akkharbarta

অক্ষরবার্তা - একটি কিশোর বার্তা উদ্যোগ... আমাদের মূল লক্ষ্য উচ্চ মানের বই পাঠকের হাতে পৌঁছে দেওয়া... যোগাযোগ করুন - akkharbarta@gmail.com | www.akkharbarta.in

গল্প ৫ । জ্যৈষ্ঠ - আষাঢ় ১৪৩৩



দিঘী ও প্রিয় পরী











অনুরাগ ভৌমিক

উদয়পুর, ত্রিপুরা

বিড়ালের বাচ্চাটা চিৎকার করলে দিঘী বুঝে তার ক্ষুধা পেয়েছে। কোনো না কোনো অজুহাতে সে তাকে খাবার দিয়ে আসে। প্রথম প্রথম শুধু দুধ খেতো, ইদানিং দুধ-ভাত, মুড়ি, বিস্কুট, মাছের কাঁটা ইত্যাদি ও খেতে শিখে গেছে। খাবার দিলে বিড়াল যখন তার ছোট্ট মুখ দিয়ে তুলে তুলে খায় তখন মাটিতে একাদশীর চাঁদের মতো চিহ্ন আঁকা হয়। দিঘী দেখেছে তার দিদার বাড়িতে। এখানে তা দেখতে পায়না। ঘাস, দূর্বাঘাসে ভরা সবটা বাড়ি। 

বারান্দা পেরিয়ে ছোট্ট উঠান, তারপর গেট গেটের পাশে যে চাঁপা গাছটা তার নিচেই বিড়ালের বাচ্চাটা দিনে দু তিনবার আসে কোথা থেকে আসে দিঘী তা জানে না জানার এমন কোনো আগ্রহ নেই সে আসে, তাকে খাওয়ায়, আদর করে, আবার আসার জন্য বলে, ঘরে ফিরে যায় তার চেয়ে বেশি তো আর প্রয়োজন নেই তবে একবেলা না দেখলে বা তার আওয়াজ না পেলে দিঘীর মনটা কেমন করে পড়ালেখা, টিফিন খাওয়া, টিভি দেখার পাশাপাশি কানটা পেতে রাখে বাইরে বিড়াল ছানাটার দিকে

বেশ কিছু দিন আগে, তখন শীতকাল, দিঘীদের বাড়ি থেকে একটু এগিয়ে গেলেই আগরতলা-সাব্রুম জাতীয় সড়ক এই সড়কের কিনারে বিরাট একটা ডাস্টবিন তার পাশে কোথা থেকে এক পাগলী এসে থাকছে দিনের অনেকটা সময় সে এখানে থাকে কোথা থেকে কুড়িয়ে খাবার এনে মাটির হাঁড়িতে করে গরম করে ইট দিয়ে সুন্দর করে চুলা বানিয়ে নিয়েছে মোটামুটি পরিপাটি তার অল্পদিনের সংসার রাতে কারো দেওয়া একটা কম্বল গায়ে জড়িয়ে বসে থাকে শেষ রাতের দিকে থেকে থেকে আর্ত চিৎকার করে ওঠে সে কি ভয়ঙ্কর চিৎকার, দিঘী হঠাৎ সজাগ হলে রীতিমতো ভয় পায়

মা সাথে রবিবার দুপুরে এদিক  দিয়ে গানের ক্লাসে যায় দিঘী এখান থেকেই অটো ধরে মাঝে মধ্যে পাঁচ সাত মিনিট গাড়ির জন্য দাঁড়াতে হয় ঐদিন মা সাথে দাঁড়িয়ে আছে এমন সময় দেখে একটা বিড়াল ছানা চিৎকার করে করে পাগলীর কাছেই ঘুরছে আর তার দেওয়া খাবার খাচ্ছে দিঘী তো ভেবেই নিয়েছে সেই বিড়ালটা হতে পারে তার মনে একটা দুশ্চিন্তা কাজ করছে বিড়ালটা কি খিদেয় কষ্ট পাচ্ছে মুহূর্তেই পাগলী কোলে নিয়ে বিড়াল ছানাটাকে আদর করছে চুমু খাচ্ছে অবাক চোখে চেয়ে আছে দিঘী ভালো করে দেখে বুঝলো নাঃ এটা তার বিড়ালটা নয় ওই বিড়ালটা তো অনেকটা ছোট প্রাণ যেন ফিরে পেল কিছু দিন পর পাগলী কোথায় চলে গেছে, বিড়ালটাকেও আর দেখতে পায়নি দিঘী হয়তো পাগলী নিয়ে গেছে সঙ্গে করে

দেখতে দেখতে দিঘীর জন্মদিন চলে এসেছে বাবা রাতে ভাত খেতে খেতে প্রস্তাব করলো এবার জন্মদিনে চলো শিলং ঘুরে আসি মা তো খুব খুশি অন্য সময় হলে দিঘী আনন্দে আত্মহারা হতো শিলং তো দিঘীর স্বপ্নের জায়গা শিলং পিক, বড় বাজার, মিউজিয়াম,

