গল্প ৫ । ফাল্গুন ১৪৩২




বুদ্ধির বল, বড় বল











সৈয়দ রেজাউল

করিম

কলকাতা, পশ্চিমবঙ্গ


 

যতীনদাদু নাতি-নাতনিদের উদ্দেশ্য করে বললেন আজ তোমাদের লোককথার যে গল্পটা শোনাব, সেটি পাকিস্তানের সাহিত্যিক মোহাম্মদ হানিফ কোরেশীর সংগৃহীত এবং লিখিত।

তবে আমাদের দেশেও বহুল প্রচলিত এই লোককথার গল্পটি। তবে একটু ভিন্নরঙে, ভিন্ন ঢঙে। আসলে লোককথার এইসব গল্প দেশ ও কালের গন্ডি মানে না কোথাও। দিকবিদিকে সে গল্প ছড়িয়ে পড়ে অনায়াসে। 

গল্পটা একটা সিংহ ও একটা ছাগলের। মাঝপথে জড়িয়ে পড়েছে একটা অতি বুদ্ধিমান শেয়াল

দাদুর এই গল্প বলার মাঝে হঠাৎই ঢুকে পড়ল রাজু। আদিখ্যেতা করে সে বলে বসলো--দাদু! ওসব ভূমিকা টুমিকা ছাড়ো। শুরু করো আসল গল্প। আমার তাড়া আছে। 

রাজুর এই বাচালতা সহ্য হলো না অন্য নাতি ও নাতনিদের। তারা গরম হয়ে উঠল সঙ্গে সঙ্গে। কোন রকমে তাদের শান্ত করে যতীনদাদু শুরু করলেন গল্প বলতে

তোমরা তো জানো পাকিস্তানের পাহাড়ি বনাঞ্চলগুলি মূলত হিমালয়, কারাকোরাম ও হিন্দুকুশ পর্বতমালার অংশ জুড়ে বিস্তৃত। আর তার অদূরে আশেপাশে গড়ে উঠেছে বহু জনবসতি

  সেই জনবসতির অধিকাংশ লোকজন দারিদ্র সীমার নিচে। তাই তারা বনের কাঠ কেটে, পশুপালন, চাষাবাদ করে তাদের জীবিকা নির্বাহ করত। তাদের গৃহপালিত পশুপাখিদের মধ্যে হাঁস মুরগি গাধা ঘোড়া গরু ছাগল ইত্যাদি ছিল।তাদের খাবার-দাবারের জন্য তখন খুব একটা চিন্তাভাবনা করতে হতো না  পালন কর্তাকে। খোঁয়াড় থেকে ছেড়ে দিলেই তারা যে যার মতো চরে বেরিয়ে নিজেদের আহার জুটিয়ে নিত

একদিন সেই আহারের খোঁজে একদল ছাগল ঢুকে পড়ল পাহাড়ঘেরা বনে। কচি কচি লকলকে ঘাসখেতে খেতে এক ছাগল বুড়ি হঠাৎ দলছুট হয়ে পড়ল। সেই কারনে চিৎকার করে ডাকাডাকি করল। কিন্তু কারও কোন সাড়া পেল না সে। বাড়ি ফেরার পথটাও হারিয়ে ফেলল। সেইক্ষণে দিনের সূর্য ডুবে গেল পশ্চিমাকাশে। ধীরে ধীরে নেমে এলো গাঢ় কালো অন্ধকার। শেষে দিশা ঠিক করতে না পেরে বুড়ি ছাগলটা হাজির হলো একেবারে পাহাড়ের ধারে। তখন তার মনে হল এই রাতের অন্ধকারে পথখুঁজে আর বাড়ি ফেরা সম্ভবপর নয়। এখন রাতটা কাটানোর জন্য তার একটা আশ্রয় দরকার। না হলে বনের হিংস্রজন্তুরা তাকে ছিঁড়েখেয়ে ফেলবে। অকালে তার প্রাণটা চলে যাবে

একথা চিন্তা করে সে আঁধারের মাঝে খোঁজাখুঁজি শুরু করল। এদিক ওদিক বেশ খানিকটা খোঁজাখুঁজি করার পর সে একটা গুহা দেখতে পেল। ছাগল বুড়ি ভাবলো এই গুহাতে সে নিশ্চিন্ত মনে রাতটা কাটিয়ে দিতে পারবে। এই কথা ভেবে সে ঢুকে পড়ল গুহার মধ্যে। আর ঠিক তখনই তার নাকে এসে ঠেকল এক বিদঘুটে ভোটকা গন্ধ। গন্ধ শুঁখেই সে অনুমান করতে পারল সে ভুলক্রমে সিংহের গুহায় এসে ঢুকেছে

