akkharbarta

অক্ষরবার্তা - একটি কিশোর বার্তা উদ্যোগ... আমাদের মূল লক্ষ্য উচ্চ মানের বই পাঠকের হাতে পৌঁছে দেওয়া... যোগাযোগ করুন - akkharbarta@gmail.com | www.akkharbarta.in

বাণিজ্য । ২৫ মার্চ ২০২৬





রূপি কথা











রোশনি চক্রবর্তী

আগরতলা, ত্রিপুরা



 

ভারতীয় রূপি শুধু একটি লেনদেনের মাধ্যম নয়—এটি এক ভ্রমণকারী। প্রত্যেকটা টাকা সুখ-দুঃখের অনুভূতি বহন করে চলে, আমাদের অর্থনৈতিক ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ। 

প্রাচীন রূপার মুদ্রা থেকে শুরু করে আধুনিক ডিজিটাল লেনদেন পর্যন্ত, প্রতিটি রূপি আমাদের দেশের সঞ্চয়, ব্যয় আর বিকাশের দায়ভার বহন করে।

 

চল, রূপির জীবনকাহিনিতে
প্রবেশ করি -

রূপির উৎস প্রাচীন ভারতে, যেখানে রূপ্য শব্দটি ব্যবহৃত হত “রূপা দিয়ে গড়া” বোঝাতে। শের শাহ ছিলেন একজন উজ্জ্বল কৌশলবিদ, প্রতিভাধর প্রশাসক এবং দক্ষ সেনাপতি। তিনিই চালু করেন রুপিয়া, যা আজকের রূপির পূর্বসূরি। ব্রিটিশ আমলে আধুনিক রূপির রূপ নিতে শুরু করে। ১৯শ শতকে কাগজের নোট চালু হয়। স্বাধীনতার পর আসে দশমিক পদ্ধতি—যেখানে আনা, পাইস, পয়সার জটিলতা বাদ দিয়ে ১০০ পয়সা = ১ রূপি করা হয়

প্রতিটি রূপি নোটের মধ্যে দেখা যায় দেশের সংস্কৃতি, অগ্রগতি, কৃষি, বিজ্ঞান, বন্যপ্রাণী আর ঐতিহ্যের প্রতীক। ১৯৯৬ সালে চালু হওয়া মহাত্মা গান্ধী সিরিজ রূপিকে একটি পরিচয় দেয়। ২০১০ সালে ভারত নিয়ে আসে রূপির প্রতীক—যেখানে দেবনাগরীর “ আর রোমান “R”-এর মিশ্রণ, যা ঐতিহ্য আর বিশ্বপরিচয়ের প্রতীক



কিশোর বার্তা-র সম্পাদক রজত বরন চক্রবর্তী-র আঁকা রূপি প্রতীক

এই প্রতীকের সঙ্গে আমাদের ব্যক্তিগত যোগও রয়েছে। কিশোর বার্তা-র সম্পাদক রজত বরন চক্রবর্তী একসময় ভারতের সরকারি রূপি প্রতীক নকশার জাতীয় প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছিলেন। তখন তিনি বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড-এর আর্ট ডিরেক্টর ছিলেন। সেই সময়ের সংবাদপত্রে তাঁর ভাবনায় তৈরি রূপি প্রতীক প্রকাশিত হয়েছিল অন্যান্য প্রতীকের সঙ্গে। তাঁর প্রতীকটি নির্বাচিত প্রতীকের সঙ্গে ভাবনায় ও শৈলীতে আশ্চর্যজনকভাবে মিল ছিল। এটি মনে করিয়ে দেয়—প্রতিটি জাতীয় প্রতীক শুরু হয় কারও কল্পনা থেকে, আর তরুণদের সাহসী স্বপ্নই দেশের পরিচয় গড়ে তোলে





