গৌরচাঁদ যেখানে দাঁড়িয়ে আছে সেখানে একটি বিশাল গাছ যেন ধ্বংসের প্রহর গুণছিল। বড় বড় কাণ্ড আর ফুলে ভরা গাছটিতে অসংখ্য পাখির বাসা, পাখিরা উড়ে গেছে ভয়ে, যতদূর চোখ যায় বিস্তৃত কালো জলরাশি। বিশাল বিশাল মাটির চাঙড়, ভূগর্ভ থেকে উঠে আসা কৃষ্ণবর্ণ পাথরের চাঁই দ্বীপের মতো জেগে উঠেছে। মাটি থিতিয়ে যাচ্ছে দ্রুত বহু নিচে, সেইসঙ্গে অনেকগুলো শহর, জনপদ তাদের ঘরবাড়ি সমেত গভীরে ডুবে যাচ্ছে, খুব সম্ভবত এই বিশাল অঞ্চলটি বঙ্গোপসাগরের সঙ্গে জুড়ে যাচ্ছে মহা প্রলয়ের পরে।
মহা প্রলয়ই তো বটে। পাহাড়পর্বতে ভরা অঞ্চলটি বহুযুগ ধরেই ভূমিকম্পপ্রধান অঞ্চলে অবস্থিত। ছোট বড় মাঝারি ভূকম্প হতেই থাকে। তবে এবার যে মহাপ্রলয় হবে তা ভূবিজ্ঞানীরা আঁচ করতে পেরেছিলেন, তাই বিপদ সংকেত জানিয়ে দেওয়া হয়েছিল প্রায় একবছর আগেই। লোকজনকে সরিয়ে অন্যত্র নেওয়া হচ্ছিল। এমনকি বিশাল বিশাল বৃক্ষকে ক্রেনে করে তুলে অন্য জায়গায় রোপণ করা শুরু হয়ে গিয়েছিল। ছয়মাসের মধ্যে যেন সুবিস্তৃত মালভূমি রূপান্তরিত হয়েছে একটি পরিত্যক্ত সভ্যতায়। তবুও গুটি কয়েক লোকজন সবচেয়ে বিপজ্জনক সম্ভাব্য প্লেটোনিক উৎসস্থল থেকে নিরাপদ দূরত্বে থেকে সবকিছু দেখাশোনা ও গবেষণার ভার নিয়ে জেগে থাকত দিন রাত এক করে।
ভূমিকম্পের একদম মিনিট সেকেন্ড মেপে সময় বলে দেওয়া এখনো যেন বিজ্ঞানীদের অধরা। অনুমান করে নব্বই শতাংশ পর্যন্ত বলা গেলেও বাকি দশ শতাংশ প্রকৃতির হাতে ছেড়ে দিতে হচ্ছে। পৃথিবীর জনসংখ্যা খুব দ্রুত কমে আসতে থাকায় এখন একজন জীবিত মানুষের কদর খুব বেশি, বিশেষ করে পুরোপুরি রক্তমাংসের মানুষ যারা। কারণ মানুষ মরতে পারছে না। কোনো অঙ্গ বিকল হলেই সেখানে বসিয়ে দেওয়া হয় কৃত্রিম অঙ্গ। এভাবে চলতে চলতে একসময় পুরো মানুষটার প্রায় প্রত্যেকটা অঙ্গই হয়ে যাচ্ছে রোবোটিক, কবে যে পৃথিবী থেকে চলে যাওয়ার অন্তিম ছাড়পত্র মিলবে তা এখন আর সেই মানুষটির হাতে নেই। সবকিছু রিপ্লেসমেন্ট হতে হতে মানুষটির যুবকসময়ের চেহারা আবার ফিরিয়ে দেওয়া হয় কিন্তু আদতে সে অতিবৃদ্ধ। বহুদিন আগে অ্যাকসিডেন্ট, প্রাকৃতিক দুর্যোগ এইসবে হাজার হাজার মানুষ মরে যেত। আহা রে! কী অনুন্নত ছিল সব। দুর্ঘটনা জানি কেমন করে ঘটত। গৌরচাঁদ প্রায়ই এইসব ভাবে। তবে যে ঘটনাটির দিকে এখন সে তাকিয়ে ছিল তা হলো বিশাল গাছটিকে কীভাবে ফিরিয়ে আনা হলো মৃত্যুর কাছ থেকে। নিচে পড়ে যাওয়ার ঠিক আগমুহূর্তে দৈত্যাকায় দুটো রোবোটিক হাত ধরে ফেলল গাছটিকে, তারপর ক্রেনে করে নিয়ে চলল নিরাপদ জায়গায়। এইসব রোবোটিক যন্ত্রমানবদের হাত প্রায় এক কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত, এমনকি তাদের পা চলে যেতে পারে ভূগর্ভের অনেক গভীরে। কিন্তু
