গল্প ১ । ফাল্গুন ১৪৩২



টিউশনি পড়বে 
ভূতের ছানা













মুহিব্বুল্লাহ কাফি

ঢাকা, বাংলাদেশ 



  

 

বাইরে ঝুম বৃষ্টি। সাথে পিলে কাঁপিয়ে দেওয়া বজ্রপাত। রাতের অন্ধকার ভেদ করে পূব দিগন্তে অনেকটা দিনের মত ভেসে উঠে আকস্মিক বিজলিতে। টিন শেডের দুচালা ঘর। নেহালের রুম থেকে পূবের জানালার ফাঁক গলে বিজলি আলো আসে থেকে থেকে। টিনের চালে বৃষ্টির আঘাতে ঝুমঝুম মৃদু আওয়াজ তোলে; নেহালের বেশ প্রিয় মুহূর্ত। 

এই নিশুতি রাতে একা শুয়ে নেহাল। বৃষ্টির বাগড়ায় ইলেক্ট্রিসিটি নেই। থাকাটা অস্বাভাবিক। গাঁও-গ্রামের বিদ্যুৎ আসা যাওয়ার প্রতিযোগিতা চলে হরহামেশাই। আসা থেকে যাওয়াটাই বিজয়ী হয় প্রতিনিয়ত। বৃষ্টি আসলে তো কথাই নেই। আভাস পেলেই বিদ্যুৎ লাপাত্তা। সারারাত। পরের দিন...

যাক সে কথাবাইরে বৃষ্টি। শীত শীত ভাব। নেহালের আবদার খিচুড়ি রাঁধতে হবে। মা তাই করলেন। একমাত্র ছেলে খিচুড়ি খেতে চেয়েছে বলে কথা। আর আমেজটাও জমপেশ। 

নেহাল খিচুড়ি খেয়ে কাঁথা টেনে উবুর হয়ে শুয়েছে। শিথানের বালিশ বুকের ক'খান হাড়ের নিচে। সহপাঠী ফরিদ থেকে ধার করে আনা 'নিশুতি রাতের ভূত' বইটা বের করল নেহাল। 

আজও নিশুতি রাত। বাইরে ঝুম বৃষ্টি। মাথার উপর ঝুমঝুম আওয়াজ। চার্জার লাইট। নিভু নিভু করছে। সহসা আসা বিজলি ছেয়ে যায় ঘরের নিভু নিভু চার্জার লাইটের আলোকে

বৃষ্টির রাত। ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা ভাব। ঝুমঝুম আওয়াজ। এহেন মুহূর্তে খিচুড়ি খেয়ে কাঁথা টেনে উবুড় হয়ে ভূতের গল্প পড়ার আনন্দ খুব উপভোগ করছে নেহাল

নেহাল পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র। গল্পের বইয়ে বুঁদ হয়ে থাকে ও প্রায়ই। ভূতের গল্প হলে তো কথাই নেই। নেহাল কত রাত কাটিয়ে দিয়েছে গল্পের বই পড়ে। তবে এমন আবহাওয়ায় ভূতের গল্প বেশ টানে নেহালকে। তাইতো আবহাওয়া টের পেয়েই বন্ধু ফরিদ থেকে ভূতের বইটা নিয়ে এসেছে আজ। রাতে পড়বে বলে। 

দুই

নেহাল ভূতের গল্প পড়ছে। বইটিতে গা ছমছম করা বেশ কিছু গল্প আছে। রাত গভীরতায় যাচ্ছে। বৃষ্টির বাগড়া ধীরে ধীরে ক্ষীণ হয়ে আসছে। তবে বজ্রপাত পড়ছে থেমে থেমে। নেহাল গল্পে মজে আছে। মিটিমিটি আলোতে। হঠাৎ নেহাল অনুভব করল তার পাশে কারোর নিঃশ্বাস ছাড়ার শব্দ। বই থেকে চোখ সরিয়ে ইতিউতি চোখ ঘুরাল ও। কিন্তু না কোনোকিছুর টের পেল না নেহাল

তাই ফের গল্পে মজে গেল নেহাল। খানিক বাদে আবার লড়চড় অনুভব করল কারোর। এইবার নেহালের শরীরের পশম দাঁড়িয়ে গেল। এমনটা কখনও হয় না। নেহাল বেশ সাহসী ও ডানপিটে ছেলে

