কালো পাঞ্জাবি আর নীল জিন্স পরে সমু চৌমাথার ধারে ফুটপাতে এসে দাঁড়ালো। সমু, অর্থাৎ সৌম্যপ্রভ বসু, বয়স পঁচিশ হলেও ইতিমধ্যেই পাড়ার জ্ঞানী গুণী ব্যক্তিদের মধ্যে একজন হয়ে উঠেছে। তবে জ্ঞানী না বলে বিজ্ঞানী বলাই সঠিক। পেশায় সে একটি দৈনিক পত্রিকার বিজ্ঞান বিভাগের সঙ্গে যুক্ত। বিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা আর ছোটখাটো গবেষণা তার নেশা, বলা ভালো জন্মগত নেশা।
সমুর দাদু ছিলেন একজন পদার্থবিদ্যার অধ্যাপক। বাড়ির চিলেকোঠার ঘরটায় তিনি জীবনের বেশিরভাগ সময় কাটিয়েছেন নানা ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষায়। নিজের হাতে তৈরি করা যন্ত্রপাতি আর অজস্র সূত্র ও মডেল এখনও সেই ঘরের এক কোণে সংরক্ষিত। দাদুর মৃত্যুর পর সেগুলোর দায়িত্ব পুরোপুরি সমুর কাঁধে বর্তায়।
স্কুলে পড়াকালীন সমু একটি কথা বলা যন্ত্র তৈরি করেছিল, যা তাকে ইন্ডিয়ান স্পেস রিসার্চ সেন্টার থেকে পুরস্কার এনে দেয়। তবে প্রথাগত শিক্ষায় বিশেষ আগ্রহ না-থাকায় স্কুল-কলেজের পড়াশোনা খুব একটা এগোয়নি তার। সময়ের বড় অংশ সে কাটায় সেই চিলেকোঠার ঘরে, দাদুর রেখে যাওয়া কাজগুলোর গভীরে ডুবে গিয়ে। বিজ্ঞান তার কাছে শুধু নেশা নয়, এক অন্তহীন সাধনা।
চৌমাথার মোড়ে সমুকে দেখতে পেয়ে পাশের পাড়ার নরেন দৌড়ে এল। নরেন সমুর প্রিয় শিষ্য। সমুর উদ্ভট সব চিন্তাধারা আর পরীক্ষা-নিরীক্ষার উপর তার অসীম আগ্রহ। হাঁপাতে-হাঁপাতে নরেন বলতে লাগল, “সমুদা! ব্যাপক খবর আছে!”
সমু বলল, “কী খবর?”
“চাটুজ্জেদের বাড়ির পুকুর ধারে কাল আমি ভূত দেখেছি!”
নরেনের কথা শুনে সমু বিরক্ত হল, “ধ্যাৎ! ভূত আবার হয় নাকি? আমার কাছে ভূতের গল্প করবি না।”
নরেন একটু দমে গিয়ে বলল, “সমুদা, কাল সন্ধ্যার পর আমি কোচিং ক্লাস থেকে ফেরার পথে চাটুজ্জেদের পুকুর পাড় দিয়ে বাড়ি যাচ্ছিলাম, তখন দেখলাম, এক বিশাল জোনাকি পোকার মত কিছু একটা জ্বল-জ্বল করছে।”
সমু এইবার একটু আগ্রহ দেখাল, জিজ্ঞেস করল, ‘তারপর?’
নরেন এ বার কথাটা বলতে একটু সাহস পেল, “তারপর, তোমার কথা মনে হল। তুমি বলেছিলে এই পৃথিবীতে ভূত-টুত কিছু নেই। সব মানুষের ভুল ধারণা জ্ঞান ও পড়াশোনার অভাবে মানুষের মধ্যে এইসব ভুল ধারণা জন্ম নেয়।”
শিষ্য নরেন তার শিক্ষা মনে প্রাণে গ্রহণ করেছে ভেবে সমু খুব খুশি হলো।
‘কিন্তু.......’
নরেনের মুখে ‘কিন্তু’ শুনে সমু জিজ্ঞেস করল, “কিন্তু, কী?”
নরেন বলল, “কিন্তু মনে হয় কালকে ভূতই দেখেছিলাম। ওই বেশ বড় জোনাকির মত গোলাকৃতির বস্তুটি থেকে ভূতের মত কি যেন একটা বেরিয়ে এসেছিল। আমার পায়ের শব্দে আবার ভিতরে ঢুকে গেল।”
“তারপর, তুই কী করলি?”
