অন্যান্য দিনের মতো গ্রামের প্রাইমারি স্কুল থেকে বাড়ি ফিরছিল সূর্য। হঠাৎই কয়েকজন ছেলের হৈচৈ চিৎকারে থমকে দাঁড়ায় সে।
দেখে ছেলেগুলো একটা বাচ্চা কুকুরের গলায় দড়ি বেঁধে টানতে
টানতে নিয়ে আসছে, দড়িটা গলায়
চেপে আটকে রয়েছে। পিছন থেকে কেউ আবার বলের মতো করে শট মারছে, তাতেই বাচ্চা
কুকুরটা গড়িয়ে পড়ছে মাটিতে। যতই সে আর্তচিৎকার করে ততই যেন মজা পায় ছেলেগুলো।
ওরা সূর্যের বয়সীই হবে, তবে ওরা তার মতো
বোধহয় স্কুলে যায় না। গ্রামের একটু দূরে কয়েকটা ঝুপড়ি বাড়ি থেকে সূর্য বের
হতে দেখে ওদের। এখানে-ওখানে ঘুরে বেড়ায়, এ বাগান-ও বাগান থেকে সুযোগ পেলেই আম, পেয়ারা, নারকেল, গাব, তেঁতুল, বেল—যা পায়
সাবাড় করে। ওদের মধ্যে কেউ কেউ নাকি নেশাও করে, মুখে কটু কথা। গ্রামের ওদিকটা একপ্রকার অচ্ছুৎ
অনেকের কাছেই। এ পাড়ার ছেলেরা কেউ মেশে না ওদের সাথে।
সূর্যের এ বছর ক্লাস ফাইভ হবে, সে বরাবরই
পড়াশোনায় ভালো। কিন্তু বাচ্চা কুকুরটাকে ওরা এভাবে মারছে কেন! ওদের কি ক্ষতি
করেছে! নাকি নেহাতই মজা পেতে! খুব কষ্ট হচ্ছে সূর্যের, ইচ্ছে করছে সব
কটাকে গিয়ে এক এক করে ঘুঁষি মারতে, কিন্তু ওরা যে পাঁচজন। পায়ে পায়ে এগিয়ে যায় সূর্য ওদের
দিকে, যদি বোঝানো যায়।
—“ওভাবে কেন মারছো তোমরা ওকে!”
একসময় ছেলেগুলো কুকুরটাকে একটা গর্তের মধ্যে ফেলে দিয়ে
দৌড় লাগায়। ভয়ে সিঁটিয়ে রয়েছে সে একেবারে। সূর্য তাকে গর্ত থেকে উঠতে সাহায্য
করে, দড়ির ফাঁসটা
খুলে দেয়—অনেকটা স্বস্তি পায় সে যেন। একটা পা খোঁড়াচ্ছিল তখনো। এ অবস্থায় তাকে
কি এভাবে ফেলে আসা যায়! কুকুরটা ও যেন বুঝতে পারে সে একটা বন্ধুর খোঁজ পেয়েছে।
একসময় সূর্য বাচ্চা কুকুরটাকে কোলে তুলে নেয়, বইয়ের ব্যাগটা পিঠে নিয়ে বাড়ির পথ ধরে।
বাড়িতে এনে উঠোনের এক জায়গায় নিজের হাতে তার একটা
আস্তানা তৈরি করে দেয়। খোঁড়া পাটা ভালো করে ধুয়ে মলম লাগিয়ে একটা ব্যান্ডেজ
বেঁধে দেয়। যদিও এ কাজে মা-ও তাকে সাহায্য করেছে। মা-ও বেশ খুশি সূর্যের এই পশুর
প্রতি মমতায়। সূর্য নিজে হাতে তাকে খেতে দেয়, আদর করে।
কুকুরটা এখন
অনেকটাই সুস্থ, সূর্যের পিছন
পিছন ঘোরে, দৌড়ায়, খেলে। সূর্য তার
খেলার বলটা ছুঁড়ে দেয় দূরে, কুকুরটার উদ্দেশে বলে—“যা।” কুকুরটাও বলটা লক্ষ্য করে দৌড়
দেয়, ছুটে গিয়ে মুখে
