akkharbarta

অক্ষরবার্তা - একটি কিশোর বার্তা উদ্যোগ... আমাদের মূল লক্ষ্য উচ্চ মানের বই পাঠকের হাতে পৌঁছে দেওয়া... যোগাযোগ করুন - akkharbarta@gmail.com | www.akkharbarta.in

গল্প ২ । শ্রাবণ ১৪৩৩







মতির ম্যাজিক ছাতা











তরুণকুমার

সরখেল

পুরুলিয়া, পশ্চিমবঙ্গ

মন্দ নয়; বাংলা কবিতায় তার দখল ভালো, ইতিহাসের সাল-তারিখগুলো তার নখদর্পণে, আর ভূগোলের মানচিত্র সে চমৎকার আঁকতে পারে। কিন্তু একটিমাত্র জায়গায় এসেই মতির সমস্ত বিদ্যা যেন থমকে দাঁড়ায়। সেটি হলো—অঙ্ক।


অঙ্ক নামক বস্তুটিকে মতির দারুণ ভয়। কেন জানি না, সংখ্যাগুলো দেখলেই তার মাথা ঝিমঝিম করতে শুরু করে। পাটীগণিত, বীজগণিতএসবের মধ্যে যখন 'x' আর 'y' ঢুকে পড়ে, তখন মতির কাছে সেগুলো আর খাতার অক্ষর থাকে না, মনে হয় যেন বিষধর কেউটে সাপ ফণা তুলে নাচছে। এই এক বিষয়ের জন্য সে কখনোই ক্লাসে প্রথম দশজনের মধ্যে জায়গা করে নিতে পারে না। মতির বাবা পেশায় ছাপোষা মানুষ, তিনি চান ছেলে যেন অঙ্কের সাগর অনায়াসে পার হয়। তাই মাঝে মাঝেই তিনি মতির মাথায় পেরেক ঠোকানোর মতো করে অঙ্কের ফর্মুলা ঢোকানোর আপ্রাণ চেষ্টা করেন। কিন্তু সমস্যা হলো, মতির মাথাটা যেন ইস্পাতের তৈরিসেখানে কোনো কিছুই সহজে ঢুকতে চায় না

স্কুলে মতির ওপর সবচেয়ে বেশি নজর দেন কল্যাণ স্যার। তিনি অঙ্কের মানুষ, কিন্তু মনটা তাঁর খুব নরম। কল্যাণ স্যার মতিকে আলাদা করে ডেকে কতবার যে বীজগণিত আর পাটীগণিত বোঝানোর চেষ্টা করেছেন, তার ইয়ত্তা নেই। কিন্তু লাভ কিছুই হয় না। পরীক্ষার ফল বেরোলেই দেখা যায়, মতি টেনেটুনে পঁচিশ কি তিরিশ পেয়েছে। মতির নিজের ব্যাখ্যাটা অবশ্য একটু আলাদা। সে বলে, পরীক্ষার হলে ঢুকলেই তার মাথায় একখানা বড় ক্যাকটাস গাছ গজিয়ে ওঠে। সেই ক্যাকটাসের কাঁটায় মতির জানা অঙ্কগুলো সব ফুটো হয়ে বাতাস বের হয়ে যায় আর হাওয়ায় মিলিয়ে যায়। সেই ভেসে থাকা দু-একটি অঙ্ক মতি অনেক কষ্টে খপ করে ধরে পরীক্ষার খাতায় বসাতে পারে বলেই সে কোনোমতে পাস নম্বরটুকু জোগাড় করে নেয়

(২)

স্কুলে ঢোকার কিছুটা আগে পঞ্চায়েতের মোড়ে একটা বিশাল ছাতিম গাছ রয়েছে। আজ বুধবার। সকাল দশটা বাজে। স্কুলের ঘণ্টা পড়তে এখনো আধঘণ্টা দেরি। মতি ছাতিম গাছের ছায়ায় এসে বসে পড়ল। আজ মতির মনে ভীষণ কু ডাকছে। কারণ আজ প্রথম পিরিয়ডেই কল্যাণ স্যারের অঙ্কের ক্লাস। কল্যাণ স্যার ক্লাসে ঢুকেই হোমটাস্কের খাতা চেক করবেন। আর স্যার শুধু খাতা দেখেন না, তিনি খুব খুঁটিয়ে পরীক্ষা করেন যে অঙ্কগুলো ছাত্ররা নিজেরা করেছে নাকি অন্য কারও সাহায্য নিয়েছে

মতির বাবা কাল রাত জেগে রাফ খাতায় সব অঙ্ক কষে দিয়েছিলেন। মতি সেই খাতা থেকে দেখে দেখে হোমটাস্কের খাতায় অঙ্কগুলো কেবল কপি করেছে। কিন্তু সমস্যা হলো, বাবার কষানো অঙ্কগুলো মতির মাথায় ঢোকার বদলে নীল-লাল তারা হয়ে চোখের সামনে নাচছে। কল্যাণ স্যার বোর্ডে ডাকলেই মতির ভাঁ ভাঁ মাথাটা একদম ধরা পড়ে যাবে