নরেন বলল, “কী করব আর? প্রাণটা হাতে নিয়ে দৌড়ে পালিয়েছি। তাই তোমাকে খুঁজছিলাম।”
সমু নরেনকে খুব বিশ্বাস করে। সে জানে নরেন তাকে মিথ্যা কথা বলবে না। তবু সে নরেনকে বলল, “আমার হাতের ঘড়িটা ধরে বলত, কালকের তোর ‘’সো-কলড’ ভূতের ঘটনাটা আবার।”
সমুর এই ঘড়িটা লাই-ডিটেক্টরের কাজ করে। ঘড়িটা ধরে কেউ কিছু বললে ঘড়ি সেটার সত্যতা শতাংশের হিসাবে বলে দেয়। নরেন যথারীতি সমুর বাম হাতে পরা ঘড়িটা ধরে তার ভূত দেখার ঘটনাটা আবার বলল। ঘড়ি থেকে একটা মহিলার যান্ত্রিক কণ্ঠ ভেসে আসল, “ট্রুথনেস ইন দা স্টেটমেন্ট ইস নাইনটিনাইন পার্সেন্ট।”
সমু আর নরেন জানে পঁচাত্তর শতাংশের বেশি আসলেই সেটা সত্য। বাকিটা যান্ত্রিক ত্রুটি হিসাবে ধরা হয়। এইবার নরেন খুশি, তার গুরুকে সে সন্তুষ্ট করতে পেরেছে।
সমু একটু চিন্তিত হয়ে পড়ল। নরেন কী দেখতে পারে? তার বর্ণনা অনুসারে তো সে আজব কিছু একটা দেখেছে। এই শহরের মধ্যে এমন কোন প্রাণীরও থাকার কথা না। তাহলে সেটা কি?
নরেন জিজ্ঞেস করল, “একবার যাবে নাকি দেখতে?”
সমু চুপ। উত্তর দিল না। ততক্ষণে সন্ধ্যা হয়ে এসেছে। এখন শ্রাবণ মাস চলছে। আকাশেও বেশ ঘন কালো মেঘ জমেছে। ঝড়বৃষ্টি আসবে। সমু বলল, “চল, আমার বাড়ি। সেখানে বসে প্ল্যান করব।”
নরেন সমুর পিছু পিছু তার বাড়ি চলল। সমুর বাড়ির ছাদের চিলেকোঠায় সেই রহস্যময় পরীক্ষাগারে নরেন ও সমু গিয়ে বসল। এই ঘরে সমু ছাড়া শুধু নরেনের প্রবেশের অনুমতি আছে। তবে কোনো কিছু স্পর্শ করার অধিকার শুধুই সমুর। বাড়ির অন্য কেউ এই ঘরে আসে না—আসার সাহসও পায় না। একবার বাড়ির কাজের মাসি ঘর ঝাঁট দিতে ঢুকেছিল, আর ভুল করে টেবিলটা সামান্য নাড়াতেই পুরো বাড়ি কাঁপিয়ে বিকট সাইরেন বাজতে শুরু করেছিল। টেবিলের উপর রাখা ভূমিকম্প সতর্কতা দেওয়ার যন্ত্রটি সক্রিয় হয়ে উঠেছিল। সেই ঘটনার পর থেকে কেউ আর ভুলেও ঘরে পা রাখে না। ঘরজুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে অসংখ্য বইপত্র, যন্ত্রপাতি, সমুর দাদুর হাতে লেখা ডায়েরি, কাগজপত্র, আর বিজ্ঞান বিষয়ক ম্যাগাজিন। এক কোণে রাখা ছোট্ট একটি বিছানায় সমু গিয়ে আধশোয়া হয়ে চোখ বন্ধ করল। বাইরে তখন ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নেমেছে। নরেন চুপচাপ তার নির্দিষ্ট চেয়ারে গিয়ে বসল। চেয়ারে বসতেই ডান পাশে থাকা একটি সেন্সর সক্রিয় হয়ে উঠল। চেয়ারের হাতল থেকে একটি ছোট ট্রে বেরিয়ে এল, যেখানে সাজানো ছিল চিপস আর আলু ভুজিয়া—নরেনের প্রিয় স্ন্যাকস। সেন্সরটি জানে, নরেন কী ভালোবাসে। একটু পরই জল তেষ্টার সংকেত পেলে বা পাশ থেকে কাগজের গ্লাসে জল পরিবেশিত হল।
নরেন খাবারে মগ্ন হয়ে রইল, আর সমু আধশোয়া অবস্থায় বাইরে বৃষ্টির শব্দ শুনতে শুনতে কী যেন চিন্তা করতে লাগল। এই ঘরটা তাদের দুজনের জন্য এক আলাদা জগৎ—কল্পনা আর বাস্তবের মাঝখানে থাকা এক কল্প-বিজ্ঞানের আশ্রয়।
প্রায় ঘণ্টা খানেক পর বৃষ্টি থামল। সমু চুপচাপ উঠে দাঁড়াল। নরেনকে বলল, ‘চল।’
‘কোথায়?’
