গল্প ৪ । ফাল্গুন ১৪৩২

কুয়াশাগড়ের 'কঙ্কাল ঘড়ি' 











পিনাকী রঞ্জন পাল

জলপাইগুড়ি, পশ্চিমবঙ্গ


 

হেমন্তের দুপুরেও কুয়াশাগড়ে রোদটা যেন ঠিক সাহস করে উঠতে পারে না। সব সময় একটা ঝিম ধরা ভাব। জানলার বাইরে তাকালে মনে হয়, পাইন গাছগুলো যেন চাদর মুড়ি দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, আর তাদের ফাঁক দিয়ে কুয়াশা চোরের মতো আনাগোনা করছে।

নীলু জানলার গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে ছিল। তার পুরো নাম নীলরতন, কিন্তু ডাকনাম নীলু। বয়স চোদ্দ, কিন্তু বুদ্ধিতে সে সাতাশের কাছাকাছি বলে দাবি করেন তার ছোটদাদু। এই ছোটদাদু, অর্থাৎ অবিনাশবাবু, মানুষটি বড়ই বিচিত্র। তিনি নিজেকে 'অদৃশ্য শক্তির গবেষক' বলেন। তাঁর ঘরের টেবিলে ছড়ানো থাকে অদ্ভুত সব যন্ত্রপাতি—ভাঙা কম্পাস, পুরনো রেডিওর ভালভ, আর পাখির পালক

"বুঝলি নীলু, শব্দ ব্রহ্ম, কিন্তু নিস্তব্ধতা হলো মহাবিশ্বের চাবিকাঠি।"

নীলু ঘাড় ফেরালে দেখল, ছোটদাদু একটা পেতলের চোঙা কানে দিয়ে দেওয়ালের দিকে তাকিয়ে আছেন

নীলু বলল, "দাদু, ওটা দিয়ে কি টিকটিকির ফিসফিসানি শুনছ?"

অবিনাশবাবু চোঙাটা নামিয়ে চশমাটা নাকের ডগায আনলেন। "ফাজলামি করিস না। আমি শোনার চেষ্টা করছি পাশের বাড়ির বিড়ালটা আজ মাছ চুরি করবে কি না। তার আগে একটা 'সিগন্যাল' পাওয়া যায়।"

ঠিক তখনই ধড়াম করে দরজা খুলে ঘরে ঢুকলেন স্থানীয় থানার দারোগা প্রিয়তোষ বক্সী। প্রিয়তোষবাবুর মুখটা বর্ষার মেঘের মতো থমথমে

"সর্বনাশ হয়েছে অবিনাশদা! হাড়হিম করা কান্ড!"

অবিনাশবাবু নির্বিকার ভঙ্গিতে নস্যি নিলেন। "বক্সী, টেনশন করলে ব্লাড সুগার বাড়ে। কি হয়েছে খুলে বলো।"

"সাহেব কুঠির সেই 'কঙ্কাল ঘড়ি'টা চুরি গেছে!"

নীলুর কান খাড়া হয়ে গেল। কুয়াশাগড়ের উত্তর দিকে সাহেব কুঠি। বহু কাল আগে এক ব্রিটিশ সাহেব, লর্ড হ্যামিল্টন ওটা বানিয়েছিলেন। তাঁর নাকি অদ্ভুত শখ ছিল। তিনি একটা দেওয়াল ঘড়ি বানিয়েছিলেন মানুষের হাড় দিয়ে। স্থানীয় লোকেরা বলে 'কঙ্কাল ঘড়ি'ঘড়িটা নাকি চলে না, কিন্তু অমাবস্যার রাতে ঠিক বারোটার সময় ঢং ঢং করে বারোটা বাজায়। আজ সেই ঘড়ি উধাও!

 

প্রিয়তোষবাবু বললেন, "কাল রাতেও কেয়ারটেকার হরিপদ দেখেছে ঘড়ি যথাস্থানে আছে। সকালে গিয়ে দেখে, দেওয়াল ফাঁকা। অথচ কোনো দরজা-জানালা ভাঙা হয়নি। তালাও বন্ধ। যেন হাওয়ায় মিলিয়ে গেল!"

নীলু বলল, "প্রিয়তোষকাকু, চোর কি চিমনি দিয়ে ঢুকতে পারে না?"

