akkharbarta

অক্ষরবার্তা - একটি কিশোর বার্তা উদ্যোগ... আমাদের মূল লক্ষ্য উচ্চ মানের বই পাঠকের হাতে পৌঁছে দেওয়া... যোগাযোগ করুন - akkharbarta@gmail.com | www.akkharbarta.in

গল্প ১ । শ্রাবণ ১৪৩৩

হরিণডাঙা হল্ট











শিবজ্যোতি দত্ত

আগরতলা, ত্রিপুরা

ফড়িংটা উড়ে গিয়ে বসল প্ল্যাটফর্মের একেবারে কোনায়। সবুজ রং, লম্বা ঠ্যাং, রোদ পড়ে পিঠটা চকচক করছে। বিশু নিঃশ্বাস বন্ধ করে হাত বাড়াল। এই ফড়িংটা ওর চাই-ই।  

 

বাড়িতে কাচের জারে লালু আছে— লাল টুকটুকে ফাইটার মাছ, অখিলদার কাছ থেকে কুড়ি টাকায় কেনা। ফড়িং পেলে লালু ফুলকো লেজ মেলে এমন ঘুরপাক খায় যে হাসি চাপা যায় না

হাত প্রায় পৌঁছে গিয়েছিল। ঠিক তখন পিছনে ঘণ্টা বাজল। ঢং!

ফড়িং হাওয়া। বিশু ঘুরে দাঁড়াল। হরিণডাঙা হল্টে ঘণ্টা বাজাল কে? এখানে ট্রেন আসে না কত কাল! পাতে মরচে পড়ছে, স্লিপারের ফাঁকে ফাঁকে ঘাস গজিয়েছে, টিকিটঘরের জানলায় ঝাঁপ পড়েছে আজ কত কাল। ওরা এই প্ল্যাটফর্মে ডাংগুলি খেলে, ফড়িং ধরে, ঘুড়ির প্যাঁচ খেলে। ঘণ্টা তো কোনও দিন বাজেনি।

প্ল্যাটফর্মের শেষ মাথায় ছোট একটা ঘর, তার সামনে দাওয়া। সেখানে বসে এক বুড়ো পিতলের ঘণ্টা মাজছে ন্যাকড়া দিয়ে। মাজছে, আর মাঝে মাঝে টোকা মেরে শুনে নিচ্ছে আওয়াজটা খোলতাই হল কি না।

“কে রে?” মুখ না তুলেই জিজ্ঞেস করল বুড়ো।

“আমি বিশু। ফড়িং ধরছিলাম।”

“প্ল্যাটফর্মে উঠেছিস, টিকিট আছে?”

বিশু হাঁ। টিকিট! এই ভাঙা স্টেশনে টিকিট! ও ভাবল বুড়ো ঠাট্টা করছে। কিন্তু বুড়োর মুখ গম্ভীর। ঘণ্টাটা নামিয়ে রেখে সে উঠে গেল ঘরের ভিতর। ফিরে এল একটা ছোট্ট জিনিস হাতে নিয়ে। মোটা পিচবোর্ডের টিকিট, হলদেটে হয়ে গেছে, তাতে ছাপার অক্ষরে লেখা— হরিণডাঙা হল্ট। নীচে খোপ কাটা, তারিখ বসানোর জায়গা।

“নে। মাসুল লাগবে না। ছোটদের আমি এমনি দি।”

বিশু টিকিটটা হাতে নিয়ে উল্টেপাল্টে দেখল। এত পুরনো, তবু কোণগুলো ভাঙেনি। ভিতরের ঘরে র‍্যাক ভর্তি এই রকম টিকিটের বান্ডিল, পাশে কালো রঙের একটা যন্ত্র। বুড়ো বলল, ওতে টিকিট ঢুকিয়ে চাপ দিলে খটাস করে তারিখ ছাপা হয়ে যায়। আগে রোজ হত। ভোরের আপ, রাতের ডাউন।

দেওয়ালে একটা ঘড়ি। গোল, কাঠের ফ্রেম, কাচে ফাটল ধরেছে। কাঁটা দাঁড়িয়ে আছে ন’টা চল্লিশে।

“ঘড়িটা বন্ধ,” বিশু বলল।

“বন্ধ।” বুড়ো চাবি ঘোরাল ঘড়ির পিঠে। ঘরঘর আওয়াজ হল, কাঁটা নড়ল না। “রোজ দম দিই। চলে না। তবু দিই। দম না দিলে ভিতরে জং ধরে যাবে না?” 

