akkharbarta

অক্ষরবার্তা - একটি কিশোর বার্তা উদ্যোগ... আমাদের মূল লক্ষ্য উচ্চ মানের বই পাঠকের হাতে পৌঁছে দেওয়া... যোগাযোগ করুন - akkharbarta@gmail.com | www.akkharbarta.in

গল্প ৪ । শ্রাবণ ১৪৩৩



রিদয়ের মহাকাশ-সফর










পিনাকী রঞ্জন

পাল

জলপাইগুড়ি, পশ্চিমবঙ্গ


বিকেলের আকাশটা আজ বড্ড অদ্ভুত রূপ নিয়েছে। শহরের উঁচু উঁচু বাড়িগুলোর মাথার ওপর দিয়ে উড়ে যাচ্ছে ভারী, কালচে মেঘের দল। চারপাশটা কেমন যেন থমথমে, যেন দিনের বেলাতেই সন্ধে নেমে এসেছে। বারান্দার গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে ছিল ছোট্ট রিদয়। তার চোখেমুখে একটা গভীর কৌতূহল। 


মাঝে মাঝেই সোঁদা মাটির গন্ধ মাখা দমকা হাওয়া এসে তার চুলগুলো এলোমেলো করে দিচ্ছে। একটু পরেই হয়তো ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামবে। রিদয় একদৃষ্টে আকাশের দিকে তাকিয়ে ভাবছিল, ওই বিশাল কালো মেঘের ভেতরে আসলে কী এমন কলকব্জা লুকিয়ে আছে, যা থেকে সবসময় শুধু জলই পড়ে!

মা তার পাশেই দাঁড়িয়ে ছিলেন। তিনি সবেমাত্র বারান্দা থেকে শুকনো জামাকাপড়গুলো তুলে নিচ্ছিলেন। রিদয় হঠাৎ খুব সিরিয়াস মুখে মাকে জিজ্ঞেস করল, “মা, একটা কথা বল তো! আকাশ থেকে সবসময় শুধু এই সাধারণ জলই কেন পড়ে? অন্য কিছু কেন পড়ে না?”

মা ছেলের এমন অদ্ভুত প্রশ্ন শুনে খিলখিল করে হেসে ফেললেন। রিদয়ের মাথায় সবসময় এমন সব মজার আর অদ্ভুত প্রশ্ন ঘোরে। মা জামাকাপড়গুলো একটা চেয়ারের ওপর রেখে ওর পাশে এসে দাঁড়ালেন। তারপর ওর মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, “অন্য কিছু বলতে তুই ঠিক কী বোঝাতে চাইছিস বাবা? আকাশ থেকে কি রসগোল্লা পড়বে? নাকি তোর প্রিয় চকোলেট?”

রিদয় একটু গম্ভীর হয়ে বলল, “আহ মা! আমি মজা করছি না। মাঝে মাঝে তো শিলাবৃষ্টি হয়, তখন আকাশ থেকে বরফের টুকরো পড়ে। আচ্ছা, বরফের টুকরোর বদলে যদি আকাশ থেকে ঝকঝকে হিরে পড়ত! তাহলে কেমন হতো বল তো? আমরা সবাই কুড়িয়ে নিতাম, আর নিমেষের মধ্যে পৃথিবীর সবাই একদম ধনী হয়ে যেত!

ছেলের কল্পনার দৌড় দেখে মা একটু মুচকি হাসলেন। তারপর রিদয়ের কাঁধে হাত রেখে রহস্যময় গলায় বললেন, “তুই হয়তো ভাবছিস এটা শুধু রূপকথার গল্পেই সম্ভব। কিন্তু তুই কি জানিস রিদয়, আমাদের এই পৃথিবীতে না হলেও, মহাকাশের অন্য এক জায়গায় সত্যিই আকাশ থেকে হিরে ঝরে!



 

মায়ের কথা শুনে রিদয়ের চোখ বিস্ময়ে একেবারে গোল গোল হয়ে গেল। সে যেন নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছে না।সত্যি বলছ মা? একটুও বানাচ্ছ না তো? কোথায় এমন হয়? কোন জাদুকরের দেশে?”

মা হাসিমুখে বললেন, “কোনো জাদুকরের দেশে নয় রে পাগলা, আমাদের এই সৌরজগতের ভেতরেই এমন দুটো জায়গা আছে। চল, আজ বৃষ্টি নামার আগে তোকে একটা দারুণ মহাকাশের গল্প শোনাই। কল্পনার ডানা মেলে এক আশ্চর্য ভ্রমণে নিয়ে যাই তোকে।

রিদয় যেন কল্পনায় ততক্ষণে একটা চকচকে রুপোলি মহাকাশযানে চড়ে বসেছে। তার চোখের সামনে ভেসে উঠল এক বিশাল, অনন্ত অন্ধকার আকাশ, যেখানে হীরকখণ্ডের মতো জ্বলজ্বল করছে অসংখ্য তারা। আর সেই অন্ধকারের বুক চিরে দূরে ভাসছে বড় বড় সব রহস্যময় গ্রহ