নোটের জীবন শুরু হয় ভারতের চারটি উচ্চ-নিরাপত্তা ছাপাখানায়—নাসিক, দেবাস, সালবোনি ও মাইসোরে। বিশেষ কটন-ভিত্তিক কাগজ, জলছাপ, সিকিউরিটি থ্রেড, রঙ বদলানো কালি আর মাইক্রোপ্রিন্টিং দিয়ে তৈরি হয় আসল নোট। ছাপা, কাটা, গোনা, প্যাক করা শেষে সেগুলো চলে যায় নিরাপদ ভল্টে। ভারতের কয়েন সরকারি মিন্টে তৈরি হয়, যা পরিচালনা করে সিকিউরিটি প্রিন্টিং অ্যান্ড মিন্টিং কর্পোরেশন অফ ইন্ডিয়া লিমিটেড (SPMCIL)এগুলো তৈরি হয় মুম্বাই, হায়দরাবাদ, কলকাতা ও নয়ডায়। স্টেইনলেস স্টিলের পাত কেটে গোল ব্ল্যাঙ্ক বানানো হয়, তারপর ছাঁচে চাপ দিয়ে প্রতীক ও নকশা বসানো হয়। প্রতিটি কয়েনের ওজন, শক্তি ও নির্ভুলতা পরীক্ষা করা হয়

নোট RBI-এর ছাপাখানা থেকে, আর কয়েন মিন্ট থেকে RBI-তে পৌঁছায়। সেগুলো রাখা হয় কারেন্সি চেস্টে, যেন মঞ্চের আড়ালে অপেক্ষমাণ অভিনেতা। ব্যাংকই RBI আর জনগণের মধ্যে সেতু। নোট আসে ATM-এ বা কাউন্টারে, কয়েন আসে ব্যাগে ভরে দোকান, ব্যাংক আর মানুষের হাতে। এখান থেকেই শুরু হয় রূপির সক্রিয় জীবন—কখনও বাসের কন্ডাক্টরের থলেতে, কখনও শিশুর পিগি ব্যাংকে

নোট হাত বদলায়, শহর বদলায়, বাজারে ঘোরে, মানিব্যাগে ভাঁজ খায়, কখনও ডেনিমে ধুয়ে যায়। কয়েন আরও শক্তপোক্ত—কাউন্টারে গড়ায়, ভেন্ডিং মেশিনে বসে, গাড়ির সিটের নিচে পড়ে, জারে ঝনঝন করে। কয়েন দশকের পর দশক টিকে থাকে, যেখানে নোট কয়েক বছরের মধ্যেই মলিন হয়ে পড়ে, উজ্জ্বলতা হারায়

ব্যাংকে ফিরে আসা নোট মেশিনে পরীক্ষা হয়। ফিট নোট আবার চলাচল করে, নোংরা নোট কিছুদিন আরও থাকে, আর আনফিট নোট যায় শেষ অধ্যায়ে। কয়েনও পরীক্ষা হয়—বাঁকা, মরচেধরা বা ক্ষতিগ্রস্ত কয়েন ফেরত যায় মিন্টে। RBI-এর কাগজকাটা কক্ষে অযোগ্য নোট ছিন্নভিন্ন করা হয়। ক্ষতিগ্রস্ত কয়েন গলিয়ে নতুন ব্ল্যাঙ্ক বানানো হয়। পুরনো টাকা বিদায় নিলে নতুন টাকা জন্ম নেয়

আজ রূপি শুধু নোট বা কয়েন নয়—UPI, অনলাইন ব্যাংকিং, ই-ওয়ালেট আর ডিজিটাল রূপি (e₹) আমাদের লেনদেনের ধরন পাল্টে দিয়েছে। তবুও নগদ টাকা কোটি মানুষের জীবনে অপরিহার্য

রূপির যাত্রা আসলে ভারতের যাত্রা—চলমান, পরিবর্তনশীল আর বিকাশমুখী। এর জীবনচক্র বোঝা আমাদের শেখায় প্রতিটি রূপিকে দায়িত্বশীলভাবে ব্যবহার করতে, যাতে সে আমাদের সেবা করতে পারে আরও দীর্ঘ সময়

<<

হোম পেইজ