আজ খুব বৃষ্টি হচ্ছে-ঝম্ ঝম, ঝম্ ঝম্। বৃষ্টির এই আওয়াজ শুনতে তিয়ার খুব মজা লাগে। স্কুল বাস থেকে আজ যখন তিয়া নামছিল তখনই পিট্ পিট্ করে বৃষ্টি পড়া শুরু হয়েছিল। বৃষ্টির মধ্যে ছোটাছুটি করে ভেজার খুব লোভ হয়েছিল ওর। কিন্তু তৃপ্তিদি ছাতা, রেইনকোট ইত্যাদি নিয়ে একেবারে তৈরি হয়ে এসেছে। বাস থেকে নামতেই একেবারে পালোয়ানের মতো খপ্ করে ওর হাত ধরে ফেলে তৃপ্তিদি।
তারপর জোড় করে রেইনকোট পরিয়ে দিয়ে ছাতা মাথায় ওকে নিয়ে বাড়ির দিকে হাঁটতে থাকে। তিয়ার কোনো আপত্তিই সে শোনে না। তিয়ার যে একটু বৃষ্টি ভেজার ইচ্ছে ছিল সেটা বলতেই তৃপ্তিদি রেগে গিয়ে গজগজ করতে করতে এগিয়ে গেল “দিন দিন দুষ্টুমী বেড়ে যাচ্ছে তোমার। অদ্ভুত অদ্ভুত সব আবদার বাড়ছে। ভিজে জ্বর আসলে তখন সব দোষ তো আমারই হবে।” অগত্যা ছাতা মাথায়, রেইনকোট পরেই বাড়ি ফিরতে হয়। তবে রাস্তায় আসতে আসতে ছাতার চতুর্দিকের গড়িয়ে পরা জল দেখতেও ওর ভালো লাগছিল। বাস-স্টপ থেকে বাড়িটা কাছেই তাই পাঁচমিনিটের মধ্যেই বাড়ি চলে আসল।
বাড়ি এসেও যে একটু বারান্দায় দাঁড়িয়ে বৃষ্টি ঝরে পড়া দেখবে তার উপায় নেই। স্নান করানোর জন্য ব্যস্ত হয়ে যায় তৃপ্তিদি। স্নানের পর খাওয়ার নিয়ে হাজির হবে আর ততক্ষণে বৃষ্টি থেমে যাবে আর মজা করে বৃষ্টির আওয়াজ শোনা হবে না। তৃপ্তিদি বড় বেশী শাসন করে। স্কুল থেকে আনা, স্নান করান, খাওয়ান– সবকিছুই একদম ঠিক ঠাক হওয়া চাই। একদম ঘড়ির কাঁটা দেখে দেখে সব করে তৃপ্তিদি। মা, বাবা সরাদিন অফিসে থাকে তাই তৃপ্তিদিই ওকে দেখে রাখে। মা, বাবা তিয়াকে অনেক ভালবাসে। ওরা ওকে অনেক খেলনা কিনে দেয় কিন্তু তিয়াকে সময় দিতে পারে না। তিয়ার ভিতরে অভিমান জমা হতে থাকে- ও তো খেলনা চায়না বরং মা, বাবার সঙ্গে খেলতে চায়।
আজ সন্ধেবলা অফিস থেকে ফেরার পর মা, বাবার কাছে কি কি অভিযোগ করবে মনে মনে তাই চিন্তা করে তিয়া। আজকে ওকে তৃপ্তিদি একটুও খেলার সময় দেয়নি। তাছাড়া একটু বৃষ্টিতে ভেজার বা বৃষ্টি দেখার সময়ও দেয়নি তার উপর তাড়া তাড়ি স্নান, খাওয়া সারিয়ে দুপুরে চোখ রাঈিয়ে ওকে ঘুম পাড়িয়ে দিয়েছে।
সন্ধ্যা হতেই ঘুম থেকে উঠতে না উঠতেই দুধ কর্ণফ্ল্যাক্স নিয়ে তৃপ্তিদিদির জোড়াজড়ি শুরু “তাড়াতাড়ি খেয়ে হোমওয়ার্ক করে নাও। মা এসে কিন্তু বকবে” তৃপ্তিদিদির কথা না শুনে পারেনা তিয়া বই, খাতা নিয়ে বসে যায়। মা, বাবা সাতটার মধ্যে চলে আসতেই তিয়া আজ তৃপ্তিদিদি ওকে যে খেলতে দেয় নি, বৃষ্টি দেখতে দেয়নি এতসব অভিযোগ বাবা, মার কাছে করতে যায় কিন্তু তাড়াহুড়োতে ঠিক গুছিয়ে বলে উঠতে পারে না– তাই চোখে জল চলে আসে। ওর কান্নার মাঝখানে তৃপ্তিদিদিও বলতে শুরু করে “তিয়া আজ খুব দুষ্টুমী করেছে। ও আজকাল কথা শুনতে চায়না ভীষন বায়নাদার হয়ে উঠেছে। অন্যায় আবদার করে। আজকে তো বৃষ্টিতেও ভিজতে চাইছিল।” তিয়া প্রতিবাদ করতে গিয়েও মুখ দিয়ে আওয়াজ বেড়ুতে চায়না— কান্নার দমকে ফুঁপিয়ে ওঠে সে। তিয়ার মা তিয়াকে কাছে টেনে নিয়ে আদর করে। তৃপ্তি অনেকদিন ধরে মানে তিয়ার জন্মের সময় থেকেই এই বাড়িতে আছে। ওরা জানে তৃপ্তি ভালো তাই ওর কাছে তিয়াকে রেখে ওরা অফিস যায়। তিয়ার খাওয়া দাওয়া, স্নান করান, ঘুম পারান সব তৃপ্তি করে। এতদিন অসুবিধে হয়নি এখন তিয়া বড় হচ্ছে ও একটু আবদার করছে কিন্তু তৃপ্তি যেন একটু যান্ত্রিকভাবেই সবকিছু করতে চাইছে। তৃপ্তি চায় সবকিছু সময়মত সেরে ও বাহবা পাবে। কিন্তু এই রোজকার একঘেয়েমি রুটিন এখন আর তিয়া মানতে চাইছে না- ওর মা, বাবা সবটাই বুঝতে পারছে।
