গল্প ২ । মাঘ ১৪৩২



ধাপ্পা! ধরা পড়লি গুপি?














অঙ্কন 

গুচ্ছাইত 

মেদিপুর, পশ্চিমবঙ্গ



 <<

সূ চি প ত্র

 

গ্রামের নাম এগরাপাটনা। ছোট্ট, সুতি-খালের ধারঘেঁষা, চারদিকে ধানক্ষেত আর ছোট বড় নানা ধরনের গাছ মাথা তোলে দাঁড়িয়ে আছে।  

বিকেল হলেই খালের পাশেই হুলি মঞ্চের ময়দান বড় বট-অশ্বত্থর নিচে জড়ো হয় গ্রামের সব বাচ্চারা। আর শুরু হয় সেই চিরচেনা খেলা—ছোঁয়াছুঁই আর লুকোচুরি। আশেপাশে ছোট ছোট ঘর, খড়ের গাদা, অর্জুন গাছ, তালের গাছ সারি ধরে দাঁড়িয়ে থাকে

বুবুন, টুম্পা, রাজু, পাপাই, মলি এবং সবশেষে খেলাধুলার সেরা বুদ্ধিমান—গুপি। গুপি আবার নিজেকে বলে “গুপি ওস্তাদ”। সেদিন বিকেলে আকাশে হালকা মেঘ। বাতাসে ধানের ঘ্রাণ। সবাই বট-অশ্বত্থর তলায় দাঁড়াতেই টুম্পা বলল, “আজ সংখ্যা গণনা করবে বুবুন! ও সবচেয়ে ধীর—তাই আমাদের লুকোতে বাড়তি সময় মিলবে।” বুবুন রেগে গিয়ে বলল, “ধীরে কেন? আমি ইচ্ছে করেই সময় নিই! খেলা জমাতে হয় তো!” তবু সবাই হেসে মন দিল না

খেলা শুরু। বুবুন গাছের গুঁড়িতে মাথা ঠেকিয়ে বলল—
এক… দুই… তিন… চার… পাঁচ… দশ… কুড়ি… তিরিশ… আসছি রে—কে দিবি ধাপ্পা দে!”

এবার সবাই ছুটে ছুটে যে যার লুকানোর জায়গায় গেল। কেউ গুদামঘরের পিছনে, কেউ ধানের গোলার আড়ালে, কেউ আবার খালের ধারে নলখাগড়ার ঝাড়ে। কিন্তু সবার মধ্যে সবচেয়ে বেশি গম্ভীর গুপি। সে ভাবল—“আজ এমন জায়গায় লুকোবো, কেউই খুঁজে পাবে না।” সে গিয়ে ঢুকে পড়ল পুরোনো জয়দেবের বাড়ির ভাঙা চালার ভেতর। সেটি গ্রামের সবচেয়ে নিভৃত কোণা। ভাঙা টালির ফাঁক দিয়ে রোদ ঢুকে পড়ে, চারদিকে জাল, ধুলো, আর কিছু ছোট্ট বাসা বানানো চড়ুইয়ের খুদে খুদে আওয়াজ। গুপি গিয়ে এক কোণে গুটিসুটি মেরে বসে পড়ল। সে নিজের মনে হাসল—“আজ আমি হবো লুকোচুরি প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন!”

এদিকে বুবুন খুঁজতে শুরু করল।

প্রথমেই সে খুঁজে পেল রাজুকে—কারণ রাজু অকারণে হাঁচি দিয়ে ফেলেছিল।

ধাপ্পা!”—চিৎকার করতেই রাজু চমকে উঠে বলল, “ওরে বাবা! আমি তো মাথা নিচু করে শ্বাসও নিতে পারছিলাম না!”

তারপর মিলল পাপাই। পাপাই আবার চিরকালই চুপিচুপি চকোলেট খেতে ব্যস্ত থাকে—তাই তেমনি পকেট থেকে আওয়াজ হতেই বুবুন ধরে ফেলল। টুম্পা আর মলিকে খুঁজতে একটু ঘোরাঘুরি লাগলেও বুবুন শেষে তাদেরও পেয়ে গেল। এবার প্রশ্ন—গুপি কোথায়?