এমন অনেক রাত পার করে দিয়েছে নেহাল ভূতের বই পড়ে। কিন্তু আজকে কেমন যেন ভয় ভয় লাগছে ওর। মনের ভুল না তো? নেহাল মনের ভুল ভেবে নিয়ে ভয় দূর করতে চায়। ঠিক এমন সময় বজ্রপাতের আওয়াজে নেহালের পিলে কেঁপে উঠল। বজ্র যেন পড়ল তার বুকের ভেতর। নেহাল একদলা থুতু বুকে নিক্ষেপ করল। এমন সময় তার মত কাউকে আবিষ্কার করল নেহাল। ওর পাশেই ওর মত উবুড় হয়ে শুয়ে ওর দিকেই তাকিয়ে আছে। 

নেহাল আঁতকে উঠল। ভয় পেল বটে তবে বিচলিত হলো না। নেহালের চিবুক ভিজে উঠল মুহূর্তে। বইটই ফেলে দিয়ে তড়িঘড়ি করে উঠে বসল

এবার তোতলাতে তোতলাতে বলল, কে তুমি?

আমি টুলু। ভূতেরর ছানা দাঁতমুখ খিঁচিয়ে ভয়ানক স্বরে না বলে বলল স্বাভাবিকভাবে। 

       তুমি কি ভূতের ছানা? ভয়ে ভয়ে বলল নেহাল। 

    টুলু বলল, তা বলতে পারো। আমি তোমার মতই। তাই ভূতের ছানাই সই

এবার ভূতের ছানা টুলুও সোজা হয়ে বসল। বিছানাতে পড়ে থাকা ভূতের বইটা হাতে নিয়ে বলল, তুমি কি জানো আমি কেন তোমার কাছে এসেছি?

নেহাল চিবুক মুছতে মুছতে বলল, না তো! কেন?

টুলু বলল, আমি এসেছি মূলত তোমাকে মারতে

নেহালের বেহাল দশা। ভূত বলতে কিছু নেই, আমি ভূতকে ভয় পাই না, এমনসব ধ্যানধারণা উবে গেল। সাহসী ছেলে এখন মুখে জড়তা মেখে বলল, কে..কে.. কেন!

       নেহাল খুব ভয় পাচ্ছে বুঝতে পেরে টুলু আরেকটু নরম গলায় বলল, ভয় পেয়ো না। যদিও তোমাকে মারতে এসেছি মানে ভয় দেখাতে এসেছি। কিন্তু তা আর করব না

নেহালের কপালের ভাঁজ এবার সোজা হল

টুলু বলতে লাগল, আমি একটাও খারাপ কাজ করতে পারি না বলে আমাকে বাসা থেকে বের করে দিয়েছে। খারাপ কাজ করতে পারলেই ঘরে যেতে পারব

          নেহাল এবার অনেকটাই বুকে সাহস জুগিয়ে বলল, কেন, খারাপ কাজ করতে হবে কেন? খারাপ কাজ করা তো মহাপাপ

টুলু নেহালের দিকে মুচকি হেসে বলল, এবার ভয় কমেছে তো

নেহাল মাথা নাড়াল

টুলু বলল, আমাদের ভূত জগতে ভৌতিক কিছু নিয়মকানুন আছে। যেগুলো না করতে পারলে ভূতসমাজে মুখ দেখানোই দায় হয়ে যায়

ও আচ্ছা এটা তোমাদের নিয়ম। নেহালের ভয় এবার অনেকটাই কেটে গেছে। 

শুধু নিয়ম না। সপ্তাহ, মাসে কোনো একজনকে পিলে কাঁপান ভয় না দেখাতে পারলে অসুখও হয় আমাদের। বলল টুলু

নেহাল ছানাবড়া চোখ বানিয়ে বলল, কিমানুষকে ভয় দেখাতে না পারলে, খারাপ কাজ করতে না পারলে অসুখ হয়!