 


“চলে না তো দম দাও কেন?”

বুড়ো এ কথার উত্তর দিল না। ঘণ্টাটা তুলে আবার মাজতে লাগল।

সে দিন বাড়ি ফিরে বিশু দেখল, দিদা উনুনের পাশে বসে খোলায় মুড়ি ভাজছে। বালি গরম হয়েছে, চাল ঢালতেই ফটফট আওয়াজ, মুড়ির গন্ধে চারদিক ভরে গেছে। দিদা হাটে এই মুড়ি বেচে। বলে, চালানি মুড়ি খেয়ে লোকের মুখের স্বাদ চলে গেছে, হাতে-ভাজা মুড়ির কদর আবার ফিরবে।

“হল্টে গেছিলি?” কাঠি নাড়তে নাড়তে জিজ্ঞেস করল দিদা।

“হ্যাঁ। একটা দাদু আছে ওখানে, জানো? টিকিট দিল আমাকে!”

দিদার হাত থেমে গেল। “নিতাই খ্যাপার কাছে গেছিলি? খবরদার বিশু! ও-মুখো হবি না!”

“কেন? দাদু তো ভাল!”

“ভাল-মন্দ তোকে বুঝতে হবে না। খ্যাপা মানুষ, খ্যাপা মানুষের হাওয়া লাগে। যেখানে বাঘের ভয়, সেখানেই তো সন্ধে হয়!”

“বাঘ কোথায় দেখলে? দাদু তো ঘণ্টা মাজছিল!”

“ওই তো!” দিদা ঝাঁঝিয়ে উঠল। “যে স্টেশনে ট্রেন নেই, সেখানে ঘণ্টা মেজে কোন কাজটা হয়, শুনি? খ্যাপা নয় তো কী!”

বিশু আর তর্ক করল না। মুড়ির খোলা থেকে এক মুঠো গরম মুড়ি তুলে নিয়ে পালাল। কিন্তু শোওয়ার সময় টিকিটটা বার করে আর এক বার দেখল। হরিণডাঙা হল্ট।

তার পর থেকে দিদা হাটে বেরিয়ে গেলে, দুপুরের দিকে বিশু প্রায় রোজ যায়।

নিতাইদাদু ওকে অনেক কিছু শেখাল। সিগন্যাল বাতিটা দেখাল— চৌকো টিনের বাতি, ভিতরে কেরোসিনের সলতে, সামনে কাচ বদলানোর খাঁজ। একটা কাচ সবুজ, একটা লাল।

“সবুজ মানে যাও। লাল মানে দাঁড়াও। বুঝলি ভাই? গোটা রেল-রাজত্ব এই দুটো কথার উপর চলে।”

“আর হলুদ? বড় স্টেশনে হলুদও দেখেছি।”

“হলুদ মানে আস্তে। ও শহুরে ব্যাপার। হল্টের দৌড় সবুজ-লাল অবধি।”

দাদু ওকে সলতে ছাঁটা শেখাল। কাঁচি দিয়ে সোজা করে কাটতে হয়, কোনাচে হলে শিখা লকলক করে, কাচে কালি পড়ে। কেরোসিন ভরা শেখাল— ফানেল দিয়ে, এক ফোঁটাও যাতে বাইরে না গড়ায়। রোজ সন্ধেয় দাদু বাতিটায় তেল ভরে, সলতে ছাঁটে, কাচ মোছে। তার পর রেখে দেয় দাওয়ার কোণে।

“একদিনও জ্বালাও না তো!” এক দিন বলে ফেলল বিশু।

“জ্বালাই। তুই থাকিস না তখন। রাত ন’টা চল্লিশে।”

ন’টা চল্লিশ! ঘড়ির বন্ধ কাঁটাও তো ওই ন’টা চল্লিশে দাঁড়িয়ে। বিশু জিজ্ঞেস করতে গেল, দাদু তার আগেই উঠে পড়ল। “ডাউন প্যাসেঞ্জার ঢুকত ন’টা চল্লিশে। দু’মিনিট দাঁড়াত। এই দাওয়া থেকে বাতি দেখাতাম। যা, বেলা গড়াল, তোর দিদা বাড়ি ফিরে দেখতে না পেলে ঝামেলা করবে।”

বিশুর মাথায় প্রশ্নটা ঘুরতেই থাকল। ট্রেনই যেখানে নেই, সেখানে রোজ রাতে কার জন্যে বাতি জ্বালানো হয়?