মা বলতে শুরু করলেন, “ওই যে কল্পনায় দেখছিস একটা বড় গোলাকার গ্রহ, যার চারপাশে একটা অপূর্ব সুন্দর, চওড়া আলোর রিং বা বলয় আছে? ওটা হলো শনি গ্রহ। ইংরেজিতে যাকে বলে স্যাটার্ন।

রিদয় মুগ্ধ হয়ে কল্পনার চোখ দিয়ে তাকিয়ে রইল।অসাধারণ! ওই গ্রহটা দূর থেকে দেখতে কত সুন্দর মা! আর ওই বলয়গুলো যেন জাদুর মতো ভাসছে।

মা আবার ইশারা করার ভঙ্গি করে বললেন, “আর ওই যে আরেকটু দূরে, শনির চেয়েও আরও বিশাল বড় একটা গ্রহ দেখতে পাচ্ছিস? যার গায়ে কমলা আর সাদার ডোরাকাটা দাগ? ওটা হলো বৃহস্পতি বা জুপিটার। আমাদের গোটা সৌরজগতের সবচেয়ে বড় গ্রহ। এত বড় যে ওর ভেতরে আমাদের এক হাজারটা পৃথিবীকে অনায়াসে ঢুকিয়ে দেওয়া যাবে!

রিদয় আর তর সইতে না পেরে লাফিয়ে উঠল, “বুঝলাম! কিন্তু হিরে কোথায়? ওই গ্রহগুলোতেই কি আকাশ থেকে টুপটাপ করে হিরে পড়ে?”

মা মাথা নেড়ে সায় দিলেন, “হ্যাঁ, ঠিক তাই! তবে সেই বৃষ্টি আমাদের পৃথিবীর মতো জলের নয়, আর মেঘগুলোও সাধারণ নয়।

রিদয় অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, “তাহলে কীভাবে তৈরি হয় এই হিরের বৃষ্টি? মেঘ থেকে তো জল হওয়ার কথা!

মা ধীরে ধীরে একজন বিজ্ঞানীর মতো করে খুব সহজে বোঝাতে শুরু করলেন, “শোন, এই বৃহস্পতি আর শনি গ্রহের কোনো শক্ত মাটি নেই। এগুলো আসলে বিশাল বিশাল গ্যাসের গোলা। এই গ্রহগুলোর আকাশে প্রচুর পরিমাণে মিথেন গ্যাস উড়ে বেড়ায়। মিথেন হলো এক ধরনের রাসায়নিক গ্যাস। এবার, ওই গ্রহগুলোতে প্রায়ই ভয়ংকর সব ঝড় ওঠে। আর সেই ঝড়ের সময় মেঘের ভেতর থেকে প্রচণ্ড শক্তিশালী বজ্রপাত বা বাজ পড়ে। সেই বাজ যখন মিথেন গ্যাসের ওপর দিয়ে যায়, তখন তার প্রচণ্ড তাপে মিথেন গ্যাসটা ভেঙে দু-টুকরো হয়ে যায়।

রিদয় একদম শ্বাস বন্ধ করে মন দিয়ে শুনছে। বিজ্ঞান যে এত রোমাঞ্চকর হতে পারে, সে আগে ভাবেনি



 

মা বলে চললেন, “মিথেন ভেঙে গিয়ে তার ভেতর থেকে কার্বন আলাদা হয়ে যায়। কার্বন মানে হলো সেই জিনিস, যা দিয়ে কয়লা বা পেনসিলের শিস তৈরি হয়। তো, সেই ছোট ছোট কালো রঙের কার্বনের টুকরোগুলো যখন ধীরে ধীরে গ্রহের ভেতরের দিকে নামতে থাকে, তখন সেখানে বাতাসের চাপ আর তাপ এত বেশি থাকে যে, সেই প্রচণ্ড চাপে আর তাপে কার্বনগুলো বদলে যেতে শুরু করে। প্রথমে সেগুলো শক্ত হয়ে গ্রাফাইটের টুকরোয় পরিণত হয়। আর গ্রহের আরও গভীরে নামতে নামতে একসময় চাপ এতই বেড়ে যায় যে, ওই কালো কার্বনটাই একেবারে চকচকে, শক্ত হিরে হয়ে যায়!

রিদয় হাঁ করে পুরো ব্যাপারটা শুনে একটা বড় শ্বাস ফেলল।তার মানে মিথেন গ্যাস ভেঙে কার্বন হয়, আর সেটা থেকেই আকাশ থেকে হিরে ঝরে পড়ছে? একদম বৃষ্টির মতোই?”

একদম তাই!মা হেসে বললেন, “তবে সেটা জলের বৃষ্টি নয়, হিরের বৃষ্টি। বিজ্ঞানীরা অনুমান করেন, শনি গ্রহে প্রতি বছর প্রায় এক হাজার টন হিরে এভাবেই আকাশ থেকে বৃষ্টি হয়ে ঝরে পড়ে!