টুলুও এবার নেহালের বন্ধুদের মতই কথাবার্তা স্বাভাবিকভাবে বলতে লাগল, অসুখ বলতে, ঠিকমতো ঘুম হয় না। বুক ব্যাধিতে পড়তে হয়। এমনকি কাউকে ভয় দেখাতে না পারলে আমাদের পেটের ভাতও হজম হয় না

নেহাল এবার খিলখিল করে হেসে উঠল। 

সে টুলুকে তার বন্ধু মনে করেই কথা বলছে। টুলু যে একটা ভূত, নেহাল বেমালুম ভুলে বসেছে। নেহাল এবার বলল, তাহলে তুমি ভয় দেখাতে পারো না?

টুলু বলল, মানুষদের ভয় দেখানো, আঘাত করা, ঘাড় মটকে দেওয়া খুব খারাপ কাজ। আমার দ্বারা এসব হয় না। কাউকে ভয় দেখতে পারি না বলেই তো অন্যরা বলে আমি নাকি ভূতসমাজের কলঙ্ক! 

টুলু একটু থেমে বলল, সত্যি কথা কি জানো

নেহাল বলল, না

টুলু এবার নেহালের কানের কাছে ফিসফিস করে বলল, সত্যি কথা হল আমাদের বংশে খুব ভালো ভয় কেউ দেখাতে পারে না। আব্বু আম্মু অন্য বংশের ভূতদের দেখানোর জন্য টুকটাক যা ভয় দেখায়। মানুষের পিলে কাঁপিয়ে দেওয়া ভয় দেখাতে পারে না। আর আমি তো না-ই। 

এ কথা বলতে ফিসফাস করার কী আছে? নেহাল কথা একটু জোরে বলল

টুলু এবার নেহালের মুখের সামনে আঙুল উঠিয়ে বলল, আস্তে বলো, অন্য বংশের ভূতেরা শুনতে পাবে। তারা কিন্তু রাতের আঁধারে ঘুরেফিরে। শুনতে পেলে আমাদের মান যাবে। কেলেঙ্কারি হয়ে যাবে

কি বললে, তোমাদের ভূতদের আবার বংশও আছে নাকি? নেহাল আশ্চর্যান্বিত হয়ে জানতে চাইল

টুলু হাতের আঙুল টিপেটিপে বলতে লাগলমেছো ভূত, গেছো ভূত, পিশাচ, পেত্নী, শাঁকচুন্নি, কানাঅলা, স্কন্ধকাটা, নিশি, রাক্ষস-খোক্কস। আরো কিছু বংশ আছে যেগুলোর নাম আমি জানি না

আচ্ছা বুঝলাম। এবার বলো তুমি কি করতে চাও? নেহাল টুলুর দিকে তাড়াহুড়ো করে বলল। 

হয়তো অনেক রাত হয়েছে বলে ঘুমও আসছে। কাল তো আবার স্কুলেও যেতে হবে

টুলু বলল, তুমি লেখাপড়া করো। বই-ও পড়তে পারো। আমিও লেখাপড়া শিখতে চাই

নেহাল বলল, তুমি লেখাপড়া শিখে কি করবে শুনি?

টুলু বলল, মানুষের মতো মানুষ হব। মানুষের সেবা করব। ভয় দেখাব না। 

ভয় তুমি এমনিতেই দেখাতে পারো না। নেহাল একগাল হেসে দিল। বলল, তারচেয়ে বরং তুমি ভূতেই থাকো

ভূত হয়েও তো আব্বু আম্মুর মানসম্মান রাখতে পারছি না। বলল টুলু। সেদিন আব্বু বলল আমি কাউকে ভয় দেখাতে পারি না বলে অন্য ভূতরা মুখ টিপে হাসে। এত লজ্জা আমি রাখি কোথায় বলো? তাছাড়া এগুলো আমার ভালো লাগে না৷ 

তা কি ভালো লাগে তোমার? কাঁথাটা এবার একটু মুড়িয়ে শুতে শুতে বলল নেহাল। 

টুলু বলল, আমার ভালো লাগে তোমাদের মত মানুষ হতে। লেখাপড়া করতে। কাউকে ভয় না দেখাতে।  ভূত হয়ে থাকতে আমার একটুও ভালো লাগে না। দম বন্ধ হয়ে আসে

নেহাল বলল, এগুলো কি তোমার আব্বু আম্মু জানে?