      উত্তরটা ও পেল হারুকাকার চায়ের দোকানে। হাটবারের বিকেল, দোকানে তখন বেশ ভিড়। বিশু বেঞ্চির কোণে বসে ছিল, কথাটা পেড়েই ফেলল।

“হারুকাকা, নিতাইদাদু রোজ রাতে স্টেশনে বাতি জ্বালে কেন গো?”

দোকান এক মুহূর্ত চুপ। তার পর হারুকাকা কেটলিতে জল চাপিয়ে বলল, “সে অনেক কাল আগের কথা। তুই তখন জন্মাসনি, তোর বাপ তখন ইস্কুলে পড়ে।” ভাঁড়ে চা ঢেলে খদ্দেরকে এগিয়ে দিয়ে তার পর আবার বলতে লাগল, “নিতাইদা ছিল হল্টের গ্যাংম্যান। টিকিটও কাটত, ঘণ্টাও দিত, পয়েন্টেও তেল দিত— হল্টে অত ভাগাভাগি থাকে না। তা হল কী, বড় ব্রিজ হল পশ্চিমে, নতুন লাইন হল। বেশির ভাগ গাড়ি সেই লাইন ধরল। এ লাইনে রইল খালি এক জোড়া প্যাসেঞ্জার— ভোরের আপ, রাতের ডাউন। একসময় উপরওলারা হিসেব কষে দেখল, হরিণডাঙায় গাড়ি থামিয়ে লাভ নেই। অর্ডার এল, হল্ট বন্ধ। গাড়ি যাবে, থামবে না।”

“তার পর?”

হারুকাকা উনুনে ফুঁ দিল। ধোঁয়ায় চোখ কুঁচকে গেল তার। “তার পরের কথাটা আর শুনিস না। ছেলেমানুষ তুই।”

“বলো না কাকা!”

পাশ থেকে এক জন বুড়ো খদ্দের বলে উঠল, “বলেই দে হারু। শুনুক না। বুঝুক, বুড়োটা খ্যাপা নয়।”

      হারুকাকা খানিক চুপ করে থেকে বলল, “নিতাইদার এক মেয়ে ছিল। টুসি। বছর আষ্টেক বয়স। হল্ট বন্ধ হওয়ার হপ্তা দুয়েকের মাথায়, এক রাতে মেয়েটার ওলাউঠার মতো ব্যারাম ধরল। ভেদবমি, চোখ উল্টে যাচ্ছে। মহকুমা হাসপাতাল সাত মাইল দূরে। গোরুর গাড়িতে সাত মাইল মানে সারা রাত। আর ডাউন প্যাসেঞ্জার হাসপাতালের স্টেশন ছুঁয়ে যায় কুড়ি মিনিটে। নিতাইদা মেয়েকে কাঁথায় জড়িয়ে প্ল্যাটফর্মে দাঁড়াল। হাতে লাল বাতি। লাল মানে দাঁড়াও— রেলের লোক, নিয়ম জানত। ন’টা চল্লিশে ট্রেন এল। নিতাইদা বাতি নাড়ল, চেঁচাল। ড্রাইভার হুইসেল দিল।”

“দাঁড়াল না?”

“বন্ধ হল্টে দাঁড়ানো মানা। ড্রাইভারেরও চাকরির ভয় আছে। ট্রেনটা বেরিয়ে গেল। ভোরে গোরুর গাড়ি যখন হাসপাতালে পৌঁছল—” হারুকাকা কথা শেষ করল না। কেটলির জল ফুটছিল, নামিয়ে রাখল।

সবাই চুপ। বিশু আর কিছু জিজ্ঞেস করল না।

“তার বছর দুয়েক বাদে,” বুড়ো খদ্দের নিচু গলায় বলল, “সেই জোড়া গাড়িও উঠে গেল। লাইনটা শুধু পড়ে রইল। কিন্তু বুড়ো রয়ে গেল। আজও রোজ রাতে ন’টা চল্লিশে বাতি দেখায়। তবে লাল নয়, শুনেছি সবুজ দেখায়। কেন, তা ও-ই জানে।”

