দাদুর গলায় ক্ষোভ, "বাড়ির অন্য
সবার মতো তুইও ভাবিস আমার কাজ নেই। এটাই হয়েছে মুশকিল।"
বিল্টু নাছোড়বান্দা, "তুমি যে
কাজগুলো করো সেগুলো আধ ঘণ্টা পরে হলেও ক্ষতি নেই।"
"সব সময় কী আর গল্প মাথায় আসে! ভুলেই গেছি অনেক কথা।"
বিল্টু বলল, "তুমি নাকি
ফুটবল, ক্রিকেট, হাডুডুডু খেলতে? আলমারিতে পুরোনো কয়েকটা কাপও দেখেছি।"
ক্রিকেট বেশি খেলিনি তবে ফুটবলটাতে সুনাম ছিল। আমার
বুদ্ধিতে একবার ম্যাচও
জিতেছিলাম। আমি তো গোলকিপার ছিলাম। ভালো লাগত না সারাক্ষণ
দাঁড়িয়ে দুটো পোস্টের মাঝে। সবাই যারা মাঠে ছোটাছুটি করে খেলত তাদেরকে নিয়েই
মাতামাতি করত। শেষে ছেড়েই দিলাম বিরক্ত হয়ে।"
"ওই গোলকিপিং এর গল্পটাই বলো যেটা তোমার বুদ্ধিতেই ম্যাচ
জিতেছিলে।"
গড়িমসি করে দাদু শুরু করার আগে বলল, দেখ ঠাম্মা কোথায় আছে। ওর কানে গেলেই---"
পেছন থেকে ঠাম্মা বলল, "এই যে এখানেই, ছোট ছেলে পেয়ে যা খুশি বলো আর বোঝাও। ওরা তো জানে না
তোমাকে, কিন্তু আমি জানি- লাখে একটি সত্যি কথা বলো না তুমি।"
ঠাম্মা চলে যেতেই বিল্টু বলল, "ছাড়ো তো
ঠাম্মার কথা।"
দাদুও বলল, "হ্যাঁ হ্যাঁ, পরে হয়ত ভুলে যেতেও পারি। তখন কলেজে পড়ি বুঝলি। দুর্গা
পুজোর সময় গিয়েছিলাম গ্রামের বাড়ি। সেখানে আবার ফুটবল খেলার খুব ধুম।
আশেপাশের গ্রামগুলোর মধ্যে ম্যাচ হয় যার ফাইনালটা হয় পঞ্চমীর দিন। যে দল জিতবে, পাবে ঝকঝকে রুপোর কাপ আর প্রত্যেক খেলোয়াড় পঞ্চাশ টাকা করে
নগদ। সবই জমিদারবাবু দিতেন। এবার ফাইনাল ম্যাচটা হবে আমাদের গ্রামের সঙ্গে দূরের একটা গ্রামের। তবে আমাদের গ্রামের দলটা
দেখলাম কেমন যেন মুষড়ে পড়েছে।
খুড়তুতো ভাই প্যালা, ওর আসল নাম প্রলয় বলল- অন্য গ্রামের দলটা নাকি খুব মারকুটে। মেরেমেরেই
ফাইনালে উঠে গেছে। তারা কি আর ফাইনালে মারতে ছাড়বে? বরং বেশি মারবে।
মেরে হয়ত হাত, পা ভেঙেই দেবে। তাই জেতার কোনো চান্স নেই রে আমাদের।"
বললাম, "খেলার আগেই তো হেরে বসে
আছিস তোরা, তাহলে ওয়াক ওভার দিয়ে দে।"
"খেলতেই হবে রে, গ্রামের প্রেস্টিজ। হারব আবার মারও খাব ভাবতে কি ভালো লাগে? তাছাড়া নগদ পঞ্চাশ টাকাটাও---"
বললাম, "তুই মার খাবি কেন? তুই তো গোলকিপার!"
প্যালা'র গলায় হতাশা, "ওদের সব খোলোয়াড়গুলোই ইয়া ধুমসো ধুমসো চেহারা আর তেমনি মোষের মতো গাঁকগাঁক করে ছোটে।"
বললাম, "তাহলে আমাকে দলে নিয়ে নে, তারপর দেখছি কী করা যায়।"
আমার কথায় তেমন ভরসা পেল না ও, "তাহলে কে বসবে?"
