গল্প ৪ । মাঘ ১৪৩২



সূর্যালোকে পাখিদের স্নান












আভা

সরকার মণ্ডল

রায়গঞ্জ, পশ্চিমবঙ্গ



 <<

সূ চি প ত্র

 

পুজোর ছুটিতে পূর্ব পরিকল্পনা মতো ছেলে রূপমকে নিয়ে বোনের নতুন ফ্ল্যাটে বেড়াতে এসেছে তমা। অনেক দিন ধরেই আসি আসি করেও আসাই হচ্ছিল না। বোনের দুই ছেলে প্রীতম আর রিতমের সঙ্গে রূপমের খুব জমে।

তারা একসঙ্গে থাকলে পুজোর দিনগুলো অসম্ভব আনন্দে কাটে। এবার পুজো ভালোই কাটবে মনে হচ্ছে।

বৈষ্ণবঘাটার এই টাউনশিপটা তমার একেবারে মনের মতো। প্রায় প্রত্যেকটা বাড়ির সামনেই চওড়া রাস্তা এবং একটা করে গাছ। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সে গাছটা বেদি করে বাঁধানো। প্রচুর পাখির কিচিরমিচির। পাশেই বিরাট একটা ঝিল। সকালবেলা অনেক মানুষ হাঁটতে আসে ঝিলের পাড়ে। ঝিলের একপাড় পড়েছে ফ্ল্যাটের দিকে, অন্য পাড় হাইরোডের দিকে। সমান্তরালে হাইরোড এবং ঝিলের মাঝখান বরাবর জায়গাটুকু জুড়ে প্রচুর দোকানপাট এবং বসার জন্য বেঞ্চ পাতা। ছোট্ট মন্দির এবং কিছু মূর্তি সহ এই ঝিলপাড় সন্ধ্যা না হতেই আলোয় ঝলমল করে ওঠে। এর আকর্ষণে ছুটে আসেন প্রচুর মানুষ।

ঝিলের অন্য পাড়ে বাঁধানো ঘাটগুলোতে বসেও আড্ডা দিতে দেখা যায় বহু মানুষকে।

ঝিলের দুই পাড়েই খাবারের দোকানগুলোতে রোল, চাউমিন, শিক কাবাব, ফিশ ফ্রাই, ঝালমুড়ি, ফুচকা ইত্যাদি দেদার বিক্রি হয়। এপার থেকে ওপারে যাওয়ার জন্য ঝিলের মাঝ বরাবর আড়াআড়ি একটি সাঁকো আছে। সন্ধ্যেবেলা সবাইকে নিয়ে তমা ঘুরে এসেছে সেখান থেকে। পাটুলীর এই ঝিলপাড় রূপমের ভীষণ পছন্দ হয়েছে। তার ইচ্ছা সে বারেবারে আসবে এখানে।

এ বাড়ির সবাই সকালে দেরি করে ঘুম থেকে উঠে—রূপমও। তমার বরাবরই ঘুম ভাঙে সূর্য ওঠার আগে।

পঞ্চমীর রাতে সবাই ঠাকুর দেখতে বেরিয়েছে। রাতে ঘুরে ঘুরে ঠাকুর দেখা তমার একদম পছন্দ নয়।

তাছাড়া কোনো নতুন জায়গায় গেলে সকাল-বিকাল সেই জায়গাটাকে নানান অ্যাঙ্গেলে নিরীক্ষণ করা তাঁর স্বভাব। গাছপালায় ঘেরা এই ফ্ল্যাটের নামটাও তমার ভীষণ পছন্দ—‘তপোবন’। যে নাম উচ্চারণেই মনটা কেমন শান্ত হয়ে আসে—হইহুল্লোড় থেকে দূরে কিছু সময় একা কাটাতে ইচ্ছে করে। সব কারণগুলো একত্র করেই, সে ঘর পাহারায় থাকবে বলে আগেভাগেই জানিয়ে দিয়েছে।

যত রাতেই ঘুমাক, ভোর না হতেই তাঁর ঘুম ভেঙে যায় রোজ। ষষ্ঠীর ভোরে পাঁচতলার ছাদে গিয়ে হাঁটাহাঁটি করছে সে। তখনই কোলাহল করতে করতে সবাইকে ঠাকুর দেখা শেষ করে ফিরতে দেখল তমা, ছাদ থেকেই। রূপমকে ফোন করে সবাইকে নিয়ে ছাদে আসতে বলল—

ভোরের যাদু দেখতে।

রূপম ছাদে এসেই মাকে বলল...