পরের দিন বিশু হল্টে গেল, কিন্তু কিছু জিজ্ঞেস করল না। দাদু দাওয়ায় বসে বাতির কাচ মুছছিল। বিশু পাশে বসল। অনেকক্ষণ কেউ কোনও কথা বলল না। শেষে দাদু কাঁচিটা এগিয়ে দিল।

“সলতেটা ছাঁট তো। তোর আঙুল সরু, আমার চেয়ে ভাল পারবি।”

বিশু খুব সাবধানে, একদম সোজা করে আগা গোল করে সলতেটা ছাঁটল। দাদু দেখে ঘাড় নাড়ল।

মাঘ মাস পড়তেই কিছু লোকজন এল।

বিশু সে দিন প্ল্যাটফর্মে বসে টিকিটের যন্ত্রটা নিয়ে খুটখুট করছিল, দেখল বড় রাস্তা দিয়ে একটা জিপ ঢুকল। নামল তিন-চার জন। সামনের জনের পরনে সাফারি স্যুট, হাতে ফাইল, চোখে চশমা। পিছনের দু’জনের হাতে ফিতে আর লাল-সাদা লাঠি।

“মাপ শুরু করো এ-দিক থেকে,” সাফারি স্যুট হাঁক দিল। “দেওয়ালে নম্বর মেরে দাও। শেড আলাদা লটে উঠবে, প্ল্যাটফর্ম আলাদা লটে।”

দাদু দাওয়া থেকে উঠে এল। “আপনারা কারা?”

“রেলের কনট্রাক্টর। গণেশ সামন্ত।” লোকটা ফাইল খুলল। “স্ক্র্যাপের টেন্ডার হয়ে গেছে দাদু। লাইন উঠবে, স্ট্রাকচার ভাঙা হবে। এখানে এফসিআই-এর গুদাম হবে। আপনি এখানে থাকেন নাকি? কোয়ার্টার তো রেলের সম্পত্তি। আপনার কাগজ আছে?”

দাদু চুপ।

“রিটায়ার করেছেন কবে? কুড়ি বছর? তা হলে তো কবেই ছাড়ার কথা। যাক গে, আমার কাজ নয় ও-সব। পনেরো তারিখ মেটেরিয়াল স্পেশাল আসবে, লাইন কেটে তুলে নিয়ে যাবে। তার আগে ঘর খালি চাই।”

বিশু কান খাড়া করল। ট্রেন আসবে? এই মরা লাইনে?

“ট্রেন আসবে?” দাদুও ঠিক ওই কথাটাই জিজ্ঞেস করল। গলাটা অন্য রকম শোনাল।

“মেটেরিয়াল স্পেশাল। ইঞ্জিন আর ক’টা খালি ওয়াগন। মেন লাইন থেকে পুরনো কানেকশন ধরে ঢুকবে। ওই জন্যেই তো লাইনটা এত দিন তোলা হয়নি— শেষ বারের মতো ট্রেন ঢোকার রাস্তা রাখতে হয় কিনা।” গণেশবাবু ঘড়ি দেখল। “পনেরো তারিখ রাতে হবে। দিনে মেন লাইনে ট্র্যাফিক থাকে, রাত ছাড়া স্পেশালের পথ নেই।”

লোকগুলো ফিতে টেনে মাপ নিতে লাগল। দেওয়ালে খড়ি দিয়ে নম্বর পড়ল— এক, দুই, তিন। টিকিটঘরের গায়ে পড়ল সাত।

দাদু সে দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার পর বলল, “মাঘ মাসটা যেতে দিন।”

    “ডেট পিছোনো যাবে না দাদু। রেলের ব্লক, বুঝলেন? ভগবানের বাপেরও সাধ্যি নেই বদলানোর!” গণেশবাবু জিপে উঠতে উঠতে বলল, “ভাগ্নে-টাগ্নে নিকটজন কেউ আছে? খবর দিন। এই শীতে বুড়ো মানুষ যাবেন কোথায়?”

জিপ চলে গেল। ধুলো উড়ল খানিক।

বিশু দাদুর পাশে গিয়ে দাঁড়াল। কী বলবে ভেবে পেল না। দাদু টিকিটঘরের দেওয়ালের খড়ির দাগটার দিকে তাকিয়ে ছিল। সাত নম্বর লট।

“দাদু, তুমি কোথায় যাবে?”