হেসে ফেললাম, "কেন তুই বসবি।"
হতাশায় ভেঙে পড়ল ও, "আমি যে
গোলকিপার। এ কাজটা তো সবাই পারে না। তুই কি পারবি? আর দল আমাকে
ছাড়বেই বা কেন? তুই কেমন খেলিস কেউ জানেই না।"
আমিই বুদ্ধিটা দিলাম শেষে, "খেলা শুরুর ঠিক
আগের মুহূর্তেই পেট ব্যথা বলে গোলপোস্টের পাশেই শুয়ে পড়বি। আর এটাও বলবি আমি খুব
ভালো গোলকিপার, ঠিক আছে।"
প্যালা কিন্তু কিন্তু করেও শেষ পর্যন্ত রাজি হয়ে গিয়েছিল।
তবে জেতাতে পারলে পঞ্চাশ টাকাটা ওকে দিয়ে দেব আন্দাজেই কথা দিয়েছিলাম।
খেলা শুরুর আগেও প্যালা দোটানায় ছিল। খেলা শুরুর আগের মুহূর্তে "খুব পেট ব্যথা করছে" বলে গোলপোস্টের পাশে প্যালা শুয়ে পড়তেই ভীড় হয়ে গেল। আমিই
প্যালার গোলকিপারের গেঞ্জিটা পরে তৈরি হলাম। কেউ আপত্তি করল না কারণ প্যালা পেটে
হাত চেপে ধরে সবাইকে বোঝাল,
"আমার ভাই; কলকাতায় থাকে, ভালো গোলকিপিং করে।" গ্রামের লোক কেউ কিছু বলল না। আর দলে আর
কোনো গোলকিপারও ছিল না। তাছাড়া জেতার আশা তো ছিল না- তাই সবাই চুপ করেই ছিল।
প্যালা গোল পোস্টের পেছনে হতাশ হয়ে বসেছিল পেটে হাত দিয়ে।
ওর চোখে চোখ পড়তে বলেছিল,
"এবার সত্যিই পেট ব্যথা করছে রে, বিশ্বাস কর।"
"করুক" বলে মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছিলাম। খেলা শুরুর বাঁশি
বেজে গেল। খানিকটা খেলা হতেই বুঝলাম- এই দলকে হারাতে পারত না প্যালার দল। ওদের
খেলোয়াড়রা বুনো মোষের মতো ছুটে এসে কনুই দিয়ে ধাক্কা মেরে ফেলে দিচ্ছিল আমাদের
খেলোয়াড়দের। আর শটের কী জোর, বাপরে। সাঁই সাঁই শব্দ তুলে
বল ছুটে আসছিল আমাদের গোলের দিকে। বেশির ভাগ শট বারের পাশ না হয় ওপর দিয়ে
বেরিয়ে গেল তাই রক্ষা। সত্যি কথা- যে ক'টা শট গোলে এসেছিল আটকানোর
সাহস হয়নি আমার। এক একটা শট যেন কামানের গোলা। আমাদের সমর্থকরা হতাশায় চুপ করে
দাঁড়িয়েছিল। আধ ঘণ্টার মধ্যে আমাদের দুজন খেলোয়াড় ওদের কনুইয়ের গুঁতোয় আহত
হয়ে মাঠ ছেড়ে গেছে। বদলে যারা নামল তারা গুঁতোর ভয়ে সিঁটিয়েই রইল। ভয়ে ওদের
খেলোয়াড়দের কাছে ঘেঁষছিলই না।
হাফ টাইমের আগেই তিনটে গোল খেয়ে গেলাম আমরা। আরো পাঁচ-ছ'টা মারাত্বক শট ভাগ্যিস একটুর
জন্য গোলে ঢোকেনি। আমাদের গ্রামের দর্শকরা অনেকেই হাফ টাইমের বাঁশি বাজার আগেই মাঠ
ছেড়ে চলে গেছে।
তবে হাফ টাইমের কিছুক্ষণ আগেই আমি আমার বুদ্ধির কাজটা সেরে
ফেললাম। প্যালার চোখে হতাশা। ওকে হাত নেড়ে আশ্বস্ত করতে গিয়ে দেখি হতাশায়
অন্যদিকে তাকিয়ে আছে। মাথা নীচু করে ও অন্যদিকের গোল পোস্টের পেছনে গিয়ে দাঁড়াল
বিমর্ষ মুখে।"
বিল্টু ধৈর্য হারাল এবার, "বুদ্ধির কাজটা
কী করলে সেটা একটু বলবে দাদুভাই?"
