরা ভাড়া দিতে পারেনা তাই কাজকম্মো করে পুষিয়ে দেয়।

প্লেটটা  নিয়ে কতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকবো?” গেছোভুতের গলার আওয়াজ পাওয়া যায়

    ঝিমলি প্লেটটা নিয়ে জগার সামনে টেবিলে রাখে

এসবে আমি ভয় পাইনা, ওঝা নিয়ে এসে সব তাড়াবো। কদিন শুকনো লঙ্কা আর সর্ষে পোড়ালেই সব পালাবে। আমার সাথে মামদোবাজি!জগা মুখে তড়পালেও তার মুখচোখ ফ্যাকাসে হয়ে গিয়েছে

এবারে কোত্থেকে একটা ডাঁসা পেয়ারা জগার কপালে এসে ঢাঁই করে লাগে

ছি, ছি, অতিথির সাথে এরকম ব্যবহার কেউ করে? নেমতন্ন করে এভাবে মারধোর করে?” জগা কপালে হাত চাপা দেয়

        হরিসাধনবাবু শূণ্যের দিকে চেয়ে ধমক দেন, ”তোরাও কি জগার মতো হবি?”

ব্রহ্মদৈত্যর গম্ভীর আওয়াজ শোনা যায়, “মামদো ছুঁড়েছে, ওর নাম নিয়ে  অপমান করায়!

জগা, তোকে শেষবারের মতো বলছি, এবাড়ির আশা ছেড়ে দে। নইলে এরা তোকে তিষ্ঠতে দেবেনা। এদ্দিন আমি ঠেকিয়ে রেখেছিলাম, এরপর আর আমার এব্যাপারে কোনো দায়িত্ব থাকবে না। পথেঘাটে, দিনেদুপুরে, রাতবিরেতে তোর বা তোর বসের খারাপ কিছু হলে আমায় দোষ দিসনে। তাছাড়া শুনলিই তো আমার নাতনিও এবাড়িতে আসতে চায়।

ঝিমলি ঘরে রাখা ওষুধের বাক্স খুলে জগার কপালে ক্যালেন্ডুলা লাগিয়ে দিয়ে তার মুখে রসগোল্লা পুরে দিয়ে বলে, ”জগাকাকা, আজ রাতে এখানে থেকে যাও। দাদুর কথামতো অন্য কাজ করো।

হরিসাধনবাবু জগার পিঠে হাত রাখেন, “সক্কালবেলা বাড়ি যাস।

সেরাতে দোতলার সবচেয়ে বড় ঘরে বিরাট পালঙ্কে জগা আর ঝিমলিকে দুপাশে নিয়ে হরিসাধনবাবু শুয়ে পড়েন। গোবিন্দ নিচে নিজের ঘরে ঘুমিয়ে পড়ে

অনেক রাতে ছাদে ধুপধাপ আওয়াজে সবার ঘুম ভেঙে যায়, হরিসাধনবাবু বিরক্ত হয়ে বলেন, ”ফূর্তিতে রাতদুপুরে নাচনকোঁদন বন্ধ কর। শান্তিতে ঘুমোতে না দিলে আমিই কিন্তু তোদের ভাগাবো। মানুষকে অগ্রাহ্য করলে মানুষও ভুতেদের গ্রাহ্যি করবে না।

জগা মুচকি হাসে, ঝিমলি ফিক করে হেসে পাশ ফিরে শোয়