“কাটোয়ায় ভাগ্নে আছে এক। চিঠি লিখেছিল কবেই, আয় মামা, থাকবি।” দাদু ঘরে ঢুকে ঘড়িতে দম দিল। ঘরঘর। কাঁটা ন’টা চল্লিশেই স্থির। “যাব’খন। পনেরো তারিখটা যাক।”

“পনেরো তারিখ কেন?”

দাদু ঘণ্টাটা নামিয়ে রাখল। তার পর এই প্রথম বিশুর দিকে সোজাসুজি তাকাল।

“তিরিশ বছরে এই প্রথম, হরিণডাঙার লাইনে ট্রেন আসছে রে ভাই। রাতে আসছে। আমি প্ল্যাটফর্মে থাকব না?”

পনেরোই মাঘ। সারা দিন হল্টে হইচই— গণেশবাবুর লোক, তাঁবু, শাবল-গাঁইতির অবিরত শব্দ। রাত থেকেই লাইন কাটা শুরু হবে।

বিশু সন্ধেবেলা ভাত খেয়ে শুয়ে পড়েছিল, কিন্তু ঘুম এল না। দিদার নাক ডাকা শুরু হতেই ও লেপ থেকে বেরোল। বাইরে কনকনে হিম, মাঠে কুয়াশা নেমেছে হাঁটু অবধি। গায়ে চাদর জড়িয়ে ও দৌড় দিল। কুয়াশার ভিতর দিয়ে দৌড়তে পা অবশ হয়ে আসছিল— শিশির-ভেজা ঘাসে ছপছপ শব্দ উঠছিল।

হল্টে পৌঁছে দেখল, তাঁবুর সামনে আগুন জ্বেলে গণেশবাবুর লোকেরা খাবার খাচ্ছে। আর প্ল্যাটফর্মের মাঝখানে, একা, দাদু দাঁড়িয়ে।

গায়ে সেই কবেকার কালো কোট— রেলের কোট, কনুইয়ে তাপ্পি। হাতে বাতি। জ্বলছে। সামনে সবুজ কাচ।

“দাদু!”

“বিশু? এত রাতে এসেছিস? তোর দিদা জানে?”

“দিদা ঘুমোচ্ছে।” বিশু হাঁপাতে হাঁপাতে পাশে এসে দাঁড়াল। তার পরই কানে গেল শব্দটা। টিক, টিক, টিক।

টিকিটঘরের দরজা খোলা। ভিতরে দেওয়ালের ঘড়িটা চলছে।

“দাদু, ঘড়িটা চলছে যে!” বিশু প্রায় চেঁচিয়ে উঠল।

“সন্ধেবেলা দম দিলাম, ভাই।” দাদুর গলা শান্ত। “তিরিশ বছর ধরে রোজ দিয়েছি। চলেনি। আজ চলল।”

বিশু ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে রইল। ন’টা বেজে সাঁইত্রিশ। কাঁটাটা নড়ছে, সত্যিই নড়ছে।

তখনই, বহু দূরে, হুইসেল।

আগুনের ধারের লোকগুলো উঠে দাঁড়াল। “স্পেশাল আসছে!” লাইনের উত্তর মাথায়, কুয়াশার ভিতরে, একটা আলো ফুটল। প্রথমে কুপির শিখার মতো ছোট, তার পর বড় হতে লাগল। মাটির ভিতর দিয়ে গমগমে একটা কাঁপুনি এসে পায়ের তলায় লাগল। মরা লাইন, মরচে-ধরা পাত— তার উপর দিয়ে তিরিশ বছর পরে চাকা গড়াচ্ছে।

    দাদু বাতিটা মাথার উপর তুলল। সবুজ আলোটা কুয়াশায় গোল।

ইঞ্জিনটা ঢুকল ঝমঝম করে, পিছনে খালি ওয়াগনের সার। ব্রেকের লম্বা আওয়াজ উঠল, চাকায় আগুনের ফুলকি ছিটকোল, আর ট্রেনটা থামল— ঠিক প্ল্যাটফর্ম বরাবর।

বিশু ছুটে গিয়ে টিকিটঘরের ঘড়ি দেখে এল। ন’টা চল্লিশ। কাঁটায় কাঁটায়।

         ইঞ্জিনের জানলা দিয়ে ড্রাইভার মুখ বাড়াল। “এই যে দাদু! বাতি দেখাচ্ছ কেন? এ প্যাসেঞ্জার গাড়ি না, মেটেরিয়াল স্পেশাল!”