রোবটগুলো বহুপুরনো মডেলের এবং ব্যবহার করা খুব অসুবিধার। কাজ শেষ হওয়ার পর অঙ্গপ্রত্যঙ্গ মিনিমাইজ করে রাখতে হয়। তবুও এগুলোকে এখনো ড্যামেজ করা হয়নি। মারাত্মক প্রাকৃতিক দুর্যোগে এদের কাজে লাগানো যায়, তাছাড়া পুরনো টেকনোলজির ধারক ও বাহকও বটে।
মোট তিনজন পরিপূর্ণ মানুষ বিপদাপন্ন। কাদামাটি জলে ভেসে গেছে হয়তো চিরতরে। যেত না, যথেষ্ট সাবধানবাণী ও পাহারা ছিল অঞ্চলটি থেকে পঞ্চাশ কিলোমিটারের কম দূরত্বে যাতে কেউ না থাকে। কিন্তু পারা গেলো না। তবে তাদের মৃত্যু সুনিশ্চিত নয়। প্রাকৃতিক দুর্যোগে উদ্ধারকার্য চালাবার জন্য যে বিশেষ রোবটগুলো তৈরি হয়েছে তারা তাদের নিয়ে আসতে পারলেই হলো। ছোট্ট ছোট্ট মৌমাছির মত অসংখ্য ড্রোনগুলো তন্ন তন্ন করে খুঁজছে। জীবিত প্রাণীর সন্ধান পেলেই কন্ট্রোল রুমে সিগনাল পৌঁছে যাবে। সে মানুষই হোক বা পশু পাখি। তারপর উদ্ধার করা অসম্ভব কিছু নয়।
গৌরচাঁদ প্রথমে একটি অদ্ভুত অনুভবের শিকার হচ্ছিল। এরকম অনুভব তার তিরিশ বছরের জীবনে কখনো হয়নি। শরীরের ভেতরে থাকা মাইক্রোচিপসকে একবার প্রশ্ন করবে নাকি ভাবছিল, কিন্তু ইচ্ছে হলো একটু সময় আরো এই অভিজ্ঞতাটির ভেতর দিয়ে অতিবাহিত হোক। একটি চনমনে শিহরণ যেন, একে কি ভয় বা Fear বলে। মাইক্রোচিপস নিজেই জানিয়ে দিল, This is called thrill. বাংলা অভিধান সঙ্গে সঙ্গে জানিয়ে দিল উত্তেজনা বা উত্তেজিত হওয়া। গৌরচাঁদ জীবনে কখনো উত্তেজিত হয়নি। মাইক্রোচিপস এটাও বলেছে This is your first thrill in life. মৌমাছি ড্রোনগুলো বোধহয় খোঁজ পেয়েছে। রোবটদের ছুটে যেতে দেখল জল কাদা আর বড়ো বড়ো ঢেউয়ের মধ্যে। মরবে তো না কেউই। শ্বাসটুকু থাকলে আবার সবকিছুই রিপ্লেস করে দেওয়া যাবে।
গৌরচাঁদ প্রকৃতির অভাবনীয় ক্ষমতা দেখে উত্তেজিত এবং অবাক হয়েছে, যা আগে কখনো হয়নি। এই জেনারেশন দীর্ঘদিন ধরে আশ্চর্য সুন্দর একটি নিরাপদ জীবন যাপন করে আসছিল। এনসিয়েন্ট হিস্ট্রির যে বিশাল স্টোরেজগুলো রয়েছে সেখান থেকে পুরনো পৃথিবীর ঘটনাগুলোর দৃশ্য দেখা ও শোনা যায়, ইচ্ছে করলে বিশেষ চশমা পরে নিলে সেইসময়টাকে কিছুটা উপভোগও করা যায়। তবে গৌরচাঁদ কখনো তা করেনি। আজ ভয়াবহ প্রাকৃতিক দৃশ্য তার মধ্যে যে নতুন অনুভবের জন্ম দিয়েছে প্রাথমিক উত্তেজনা কাটানোর পর সেই অনুভব বদলে গেছে বিস্ময়ে।
সদ্য জেগে ওঠা এই বিশাল ঘোলা জল ও মাটির থকথকে অঞ্চলটাকে পেছনে রেখে গৌরচাঁদ নিজের আস্তানায় ফিরছে। পড়াশোনা বিস্তর করেছে এবং করছে গৌরচাঁদ। এটাতে ছাড় দেওয়া যাবে না বর্তমানের পৃথিবীতে বাঁচতে হলে। কষ্ট করে ব্রেন খাটিয়ে শিখতে হয় সবকিছু। এখন একমাত্র রোবট ছাড়া অবশিষ্ট সব মানুষকেই সারা জীবন বিভিন্ন রকম কোর্স করে যেতে হয়। কারণ জীবন সুদীর্ঘ। অবসাদ আসতে দেওয়া চলবে না। আর নতুন জিনিসগুলো আত্মস্থ না হলে চলাফেরাই করা যাবে না।