"একটু নয় গোটাটাই বলব, তবে গল্পের শেষে।"
বিল্টু জেদ ধরেই রইল, "একটুও বলো
দাদুভাই, প্লিজ্-জ্-জ্।"
হেসে উঠল দাদু, "আমাদের
খেলোয়াড়দের বলেছিলাম- সব্বাই গোলকিপারের বাঁদিকে শট মারবি। মানে তোদের ডান দিকে।
হাফ টাইমের পর ওদের গোলকিপার শুধুই পা চুলকোয়। গোলপোস্টের
বাঁ দিকে দাঁড়াতেই চাইছে না। শুধুই ডান দিকে সরে গিয়ে দাঁড়ায় আর নীচু হয়ে ঘনঘন পা চুলকোয়। ওদের দল ভালো করে কিছু বোঝার আগেই আমাদের
খেলোয়াড়রা বাঁ দিকে শট মেরেই পাঁচটা গোল দিয়ে দিল। সারা মাঠে হই চই পড়ে গেছে।
গ্রামেও খবর চলে গেছে। পিলপিল করে গ্রামের লোকেরা ফিরছে খোল, কত্তাল বাজিয়ে। ওদের খেলোয়াড়রা গুঁতোগুঁতি করে আরো দুটো গোল দিলেও আমাদের খেলোয়াড়েরা তখন
আলাদা মজা পেয়ে গেছে- গোলের বাঁ দিকে শট মারলেই গোল।
ওদের গোলকিপার তখন দুটো গোলপোষ্টই ছেড়ে দিয়ে অনেকটা এগিয়ে
এসে পা চুলকোতে ব্যস্ত। সেই ফাঁকে আমাদের ছেলেরা আরো তিনটে গোল দিয়ে দিল। ব্যস
খেলা, গল্প দুটোই শেষ।"
এবার বিল্টু দাদুর হাত চেপে ধরল, "কী বুদ্ধি খাটিয়েছিলে না বললে হাত ছাড়বই না দাদুভাই।"
দাদু হো হো করে হেসে উঠতেই ঠাম্মা হাজির, "কচি ছেলেগুলোকে যা খুশি বুঝিয়ে খুব মজা পাচ্ছ না ?"
দাদু নাক কুঁচকে বলল, "মনে হচ্ছে পোড়া
পোড়া গন্ধ পাচ্ছি। উনুনে কিছু দুধটুধ চাপিয়ে এসেছ নাকি?"
"ও মা তাই তো, যাই দেখি গে তবে" বলে
নাক কুঁচকে ঠাম্মা ছুটল। দাদু বিল্টুর কাঁধে হাত রাখল, "একেই বলে বুদ্ধি, বুঝলি। দেখলি কেমন তোর
ঠাম্মাকে রান্নাঘরে পাঠালাম।"
বিল্টু খুব বিরক্ত হলো, "বুদ্ধিটা কী
ছিল সেটাই বলো না দাদুভাই।"
দাদু বলল, "এমন কিছু না রে দাদুভাই-
পকেটে তিন-চার মুঠো চিনি নিয়ে গেছিলাম। হাফ টাইমের কিছুক্ষণ আগে চিনিগুলো সবার
অলক্ষ্যে বাঁ দিকের পোষ্ট ঘেঁষে ছড়িয়ে দিলাম। কয়েক মিনিটের মধ্যেই বড় বড় লাল
পিঁপড়ে ভীড় জমাতে শুরু করল আর বাঁ দিকটা একে বারে ছেয়ে গেল পিঁপড়েতে। কিছুক্ষণ
পরেই সাইড চেঞ্জ করে অন্যদিকের গোল পোস্টে চলে গেলাম আমি আর ওদের গোলকিপার এই দিকে
এল। তারপর---"
উচ্ছসিত বিল্টু, "গল্পটা সত্যি
গো দাদু ভাই?"
পেছন থেকে ঠাম্মা বলল, "তোর দাদু উকিল
আর উকিলরা কোনোদিন সত্যি বলে না- জেনে রাখ দাদুভাই।"