গুহার ভেতরটা তখন আলো-আঁধারিতে পরিপূর্ণ ছিল। ছাগল বুড়ির আগমনে তন্দ্রাচ্ছন্ন সিংহের নিদ গেল চটকে। চোখ খুলে সে তাকিয়ে দেখে তার অদূরে দাঁড়িয়ে আছে এক অদ্ভুত ধরনের জীব। ছোঁচালো তার মুখ, মাথার দুপাশে ঝুলে পড়া লম্বা দুটো কান, টানা টানা বড় বড় চোখ। সারা শরীরটা ঢাকা কালো কম্বলে।আর মাথার দুপাশে দুটো বড় বড় শলাকা। তা দেখে হতবাক হয়ে গেল সিংহ। এভাবে হুট করে কোন পশুপাখি তো মরার জন্য তার ডেরায় ঢোকে না। তা হলে এই অদ্ভুত জন্তুটা আবার কোথা থেকে এলো? কি তার পরিচয়? এসব কথা জানতে সভয়ে  সিংহ জিজ্ঞেস করল--তুমি কে ভাই? আর কেনই বা তুমি এখানে এসেছ?

ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যে পড়েও মাথা ঠান্ডা রেখে প্রাণে বাঁচতে ছাগল বুড়ি বলল--আমি হলাম এই বড় মহারণ্যের ছাগ বাহিনীর মহারানী। পেটের ব্যামোতে আমি ভুগছিলাম বহুবছর ধরে। এক কবিরাজমশাই নিদান দিয়েছেন গুণে গুনে ৫০ টা চিতা, ২৫ টা হাতি, আর ১৫ টা সিংহ খেতে হবে। তাহলে আমার পেটের ব্যামো নির্মুল হবে। তার নিদান মতো চলেছি। এখন মোটামুটি সুস্থ আছি। আর খান দুই সিংহ খেলে কোটা পূরণ হবে। তাহলে আমি সম্পূর্ণরূপে সুস্থ হব। পেটের সবরকম জ্বালা-যন্ত্রনার হাত থেকে মুক্তি পাব। অনেক খোঁজাখুঁজি করে তোমার সন্ধান পেয়েছি। তাই রাতের অন্ধকারে তোমার দরবারে এসেছি। এখন...!

ছাগল বুড়ির কথা শুনে ভয়ে আতঙ্কে বুকটা কেঁপে উঠল সিংহের। মৃত্যু যে তার আসন্ন একথা ভেবে সে মনে মনে একটা বুদ্ধি খাটালো। অত্যন্ত বিনম্র চিত্তে সে ছাগল বুড়ির কাছে নিবেদন করল--হে মাতা! মৃত্যুর পূর্বে আপনার কাছে আমার একটাই পার্থনা।আমাকে ক্ষণকালের জন্য পরিশুদ্ধ হয়ে আসার সময় দেওয়া হোক। যাতে আমি পবিত্র শরীরে স্বর্গে গমন করতে পারি তার জন্য আমাকে একটু স্নানের সুযোগ দেওয়া হোক। 

এরকম একটা পরিস্থিতি তৈরি হোক এটা কায়ামনো বাক্যে ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করছিল ছাগলবুড়ি। তার সেই প্রার্থনা মঞ্জুর করেছেন ঈশ্বর। তবুও নিজের গম্ভীরতা বজায় রেখে ছাগল বুড়ি বলল--যেতে চাইছ যাও, কিন্তু বেশি বিলম্ব করো না। আমার আবার বহু কাজ পড়ে আছে

সে কথা শুনে সিংহ কি আর দাঁড়ায়? সঙ্গে সঙ্গে সে পড়ি-মরি করে দিল ভোঁ দৌড়। দৌড়তে দৌড়াতে সে একটা গাছে গিয়ে ধাক্কা মারল। সেই বৃক্ষের তলায় শিকারের আশায় ওৎ পেতে অপেক্ষা করছিল একটা শেয়াল। সিংহকে গাছে টক্কর খেতে দেখে সে এগিয়ে গিয়ে সমবেদনা জানিয়ে সে বলল--মহারাজ! আপনি ঠিক আছেন তো? এই ভর সন্ধ্যাবেলা এভাবে পাগলা হাতির মতো দৌড়াচ্ছেন কেন?

