akkharbarta

অক্ষরবার্তা - একটি কিশোর বার্তা উদ্যোগ... আমাদের মূল লক্ষ্য উচ্চ মানের বই পাঠকের হাতে পৌঁছে দেওয়া... যোগাযোগ করুন - akkharbarta@gmail.com | www.akkharbarta.in

গল্প ১ । বৈশাখ ১৪৩৩












চামটাবুড়োর বিরসা











শুভাশিস 

তলাপাত্র

আগরতলা, ত্রিপুরা


 

অযোধ্যা পাহাড়, অনেকের কাছে ভালো পাহাড়। ছোটনাগপুর মালভূমির পশ্চিম প্রান্ত। পশ্চিমবঙ্গের পুরুলিয়া জেলায়। ভালো পাহাড় কেন বলে? সেটা শুধু ভালো পাহাড়ে গেলেই বোঝা যাবে। যে পাহাড়ে গেলে কোনো খারাপ চিন্তা কখনো কাছে আসে না। ধুয়ে মুছে যায় দুষ্ট ভাবনা।

অযোধ্যা পাহাড়ের চূড়া এবড়ো খেবড়ো পাথরে মোড়া তবে একটা বড়ো অংশ বেশ মসৃণ সমভূমি খুব বেশি উচুঁ পাহাড় নয় সাতশো চব্বিশ মিটার সারি বেঁধে পরপর দাঁড়িয়ে আছে আরো দুই পাহাড় পাকদন্ডীর মতো শাল পিয়াল মহুল আর পলাশ বনের মধ্য দিয়ে চলেছে রাঙামাটির পথ অযোধ্যা পাহাড়ের শীর্ষে সেই শীর্ষে দাঁড়ালে জলভেজা শীতল বাতাস সব শ্রান্তি জুড়িয়ে দেয় যে দিকে তাকানো যায় -শুধু নীলাভ সবুজের দোর্দণ্ড সমারোহ চোখ সরানো যায় না প্রকৃতি যেন উজাড় করে দিয়েছে ভালো পাহাড়কে এই উদারতাই যেন অরূপরতন, সবার মধ্যে বাস করতে চায়

তিন পাহাড় অযোধ্যা পাহাড়ের পরেই, আরো উচুঁ এক পাহাড় - নাম তার চামটাবুড়ো মাঝখানে আছে এক বিশাল হ্রদ খায়রাবেড়া বাঁধ থেকেই সেই হ্রদের জন্ম বর্ষায় জলে ভাসতে থাকে কংসাবতী এবং সুবর্ণরেখা বয়ে যায় পুরুলিয়ার ওপর দিয়ে তবু পুরুলিয়া শুখাভূমি হ্রদের জল, নদীর জল বাঁচিয়ে রেখেছে এই বনাঞ্চলকে বনের পশুপাখিকে

সেবার চামটাবুড়োতে বসন্তের পুরো একটা দিন কাটিয়ে, পলাশবনের ছায়া ধরে নামছিলাম নিচে পা চালিয়ে তখনও খরখরে রোদ ছিল কিন্তু এই ঋতুতে হঠাৎ করে অন্ধকার ঝেঁপে আসে শীত যে পুরো যায়নি, এটা তার একটা বড়ো প্রমাণ তখন প্রকৃতি হয়ে ওঠে আরো বিচিত্র, আরো রহস্যপূর্ণ চামটাবুড়োকে লালমাটির পাহাড় বলে ডাকা হলেও, উপরের দিকে মাটি খুব কম, পাথরই বেশি তাই তৃণভোজী প্রাণীর দেখা মেলে না আছে হিংস্র শ্বাপদ চামটাবুড়োতে তাই দল বেঁধে চড়তে হয়, সূর্যের আলো ম্রিয়মান হবার আগেই নিচে ফিরতে হয় এই রহস্যপূর্ণ পাহাড় পথে তাই একজন স্থানীয় মানুষকে সঙ্গী করতে হয়, শুধু পথ দেখানোর জন্য নয়, এই পাহাড় ঘিরে কতো গল্প আছে, সেগুলো শোনার জন্য কোনো কিতাবে সেই সব গল্প মিলবে না আর যাদের পূর্বপুরুষরা সেই গল্পগুলো বলে আসছে শতকের পর শতক, তাদের মুখে সেই গল্প যেন প্রতিদিন জীবন্ত হয়ে ওঠে

সেবার আমাদের সঙ্গী ছিল ডম্বরু, একজন মুন্ডা পরে জেনেছিলাম সে বিষ-তির বানায়, বেচে শিকারী হিসেবেও বেশ নামডাক তার এখন মেলাতে পারছি চামটাবুড়োর চূড়ায় যেখান থেকে অনেকগুলো পথ নানা দিকে চলে গিয়েছে, সেখানে বেশ কয়েকটি আদিম গাছ ছিল সেখানে মৌচাকের মত ঝুলন্ত চাক দেখে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, এই জঙ্গলে মধুও পাওয়া যায়? ডম্বরু এক নিমেষে প্রায় আঁতকে উঠে বলেছিল - লেলে চাক খুব বিষ এদের পাঁচছটা লেলে কামড়ালে সে মানুষকে আর বাঁচানো যায় না সেই বিষ ওদের হুলের ঠিক পেছনে একটা খুব ছোট থলেতে জমানো থাকে ভয় পাবেন না এদের না খচালে, এরা কাউকে কামড়াতে আসে না