গাছের নিচে ঠান্ডা হাওয়া বইছিল। তিন-চারটে ফিঙে পাখি ডাল থেকে ডালে উড়াউড়ি করে ছোঁয়াছুঁয়ি খেলছিল। মতি ছাতিম গাছের গুঁড়িতে হেলান দিয়ে নিজের বড় ছাতাটা পাশে রাখল। এই ছাতাটা সে গতকালই পথের পাশের একটা পুরনো পাকুড় গাছের কোটরে পড়ে থাকতে দেখেছিল। ছাতাটা খুব অদ্ভুতপুরনো হলেও এর ওপর অনেকগুলো রূপালি রঙের রাংতা তাপ্পি দেওয়া। রোদে ধরলে ছাতাটা ঝলমল করে ওঠে। মতি ভাবল, রোদ নেই ঠিকই, কিন্তু আজ ছাতাটা মাথায় দিয়েই সে অঙ্কের খাতাটা একবার খুলবে

মজার ব্যাপার হলো, ছাতাটা মাথায় ধরার সাথে সাথেই মতির মনের ভেতর কেমন এক অদ্ভুত স্থিরতা নেমে এল। সে ব্যাগ থেকে খাতা বের করে গতিবেগের অঙ্কগুলো দেখতে লাগল। অবাক কাণ্ড! যে গতিবেগের অঙ্ক দেখলেই মতির মাথা ঘোরার বেগ বেড়ে যেত, আজ সেগুলো তার কাছে বেশ সহজ মনে হতে লাগল। সে পকেট থেকে কলম বের করে খাতার সাদা পাতায় কষতে শুরু করল। এক, দুই, তিনতিনটি শক্ত অঙ্ক সে নির্ভুলভাবে করে ফেলল। উত্তরমালার সাথে মিলিয়ে দেখল, সব ঠিক আছে। মতির মনে হলো, সে যেন একটা জাদুর চাবি খুঁজে পেয়েছে। এরপর সে একটার পর একটা অঙ্ক করতে লাগল। গতিবেগ, সময় আর দূরত্বের জটিল হিসেবগুলো তার কলমের ডগায় যেন নেচে উঠছে। মতি জীবনে এত আনন্দ নিয়ে কোনোদিন অঙ্ক কষেনি। সে বুঝতেই পারল না যে কখন আধা ঘণ্টা কেটে গেছে

(৩)

মতি যখন ক্লাসে ঢুকল, তখন কল্যাণ স্যার রোল কল সেরে ফেলেছেন। মতি দশ মিনিট দেরি করে ফেলায় একটু কাঁচুমাচু মুখে স্যারের সামনে দাঁড়াল। স্যার বললেন, “কী মতিরাম, আজ গতিবেগের অঙ্ক বুঝতে গিয়ে রাস্তায় গতি কমিয়ে ফেলেছিলে নাকি? যাও, বসো।

কল্যাণ স্যার আজ বোর্ডে গিয়ে গতিবেগের সবচেয়ে কঠিন অঙ্কটা লিখলেন। ক্লাসের ভালো ভালো ছাত্ররা যখন মাথা চুলকাচ্ছে, তখন মতি হুট করে হাত তুলল। স্যার অবাক হয়ে বললেন, “কী মতি, তুমি পারবে?” মতি বীরদর্পে বোর্ডে গিয়ে খটখট করে চকের শব্দে অঙ্কটা নামিয়ে দিল। কল্যাণ স্যারের তো চক্ষু চড়কগাছ! যে মতি একটা সাধারণ যোগ-বিয়োগ করতে গিয়ে দশবার ঢোক গিলে ফেলত, সে কি না এমন জটিল অঙ্ক চোখের পলকে করে দিল? তিনি মতির পিঠ চাপড়ে বললেন, “শাবাশ মতি! আমি জানতাম তোমার মধ্যে প্রতিভা লুকিয়ে আছে।




স্কুলের সারাটা দিন মতির খুব ফুরফুরে কাটল। সে এখন আর এলেবেলে ছাত্র নয়। স্কুল ছুটির পর সে যখন বাড়ি ফিরতে লাগল, তার মনে পড়ল সেই রাংতা মোড়া ছাতাটার কথা। সে সকালে ক্লাসে ঢোকার আগে ছাতাটা পুটুস ঝোপের আড়ালে লুকিয়ে রেখেছিল। ছাতাটা কুড়িয়ে নিয়ে সে মাথায় দিয়ে হাঁটতে লাগল। চার মাইল পথ, কাঁকুরে মাঠ, পুকুরপাড়সবকিছুই আজ তার কাছে খুব সুন্দর লাগছিল। তার মনে হচ্ছিল, এই ছাতাটা কেবল রোদের নয়, এটা একটা ম্যাজিক ছাতা। এটা মাথায় দিলেই তার মাথার ক্যাকটাস চারাটা উধাও হয়ে যায়

