এবার পুজোয় আমেরিকা থেকে একটি অপূর্ব কলম উপহার দিয়েছিল তিন্নিকে ছোটন মামা। কিন্তু কলমটা দিয়ে লিখতে গিয়ে সে আশ্চর্য - হলো, কেউ যেন কলমে ভর করে লিখে দিচ্ছে এবং অদ্ভুত গতিতে কলমটা এগিয়ে চলছে! তাকে - কোনো রকম কষ্টই করতে হয় না। তেমন একটা ভাবনাও ভাবতে হয় না। কলমের মধ্যেই যেন সব ভাবনা এসে ভিড় করে থাকে।
কলমটা হাতে নিয়ে কিছু লেখার কথা ভাবতেই কলম এগিয়ে চলেছে। আবার কলমটা দিয়ে ছবিও আঁকা যায়। আশ্চর্য কান্ড! মামা এসব কিছুই বলেননি। সবাই যেমন দেয় মামা তেমনভাবে দিয়েছে।
বলেছে,
“এটা বিদেশি কলম। তোমাকে দিলাম। সাবধানে রাখবি। দেখ হারিয়ে না যায় যেন।” সবশেষে বলেছে, “হারিয়ে গেলে তোমার কিন্তু ক্ষতি হবে।”
কী ক্ষতি হবে মামা আর ব্যাখ্যা করে জানাননি। তিন্নিও আর জানতে চায়নি তখন। সে দেখল, এটা দিয়ে
যে কোন প্রশ্নের উত্তরই সঠিকভাবে লেখা যায়। না জানলেও কে যেন কলমে ভর করে ঠিকটা লিখিয়ে নেয়। আজব কান্ড। বিশ্বাস হচ্ছে না কিছুতেই। চিৎকার করে সবাইকে বলতে ইচ্ছে করছিল তার। কিন্তু পরক্ষণেই মনে হল,
এখনই কাউকে কলমের কথাটা বলা ঠিক হবে না। কারণ স্কুলে গিয়ে উত্তরগুলো ঠিক হচ্ছে কিনা আরেকবার যাচাই করে নেয়া যেতে পারে। তিন্নি বরাবরই অংকে কাঁচা। ইংরেজি গ্রামারও তার মাথায় ঠিকমতো ঢুকে না। সেজন্য বাড়িতে যেমন কোণঠাসা হয়ে থাকে। স্কুলেও ভালো
বন্ধুদের সঙ্গে তার মনের কথা বলতে পারেনা। সব সময় একটা কুণ্ঠাবোধ কাজ করে। এবার তাদের জব্দ করা যাবে। তার কী যে আনন্দ হচ্ছে! অথচ আনন্দের ভাগটা কারও সঙ্গে শেয়ার করতে পারছে না। এ যেন রবীন্দ্রনাথের সেই বিখ্যাত উক্তি “কে লইবে আনন্দ মোর--”
পরদিন সোমবার। অন্যদিনের তুলনায় তাড়াতাড়ি স্নান-খাওয়া সেরে স্কুলে রওনা হয়ে গেল তিন্নি। বাড়ি থেকে বেশি দূর নয় তাদের স্কুল। ক্লাসে বই খাতা রেখে প্রেয়ারে চলে গেল সে। আজ পড়াশোনায় ভালো বন্ধুদের সঙ্গে সাহস করে দাঁড়িয়ে গেল। অন্যরা কেউ কেউ ফিসফিস করছে। করুক গে। তার ভেতর একটা অজানা সাহস এবং আত্মবিশ্বাস গড়ে উঠেছে। মামার দেওয়া কলমটাই তার আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে তুলেছে। মনে মনে তাকে ধন্যবাদ জানালো। এর মধ্যেই কলমটার নাম দিয়েছে সে ‘প্রিয়বন্ধু’। অবশ্য সে ছাড়া প্রিয়বন্ধুর কথা আর কেউ জানে না। মামাও কি জানে এসব? সকালে মাকে বলবে ভেবেও বলেনি।