হাই গৌর! তুমি এখানে! ভীষণ মিষ্টি গলার এই আওয়াজটি শুনে গৌর একটু দাঁড়াল। শ্যামলিমা। সে অর্ধেক মানুষ ও অর্ধেক যন্ত্র। হৃদয় নেই, হার্ট অ্যাটাক হয়েছিল, রোবট ডাক্তাররাই সার্জারি করেছে শুধু ডিরেকশন দিয়েছে অতি বৃদ্ধ এক প্রাচীন মানুষ চিকিৎসক। স্তব্ধ হয়ে যাওয়া হার্টকে নিখুঁতভাবে শরীর থেকে বের করে সেখানে কৃত্রিম হৃদয় বসানো হয়েছে শ্যামলিমার। তাতে কী ধরনের ফিলিংস আসা যাওয়া করে স্পষ্ট কোনো ধারণা এখন পর্যন্ত নেই।
ব্রেন অবশ্য শ্যামলিমার নিজস্ব। তার বিকল হার্টটিও কিন্তু সংরক্ষণ করা হয়েছে। সেটা দিয়ে আবার গবেষণা করা যাবে। তাই শারীরিকভাবে হৃদয়হীন মেয়ে শ্যামলিমা। মুখটি সারাক্ষণ হাসি হাসি। কোনো প্রবলেম ফেস করতে গেলেও ওকে হাসি হাসি মুখেই দেখা যায়। শ্যামলিমা গৌরচাঁদদের গ্রীন ব্লকের তের নম্বর হাউসে থাকে। সঙ্গে ওর মা বাবা। এখন পর্যন্ত তারা সম্পূর্ণ মানুষ শরীর। মেয়ে চোখের সামনে ঘোরাফেরা করছে কথাবার্তা বলছে এতেই তাদের অফুরন্ত আনন্দ। নাইবা থাকল ওর হৃদয়, ব্রেন আছে তো। মা বাবা বলে ডাকছে।
গৌর শ্যামলিমার দিকে একটুসময় তাকাল। তুমি কোথায় যাচ্ছো? ওদিকে একটু দেখব।
আর যাওয়া নিষেধ, যেকোন সময় মাটি ধসে যেতে পারে। আমাদের গ্রীন ব্লকের মানুষজনকে সরে যেতে হতে পারে। প্রায় হাজার মাইল দূরে সবাইকে নিয়ে যেতে পারলে ভালো। হয়তো কিছুক্ষণ পরই বিপদ সাইরেন বেজে উঠবে, জায়গাটি পুরো সাগরের মতো হয়ে গেছে বা বলতে পারো পৃথিবীর একটি বৃহত্তম হ্রদ। তুমি আমাদের ব্লকের জায়েন্ট স্ক্রিনেই সব দেখতে পেয়েছো নিশ্চয়ই, তবুও ওদিকে যাচ্ছো? বিশেষ কোনো উদ্দেশ্য? গৌরচাঁদ চোখ দুটো ঈষৎ সরু করল।
শ্যামলিমার মুখে তেমনই মিষ্টি হাসি। কিন্তু তারপর সে একটি অদ্ভুত কথা বলল। আমার অকেজো হয়ে যাওয়া হার্টটি কি আমি দেখতে পারি?
সেটার জন্য মেডিকেল ডিপার্টমেন্টে যোগাযোগ করতে হবে, আমি কি বলব?
হু। জানি।
তাছাড়া তুমি তো এসব নিয়েই পড়াশোনা করছ। ভালো করেই জানো কি করতে হবে।
একজন জ্যান্ত মানুষের হার্ট আমি কি পেতে পারি গৌরচাঁদ? শ্যামলিমা রূঢ় গলায় বলল।
গৌরচাঁদ থমকে দাঁড়াল। আবার বিস্ময়! চব্বিশ ঘন্টায় দুবার বিস্ময় জাগল।
না পেতে পারো না। সেজন্য তোমাকে খুন করতে হবে। পৃথিবীতে পুরোপুরি মানুষের সংখ্যা কী ভীষণভাবে গুণে রাখা হয়েছে তা আমরা সবাই জানি। আর ব্লাড গ্রুপ তো মিলতে হবে। তোমার মা বাবার সঙ্গে হয়তো তোমার ব্লাড গ্রুপ মিলতে পারে, কিন্তু অন্যদের সঙ্গে?