চারদিকে খুঁজেও নেই। নলখাগড়া, গোলাঘর, গুদামঘর, বাঁশঝাড়—সব চষে ফেলেও গুপির দেখা মিলল না

সবার মুখে তখন একটাই কথা—“গুপি তো আবার নিজের মতো গুনে গুনে লুকোয়। হয়তো খালের ওপাশে চলে গেছে কি?” মলি বলল, “চল সবাই মিলে খুঁজে দেখি, ও একাই কোথাও অচিন্ত্য জায়গায় বসে আছে।”

সবাই ছোটাছুটি শুরু করল। গুপি ততক্ষণে ভাঙা চালার ভেতরে বসে হেসে কুটি কুটি—“এরা সব বোকা! আমাকে খুঁজেই পাবে না…”

হঠাৎ—ড্যাং! ড্যাং!

একটা ঠুনঠুনে পাত্রের আওয়াজ! গুপি চমকে উঠে দেখল—চালার ওপরের ভাঙা টালি নড়ে উঠছে।

তারপরই… ম্যাঁওউউউ!

একটা মোটা, অত্যন্ত আত্মসম্মানী, জয়দেবের মা-দিদিমার হুলোবিড়াল “বাঘাই” ঝপ করে নেমে এল ঠিক গুপির মাথার ওপর! বিড়ালও চমকে উঠল, গুপি আরও বেশি!—“আরে আরে! আমার উপর পা দিস না, বাঘাই! আহ্ বাঁচা!”—গুপি চিৎকার করে উঠল। বিড়াল ভয় পেয়ে লাফ দিয়ে বেরিয়ে দৌড়! আর গুপি তার পিছন পিছন বেরুলো—কিন্তু ঠিক সেই সময়ই চালার টালি ভেঙে গুপি পুরো ধুলোয় ময়লা, কালো ঝুল মাখামাখি হয়ে বেরিয়ে এল

বাইরে তখন রাজু, পাপাই, টুম্পা, মলি—সবাই মিলে খুঁজে খুঁজে ক্লান্ত।
হঠাৎ ভাঙা চালার দিক থেকে একটা ধুলোঝড় উঠে এল। টুম্পা বলল,

ও কী? ভূত নাকি?”

ধুলো সরে যেতেই দেখা গেল—গুপি নিজেই! ধুলোয় মাখামাখি, মাথায় টালি, গায়ে খড়, পায়ে মাকড়সার জাল! সবাই এমন হাসল—গ্রামের গাঁয়ে যেদিন সেরা হাট বসে, তাও এত হাসি শোনা যায় না

বুবুন বলল, “এই হলো তোর ‘গুপি ওস্তাদি’? বিড়াল যদি না থাকত, তাহলে তো চিরতরে বেরোতিস না!” গুপি মুখ শক্ত করে বলল, “খেলা তো খেলাই—মোচড় থাকতেই হবে!” তখন পাপাই বলে উঠল,
মোচড়? এই মোচড়ে তুইই ধরা পড়লি প্রথমে! ধাপ্পা—ধরা পড়লি!”

সবাই আবার হো-হো করে হাসল। এরপর সবাই ঠিক করল—“আজকের লুকোচুরি খেলায় চ্যাম্পিয়ন—বাঘাই বিড়াল! কারণ সবার আগে সে-ই গুপিকে খুঁজে পেয়েছে!” গুপি একটু লজ্জা পেল… কিন্তু আবার হেসে ফেলল। কারণ গ্রামের লুকোচুরি মানে তো শুধু খেলা নয়—বন্ধুত্ব, স্মৃতি আর হাসির মহল

সন্ধ্যাবাতাসে ধানের গন্ধ মিলিয়ে গিয়ে, হেসে খেলে সবাই বাড়ি ফিরল। আর গুপি ভাবল—“আগামীকাল আমি আরও ভালো জায়গা খুঁজে রাখব। বিড়ালকেও ফাঁকি দেব!” কিন্তু তার বন্ধুরা জানত—গুপি লুকোক না লুকোক, হাসির মোচড় ছাড়া ও কখনোই খেলতে পারে না!