পুরানো কথার ঝাল বেশি। আমাদের ছোটবেলাকার অর্থাৎ কিশোর বয়সের একটা ঘটনা দুর্গাপূজা দেখতে গিয়ে মনে পড়ল। যুবসমাজ ক্লাবের মূর্তি দেখতে গিয়ে আবিষ্কার করলাম, আলোর ঝলমলানির মধ্যেও একটা পোড়াবাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। এখন বোধহয় কেউ থাকেন না। তাদের খবরা-খবর ও আমার এখন জানা নেই। বলছিলাম, আমার ছোট বেলাকার ডাঃ অজয় কাকুর কথা।
উনি আমার বাবার বন্ধু ছিলেন। আর তার ছোট ছেলে আমার এক বছরের সিনিয়র ছিলেন। খুব ছোটবেলায় একদিন বাবা তার বাড়িতে আমাকে নিয়ে গিয়েছিলেন। তার বসার চেয়ারের ঠিক উপরটায় একজন ভদ্রলোকের ছবি দেখতে পেয়ে আমি ডাক্তার কাকুকে উনার পরিচয় জানতে চাইলাম। খুব সহজভাবে উনি জানালেন, ‘ইনি হচ্ছেন মিঃ আব্রাহাম লিংকন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি ছিলেন।’ ছোটবেলায় বাড়িতে, বিশেষতঃ আমাদের বাড়িতে কোন দেশপ্রেমিকের ছবি বা রবীন্দ্রনাথ, স্বামীজীর ছবি দেখতেই আমরা অভ্যস্ত। ফলে লিংকনের ছবি আমাকে একটু অবাক করল! ডাক্তার কাকু আমার হাবভাব দেখে সব বুঝতে পেরেছেন। বলছেন, ‘কি মনে মনে ভাবছ -এখানে এ ছবি কেন?’
পাশ থেকে বাবা উত্তর দিলেন, ‘গণতন্ত্র হল জনগণের, জনগণের দ্বারা এবং জনগণের জন্য সরকার-Government of the people, by the people, for the
people.’
এই কথাটা শুনে ডাক্তারকাকু আমাকে বললেন, ‘বুঝতে পারলে?’
‘হ্যাঁ’, বলেছিলাম, কিন্তু কোন কিছু না বুঝেই তা বলা হয়।
বাইরে ঝপ্ ঝপ্ বৃষ্টি হচ্ছে। আর তারই তালে তালে বাবা এবং ডাক্তার কাকুর বলা কথাগুলি আমাকে আজো নাড়া দেয়। আমাকে শুনিয়ে বাবা বলছিলেন, ’তিনি গণতন্ত্রের জনক। তাই সমস্ত বিশ্ব তাকে সম্মান জানায়, শ্রদ্ধা করে।’
ডাক্তার কাকু বললেন, ‘খোকা বুঝতে পারলে তো?’
বাবা এবং ডাক্তার কাকু কথা বলছিলেন। বাবা বললেন, ‘শোন অজয়, এই গণতন্ত্রের আরেক নাম জনগণের শাসনতন্ত্র। ফলে শাসনতন্ত্র যারা তৈরি করবেন, তাঁদেরকে আদর্শভিত্তিক চলনায় অভ্যস্ত হওয়া প্রয়োজন।’ কতটা প্রয়োজনীয় কথা বাবা বলেছিলেন, আজ তা উপলব্ধি করতে পারি।
‘আদর্শে খুশি থাকার জন্য মানুষ অনবরত নিজেকে পরিশুদ্ধ করে চলে। মানুষ আদর্শতন্ত্রী না হলে গণশক্তির অভ্যুত্থান হয় না।’
বাবা যোগ করলেন, ‘মানুষের আদর্শতে ভালোবাসা যোগ করলে, প্রত্যেকে প্রত্যেকের ধারণ, পালনে সহায়তা ও শক্তি যোগাতে পারে। ফলে গণশক্তি আর আত্মশক্তি সমৃদ্ধ হয়।’
‘আদর্শতন্ত্র, গণতন্ত্র, ব্যক্তিতন্ত্র মানুষকে তার চিরকাম্য স্বস্তি, শান্তি ও সমৃদ্ধি দান করে। ‘এক নিঃশ্বাসে অজয়কাকু কথাগুলি বলে গেলেন।
কথাটায় ছেদ পড়ল কাকিমণির চা-বিস্কিট আপ্যায়নে।
আমার বাবা আর ডাক্তার কাকু নিজেদের মধ্যে কথাগুলি বললেও আজ থেকে বহু বছর পূর্বে বলা এ কথাগুলি আমার এখনো মনে আছে।
আজ সকালে দৈনিক পত্রিকায় ‘ভাবনার জগত’ কলমে সদগুরুর একটা মন্তব্য দেখতে পাই। ওইখানে বলা হয়েছে, ‘ফ্রিডম অর্থাৎ স্বাধীনতা মানে প্রীতি নিয়ে স্বেচ্ছায় স্বচ্ছন্দে প্রিয়- নিকেতনে বাস করা। এর উল্টো হলেই সত্তা সঙ্কুচিত হয়।...... ব্যক্তি স্বাধীনতার কথা যে বলছি, এর পেছনে একটা মস্ত কথা এই যে আমি তা’ করতে পারব না, যাতে পারিপার্শ্বিকের বাঁচাবাড়া ও সুখ সুবিধা ক্ষুন্ন হয়। ভেজাল চলনকে সমাজ কখনো বরদাস্ত করে না। সমাজবিধান ও পারিপার্শ্বিক এমন হওয়া চাই, যাতে প্রত্যেকে স্বত:ই সৎ চলনে অভ্যস্ত ও প্রবুদ্ধ হয়ে উঠে এবং উল্টো চলন নিরুদ্ধ হয়-ই কি হয়।’ এই লেখাগুলি রাত্রিতে আবারো একবার পড়লাম। পড়তে পড়তে বাবা এবং কাকার কথা মনে পড়ে গেল। কিশোর বয়স পেরিয়ে আসা সদ্য বানপ্রস্থী আমি মনে মনে উপলব্ধি করলাম, এরই নাম বোধহয় ‘গণতন্ত্র’ যেখানে দ্বন্দ্ব, বিরোধ ও বৈষম্যকে এড়িয়ে চলে স্বাতন্ত্র্যময় জীবনকে উপভোগ করা যায়।
সূচিপত্র