ডম্বরুর সঙ্গে নেমে এসেছিলাম নিচে, পারভিতে এই গ্রামেই পর্যটকরা জড়ো হয়, চামটাবুড়ো চড়তে পারভি অনেকটা বেস ক্যাম্পের মতো

সেখান থেকে কয়েক পা দূরে ডম্বরুদের কয়েক পরিবারের গ্রাম চামটাবুড়োর ঢালে এটা ওদের নয়া বসত খায়ড়াবেড়া বাঁধ বানানোয় ওদের বাপ-ঠাকুর্দার গাঁ ভেসে গিয়েছিল সাঁওতাল-ভীল মানুষরা যারা ওই গ্রামে থাকত, তারা ছন্নছাড়া হয়ে ভেসে যায় নানা দিকে একেবারে নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছে সেই গ্রাম হারিয়ে-যাওয়া সেই গ্রাম কিন্ত বেঁচে আছে তাদের কৌম-স্মৃতিতে তারই মধ্যে তারা তাদের পূর্বপুরুষদের খোঁজে বাঁধ বানানোর সেই একই গল্প ডম্বুর থেকে নর্মদা

একটু দূরে একটা বেচাকেনার জায়গা একেবারেই ছোটো পানীয় জলের বোতল, চিপসের গাদা গাদা প্যাকেট যেমন হয় এইসব জায়গায় ভীড় বাঁচিয়ে একটু দূরে একটা তেরো-চোদ্দ বছরের ছেলে বসে আছে পেছনে ঝুলছে একটা পটচিত্র আমি এগিয়ে গেলাম

বললাম- দেখাও তোমার বাকি পটগুলো এক একটা পট দেখছি আর বিষ্ময় এবং মুগ্ধতায় আমি স্থানু হয়ে যাচ্ছি

জিজ্ঞাসা করলাম, কে এঁকেছে?

বলল- আমি ছেলেটাকে আবার দেখলাম কোথাও সামান্য পেলবতা নেই পাথর-কাটা শরীর যেন কঠোর শ্রমের অভিঘাত সারা শরীরে

বললাম- এই পট কি দামে বেচবে? চার ফুট প্রস্থ, আট ফুট উচ্চতার পুরনো শাড়ির দুদিকে কাগজ সেঁটে বানানো পটে আঁকা কৌম- জীবনের চিত্র বললাম- রঙ কোথায় পেলে?

- বানিয়েছি চেমটাবুড়োর নানা গাছের ফুল, পাতা, ডালা আর বাকল থেকে পাথর থেকে মাটি থেকে বুড়ো পাহাড় আর ডুবে-যাওয়া না-দেখা গ্রাম কত রঙে আমার ভিতর জেগে ওঠে কত স্বপ্ন, কত আনন্দ, যা আমাদের জীবনে নেই, সব আসে আমি দেখি, আর আঁকি বেচা হলে ভালো লাগে হাতে টাকা এলে মাকে দিই এই মা, শুধু কষ্টই পায় আমাদের জীবনে সুখ কই? তবু স্বপ্ন দেখি সেই স্বপ্ন দিয়েই পট আঁকি

এত কথা আছে ছেলেটার ভিতরে! আমি বললাম- এই পটের দাম অনেক

না, না ছয়শো টাকা তুমি না হয় কিছু কম দিও

          আমি বললাম- কমই দেব এই পটের আসল দাম কি করে দেব? এই নাও- বলে তার হাতে তিন হাজার টাকা দিলাম সে অবাক হলো মুখে কিছু বলতে পারলো না নীরব হয়ে গেল এমন সময় ডম্বরু আমাকে খুঁজতে খুঁজতে সেখানে এল তার পাওনা গণ্ডা রয়ে গেছে বুঝলাম- সেই জন্যই সে খুঁজে বেড়াচ্ছে আমার হাতে পট দেখে ছেলেটিকে বললো-

কিরে বাপ ঠকাসনি তো? ছেলেটি কোনো উত্তর দিলো না

তোমার ছেলে?

- বিরসা


বিরসার সেই পটের অংশ...

বিরসার সেই পট এখন আমার বৈঠকখানায় সেই পটের আলোকচিত্র রইল, এই লেখার সঙ্গে এই পটের জন্য প্রতিদিন আমার সঙ্গে দেখা হয়ে যায় চেমটাবুড়োর বিরসার সঙ্গে তাদের কৌম-জীবনের সঙ্গে সেই জীবনে রয়েছে অরণ্য, বন্য জীবজন্তু, পাহাড় রয়েছে এক ছন্দ সেই জীবন থেকে আমরা চলে এসেছি অনেক দূরে মানুষে মানুষে সম্বন্ধগুলো হারিয়ে গেছে আর আমরা একেই বলছি আধুনিকতা এক অপরিচয়ের ঠুলি পরে কোথায় চলেছি? হঠাৎ -দেখা সেই বিরসা নামের ছেলেটি সেই পথ জুড়ে দাঁড়িয়ে আছে, নীরবে আর বিষণ্ণ চোখে তাকিয়ে থাকে আমাদের দিকে, আমার দিকে