akkharbarta

অক্ষরবার্তা - একটি কিশোর বার্তা উদ্যোগ... আমাদের মূল লক্ষ্য উচ্চ মানের বই পাঠকের হাতে পৌঁছে দেওয়া... যোগাযোগ করুন - akkharbarta@gmail.com | www.akkharbarta.in

গল্প ৩ । শ্রাবণ ১৪৩৩




বন্ধুত্বের প্রতীক











চৈতন্য দাশ‌

নদিয়া, পশ্চিমবঙ্গ

পিয়ানোর বয়স তখন মাত্র পাঁচ। ছোট্ট মেয়ে। চোখ দুটো টানা টানা, ভীষণ কৌতূহলী। সব সময় জানালার ধারে বসে রাস্তার দিকে তাকিয়ে থাকে। রাস্তা দিয়ে কত বাবা-মা হেঁটে যায়। তাদের আগে-পিছে ওর মতোই ছোট ছোট ছেলেমেয়ে। ওরা নিশ্চয়ই ভাই-বোন হবে!


পিয়ানো একা। তার কোনও ভাইবোন নেই। মা-বাবা তাকে খুব ভালোবাসে। কিন্তু তাঁরা দু’জনেই চাকরি করেন। তাঁদের নিজের কাজেই সর্বদা ব্যস্ত থাকেন। তাঁরা অফিসের জন্য বেরিয়ে যাওয়ার পর কাজের মাসিই পিয়ানোর একমাত্র সঙ্গী। বয়স্ক মানুষের সঙ্গে তার শিশুমন যায় না। বড্ড বেমানান লাগে

বিশাল বড় বাড়িটা পিয়ানোর কাছে খুব ফাঁকা মনে হয়। খেলনা, রংতুলি, গল্পের বই সবই হাতের কাছে, তবু কোথায় যেন একটা শূন্যতা লুকিয়ে থাকত

পিয়ানোদের বাড়ির নিচতলায় থাকত একটা ভাড়াটে পরিবার। তার জন্মের তিন বছর পর সেই ভাড়াটে পরিবারের ঘরে জন্ম নেয় একটি ফুটফুটে শিশুপুত্র। নাম রাখা হয় পিপান

পিপানের জন্মের পর পিয়ানোর জীবনে অভাবনীয় পরিবর্তন আসে। প্রথম প্রথম পিয়ানো দূর থেকে তাকিয়ে থাকত। ছোট্ট পিপান তখনও হাঁটতে শেখেনি। শুধু হাঁ করে তাকিয়ে থাকে আর এতাল বেতাল হাসে। সে হাসি যেন পিয়ানোর কাছে চাঁদের হাসির মতো মনে হতো। মনের খুশিতে সে চকচক করত। কতক্ষণে তার সঙ্গে কথা বলবে…

মনে মনে ভাবত, ও যদি আমার ভাই হতো!”

ভাই-বোনের এ সম্পর্ক আপন-পর মানে না। এটা শুধু একটা শিশুমনের একাকিত্বের শূন্যতার পরিপূরক। যে পরিপূরক-পূর্ণতায় নিষ্পাপ শিশু সীমাহীন আনন্দের সমুদ্রে নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করে

পিপান একটু বড় হতেই পিয়ানো তাকে হাত ধরে হাঁটতে শেখানোর চেষ্টা করে। পিয়ানোর চেষ্টাতেই সময়ের থেকে আগেই যেন হাঁটা শিখে গেল। ছোট্ট ছোট্ট পা থপ থপ করে ফেলতে ফেলতে সামনের দিকে এগিয়ে যায়, পরক্ষণেই ধপাস করে পড়ে…পিয়ানো খিল খিল করে হাসতে হাসতে তুলে দাঁড় করিয়ে দেয়

এইভাবে হাঁটাহাঁটি, খুশি খুশি দুষ্টুমি করার পর পিপানকে পাশে বসিয়ে পিয়ানো তার খেলনাগাড়ি তার দিকে  ঠেলে দেয়। তার পুতুলখেলার গল্প শোনায়। কখনও আবার নিজেই মা সেজে পিপানকে ঘুম পাড়ানোর অভিনয় করে…

পিয়ানোর মা অফিস ছুটির দিনগুলোতে অবাক হয়ে দেখে— ভাড়াটিয়ার বাচ্চাটাকে পেয়ে মেয়েটা যেন নিজের একাকিত্ব ভুলে গেছে। এখন সে সকালে উঠেই দৌঁড়ে যায় পিপানের কাছে। পিপানদের ঘরের দরজা বন্ধ থাকলে হতাশ হয়ে ফিরে এসে মাকে জিজ্ঞেস করে,

মা, পিপান কি আজকে আমার সঙ্গে খেলবে না?” ও ছাড়া, আমি কার সঙ্গে খেলব মা? ওদের ঘরের দরজা তো বন্ধ!”