শ্যামলিমা একটু অদ্ভুতভাবে তাকিয়ে আছে গৌরের দিকে। ওর মুখের হাসিটি অস্বাভাবিক মনে হলো।
কিন্তু আমি আবার পুরোপুরি মানুষ হতে চাই। প্রলয়ের ফলে যে তিনজন মানুষকে পাওয়া যাচ্ছে না তাদের মধ্যে যদি কেউ একজনও মারা যায় তার হার্টকে খুব দ্রুত বডি থেকে সরিয়ে আমার মধ্যে রিপ্লেসমেন্ট করে দিলে আমি পুরো মানুষ হয়ে যাবো। কত অল্প বয়স আমার চিন্তা করো, এখন থেকে আমি কেন এভাবে বেঁচে থাকব, কেউ আমার কাছে আসতে চায় না, কারণ হৃদয় নেই। হাত, পা না থাকলেও মানুষ থাকতাম, কিন্তু এখন আমি মানুষ নই।
কিন্তু কে তোমাকে সার্জারি করবে শ্যামলিমা? এটা অন্যায়। এধরনের অপারেশনে ব্লাড গ্রুপ মেলার কথাটাও তো তুমি বুঝতে পারছ। আমাদের আইন তোমাকে পুরোপুরি আউট করে দেবে। দীর্ঘ শাস্তি পাবে।
আমার সার্জারির ব্যবস্থা আমি করব, দৃঢ়ভাবে বলল শ্যামলিমা।
গৌরচাঁদ আর কথা বাড়াল না। গ্রিন
ব্লকে পৌঁছুতে পৌঁছুতেই শ্যামলিমার একটি আশা ব্যর্থ হয়ে গেল। কারণ রাস্তার বাঁকে রাখা জায়েন্ট স্ক্রিনগুলোতে দেখাচ্ছিল তিনজন মানুষ এবং জীবিত পশু সবাইকেই আহত অবস্থায় উদ্ধার করা গেছে এই ভয়ঙ্কর প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের পরও। তাদেরকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এখন রোবট সার্জনরাই তাদের অপারেশন করে ঠিক করে তুলবে।
আর একই সঙ্গে চারদিকে তীব্র সাইরেন বাজিয়ে ঘোষণা করা হলো সবাই যেন এরোড্রামের দিকে যায়। আপাতত সব মানুষকে এখান থেকে সরে যেতে হবে।
শ্যামলিমা গৌরকে বাই বলে ছুটতে ছুটতে চলে গেলো। শুধু গৌরচাঁদের অসম্ভব প্রতিক্রিয়াশীল মন বলল শ্যামলিমা এইমুহূর্তে যে হাসি হেসেছে সেটা রোবটের হাসি নয়। এই হাসির সঙ্গে কাল্পনিক এক নিষ্ঠুর সংযোগ রয়েছে গৌরচাঁদের।
কিছু মানুষ, কিছু অর্ধেক মানুষ আর বিপুল পরিমাণ রোবট মিলে সামলে নিল এই দুর্যোগকে। সবকিছু আবার স্বাভাবিক নিয়মে চলতে লাগল। গৌরচাঁদ এখন যে জায়গায় আছে ওর প্রায় মানুষ বন্ধু নেই বললেই চলে। অতি উন্নত কয়েকটি রোবট রয়েছে যাদের ব্যবহারে যান্ত্রিকতা নেই। মনে হয় তারা আসলেই মানুষ। শুধু গৌরচাঁদ জানে তার খুব প্রয়োজন মানুষের। রক্ত ও মাংসের সহানূভূতিশীল একজন মানুষ যার কাছে স্বাভাবিক বিস্ময় ও কল্পনা রয়েছে, যাদের চেহারা সবসময় সুঠাম সুন্দর হয় না। কিন্তু সারা পৃথিবীতে হিসেব করে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাখা হয়েছে মানুষদের। ইচ্ছে করলেই মানুষ মানুষের কাছে যেতে পারে না।
ডাঃ শ্যামলিমা 3075 k1, নামটি স্বাভাবিকভাবেই বিখ্যাত। সার্জারিতে এত নিঁখুত ডাক্তার কাম রোবট কমই আছে। মানুষ ভরসা পায় কারণ এর ব্রেন আছে, মানুষের মতো সংবেদনশীল। নাই বা থাকল হৃদয়। হৃদয় দিয়ে কী হয়! ব্রেনটাই আসল। সেখানেই মেধা ও বুদ্ধিমত্তা।