তিয়ার বাবা তৃপ্তির দিকে তাকিয়ে বলে, “আগামীকাল স্কুল থেকে আসলে তিয়া যা খুশী করবে ওকে কিছু বলবে না। ইচ্ছে হলে স্নান করবে, যখন ইচ্ছে হবে খাবে, ঘুমাবে ওকে একদমই জোড় করবে না।” তৃপ্তিদি একটু অসন্তুষ্ট হয়ে রান্নাঘরের দিকে চলে গেল। মা হাসছে, বাবাও ওকে আদর করতে করতে বলে, “কালকের দিনটাতে তুমি খুব আনন্দ করবে। তাছাড়া কালকে তুমি একটা উপহার পারে। স্কুল থেকে ফিরলেই তুমি সেই উপহারটা পাবে।”
তিয়া চোখের জল মুছে জিজ্ঞেস করে “কী উপহার বাবা?” “সেটা কালকেই দেখবে” ওর মা ওর মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করে। মা, বাবাকে আজ একটু বেশীই যেন খুশী দেখায়। মা অনেকদিন পর তিয়াকে গান গেয়ে ঘুম পাড়াল। খুব সুন্দর স্বপ্ন দেখতে দেখতে তিয়া ঘুমিয়ে পড়ল।
সকালে ঘুম থেকে উঠতেই গতদিনের কথা মনে পড়ে গেল। ও আজ একটা উপহার পাবে সেটাও মনে হল। বাবা সকালে উঠেই পত্রিকা পড়ায় ব্যস্ত হয়ে গেছে। মা, তৃপ্তিদিদির সংগে রান্নাঘরে। ওকে উঠতে দেখে মা এসে ওকে স্কুলে যাওয়ার জন্য তৈরি করে দিল। তৃপ্তিদিদি ওকে নিয়ে স্কুল বাসে তুলে দিয়ে আসল। ঘর থেকে বেরোনোর সময় পত্রিকার থেকে মুখ সরিয়ে বাবা বললো, “স্কুল থেকে ফিরলেই তোমার গিফ্ট পেয়ে যাবে।” বাবা, মাকে টাটা করে ও বেড়িয়ে এসেছিল।
স্কুলে সারাক্ষনই একটু অন্যমনস্ক হয়ে যাচ্ছিল তিয়া। সময়টা ওর কাটছিলই না। মনের মধ্যে বার বার সেই উপহারের কথাটাই মনে আসছিল। কখন বাড়ি যাবে সেটাই ভাবছিল সে। স্কুল বাস থেকে নেমেই তিয়া অবাক হয়ে গেল। বাস স্টপেজে ওর বাবা দাঁড়িয়ে আছে। “বাবা, তুমি আজ অফিস যাওনি?” খুশীতে ডগমগ হয়ে তিয়া জিজ্ঞাসা করে। বাবা ওর কাঁধের থেকে ব্যাগটা নিজের হাতে নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে বলে “তোকে একটা চমৎকার গিফট দেব তাই আজ আমি আর তোর মা অফিস যাইনি। ঘড়ের দরজায় মা দাঁড়িয়েই ছিল। “তোমার জন্য আমরা উপহার আনতে গিয়েছিলাম তো তাই অফিস যাওয়া হয় নি। এখন তোমার ঘরে যাও ওখানেই তোমার উপহার পেয়ে যাবে” মা হাসতে হাসতে বলে। দিয়া গুটি গুটি পায়ে নিজের ঘরের পর্দা তুলে উঁকি মারে। কিন্তু একি দেখছে দিয়া? নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারছিল না। দিয়ার ঘরে বসেছিল দিয়ার ঠাম্মি আর দাদু। দৌড়ে গিয়ে ওদের মাঝখানে দাঁড়িয়ে হাঁপাতে থাকে সে। ঠাম্মি ওকে জড়িয়ে ধরে। একটা পরম নির্ভরতায় ও ঠাম্মির কোলে মুখ লুকায়। এখন আর ওর কোন চিন্তা নেই। ঠাম্মি আর দাদুর সংগে ও খুব খেলতে পারবে। বাবা জিজ্ঞেস করে “উপহারটা কেমন হল দিয়া?” এক মুখ হাসি নিয়ে তিয়া বলে “খুব ভালো উপহার বাবা” মা, বাবা দুজনেই খুব খুশী হয়ে হাসতে থাকে আর ওদের সঙ্গে ঠাম্মি, দাদুও যোগ দেয়।