এত সকালে কেন ওঠো মা? ঘুমোতে পারো না? আর আমরা সারারাত জেগে ঠাকুর দেখে এলাম, আমাদেরও একটু না হয় ঘুমাতে দাও!

রিতম, প্রীতম রূপমের কথায় সায় দিয়ে বলে উঠল—

ঠিক মাসীমণি, তুমি যেন কেমন! এত সকালে কেউ ঘুম থেকে ওঠে?

তমা ইশারায় আকাশের দিকে দেখাল। সেদিকে তাকিয়ে সবাই বিস্ময়ে থ! এমন অবাক করা দৃশ্য তারা কখনও দেখেনি। আকাশটা আবির রঙে ছেয়ে গেছে। সোনার থালার মতো একটা সূর্য উঠি উঠি করছে। তপোবনের সামনেই রাস্তার উপর থাকা বিশাল পাকুড় গাছ থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি দলবেঁধে উড়ছে আবার ফিরে গিয়ে গাছে বসছে। এত পাখি একসঙ্গে তারা কখনোই দেখেনি। তাদের চোখের সামনে থেকে মাত্র কয়েক হাত দূরে রঙিন পাখির ভাসমান মেলা। চারদিকে তাদের কিচিরমিচির ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই।

তাদের চোখে মুগ্ধতা! অস্ফুটে সবাই একসঙ্গেই প্রায় বলে উঠল...

ওয়াও!

কতক্ষণ যে ওরা নির্বাক হয়ে এই দৃশ্য দেখছিল তার হিসেব কেউ রাখেনি।

আস্তে আস্তে সূর্যটা স্পষ্ট হয়ে তাপ বিলাতে শুরু করতেই পাখির দল উড়াউড়ি ছেড়ে একে একে গাছের শাখায় আশ্রয় নিতে শুরু করল।

এতক্ষণে বাচ্চাদের হুঁশ ফিরল। তাড়াতাড়ি ক্যামেরা বের করে ছবি নেওয়ার আগেই পাখির সংখ্যা কমে গেল অনেকটা।

রূপমের মুখে আফসোস—

ইস্, এত পাখি একসঙ্গে ছিল—ছবি তোলা হলো না।

তমা বলল,

তাতে কী হয়েছে? রোজ সকালেই এই দৃশ্য দেখতে পাওয়া যায়। ইচ্ছে থাকলে রোজ এই দৃশ্য দেখতে পারো, ছবিও তুলতে পারো। শুধু সকালে নয়, সন্ধ্যায় সূর্য ডোবার আগেও দলে দলে পাখি ঘরে ফেরার আগে সূর্যালোকে স্নান সারে।

রিতম, প্রীতমও অবাক হলো, বলল—

তাই? রোজ সকালে এত পাখি উড়াউড়ি করে? আমাদেরই এত কাছে? আর আমরাই জানতে পারিনি... আশ্চর্য! কাল ভোরবেলা উঠেই ছাদে আসব আগে।

তমা বলল—

সকাল দশটা অবধি যারা ঘুমায় তারা ভোরবেলার এমন আরও অনেক সুন্দর দৃশ্যই মিস করে যায়!

রূপম বলল,

কাল থেকে সেও খুব ভোরে উঠবে। সূর্যালোকে পাখিদের স্নান দেখতে ভীষণ ভালো লেগেছে তার। এই ভালোলাগার অনুভূতি সে রোজ অনুভব করতে চায়!