          প্রিয়তোষবাবু বিরক্ত হয়ে বললেন, "ইয়ার্কি হচ্ছে? চিমনি দিয়ে বড়জোর একটা বিড়াল ঢুকতে পারে, আস্ত মানুষ নয়। আর ওই ঘড়ির যা ওজন, দুজন পালোয়ান ছাড়া নড়ানো অসম্ভব।"

          অবিনাশবাবু উঠে দাঁড়ালেন। "চল নীলু, ঘটনাস্থল পরিদর্শন করা যাক। আমার 'স্পেকট্রাল ডিটেক্টর'টা সঙ্গে নিই। যদি কোনো ভৌতিক ব্যাপার থাকে, ধরা পড়বেই।"

সাহেব কুঠির সামনে যখন ওরা পৌঁছাল, তখন বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামছে। বাড়িটা দেখলেই গা ছমছম করে। লতা-পাতায় ঢাকা বিশাল থামগুলো যেন একেকটা প্রহরীর মতো দাঁড়িয়ে। কেয়ারটেকার হরিপদ থরথর করে কাঁপছিল

নীলু হরিপদকে জিজ্ঞেস করল, "কাল রাতে আপনি কোনো শব্দ পাননি?"

হরিপদ ঢোক গিলে বলল, "পেয়েছি খোকাবাবু। রাত তখন দুটো। ছাদের ওপর মনে হলো কারা যেন নাচছে। খটখট শব্দ। ভয়ে আমি লেপের তলা থেকে বেরোইনি।"

নীলু দেওয়ালের কাছে গেল। যেখানে ঘড়িটা ছিল, সেখানটা ফাঁকা। কিন্তু দেওয়ালের গায়ে একটা অদ্ভুত জিনিস লক্ষ্য করল সে। একটা সরু কাদার দাগ। দাগটা দেওয়াল বেয়ে উপরে উঠে গেছে, সোজা ভেন্টিলেটরের দিকে

"ছোটদাদু, এদিকে এসো।"

অবিনাশবাবু ম্যাগনিফাইং গ্লাস দিয়ে দাগটা দেখলেন। "হুম! কাদা। কিন্তু সাধারণ কাদা নয়। লালচে। এই তল্লাটে তো লাল মাটি নেই। এটা পাওয়া যায় একমাত্র ওই 'মরা নদীর' চড়ায়, যেটা এখান থেকে তিন মাইল দূরে।"

নীলু বলল, "দাদু, চোর দরজা দিয়ে ঢোকেনি, চিমনি দিয়েও নয়। ঢুকেছে ওই ভেন্টিলেটর দিয়ে। কিন্তু মানুষ নয়।"

প্রিয়তোষবাবু চোখ কপালে তুললেন, "তাহলে? ভূত?"

নীলু হাসল। সমরেশ বসুর গোগোল যেমন করে হাসত। "ভূত নয় কাকু। বাঁদর বা শিম্পাঞ্জি জাতীয় কিছু। একমাত্র তাদের পক্ষেই ওই সরু ফোকর দিয়ে ঢোকা সম্ভব। আর দেওয়ালের দাগটা দেখছেন? ওটা কোনো জুতোর দাগ নয়, থাবার দাগ।"

অবিনাশবাবু লাফিয়ে উঠলেন। "ইউরেকা! মনে পড়েছে! গত পরশু বাজারে দেখেছিলাম এক জিপসি জাদুকরকে। তার সঙ্গে একটা বিশাল ওরাংওটাং ছিল। ওটা কি তবে...?"

নীলু বলল, "চলো দাদু, মরা নদীর চড়ায়। আজই ওই জাদুকর তাঁবু গুটিয়ে পালাবে।"

পুলিশের জিপ আর অবিনাশবাবুর পুরনো ল্যান্ড রোভার ছুটল মরা নদীর দিকে। চারদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার। কুয়াশা এতটাই ঘন যে হেডলাইটের আলোও বেশি দূর যাচ্ছে না

নদীর চড়ায় পৌঁছাতেই দেখা গেল, একটা তাঁবু গোটানো হচ্ছে। কয়েকজন লোক ধরাধরি করে একটা বড় কাঠের বাক্স লরিতে তুলছে

"থামো!" প্রিয়তোষবাবু রিভলবার উঁচিয়ে চিৎকার করলেন

লোকগুলো চমকে উঠল। কিন্তু তাদের সর্দার, লম্বা চুলওয়ালা সেই জাদুকর, একটা অদ্ভুত শিস দিল। সঙ্গে সঙ্গে অন্ধকারের ভেতর থেকে এক বিশাল ছায়া লাফিয়ে পড়ল পুলিশের জিপের ওপর। সে এক লোমশ দানব! ওরাংওটাংটা জিপের বনেটে উঠে দাঁত খিঁচিয়ে গর্জন করতে লাগল

প্রিয়তোষবাবু ভয়ে পিছিয়ে গেলেন। "এ তো সাক্ষাৎ যমদূত!"