(৪)

        সন্ধ্যায় মতির বাবা যখন খাতা নিয়ে বসলেন, তখন তিনি এক অভাবনীয় দৃশ্য দেখলেন। মতি তাঁকে কোনো প্রশ্নই করল না। সে অনর্গলভাবে সমস্ত জটিল হোমটাস্কগুলো নির্ভুলভাবে করে ফেলল। মতির বাবা চশমাটা নাকের নিচে নামিয়ে বললেন, “এ কী রে মতি! তুই তো দেখি জাদুকর হয়ে গেছিস!মতি শুধু হাসল। সে জানত, এই জাদুর আসল রহস্য কী

এর পরের কয়েক মাস যেন মতির জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়। প্রথম সাময়িক পরীক্ষায় সে সবাইকে তাক লাগিয়ে অঙ্কে সর্বোচ্চ নম্বর পেল। অষ্টম শ্রেণি থেকে নবম শ্রেণিতে ওঠার সময় মতির রেজাল্ট দেখে হেডস্যারও অবাক। মতিরাম এখন আর শেষ বেঞ্চের ভয় পাওয়া ছেলেটি নয়, সে এখন ক্লাসের প্রথম দশজনের অন্যতম। সবচেয়ে খুশি হলেন কল্যাণ স্যার। রেজাল্ট আউটের দিন তিনি মতিকে জড়িয়ে ধরে বললেন, “অঙ্ক হলো মণি-মাণিক্যের খনি। যে একবার ডুব দিতে জানে, সেই আসল সম্পদ পায়। তুমি সেই খনি খুঁজে পেয়েছ মতি।

মতি রেজাল্ট হাতে নিয়ে বীরদর্পে বাড়ির পথ ধরল। পথে সেই পুরনো পাকুড় গাছ। হঠাৎ মতির মনে হলো, ম্যাজিক ছাতাটার কৃতজ্ঞতা জানানো উচিত। সে গাছটার কোটরে উঁকি দিলযেখানে সে মাঝে মাঝে ছাতাটা লুকিয়ে রাখত। কিন্তু উঁকি দিতেই মতির মুখটা শুকিয়ে গেল

পাকুড় গাছের কোটরটা একদম ফাঁকা। সেখানে কোনো ছাতা নেই। মতি পাগলের মতো আশেপাশে খুঁজল, পুটুস ঝোপের আড়াল দেখল, কিন্তু রাংতা মোড়া সেই অদ্ভুত ছাতাটা কোথাও পাওয়া গেল না। সেটা যেন বেমালুম হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে। মতির বুকের ভেতরটা হু-হু করে উঠল। তবে কি জাদুটুকু ফুরিয়ে গেল?

(৫)

বাড়িতে আনন্দের ধুম পড়ে গেছে। কাকা তাকে নতুন সাইকেল কিনে দেবেন বলে ঘোষণা করেছেন। মা তার প্রিয় ক্ষীরের নাড়ু বানিয়েছেন। কিন্তু মতির মন খারাপ। সে ভাবছে, কাল থেকে যখন আবার স্কুল শুরু হবে, তখন ছাতাটা ছাড়া সে কি অঙ্ক পারবে? সেই ক্যাকটাস চারাটা কি আবার তার মাথায় ফিরে আসবে?

পরদিন সকালে সে পড়তে বসল। বুকটা কাঁপছে। গতিবেগের একটা কঠিন অঙ্ক সামনে রাখল সে। ছাতা নেই, মাথায় কোনো ম্যাজিক নেই। কিন্তু কলমটা ধরতেই সে অবাক হয়ে দেখলহাতের আঙুলগুলো অবলীলায় নড়ছে। কোনো ক্যাকটাস গজাচ্ছে না মাথায়। বরং অঙ্কগুলো এখন তার মজ্জায় মিশে গেছে

মতি বুঝতে পারল, ছাতাটা আসলে ছিল একটা আত্মবিশ্বাসের চাবিকাঠি। সেটা হারিয়ে গেলেও তার দেওয়া জ্ঞানটুকু মতির ভেতরেই রয়ে গেছে। কুড়িয়ে পাওয়া জিনিস হয়তো এভাবেই কোনো একদিন হঠাৎ হারিয়ে যায়, কিন্তু তার রেখে যাওয়া শিক্ষাটা মানুষের চিরকালের সম্পদ হয়ে থাকে। মতি জানালা দিয়ে আকাশের দিকে তাকাল। তার মনে হলো, কোনো এক অদেখা জাদুকর হয়তো অন্য কোনো ভীতু ছেলেকে সাহায্য করার জন্য ছাতাটা তুলে নিয়ে গেছে। মতি মৃদু হাসল আর কলম তুলে নিয়ে পরের অঙ্কটা কষতে শুরু করল

সূচিপত্র