 


 












 

শিশুদের বন্ধুত্ব বড়দের হিসাব মানে না। বড়দের হিসেবে ভাড়াটিয়ার সঙ্গে‌ শুধু টাকা-পয়সার সম্পর্ক। একদিন ভাড়াটিয়া চলে যাবে। সব যোগাযোগের ইতি ঘটবে। আবেগ, ভালোবাসার স্থান সেখানে নেই। 

পিপান যত বড় হতে থাকে পিয়ানোর খুশির জগত বিস্তৃত হতে থাকে। দুই ভাইবোনের মতো পাশাপাশি বসে পড়াশোনা করে, ছবি আঁকে, গান করে, গল্প, খুনসুটি করে…

দিনগুলো ভালোই কাটছিল। কিন্তু পিয়ানোর হাসিখুশির জগত বেশিদিন স্থায়ী হলো না। তার বয়স যখন আট, তাদের বাড়ির কাজের মাসির কাছ থেকে জানতে পারে — ভাড়াটিয়া পরিবারটি অন্য জায়গায় চলে যাবে। বদলির চাকরি, আর থাকা সম্ভব নয়

ব্যাপারটা ছোটো পিয়ানো ঠিক বুঝতে পারেনি

          “চলে যাবে কেন?” সে বারবার জিজ্ঞেস করে

 

দুই 

যেদিন সত্যি সত্যি পিপানদের ঘরের জিনিসপত্র গোছানো শুরু হলো, পিয়ানো আর নিজেকে সামলাতে পারল না। সে পিপানের হাত ধরে বলল,

তুমি কোত্থাও যাবে না। তুমি আমার ভাই।”

          পিপান তো আরো ছোট। কিচ্ছু বোঝে না, কিন্তু পিয়ানোর চোখের জল দেখে সেও কাঁদতে শুরু করে

          চলে যাওয়ার দিন পিয়ানো প্রচণ্ড কান্নাকাটি করল। সে দরজার সামনে বসে পড়ল

আমি পিপানকে ছাড়া থাকতে পারব না। পিপান কোত্থাও যাবে না…,” লাগাতার বলেই চলল

সেদিন রাতেই পিয়ানো জ্বরে পড়ল। শরীরের চেয়ে মনটাই যেন বেশি অসুস্থ। ডাক্তার এলেন, ওষুধ দিলেন, কিন্তু পিয়ানোর শুধু একটাই কথা—

পিপানকে ডাকো। পিপান কোথায়? আমার ভাই…”

এই খবর যখন ভাড়াটিয়া পরিবার শুনল, তারা আর বসে থাকতে পারল না। কয়েক দিনের মধ্যেই তারা পিপানকে নিয়ে পিয়ানোকে দেখতে এলো

পিপানকে দেখামাত্র পিয়ানো উঠে বসে। চোখেমুখে যেন প্রাণ ফিরে আসে। সে পিপানকে জড়িয়ে ধরে বলল,

তুমি আবার চলে যাবে না তো?”

এই দৃশ্য দেখে বড়দের চোখেও জল চলে আসে

কিন্তু পরিস্থিতি কঠিন হয়ে উঠল। তারা তো জানে, তাদের ফিরে যেতে হবে। কিন্তু পিয়ানো কিছুতেই পিপানকে ছাড়তে চাইছে না। কান্নাকাটি শুরু করলেই তার জ্বর বাড়ছে, মনখারাপ করছে

পিপানের বাবা পিয়ানোর বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। ‌পিয়ানোর বাবা একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন, “আসলে কী জানেন? পিয়ানো পিপানের জন্য কষ্ট পাচ্ছিল আর আমি আপনার জন্য কষ্ট পাচ্ছিলাম। আপনারা যখন চলে যাচ্ছিলেন, আমার শুধু মনে হচ্ছিল, আপনাদের সঙ্গে এ জীবনে আর হয়তো দেখা হবে না…

আমি মুখ ফুটে বলতে পারিনি, ‘আপনারা থেকে যান’। সেটা তো অবাস্তব, আবেগের কথা। বাস্তবটা হলো আপনাদের যেতেই হবে। পিয়ানোর জন্যই আবার আপনাদের সঙ্গে দেখা হলো। কিন্তু আপনাদের আটকে রাখার ক্ষমতা তো আমার নেই…”

পিপানের বাবা হাঁ করে তাকিয়ে রইলেন। পিয়ানো বিছানা থেকে উঠে এসে তাকে জিজ্ঞেস করল, “পিপান আমার সঙ্গে থাকবে তো, আঙ্কেল?”