নরেনের প্রশ্নে একটু বিরক্ত হয়ে সমু বলল, “তোর ভূতকে দেখে আসি চল।”
নরেন এইবার আনন্দে আত্মহারা। অনেকদিন পর সমুর সাথে কোন অভিযানে যাবে। সেটা তার ভাগ্যের ব্যাপার। এই সুযোগ সচরাচর পাওয়া যায় না।
সমু বিছানার নিচ থেকে দু জোড়া নৌকার মতো প্লাস্টিকের কিছু একটা বের করে নরেনকে এক জোড়া দিয়ে বলল, “নে, দুটোর উপর দু পা রেখে দাঁড়িয়ে লাল বটনগুলিতে চাপ দে।”
নরেন কথা না-বলে দুটোর উপর দাঁড়িয়ে লাল বটনগুলিতে চাপ দিতেই পা থেকে শুরু করে কোমর অব্দি জুতো সহ প্যান্টের উপর প্লাস্টিকের আস্তরণ পড়ে গেল।
সমু এইবার বলল, “ভারী বৃষ্টি হয়েছে। চাটুজ্জেদের পুকুর পাড়ে অনেক কাদাজল হবে। জামাকাপড় নষ্ট হবে না।”
নরেন অবাক হয়নি। সমুর অদ্ভুত যন্ত্রপাতি আর গেজেট সম্পর্কে তার ভালোই ধারণা আছে। এমন অগুনতি অদ্ভুত জিনিস সমুর কাছে থাকাটা খুব স্বাভাবিক। সমু তার ব্যাগটা হাতে তুলে নিল। ব্যাগের ভেতরে কী আছে, সেটা নিয়ে নরেন কিছু জিজ্ঞেস করল না।
এইবার তারা চলল চাটুজ্জেদের বাড়ির বাগানের দিকে। সন্ধের আলো তখন ঘনিয়ে প্রায় রাত হয়ে এসেছে। বাগানটা এমনিতেই নিরিবিলি জায়গায়, মানুষজন খুব একটা আসা-যাওয়া করে না। গাছের ছায়ায় লুকিয়ে থাকা বাগানটা অন্ধকারে আরও রহস্যময় দেখাচ্ছে। বাগানের লাইটগুলো ক্ষীণ আলো ছড়াচ্ছে, আশপাশের সব কিছু অস্পষ্ট লাগছে।
পাঁচিলটা বেশি উঁচু নয়, কিন্তু তার গায়ে লতাগুল্ম জড়িয়ে আছে। পাঁচিল টপকানোর সময় ঝোপের ভেতর থেকে আচমকা কিছু একটা নড়ার শব্দ হলো। নরেন থমকে দাঁড়াল। সমু পিছন ফিরে শান্ত গলায় বলল, “ভয় পাচ্ছিস? কিছু নেই, কিছু হবে না। আমি আছি। চল।”
দু’জনে পাঁচিল টপকে বাগানে ঢুকল। চারপাশে শুধু ঝিঁঝি পোকার শব্দ, আর মাঝে মাঝে ঝোপের ভেতর কিছু একটা নড়ার মৃদু আওয়াজ। দূরে কোথাও কুকুর ডেকে উঠল। বাগানের মাঝখানে একটা বড় আমগাছ দাঁড়িয়ে আছে, যার নিচের ছায়াটা এত গভীর যে মনে হচ্ছিল কেউ সেখানে লুকিয়ে আছে।
নরেন ফিসফিস করে বলল, “সমুদা, আমরা ঠিক করছি তো?”