অবিনাশবাবু পকেট থেকে একটা ছোট কৌটো বের করলেন। "নীলু, সরে দাঁড়া! আমার 'হিপনোটিক পাউডার' প্রয়োগ করার সময় এসেছে।"

তিনি কৌটোর ঢাকনা খুলে এক মুঠো ছাই ছুড়ে দিলেন ওরাংওটাংটার দিকে। কিন্তু বাতাসে উল্টো টান থাকায় ছাইটা গিয়ে পড়ল স্বয়ং প্রিয়তোষবাবুর নাকে। তিনি প্রচণ্ড হাচঁতে শুরু করলেন, "হ্যাঁচ্চো! হ্যাঁচ্চো!"

ওরাংওটাংটা বিভ্রান্ত হয়ে থমকে গেল। এই সুযোগে নীলু দৌড়ে গিয়ে লরির চাকার কাছে রাখা একটা দড়ি ধরে টান দিল। দড়িটা বাঁধা ছিল কাঠের বাক্সের সাথে। বাক্সটা হুড়মুড় করে নিচে পড়ে ভেঙে গেল

বাক্সের ভেতর থেকে বেরিয়ে এল সেই হাড়ের তৈরি ভয়ংকর দর্শন 'কঙ্কাল ঘড়ি'আর তার সঙ্গে গড়িয়ে পড়ল আরও অনেক চুরি করা অ্যান্টিক মূর্তি

জাদুকর পালাবার চেষ্টা করছিল, কিন্তু হাঁচি থামিয়ে প্রিয়তোষবাবু ততক্ষণে তাকে জাপটে ধরেছেন। পুলিশ বাহিনী বাকিদের ঘিরে ফেলল

জাদুকর, যার আসল নাম গদাই চোর, স্বীকার করল যে সে ওরাংওটাংটাকে ট্রেনিং দিয়ে চুরি করাত। ওটা ভেন্টিলেটর দিয়ে ঢুকে ভেতর থেকে দরজা খুলে দিত, অথবা ছোট জিনিস নিজেই নিয়ে আসত

 

রাত গভীর। কুয়াশাগড়ের থানায় বসে গরম চা খাচ্ছে সবাই

অবিনাশবাবু চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বললেন, "আমার পাউডারটা কাজ করেছে দেখলি নীলু? ওটা না দিলে বক্সী অত জোরে হাচঁত না, আর ওরাংওটাংটাও ভয় পেত না।"

নীলু মুচকি হেসে বলল, "হ্যাঁ দাদু, তোমার ওই পাউডারই আসল হিরো। তবে বাঁদরটার জন্য আমার মায়া হচ্ছে। বেচারা জানতও না সে চুরির দায়ে ফেঁসে যাচ্ছে।"

প্রিয়তোষবাবু তখনো নাক মুছছেন। "যাই বলুন দাদা, আপনার নাতি কিন্তু জেম। ও না থাকলে আমরা ভূত ভেবেই মরতাম।"

বাইরে তখন কুয়াশা কেটে গিয়ে চাঁদের আলো ফুটেছে। নীলু জানলার দিকে তাকাল। তার মনে হলো, রহস্য জিনিসটা আসলে কুয়াশার মতোই। একটু বুদ্ধি আর সাহসের আলো ফেললেই সেটা পরিষ্কার হয়ে যায়। তবে ছোটদাদুর মতো একজন সঙ্গী থাকলে ব্যাপারটা অনেক বেশি জমে ওঠে

ঘড়িতে ঢং ঢং করে দশটা বাজল। অদ্ভুত ব্যাপার, থানার পুরনো ঘড়িটা গত দুবছর ধরে অচল ছিল, আজ হঠাৎ চলতে শুরু করেছে। অবিনাশবাবু সেদিকে তাকিয়ে গম্ভীর মুখে বললেন, "বলেছিলাম না নীলু? শব্দ ব্রহ্ম! আজকের এই হইচইয়ে ওর ঘুম ভেঙে গেছে।"

নীলু আর কিছু বলল না, শুধু হাসল। কুয়াশাগড়ের রাত আজ বড় শান্ত