প্রথম ক্লাসটি ইংরেজির। হোমওয়ার্ক
ঠিকঠাক ভাবে হয়েছে দেখে স্যার তাকে বাহবা দিলেন। আর বাকি আছে অংকের ক্লাস। অংকের ক্লাসেও আশাতীত সাফল্য পেয়েছে। তিন্নি ধন্যবাদ জানাল প্রিয়বন্ধুকে।
পরদিন খুব ভোরে ঘুম ভেঙে যায়। অবশ্য স্বপ্নে প্রিয় বন্ধু দেখা দিয়েছে! সে বলছে, “তুমি আমাকে পেয়ে খুব খুশি হয়েছো দেখে এবং তোমার পড়াশোনা এগিয়ে যাচ্ছে দেখে আমারও খুব আনন্দ হচ্ছে। কিন্তু তাই বলে তুমি যদি পড়াশোনা বন্ধ করে আমার উপর ভরসা করে থাকো তাহলে কিন্তু আমি হারিয়ে যাব। আরেকটি কথা, আমার কথা অর্থাৎ কলমের কথাটা কাউকে বলবেনা। মাকেও না। মামাকে জানাতে পারো, তবে এখন নয়। বন্ধুদের তো নয়-ই। বললে কিন্তু ফল ভালো হবে না। এটা মনে রাখবে। তোমার মামা ব্যাপারটা জানেন। তোমাকে বলেননি। তোমার কাছ থেকে কী উত্তর আসে, কী ফল আসে তার জন্য মামা অপেক্ষা করছিলেন। এবার তুমি মামাকে বললেই বুঝতে পারবে। আমি তোমার কাছে এসেছি তোমার সাফল্য এবং আত্মবিশ্বাসকে গড়ে তোলার জন্য। তুমি যদি পড়াশোনা না করো, তাহলে কিন্তু আমি তোমার কাছে থাকতে পারবো না!” বলে প্রিয়বন্ধু চলে গেল। সেই সঙ্গে তার ঘুমও ভেঙে গেল।
এদিকে পড়াশোনা ভালো হচ্ছে দেখে স্কুলে তার বন্ধুর সংখ্যা বেড়ে গেছে। এখন সবাই তার সঙ্গে মেশে। তার সঙ্গে বসতে চায়। টিফিন ভাগ করে খায়। তার বেশ মজা লাগছিল। বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলতে বলতে ব্যাগে হাত ঢোকায়। প্রিয় বন্ধুকে একবার ছুঁয়ে নেয়, দেখে নেয় ঠিকঠাক আছে কিনা। জানার ইচ্ছে করছিল তার, বন্ধুর কালি যখন শেষ হয়ে যাবে তখন কী হবে?
কিন্তু পড়াশোনা করতে কার ভালো লাগে! পড়াশোনা না করেই যদি সাফল্য পাওয়া যায় সেটাই বেশ ভালো। আস্তে আস্তে সরে আসছিল পড়াশোনা থেকে তিন্নি। কিছুদিন পর ভুলে গেল প্রিয়বন্ধুর পরামর্শের কথা। একদিন একটা অঙ্ক মেলাতে গিয়ে ব্যাগে হাত দিয়ে দেখে বন্ধু নেই! হারিয়ে গেছে। তার খুব কান্না পাচ্ছিল। “এ আমি কী করলাম?” সঙ্গে সঙ্গে বই খাতা খুলে আবার পড়তে শুরু করল সে। বন্ধুর পরামর্শ মতো পড়াশোনায় মন দিল তিন্নি। প্রিয়বন্ধু নিশ্চয়ই অন্য কারোর কাছে গেছে যে তার মতোই ছিল আগে। তাকেও তার আত্মবিশ্বাস গড়ে দেবার জন্য তার কাছে পৌঁছে গেছে সে। সে কি মামাকে কলমের কথাটা জানাবে? সত্যি সত্যি মামা এসব জানেন কিনা। তাছাড়া মামার দেওয়া এমন মূল্যবান উপহারটা হারিয়ে গেছে এই কথাটাই বা বলবে কী করে! মামা কিছুতেই ভালো মনে নেবেন না।