তুলে সূর্যের পায়ের কাছে ফেলে সামনে এসে দাঁড়ায়। যেন বলে—“আবার ছোঁড়ো।”
মায়ের দেওয়া নাম ভোলা, কুকুরটাকে সেই নামেই ডাকে সূর্য। আর একবার ডাক শুনেই দৌড়ে
আসে, লেজ নেড়ে আদর
চায়, কখনো দু’পা তুলে
গায়ে উঠতে চায়। সূর্যের কাছ থেকে অনেক আদবকায়দাও শিখেছে ভোলা। মানুষের ভাষা না
বুঝলে কি হবে, আকার-ইঙ্গিত
বোঝে। আবার ভুল কিছু করলে সূর্যের শাসন মাথা পেতে নেয়।
স্কুলে যাওয়ার পথে, বাড়ি থেকে বেরিয়ে অনেকটা চলে আসে ভোলা, সূর্যের পিছু
পিছু। একসময় সূর্য বলে—“ভোলা, এবার বাড়ি যা।” কিছুক্ষণ থমকে দাঁড়িয়ে আবারও সূর্যের
পিছু নেয়। সূর্য তখন দাঁড়িয়ে পড়ে ধমক দিয়ে ওঠে—“যা বাড়ি যা।” ভোলা তখন
পিছনের রাস্তায় দৌড় লাগায়। আবার বাড়ি ফেরার সময়টাও কেমন যেন বুঝে গেছে। ছটফট
করতে থাকে সারা উঠোন, বাড়ি ছুটে যায়
বড় রাস্তার মোড়ে। দূর থেকে সূর্যকে দেখতে পেলেই দৌড়ে আসে, ফিরে আসে তার
সাথে। সে যেন সূর্যকে স্কুলে দিয়ে আসা-নিয়ে আসার দায়িত্ব নিয়েছে।
সূর্যও অপেক্ষায় থাকে কখন ভোলাকে আদর করবে। ভোলা লেজ
নাড়তে নাড়তে গায়ের ওপর ভর দিয়ে দু’পা তুলে দাঁড়ায়, পায়ের কাছে
শুয়ে লুটোপুটি খায়। যেন বলে—“তুমি স্কুল থেকে তাড়াতাড়ি ফিরতে পারো না! একা আমি
কার সাথে খেলা করি!”
ছোট্ট সেই ভোলা এখন হৃষ্টপুষ্ট বড়সড় এক কুকুর, গায়ে
বাদামী-সাদা চকচকে লোম। অন্যান্য কুকুর ভয় পায় তাকে। সারা বাড়ি পাহারার দায়ও
যেন তার।
প্রতিদিনকার মতো সেদিনও সূর্যের স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার
অপেক্ষায় পথ চেয়েছিল ভোলা, ছটফট করছিল। আর দূর থেকে সূর্যকে দেখে রাস্তা পার হতে
গিয়েই ঘটল বিপত্তি। বোঝার মতো শক্তি ছিল না তার। আর কিছু বুঝে ওঠার আগেই শেষ হয়ে
গেল সব। ওপাশ থেকে আসা একটা বালি বোঝাই লরি পিষে দিয়ে গেল তাকে। কিছুক্ষণ
আর্তচিৎকার, তারপর সব শেষ।
সূর্য অনুভব করল সেদিনের তার সেই চিৎকারটা ছিল বাঁচতে
চাওয়ার, আর আজকের এই
আর্তিটা মৃত্যু-যন্ত্রণার। ভোলার আর সূর্যের কাছে পৌঁছানো হলো না।
হাউহাউ করে কেঁদে ওঠে সূর্য, বলে—“ভোলা রে, আজ তোর এ কী অবস্থা! তোকে সেদিন রাস্তা থেকে
বাড়ি এনেছিলাম এটা দেখার জন্যে!” মা জড়িয়ে ধরে সূর্যের চোখের জল মোছায়, সান্ত্বনা দেয়।
সূর্য দেখে মায়ের চোখ দুটোও জলে ভেসে যাচ্ছে।