পিপানের বাবার চোখে জল। চোখ মুছতে মুছতে বললেন, “থাকবে।” সে কথা শোনার সঙ্গে সঙ্গে পিয়ানোর চোখেমুখে ভর করা দুঃখ উবে গিয়ে খুশির অভিব্যক্তি ফুটে উঠল

পিয়ানোর কথা ভেবে শেষ পর্যন্ত তিনি মহৎ সিদ্ধান্ত নিলেন। তিনি বললেন,

আমি সামনের মাসেই অবসর নেব। অবসর নেওয়ার পর এখানেই থাকব, এই পাড়াতেই, পিয়ানো মামনির কথা ভেবে।”


তিন

পরের মাসে চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার পর তিনি পিয়ানোদের পাড়াতেই একটি ছোট জমি কিনলেন। বাড়ি করতে সময় লাগবে—  ছয় থেকে সাত মাস। সুতরাং এই সময়ের জন্য পিপানের বাবা আবার পিয়ানোদের বাড়িতে ভাড়াটিয়া হিসাবে এলেন। পুরো আট মাস লাগল, নতুন বাড়ি সম্পূর্ণ করতে

নতুন বাড়িতে চলে যাওয়ার সময়ে ভাড়ার কথা যখন উঠল, পিয়ানোর বাবা দৃঢ় কণ্ঠে বললেন,

এই কয় মাসের ভাড়া আমি নেব না। ভাড়ার টাকার  চেয়ে আমার মেয়ের হাসি অনেক বেশি দামি।”

এই কথাটা শুনে পিপানের বাবা চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলেন। চোখে জল, মুখে কৃতজ্ঞতার হাসি

তিনি পরিবারসহ নতুন বাড়িতে বসবাস করা শুরু করলেন

তারপর থেকে পিপান প্রায়ই আসত পিয়ানোদের বাড়িতে। তারা একসঙ্গে পড়ত, খেলত, ঝগড়া করত, আবার নিজেরাই মিটিয়ে নিত

নতুন বাড়িতে ওঠার দিন পিয়ানো নিজের হাতে একটি ছোট ফুলগাছ উপহার দিল পিপানকে

আমাদের বন্ধুত্বের মতো এটা বড় হবে,” সে বলল

পিয়ানো আর পিপান একসঙ্গে বড় হচ্ছে, ভাইবোনের মতো। রক্তের সম্পর্ক না থাকলেও তাদের মন দুটো এক সুতোয় বাঁধা

 ‌

চার

দেখতে দেখতে পিয়ানোর দেওয়া ফুল গাছটা বড় হয়ে গেল। অদ্ভুত ব্যাপার! শুরুতে একসঙ্গে গাছে দুটো ফুল ফুটল। একটি বড় আরেকটি ছোট। সেদিন সকালে সেই ফুল গাছের সামনে বসে পিয়ানোর বাবা ও  পিপানের বাবা চা খাচ্ছিলেন। ফুল গাছের দিকে তাকিয়ে পিপানের বাবা পিয়ানোর বাবাকে উদ্দেশ্য করে বললেন,‌ “একবার দেখুন, পিয়ানোর দেওয়া গাছে‌ একসঙ্গে দুটো ফুল ফুটেছে। ফুল দুটো যেন পিয়ানো ও পিপানের বন্ধুত্বের প্রতীক।”

আপনি সঠিক বলেছেন,” বলেই পিয়ানোর বাবা একটি দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন, “শিশুমনের ভালোবাসা কোনও হিসাব মানে না

একটু সহানুভূতি, একটু ভালোবাসা  একটি শিশুর জীবন বদলে দিতে পারে। সত্যিকারের সম্পর্ক তৈরি হয় হৃদয় দিয়ে। কাগজের পরিচয়ে নয়…”

সূচিপত্র