নিজস্ব রোবট টিম বানিয়েছেন ইনি। পৃথিবীর যেকোন জায়গায় যেকোন সময় ডাক পড়তে পারে। সমস্ত পৃথিবীর মেডিকেল সায়েন্সের সঙ্গে অনিবার্য চুক্তিতে আবদ্ধ।
একদিন সে একটি জীবন্ত হার্ট চেয়েছিল নিজের জন্য? এর উত্তর গৌরচাঁদ তখনও দিতে পারেনি, এখনও না।
গৌরচাঁদের বর্তমান ফ্ল্যাটটির বারান্দায় কিছু প্রাচীন গাছের বনসাই। তাদেরকে এখন আর পৃথিবীতে পাওয়া যায় না। খুব যত্ন করে
বিরল প্রজাতির কয়েকটি গাছকে পরিবর্তিত আবহাওয়ায় গৌরচাঁদ বাঁচিয়ে রেখেছে। গভীর রাতে গাছগুলোর কাছে দাঁড়ালে যেন পূর্বপুরুষদের কথাবার্তা ভেসে আসে।
সামান্য আলোছায়ায় বারান্দায় হাঁটছিল গৌর। সারাদিন অসম্ভব ধকল গেছে। কাজগুলো চোখে দেখা যায় না, কিন্তু নিরবিচ্ছিন্ন মনোযোগের সঙ্গে করতে হয়। ক্রমাগত মেশিনের দিকে তাকাতে তাকাতে একসময় ক্লান্ত হয়ে যায় চোখদুটো। মনে হয় চোখের সামনে কিছু বিচ্ছিন্ন রঙ আসা যাওয়া করছে শুধু।
রাত্রির সুষুপ্তি ভেদ করে বাড়ির বাগানে একটি ড্রোনকে নামতে দেখল গৌরচাঁদ, কয়েকজন মানুষ। অবশ্য মানুষ কিনা আজকাল নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। হেলমেট খুলে ফেলার পর প্রথমজনকে চিনে ফেলল সহজেই, অমলিন চেহারার শ্যামলিমা।
সঙ্গে ছোট্ট একটি টিম। সবাই হাসল, সেই একই রকম প্রাণহীন যান্ত্রিক হাসি।
গৌরচাঁদ হেসে হাত বাড়াল। তোমার মা বাবা ভালো আছেন?
প্রথমেই মা বাবা কেন? আমি কেমন আছি জিজ্ঞেস করতে পারতে।
তুমি তো ভালোই আছো ।
কিন্তু কথা হচ্ছে আমার মা বাবা এখনো মরেনি বা তাদের ব্রেন ও হৃদয় কোনোটাই নিতে পারছি না, এটাই বোধহয় তোমার মনে হয়েছিল, আমার অনুমান নির্ভুল তাই না?
আমি এখনও হৃদয়হীন। তবে তোমার আর আমার ব্লাড গ্রুপ এক।
হঠাৎ গৌরচাঁদের কেমন ভয় করতে লাগল এবং তারপরই সম্পূর্ণ ব্ল্যাক আউট।
ঠিক কতক্ষণ চলেছিল মনে নেই। যখন চেতনা এলো সেখানে শ্যামলিমা ছিল না। শ্যামলিমার দুজন সহকারী। তবে গৌরচাঁদ উঠতে পারেনি। তার জটিল অপারেশন হয়েছে। পরিচর্যায় আছে রোবট নার্স ও ডাক্তার। জানতে পারল ওর হার্ট রিম্যুভ করা হয়েছে। বসানো হয়েছে কৃত্রিম হৃদয়। গৌরচাঁদ চিৎকার করতে চাইল, পারল না। বিরবিরিয়ে বলল তোমার বিরুদ্ধে আইন ব্যবস্থা নেবে।
কেউ যেন ওর মনের কথাগুলো বুঝে ফেলেছে, অজানা প্রান্ত থেকে উত্তর এলো, পুরোপুরি মানবী হয়ে গেছি, শরীরে কোনো যন্ত্র রাখিনি, অনেক ধন্যবাদ তোমাকে, অবশ্য তুমি নিশ্চয়ই এতক্ষণে অসম্ভব রেগে গেছো, তবে এমন জায়গায় হারিয়ে যাবো, খুঁজে পেতেও বহুদিন লেগে যাবে, আমি বোকা নই গৌরচাঁদ।