পরদিন স্কুলে গিয়ে অবাক হয়ে যায় তিন্নি। নন্দিতা যে কলমটা দিয়ে লিখছে এটা তো তার সেই কলমটাই। লালের মধ্যে সোনালী রং করা। একদিকে আংটার মতো ক্লিপ রয়েছে। তা ঘোরালে
হাতের পাঁচটা আঙ্গুল যেন। তখন তা দিয়ে পিঠ চুলকানো যায় । তার একটা বোতাম টিপ দিলে কালি আসে এবং তখন এই আঙ্গুলগুলো ড্রইং এর কাজ করে। অর্থাৎ ড্রয়িংও করা যায়। আর সেই বহু উদ্যেশ্যসাধক কলমটাই
নন্দিতা চুরি করল! নিশ্চয়ই নন্দিতা তিন্নির ব্যাগ থেকে কলমটা চুরি করেছে। সে চিৎকার করে বলে উঠলো, নন্দিতা আমার কলমটা দে। ক্লাসে সবাই অবাক হয়ে গেল। আর তখনই ঘুমটা ভেঙে গেল। কলম হারিয়ে গেছে বলে মিথ্যে একটা স্বপ্ন দেখলো। সে ঠিক করেছে, এবার মামাকে জানানো দরকার পুরো বিষয়টা। মামাই তার সমাধান দিতে পারবেন। ভাবতে ভাবতে একদিন মামাকে বিষয়টা জানিয়েই দিল। কথা হচ্ছিল মার সঙ্গে। এক সময় মা বললেন, তিন্নি তোর সঙ্গে কথা বলবে। মার কাছ থেকে মোবাইলটা কানে দিয়ে মামাকে বলল, “মামা, তোমার দেওয়া কলমটা হারিয়ে গেছে।” বলে কেঁদে দিল তিন্নি। “খুব লক্ষ্মী ছিল গো। আমি যা ভাবি তার সবটাই ভাবতে না ভাবতে লিখে দেয় কলমটা। জটিল অংক করে দেয়। ইংরেজি গ্রামার সংশোধন করে দেয় কলমটা। কলমটা পাওয়ার পর আমার পড়াশোনা অনেক এগিয়ে গেছে। তুমি মার কাছ থেকে জেনে নেবে এবারে আমার রেজাল্ট খুব ভালো হয়েছে। পরীক্ষায় আমি এবার থার্ড হয়েছি। রেজাল্ট
আরও ভালো করার জন্য পড়াশোনা করব। তোমার উপহার দেওয়া কলমটা হারিয়ে গেছে বলে তুমি খারাপ পেয়ো না।”
সব শুনে মামা বললেন, “ধুর পাগলী, কলম আবার এসব করে দেয় নাকি! তোমাকে তখন সেসব বলেছি মনোযোগ দিয়ে লেখাপড়া করার জন্য। তুমি তো তা-ই করেছ এবং রেজাল্ট ভালো হয়েছে। আরও ভালো করতে হবে তোমাকে। কলমের কথাটা এখন মন থেকে বিদায় করে নাও। আর রীতিমতো পড়াশোনায় মন দাও। দেখবে রেজাল্ট আরো ভালো হবে। এবার নির্ঘাত তুমি প্রথম হবে। তখন আমি আরেকটা এমন উপহার দেব দেখবে জীবনে আর পেছন ফিরে তাকাতে হবে না। তর তর করে সামনে এগিয়ে যাবে।” মামার কথা শুনে আনন্দে তার মনটা ভরে উঠলো। নিমেষে চোখের জল শুকিয়ে গেল। এরকম আরেকটি ভালো উপহার প্রাপ্তির আশায় সে সঙ্গে সঙ্গে বই খাতা খুলে পড়তে আরম্ভ করল।