রিদয় চোখ বন্ধ করে কল্পনা করতে শুরু করল। সে যেন স্পেস-সুট পরে দাঁড়িয়ে আছে শনি গ্রহের এক অদ্ভুত পরিবেশে। তার চারপাশে বিশাল আকারের সব মেঘ। হঠাৎ আকাশ চিরে নীল রঙের বিদ্যুৎ চমকালো—কড়কড়াত! আর তারপরেই টুপটাপ করে ওপর থেকে কিছু পড়তে শুরু করল। কিন্তু সেগুলো বৃষ্টির ঠান্ডা ফোঁটা নয়। সেগুলো হলো ঝকঝকে, উজ্জ্বল, চোখ-ধাঁধানো ছোট-বড় হিরের টুকরো!

রিদয় খুশিতে লাফিয়ে উঠল, “ওয়াও! আমি তো আজ কোটিপতি হয়ে গেলাম!কল্পনায় সে তার স্পেস-সুটের পকেটে আর বড় একটা ব্যাগে ভরে ভরে হিরে কুড়োতে শুরু করল

কিন্তু হঠাৎ সে বুঝতে পারল, এই হিরেগুলো বরফের মতো ঠান্ডা নয়, বরং সেগুলো ভীষণ গরম! আর অসম্ভব ভারী। তার স্পেস-সুটের গ্লাভস পরা হাতেও যেন ছ্যাঁকা লাগছে

          মা যেন ওর মনের কথা বুঝতে পেরেই বললেন, “কিন্তু একটা বড় সমস্যা আছে রিদয়। বাস্তবে ওখানে যাওয়া আর হিরে কুড়িয়ে আনা মোটেও এত সহজ নয়। ওই গ্রহগুলোর ভেতরের তাপমাত্রা আর চাপ এতই ভয়ংকর বেশি যে, মানুষের তৈরি কোনো মহাকাশযান সেখানে পৌঁছানো মাত্রই দুমড়ে-মুচড়ে গলে ছাই হয়ে যাবে। মানুষ তো সেখানে এক সেকেন্ডও বেঁচে থাকতে পারবে না। আর ওই হিরেগুলো গ্রহের একদম গভীরে গিয়ে শেষমেশ অত্যধিক গরমে গলে গিয়ে তরল হিরের সমুদ্র তৈরি করে।

রিদয়ের মুখটা একটু গোমড়া হয়ে গেল। সে হতাশ গলায় বলল, “ধুর! তাহলে তো আমরা কোনোদিনই ওই হিরের বৃষ্টি চোখে দেখতে পাব না! সব তো বেকার হয়ে গেল।

মা তার চিবুকটা ধরে একটু উঁচু করে মৃদু হেসে বললেন, “বেকার হবে কেন? বিজ্ঞান তো রোজ এগোচ্ছে। হয়তো একদিন তুই-ই এত বড় বিজ্ঞানী হবি যে, এমন কোনো আধুনিক যন্ত্র বা রোবট আবিষ্কার করবি, যা শনির বুকে দাঁড়িয়ে হিরের বৃষ্টির স্পষ্ট ছবি তুলে পৃথিবীতে পাঠাবে। অসম্ভব বলে তো বিজ্ঞানে কিছু হয় না!

রিদয়ের চোখ দুটো আবার উৎসাহে চকচক করে উঠল। হতাশা কেটে গিয়ে সেখানে এক নতুন স্বপ্নের জন্ম হলো। সে শক্ত গলায় বলল, “হ্যাঁ মা, আমি বড় হয়ে মহাকাশ বিজ্ঞানীই হব! আমি নিজেই একদিন ওই হিরের বৃষ্টির রহস্য খুঁজে বের করব।

মা তার মাথায় পরম স্নেহে হাত বুলিয়ে দিলেন।সেটাই তো চাই। বড় স্বপ্ন দেখবি, আর নতুন কিছু জানার চেষ্টা করবি সারাজীবন।

সেদিন সন্ধ্যায় সত্যিই কমলপুর শহরে বৃষ্টি নামল। টাপুর টুপুর করে জল পড়তে লাগল টিনের চালে আর গাছের পাতায়। রিদয় বারান্দা থেকে হাত বাড়িয়ে বৃষ্টির ফোঁটাগুলো ধরতে ধরতে আকাশের দিকে তাকিয়ে ভাবল, “এই বৃষ্টিটা জলের হলেও, এই বিশাল ব্রহ্মাণ্ডের কোথাও না কোথাও ঠিক এই মুহূর্তেই আকাশ থেকে ঝরছে রাশি রাশি হিরে…

তার মুখে একটা স্বপ্নমাখা মিষ্টি হাসি ফুটে উঠল। পৃথিবীতে না হলেও, মহাকাশে এমন কত শত আশ্চর্য ঘটনা যে ঘটে চলেছে প্রতিদিন! আর সেই সব অজানা রহস্যের পর্দা ফাঁস করার জন্যই তো বিজ্ঞানের জন্ম। রিদয় জানে, একদিন সে বড় হবে, আর এই অনন্ত মহাকাশের অজানা রহস্যের খোঁজে নিজের স্বপ্নের ডানায় ভর করে ঠিক পাড়ি দেবে

সূচিপত্র