না, তারা কিছু জানে না। তারা জানে আমি তোমাকে ভয় দেখাতে এসেছি। বলল টুলু। এবং তারা এটা বলেছে তুমি একা থাকো। তাই আগামী কয়েকমাস তোমার ঘরে এসে তোমাকে একটুআধটু ভয় দেখিয়ে শিখতে। তাই আমি একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছি

কি সিদ্ধান্ত নিয়েছ? জানার আকুতি নেহালের

সিদ্ধান্ত নিয়েছি লেখাপড়া শিখব

এটা খুব ভালো সিদ্ধান্ত। বলল নেহাল

টুলু মাথা চুলকাতে চুলকাতে বলল, কিন্তু শিখবটা কোথায়?

নেহাল বলল, কোথায় মানে? স্কুলে শিখবে। তোমাদের স্কুল আছে না?

টুলু বলল, হ্যাঁ, স্কুল তো আছে। কিন্তু আমাদের স্কুলে লেখাপড়া শেখায় না

কি, তোমাদের স্কুলে লেখাপড়া শিখায় না, তো কী শিখায়? বলল নেহাল। 

টুলু বলল, আমাদের স্কুলে শিখানো হয়কীভাবে মানুষদের ভয় দেখালে পিলে কাঁপান যায়।

কি আজব স্কুল রে বাবা! নেহাল যেনো অবাকই হচ্ছে বারবার। বলল, তো তোমাদের ওই স্কুলে ভর্তি হতে তো পারতে। আর কিছু না হোক ভয় দেখানো শেখতে তো পারতে

টুলু এবার একটু বিরক্তিকর ভাব নিয়ে বলল, কিযে বলো। আমি মানুষের মত ভালো কাজ করতে চাই। তাছাড়া আব্বু তো আমাকে অনেক মেরেছে ভূতস্কুলে ভর্তি হতে। কিন্তু আমি হয়নি। 

তো, কোন স্কুলে ভর্তি হবে শুনি? নেহালের প্রশ্ন। 

টুলু ভূত বইটা হাতাতে হাতাতে বললআমি তোমাদের স্কুলে ভর্তি হতে চাই। লেখাপড়া শিখতে চাই

নেহাল বলল, সর্বনাশ! তুমি আমাদের স্কুলে গেলে সবাই পালাবে। ভূত কি আর মানুষের স্কুলে পড়ে?

তা ঠিক বলেছ। কিন্তু করবটা কি বলো? লেখাপড়া তো শেখতে হবে। না হয় মানুষের মতো মানুষ হব কীভাবে। 

এক কাজ করলে কেমন হয়? টুলু নেহালের কাঁথার দিকে চেয়ে বলল

কী কাজ? বলল নেহাল

টুলু বলল, টিউশনি পড়ব। 

কি, টিউশনি পড়বে? নেহাল এবার কাঁথা ফেলে লাফিয়ে উঠল। আরে বলে কি। কী পড়বে, পড়াবেটা কে?

টুলু স্বাভাবিকভাবে বলল, কেন, লেখাপড়া শিখতে যা যা পড়ার প্রয়োজন তাই পড়ব। আর পড়াবে তুমি। 

কি, আমি পড়াব! নেহাল আবারও আশ্চর্যান্বিত হল। আকাশ থেকে পড়ল যেনো

হ্যাঁ, তুমিই পড়াবে। তোমার কাছে প্রতিদিন তো আসবই। আব্বু আম্মু ভাববে তোমাকে একটু একটু ভয় দেখাতে আসি। কিন্তু সে সুযোগে আমি লেখাপড়া শিখে নেবো। মানুষের মতো মানুষ হব। পারবে না আমাকে টিউশনি করাতে? লেখাপড়া শিখিয়ে মানুষের মতো মানুষ হিসেবে গড়ে তোলতে?

নেহাল আমতা আমতা করতে লাগল। তার যেনো আবারও ভয় লাগতে শুরু করল। তবে সাহস করে বলেই ফেলল, কেন না। অবশ্যই আমি তোমাকে টিউশনি পড়াব। লেখাপড়া শিখিয়ে মানুষের মতো মানুষ হিসেবে গড়ে তোলব

নেহালের সম্মতি পেয়ে ভূতছানা টুলু বেজায় খুশি। আগামীকাল রাতে এমন সময় টিউশনি পড়তে আসবে বলে টুলু বিদায় নিল। নেহাল কাঁথা মুড়ি দিয়ে ভাবনায় গেল, আগামীকাল টুলুকে সে কী পড়াবে!