পোর-খাওয়া অভিজ্ঞ মানুষ শঙ্কর নাইয়া। সুন্দরবনের গহীন অরণ্যঘন সুন্দরবন তাঁর হাতের তালুর মতো চেনা। ওর অনুমান ক্ষমতা এতটাই প্রখর যে অনেক আগে থেকেই সে বিপদের আঁচ করতে পারে।
হিংস্র শ্বাপদের উপস্থিতি টের পায়। জলের রং দেখে বলে দিতে
পারে কোথায় মাছ বা মীন বেশি পরিমাণে ধরা যাবে। আর এই গুণটাকেই সে পেশা হিসেবে
বেছে নিয়েছে। যারা বিদ্যেধরি গোমতী বা অপরিসর জঙ্গল সংলগ্ন খাঁড়িতে মীন-কাঁকড়া
মাছ ধরতে যায় তারা ওকে সঙ্গে রাখে।
আজ ভোর না হতেই মাতঙ্গিনী এসে ডাক দিল, ‘শঙ্করদাদা বাড়ি আছ?’
শঙ্কর ঝাঁপ ঠেলে বাইরে বেরিয়ে এলো। বলল, ‘আরে মাতঙ্গিনী, তুই?’
‘দাদা আজকে তোমাকে আমার সঙ্গে একবার যেতে হবে। পীরখালি
জঙ্গলের খাঁড়িতে।’
সে কী! তুই শুনিসনি সারা রাত ধরে বাজি-পটকা ফাটিয়েছে
বনবিভাগের লোকেরা নগেনাবাদের দিকে। মৈপীঠের ঘন জঙ্গল থেকে বাঘটা নদী পেরিয়ে
লোকালয়ে ঢুকে পড়েছে। ওরা তো মাইকে সতর্কবার্তাও প্রচার করছিল। তাড়াতাড়ি বাড়ি
ফিরে যা। বাইরে থাকিস না। যতক্ষণ না বাঘটা ধরা পড়ছে ততক্ষণ কোনো স্বস্তি নেই
বুঝলি।’
‘সব জানি দাদা। কী
করব বল, পেট বড় বালাই। তিনদিন এই উৎপাতে বেরতে পারিনি।
আজ না গেলেই নয়। দিন আনা দিন খাওয়া লোকেদের সমস্যা তো বোঝই।’
‘আমাকে মাফ কর
মাতঙ্গিনী, আজ আমি তোর সঙ্গে যেতে পারব না।’
মাতঙ্গিনীর হাজার অনুরোধেও কাজ হল না। হতাশ হয়ে বাড়ি ফিরল
সে। ছেলেদের বলল, ‘চল বেরিয়ে
পড়ি।’
বড় ছেলে সুধীর শঙ্কা নিয়ে বলল, ‘কাকা যখন এল না, আজ থাক না মা।’
মাতঙ্গিনী ছেলের কথায় কান দিল না। মাথায় ঘুরছে ভাড়ায়
নেয়া ডিঙ্গি নৌকাটার কথা। তিনদিনের ভাড়া বাকি পড়েছে। না দিতে পারলে নৌকাটা যদি
কেড়ে নেয় মালিক তবে তো সব শেষ। রোজগারের সব পথ বন্ধ হয়ে যাবে।
‘চল চল বেরিয়ে
পড়ি। অত ভাবিস না। চোখ-কান একটু খোলা রাখতে হবে মনে রাখিস। অভিজ্ঞতা তো আমাদেরও
আছে নাকি!’
ওরা তিনজন। সুধীর বৈঠা হাতে গলুইয়ে। অধীর দাঁড় বাইছে।
মাঝে মাতঙ্গিনী চোখে সতর্ক দৃষ্টি। এদিকটাতায় নাইলনে জাল দিয়ে ঘেরা থাকলেও
পৃথিবীর ক্ষিপ্র প্রাণীটাকে আটকানো সহজ কথা নয়। এখানে নদী-নালা-খাঁড়ির পরতে পরতে
রহস্য বিরাজ করে। রহস্যভেদী হয়ে উঠতে পারলেই তার পাওনার ঘরা পূর্ণ। কপাল ফেরে।
সুখের মুখ দেখে। কিন্তু মাতঙ্গিনীর পাথর-চাঁপা কপাল। সংগ্রাম করেও জীবনের বাঁচার
রসদটুকু জোগাড় করে উঠতে পারে না। দীর্ঘশ্বাস চেপে বসে রইল সে।
‘অধীর, একটু জোরে দাঁড় চালা বাবা। আজ সজনেখালির দিকে
যেতে পারলে ভাল হত রে। তিনদিন কোনো কামাই নেই। বেশি করে মীন ধরতে পারলে ভাল হত।’
সুধীর ডিঙ্গির অভিমুখ ঠিক করতে করতে বলল, ‘কিন্তু মা, আমাদের তো কোনো
বৈধ কাগজপত্রও নেই। মাছ ধরতে নিষিদ্ধ এলাকায় যাওয়া কি ঠিক হবে!’
‘জানি ঠিক হবে না।
আইন মেনে পেটের ভাত আর হচ্ছে কোথায় বল! ঠিক আছে, চল তবে ভারানির
খালেই যাই। আজ কাঁকড়াই ধরি। আসলে এত কম্পিটিশন এখানে যে বেশি পরিমাণ কাঁকড়া ধরাও
যায় না।’
সরসর শব্দ করে ডিঙ্গি খালের মুখে অপূর্ব দক্ষতায় দাঁড়
করাল সুধীর। অধীর পাঁকে লঘি পুতে ডিঙ্গি বেঁধে দিল। নদীতে এখনো জোয়ার আসেনি। এলেই
মাতঙ্গিনী সুত ফেল কাঁকড়া ধরা শুরু করবে। খালের দু’পাশে ঘন ম্যানগ্রোভের জঙ্গল।
পাড়ের কর্দমাক্ত মাটি থেকে বেরিয়ে আছে শ্বাসমূল। অসাবধানী পা ফেললেই রক্তাক্ত
হবার সম্ভাবনা। গরান, গেঁওয়া, সুন্দরীর গা ঘেঁষে হেঁতালের নিবিড় বন। অদ্ভুত
নিঃশব্দ চারধার। গাঙসারসের চিৎকার নেই। পাখিদের কলরবও শোনা যায় না। গহীন অরণ্যের
নেশাধরা গন্ধ আছে, যা মানুষকে
আবিষ্ট করে রাখে। আর এই সুযোগেই হন্তারক রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারের খপ্পরে পড়ে যায়
অনেকে। বাঘে মানুষের অসম লড়াই এ অঞ্চলের সাধারণ খবর।
নদীজলের...