সমু মুখে একটা অদ্ভুত হাসি এনে বলল, “ঠিকই করছি। চুপচাপ চল।”
বাগানের বাতাসটা ঠান্ডা। চারপাশে গাছপালার ছায়াগুলো যেন ধীরে ধীরে সরে গিয়ে তাদের দিকে তাকিয়ে আছে। দুজনে নিঃশব্দে গাছপালার ভেতর দিয়ে এগিয়ে চলল। সমু এইবার খুব আস্তে বলল, “একটু দাঁড়া। এইখানে একটু অপেক্ষা করি। ব্যাপারটা বুঝে নিই একটু।”
“সবদিকে তো অন্ধকার হয়ে আছে। পুকুর পাড়ের রাস্তায় লাইটটাও আর জ্বলছে না। লোড-শেডিং হয়ে গেছে মনে হয়। কিছুই দেখা যাচ্ছে না,” নরেন ফিসফিস করে বলল।
“এইখানে টর্চ জ্বালানো যাবে না। এই নে, এইটা পরে ফেল। এইটা নাইট ভিশন চশমা,” ফিসফিস করে কথাটা বলে সমু ব্যাগ থেকে একটা চশমা বের করে নরেনকে দিল। নিজেও একটা চশমা পরে নিল।
নরেন দেখল চশমাটা দিয়ে এই অন্ধকারে সব দেখা যাচ্ছে কিন্তু একটু সবুজ-সবুজ ভাব সবকিছুতেই।
এর মধ্যে সমু ব্যাগ থেকে ছোট্ট একটা যন্ত্র বের করল। ছোট্ট ড্রোনের মতো একটা যন্ত্র। সমু সেটাকে চাবি দিয়ে উড়িয়ে দিল। পকেট থেকে মোবাইল ফোনটা বের করে দেখতে লাগল। নরেন জিজ্ঞেস করল, “সমুদা, এইটা কী গো?”
“স্ক্যানার মেশিন। আমাদের চারদিকে পাঁচশ মিটারের মধ্যে প্রাণী ছাড়া অন্য কোনও চলমান অবজেক্ট থাকলে এই মোবাইলের স্ক্রীনে চলে আসবে। এই স্ক্যানারে পৃথিবীর সব প্রাণীর ডিএনএ-র ডাটাবেস আছে। প্রাণী ছাড়া অন্যকিছু চলমান অবজেক্ট থাকলেই সে ডিটেক্ট করে নেবে।”
সমুর কথা নরেনের মগজে পুরাটা ঢুকল না। সে শুধু ‘হুম’ বলে থেমে গেল।
এর মধ্যে নামল জাঁকিয়ে বৃষ্টি। সমু তাড়াতাড়ি নিজের পকেট থেকে দুটো বোতাম বের করল। একটা নিজের বুকে আরেকটা নরেনের বুকে লাগিয়ে বোতামে টিপ্ দিল। সাথে সাথে বৃষ্টির জল তাদের শরীর এড়িয়ে পড়তে শুরু করল।
সমু নরেনকে বলল, “এইটা হচ্ছে ভ্যাকুয়াম ছাতা। শরীরের চারদিকে একটা ভ্যাকুয়ামের লেয়ার তৈরি হয়ে যাবে। বৃষ্টিতে ভিজতে হবে না।”
এর মধ্যেই সমুর মোবাইল স্ক্রিনে বিপ-বিপ আওয়াজ শুরু হল। একটা জায়গায় লাল চিহ্ন দেখাচ্ছে। সমু বলল, “পেয়ে গেছি!”
নরেন কৌতূহলের সাথে জিজ্ঞেস করল, “ভূত?”
সমু চুপচাপ পুকুরের ধারে বড় গাছের নিচে ঝোপটার কাছে গিয়ে বসে পড়ল। নরেন কিছু বুঝতে না-পেরে সমুর পাশে বসে পড়ল। তার মনে কেবল একটাই প্রশ্ন—সমু’দা এ সব কী করছে?”