        সিংহ মশাই হাঁপাতে হাঁপাতে বলল--আর বলো কেন? এই ভর সন্ধ্যাবেলায় আমার গুহায় এক আজব প্রাণী এসে ঢুকেছে। দেখতে কতকটা ছাগলের মতো হলেও আসলে একটা হিংস্র জন্তু। সে ইতিমধ্যে অনেক চিতাহাতি খেয়ে আমাকে খেতে এসেছে। তাকে কোন রকমে ভাঁওতা দিয়ে আমি পালিয়ে এসেছি

বুদ্ধিমান শেয়াল মনে মনে ভাবল সিংহ মশাইয়ের জ্ঞানের পরিধি বনাঞ্চলের মধ্যে সীমাবদ্ধ। অথচ এই জগৎ সংসারের সব অঞ্চল তার ঘোরা। ছাগলের মত হিংস্রপ্রাণী এজগৎ সংসারে থাকলে তার চোখে পড়ত না? নিশ্চয়ই ছাগলবুড়ি তাকে ভাঁওতা দিয়েছে। মনের মধ্যে গজিয়ে ওঠা সেকথাগোপন রেখে সিংহমশাইকে শেয়াল বলল--মহারাজ! আমার তো মনে সন্দেহ হচ্ছে সেইসঙ্গে কৌতুহল হচ্ছে সেই অদ্ভুত প্রাণীটাকে অন্তত একবার দেখে আসতে। কে জানে, সেই প্রণীটা আজ আমাদের নৈশ ভোজের আহার হবে কিনা?

সিংহটা গুহা ছেড়ে বের হয়ে যাবার পরও নিশ্চিন্ত মনে ছাগল বুড়ি নিদ্রা যেতে পারছিল না। মনে তার আশঙ্কা ছিল, সিংহটা যে কোন অবস্থায় ফিরে আসতে পারে তার গুহায়। আর সে ফিরে এলে তার হাড়-মাস সব চিবিয়ে খাবে। তাই প্রাণে বাঁচার জন্য সে গুহার বাইরে এসে দাঁড়াল। আর ঠিক সেইসময় সে দেখতে পেল সিংহটা গুহার দিকে ফিরছে। সঙ্গে আছে একটা কেঁদো শেয়াল। তাদের দুজনকে একসঙ্গে আসতে দেখে ছাগল বুড়ি তো খুব ভয় পেল। কিন্তু বুকের বল হারালো না। সে অত্যন্ত ব্যাঙ্গের সুরে ধিক্কার জানিয়ে শেয়ালকে বললতোকে আমি প্রাণী জগতের সবচেয়ে বুদ্ধিমান বলে ভাবতাম, কিন্তু তুই যে এতটা অপদার্থ তা আমার জানা ছিল না! তোকে অনেক করে বলে দিলাম দুটো সিংহ নিয়ে আসতে। তুই নিয়ে এলি মাত্র একটা সিংহ! দাঁড়া তোর মজা দেখাচ্ছি আমি

এ কথা শুনে সিংহ ভাবলো শেয়াল নিশ্চয়ই তার সঙ্গে প্রতারণা করেছে। তাই বিন্দুমাত্র দেরি না করে সে ঝাঁপিয়ে পড়লো শেয়ালের উপর‌। তারপর ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে ফেলল তার সারাশরীর। তারপর লেজ গুটিয়ে দে দৌড়। আর একবারও সে তাকিয়ে দেখল না পিছনের দিকে

দাদুর গল্প বলা শেষ হলেও তখনও গাল হা করে বসেছিল নাতি-নাতনিরা। তারপর একসময়  শুভঙ্কর দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে দাদুকে বলল--দাদু!এ গল্পের তাৎপর্য কি তা তো বললে না?

যতীন দাদু বললেন--তাৎপর্যটা বুঝতে পারলে না শুভঙ্কর! বুদ্ধি, সাহস আর চাতুর্যের বলে ছাগলের মত সামান্য একটা তৃণভোজী প্রাণী সিংহের মতো অতি ভয়ংকর পরাক্রমশালী জানোয়ারকে পিছু হটতে বাধ্য করছে। অপরদিকে অতি চালাকের যে পরিণতি হয় শেয়ালের প্রাণ হারানোর মধ্যে তা ফুটে উঠেছে এই লোককথায়

(পাকিস্থানি লোককথা অবলম্বনে)