দাদু বাতি নামাল না। বলল, “থামলে তো।”

“থামব না? এখানেই তো কাজ!” ড্রাইভার হেসে ফেলল। “তা তুমি কে?”

“হরিণডাঙা হল্টের নিতাই মণ্ডল। গ্যাংম্যান।” দাদু সোজা হয়ে দাঁড়াল। তার পর ঘরে ঢুকে পিতলের ঘণ্টাটা নিয়ে এল, আর দু’বার বাজাল। ঢং! ঢং!

“ডাউন ঢুকল,” আপন মনে বলল দাদু।

বাকি রাতটার কথা বিশুর ভাল মনে নেই। আগুনের ধারে বসে ও কখন ঘুমিয়ে পড়েছিল। আধো ঘুমে শুনছিল, দাদু ড্রাইভারের সঙ্গে গল্প করছে— কোন সালের বান, কোন ইঞ্জিনের ক’টা চাকা, কয়লার গাড়ি থেকে স্টিলের গাড়ি। ভোরের দিকে কে ওর গায়ে একটা কম্বল চাপা দিয়ে গেল।

ঘুম ভাঙল শাবলের শব্দে। রোদ উঠে গেছে। লাইনের উপর লোক ঝুঁকে পড়ে কাজ করছে, ক্লিপ খুলছে, পাত কাটছে— ফুলকি উড়ছে। ওয়াগনে একটার পর একটা পাত উঠছে ঝনঝন করে।

        দাদু কোথাও নেই।

“বুড়ো ভোরের দিকে ইঞ্জিনে উঠে বসেছিল, দেখলাম,” আগুনের ধারের এক জন বলল। “ড্রাইভারের সঙ্গে খুব ভাব হয়ে গেছল। মেন লাইনের জংশনে নামিয়ে দেবে বলল, ওখান থেকে কাটোয়ার গাড়ি পাওয়া যায়।”

“না না, আমি দেখেছি হেঁটে যেতে,” আর এক জন বলল, “তোরঙ্গ মাথায়, বড় রাস্তা ধরে।”

কে যে ঠিক দেখেছে, বোঝা গেল না।

বিশু কোয়ার্টারের দিকে গেল। দরজা খোলা। ভিতর থেকে টিক টিক শব্দ আসছে— ঘড়িটা দেওয়ালে রয়ে গেছে, চলছে। তোরঙ্গ নেই, ঘণ্টাটাও নেই। আর দাওয়ার কোণে, রোজকার মতোই, সিগন্যাল বাতিটা রাখা। কেরোসিন ভরা। সলতে ছাঁটা— একদম সোজা করে।

বিশু বাতিটা বুকে চেপে বাড়ি ফিরল। দিদা উঠোনে বসে চাল বাছছিল। বকুনির জন্যে ও তৈরি হয়েই ঢুকেছিল, কিন্তু দিদা ওর মুখের দিকে তাকিয়ে কী বুঝল, কিছু বলল না। শুধু কুলুঙ্গি থেকে শিশি-বোতল সরিয়ে জায়গা করে দিল।

    বাতিটা এখন সেখানেই থাকে, লালুর জারের পাশে। বিশু রোজ কাচ মোছে। মাঝে মাঝে সলতে ছাঁটে।

হল্টের জায়গায় এখন গুদাম উঠছে। লাইন নেই, পাত নেই, খালি মাটিতে লম্বা একটা সোজা দাগ রয়ে গেছে— ঘাস সেখানে গজায়নি, দূর থেকে দেখলেই বোঝা যায়, এখান দিয়ে লাইন গিয়েছিল।

তবে এক-একটা রাতে, ন’টা চল্লিশ নাগাদ, দূরের মেন লাইন থেকে হুইসেল ভেসে আসে। দিদা বলে, ও হাওয়ার কারসাজি, শীতের রাতে শব্দ অনেক দূর যায়। হবেও বা। কিন্তু সেই রাতগুলোয় বিশু কুলুঙ্গি থেকে বাতিটা নামায়, দেশলাই জ্বালে, সামনে সবুজ কাচটা লাগিয়ে জানলায় ধরে। 

হুইসেলটা তখন আর এক বার ডাকে। উত্তর দেয়, না এমনিই ডাকে, কে জানে!

হুইসেলটা তখন আর এক বার ডাকে। উত্তর দেয়, না এমনিই ডাকে, কে জানে!