সমু যেন কিছু একটার অপেক্ষা করছে। কিছু ক্ষণ পর, তাদের থেকে একটু দূরে সবুজ উজ্জ্বল আলো জ্বলে উঠল। আলোর ভেতর থেকে একটি বড় ডিম্বাকৃতির কিছু ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে উঠল। সেই বস্তুটি থেকে বেরিয়ে এল একটি অদ্ভুত প্রাণীর মতো কিছু একটা জিনিস।
প্রাণীটার গায়ের রং ফিকে ধূসর, মুখটা ডিম্বাকৃতির, আর চোখ দুটো বড় বড়, জোনাকির মতো জ্বলজ্বল করছে। তার হাতে লম্বা লম্বা তিনটি করে আঙুল। কোনও পোশাক নেই, আর তার চলার ভঙ্গি অদ্ভুত। নরেন প্রথমে কিছুই বুঝতে পারল না। প্রাণীটাকে দেখে সে কাঁপতে শুরু করল। ভয়ে ভীষণ আঁতকে উঠে ফিসফিস করে বলতে লাগল, “রাম...রাম...রাম!”
প্রাণীটি আরও এক ধাপ এগিয়ে আসতেই নরেনের সহ্য হল না। সে রীতিমতো ভিরমি খেয়ে অজ্ঞান হওয়ার উপক্রম। সমু তখনও শান্ত, প্রাণীটার দিকে অপলক তাকিয়ে। মনে হচ্ছিল, এই ব্রাম্ম মুহূর্তটাই তার বহুদিনের অপেক্ষার ফল।
নরেনের কাণ্ড কারখানা দেখে সমু বিরক্ত হয়ে বলল, “চুপ কর। এইটা এলিয়েন-ভিনগ্রহবাসী। আমার এইটাই সন্দেহ ছিল। আমার স্ক্যানারে ধরা পড়েছে। আমি একটা স্বাগতম বার্তা পাঠিয়েছি তাদের।”
ততক্ষণে সেই অদ্ভুত ভিনগ্রহবাসীটি তাদের সামনে এসে দাঁড়ালো। সমুর মোবাইলে যান্ত্রিক কণ্ঠস্বর বাজতে থাকল। এই যন্ত্রটা হচ্ছে একটা ট্রান্সলেটর। ভিনগ্রহবাসীদের ভাষা ট্রান্সলেট করে দেবে।
“তুমি কোন গ্রহের?”
সমুর প্রশ্নের উত্তরে ট্রান্সলেটর যন্ত্র বলল, “তোমাদের আকাশগঙ্গা ছায়াপথের পাশের ছায়াপথে আমাদের গ্রহ, নাম অর্বিটার। তোমাদের গ্রহ থেকে তিনশো পনেরো আলোকবর্ষ দূর মাত্র।”
ভিনগ্রহবাসীটির মুখ থেকে কিছু শোনা গেল না। নরেনের মনে পড়ল, সমু একবার বলেছিল, মানুষ শুধু কুড়ি থেকে কুড়ি হাজার ডেসিবেলের মধ্যে শব্দ শুনতে পায়। তার কম বা বেশি হলে শুনতে পায় না। তাই হয়তো বা শুনতে পাচ্ছে না। যন্ত্রটি ঠিক বুঝে নিচ্ছে।
সমু আবার প্রশ্ন করল, “কতটা সময় লাগল আমাদের পৃথিবীতে আসতে?”
যন্ত্র বলে উঠল, “আমরা অনেক দ্রুত চলতে পারি। তোমাদের দৃষ্টির গতিবেগ থেকেও অনেক অনেক বেশি গতিবেগ আমাদের। মুহূর্তের মধ্যেই আমরা চলে আসতে পারি। আমরা তোমাদের গ্রহ সম্পর্কে সব তথ্য নিয়ে নিয়েছি। কিন্তু মানুষের সাথে যোগাযোগ করি না। এইখানে রোগ বেশি, হিংসা বেশি। ভয়ানক হিংস্র প্রাণী মানুষ।”
সমু এইবার জিজ্ঞেস করল, “তাহলে এইখানে কেন আসলে?”
“আমরা পৃথিবীর পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম। আমার সঙ্গী তোমাদের এই জায়গার ঠিক উল্টো দিকে, অর্থাৎ মেক্সিকোতে নামে। সেখানে কিছু মানুষ তাকে দেখে ফেলে। তার যানে যান্ত্রিক ত্রুটি হওয়ায় তাকে পৃথিবীতে নামতে হয়। আর আমি ভুল করে পৃথিবীর এই দিকে এসে পড়ি,” ভিনগ্রহবাসীটি শান্ত গলায় বলল।
নরেনের মনে হঠাৎ পত্রিকায় পড়া খবরটা ভেসে উঠল—মেক্সিকোতে নাকি ভিনগ্রহবাসী দেখা গেছে।
সূচিপত্র