লেইক, চিরিয়াখানা, ঝর্ণা, চেরাপুঞ্জি, আরো কতো কী ঘুরবে বাবা তো অনেক বার শিলং গেছে বাবার মুখে শিলং এর গল্প শুনে শুনে, জায়গাটা দেখার তীব্র ইচ্ছা জাগে তাছাড়া বাংলা ইয়ে লীলা মজুমদারের যাত্রা মঙ্গলগল্পে তিনি লিখেছেন ছোটবেলা বাবার সাথে শিলং ঘুরেছেন তখনই শিলং সম্বন্ধে বিরাট একটা কৌতূহল জাগে দিঘীর কিন্তু যাওয়া আর হয়ে ওঠে নি

মনে তো দিঘীর তীব্র যাওয়ার ইচ্ছে কিন্তু সে যদি এক সপ্তাহের জন্য চলে যায় তবে বিড়াল বাচ্চাটাকে খাবার দেবে কে? না খেয়ে তো মরে যাবে পরদিন সকালে মা দিঘীকে জিজ্ঞেস করে, কী রে তোর ইচ্ছে নেই শিলং যাবার? না হলে বল অন্য কোথাও যাবো

না মা, শিলং তো আমার খুব যাওয়ার ইচ্ছে শীতের শহর খুব সুন্দর শহর, বাবা বলেছে

না, তেমন উৎসাহ দেখতে পাই নি তাই বলছি

না মা, কিছু নয় তাহলে আমরা কবে যাচ্ছি?”

আজ তোর বাবা ট্রেনের টিকিট কাটবে আমরা প্রথমে যাচ্ছি গৌহাটি সেখানে কামাখ্যা মায়ের দর্শন করে পরদিন চলে আসবো শিলং বুঝলি

তবে তো খুব মজা হবে দুইটা জায়গাই ঘুরে আসতে পারবো

যাওয়ার দিন যতো ঘনিয়ে আসছে, দিঘীর চিন্তা তত বাড়ছে চোখে ভেসে ওঠছে বিড়াল ছানাটির করুণ ক্ষুধার্ত মুখটা দিঘীর চোখে জল চলে আসে এই দুঃখ কারো সাথে শেয়ার করতে পারছে না সে কী করবে? একবার মা কাছে যায়, এখনই বলে দেবে আবার কি চিন্তা করে ফিরে আসে বাবা আজ সকাল বেলা বলে, পরশু দিন সকাল সাতটায় ট্রেন যা যা নেওয়ার ট্রলিতে নিয়ে নে পরে মনে থাকবে না, প্রয়োজনীয় অনেক কিছু ভুলে যাবি

আচ্ছা বাবা তুমি সে নিয়ে চিন্তা করবে না

পরদিন প্রথম সকালে সূর্য তখন সবে মাত্র পূর্ব দিকে উঠেছে পাখিদের কিচিরমিচির শোনা যাচ্ছে সোনা রোদে মুখরিত পৃথিবী কিন্তু দিঘীর মনে এক আকাশ অশান্তি উঠানের ছোট্ট বাগান থেকে ফুল পেরে সাজিতে রাখতে গিয়ে দিঘী আবার ভাবতে লাগে আগামী কাল তো ওরা চলে যাবে কী হবে? একটা উপায় তো হলো না দুফোঁটা জল চোখ বেয়ে পড়ে গেলো সাদা মল্লিকা ফুলটির উপর

এমন সময় প্রকট হলো একটা সুন্দরী পরী কী দিঘী কাঁদছো কেন?”

দিঘী তো পরীকে দেখে আপ্লুত তারপর সব খুলে বলল পরী শুনে হাসছে আর বলছে এই সামান্য ব্যাপার নিয়ে এতো কান্না করছো? এর সুন্দর সমাধান এক্ষুনি করে দিচ্ছি তুমি নিশ্চিন্তে মা বাবার সাথে ঘুরে এসো এসে শিলং এর গল্প শোনাবে আর আমি আছি, কিচ্ছু ভাববে না, দিনে দু তিনবার তোমার বিড়াল ছানা টাকে খাবার দেবো, খেলবো, ওর সাথে সময় কাটাবো আমি তাকে দুধ এনে দেবো, মাছ এনে দেবো, মুড়ি, বিস্কুট সব কিছু

দিঘী অনেকটা রিলাক্স হলো মুখে হাসি ফুটলো সে যেন হিমালয় আরোহন করে নিলো পরীকে জড়িয়ে ধরে বলে, তুমি আমার প্রিয় পরী তুমি আমাকে বাঁচালে

আরে কিছু না, তুমি তো আমার ছোট্ট বন্ধু, তোমার জন্যে কাজ না করলে হয়?”

তুমি খুব খুব ভালো পরী গো

ঠিক আছে তাহলে এই কথা রইলো তুমি ভালো করে এই ভ্রমণ উপভোগ করে এসো

ঠিক আছে পরী এখন ঘরে যাই আবার সময় করে আসবো

পরী দিঘী কে আদর করে হাওয়ায় মিলিয়ে গেলো দিঘী অনন্ত উচ্ছ্বাসে ঘরে চলে আসে

 সূচিপত্র