গল্প ২ । আশ্বিন ১৪৩২

ব্যাকবেঞ্চার













কিরণময় নন্দী

হুগলি, পশ্চিমবঙ্গ


 

তৃতীয় পিরিয়ডে তখন সৌমেন বাবুর ক্লাস চলছে। অষ্টম শ্রেণির গণিত ক্লাস। বীজগণিতের জটিল মান নির্ণয়ের অংক চলছে বোর্ডে।

সৌমেন বাবু যথাসাধ্য চেষ্টা করছেন বীজগাণিতিক চলরাশির সমস্যা সমাধানে। স্কুলের নিয়মশৃঙ্খলা অনুযায়ী হরিহরপুর উচ্চ বিদ্যালয়ে তখন নিরবিচ্ছিন্ন ব্যস্ততা। খেলার মাঠ ফাঁকা। স্কুলের পাশের রাস্তায় তখন কিঞ্চিৎ যানবাহন ছুটছে। পশ্চিম দিকের চাষের জমিতে ধান রোয়ার কাজ চলছে জোরকদমে

দুই পিরিয়ডের পর সর্ট টিফিনে সকলে জল পানের ও টয়লেট যাওয়ার বিরতি সেরে ক্লাসে মনোযোগ দিয়েছে। মন নেই অষ্টম শ্রেণির ছাত্র টুবাইয়ের। জানালার পাশে বসে তাকিয়ে রয়েছে ক্ষেতের দিকে। লাইন ধরে শ্যামল কাকারা ধান রুইতে ব্যস্ত। কোমর নুইয়ে চারাগাছগুলো পুঁতে চলেছে অবিরাম। কোনো ক্লান্তি স্পর্শ করছে না। টুবাইয়ের বাড়ি পাশের গ্রাম বসুদেবপুর মাঝিপাড়ায়। ওদের বাড়ির পাশ দিয়ে ছোট নদী বয়ে গেছে। ওখানকার বেশিরভাগ  লোক আগে নৌকা চালিয়ে সংসার চালাতো। এখন কংক্রিটের ব্রিজ। তাই যাত্রী পারাপারে আর নৌকার ব্যবহার নেই। তবে বছরের বেশিরভাগ সময়ে নদীতে নৌকায় চেপে সারারাত মাছ ধরে অনেকেই। টুবাইয়ের বাবাও মাছ ধরার কাজ করেন। আবার চাষের সময়ে জমিতে চাষের কাজে হাত লাগান। কোনোক্রমে সংসার চলে। মাঝেমাঝে বাবার সাথে নৌকায় চেপে অনেকদূর চলে যায়। দাদুদের আমলের গল্প শোনে বাবার মুখে। কত কষ্টের জীবন। মাছ ধরেই টুবাইয়ের বাবাদের, পিসিদের মানুষ করেছেন। বিঘে খানেক জমিও কিনেছেন নদীর পাড়ে। আসলে নদীই টুবাইদের জীবনে গতিশীলতা

হঠাৎ ছোটো চকের টুকরো উড়ে এসে পড়লো টুবাইয়ের মাথায়। জানালা থেকে চোখ ফিরিয়ে সামনে তাকাতেই সৌমেন বাবুর কড়া চাহনিতে টুবাই বেশ ভয় পেয়ে গেলো। টুবাইয়ের দিকে সকলে তাকিয়ে। কেউ কেউ তাচ্ছিল্যের মুচকি হাসি হাসছে। প্রথম পর্যায়ক্রমিক মূল্যায়নের অংকের নাম্বার শুনিয়ে সৌমেনবাবু বললেন, "এবারেও কি ঐ সম্পাদ্য টুকু করে সাদা খাতা জমা করবি?"

রুবাই নির্লিপ্ত। কোনো উত্তর নেই। আনমনা রুবাই বারেবারে অসম্মানিত হয়, বকা খায় স্যার, দিদিমণিদের কাছে

তবুও পড়ায় মন বসে না ওর। নৌকা চালাতে ভালোলাগে, সাইকেলে চড়ে নদীর পাড় ধরে অনেকদূর চলে যায়। স্নানের সময়ে দু একটা মাছ ধরবেই ও

সৌমেন বাবুর বকা খেয়ে চুপ করে বসে পড়লো টুবাই। সামনে সাদা খাতা খোলা আর অঙ্ক বইয়ে তখন ইংরেজি বর্ণমালার এক্স, ওয়াই এবং নানা সংখ্যার দাপাদাপি। সব যেন গুলিয়ে যাচ্ছে ওর। তবুও বিজ্ঞানের বল, চাপ কিংবা ভিটামিন, পুষ্টি, বাস্তুতন্ত্র কিছুটা মাথায় ঢুকলেও... অঙ্ক যেন আড়ি করেছে রুবাইয়ের সাথে

স্কুল ছুটির পর সাইকেলে করে বাড়ি ফেরে টুবাই বন্ধুদের সাথে। বসুদেবপুর মাঝিপাড়ার ব্রিজের এপাড়ে বামদিকে ওদের বাড়ি। আর কিছু ছেলেমেয়ে ঐ ব্রিজ পাড় করে চলে যায় আকন্দপুরে।টুবাই প্রায়ই আকন্দপুর যায় সাইকেলে চড়ে কিংবা নৌকা বেয়ে

 

নদীকেন্দ্রিক জীবনযাত্রায় বড়ো হতে থাকে টুবাই। সাইকেল চড়া, নৌকা চালানো, স্কুলে যাওয়া, বাবার সাথে মাছ ধরা আর অমনোযোগী পড়াশোনা নিয়ে কিশোর টুবাই চলছে আপন গতিতে

 

বন্যা ওদের নিত্য সঙ্গী। তবে এবারের বন্যা ভয়ঙ্কর। নদী উপচে জল ঢুকছে গ্রামে। জমি ডুবিয়ে, রাস্তা ডুবিয়ে বন্যার জল টুবাইদের খামারে। নদীর নৌকা ওদের খামারে বাঁধা

রাতে জল বাড়ছে হু হু করে। খামার ডুবিয়ে জল একেবারে টুবাইদের বাড়িতে। একতলা প্লাস্টারহীন দু-কামরা ঘরের মেঝেতে জল। সকলের সাথে হাত মিলিয়ে টুবাই বাড়ির আসবাব তুলছে ছাদে। ত্রিপল টাঙিয়ে ছাদে মালপত্র রাখা চলছে জোরকদমে। বিদ্যুত নেই। হ্যারিকেনের আলো সামনের ভয়ঙ্কর অন্ধকার টপকে যেতে সাহস পাচ্ছে না। চারিদিকে তখন চাপা আতঙ্ক কাজ করছে

 

খবর এলো ওদের ক্লাসের অঙ্কুরের কাকিমার প্রসব বেদনা উঠেছে আর শ্যামল কাকাকে সাপে কামড়েছে। দুজনেই যন্ত্রণায় ছটপট করছে। এখুনি ওদের হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে। তখন রাত এগারোটা। ছাদে উঠে মোবাইলে কথা চলছে ঐ পাড়ার একে অপরের সাথে

 

ঠিক হলো অঙ্কুরের কাকিমা আর শ্যামল কাকা সহ টুবাই, টুবাইয়ের বাবা, সনাতন কাকা, অঙ্কুরের মা আর বাবা যাবে নৌকায় করে। টুবাইকে নিয়ে অনেকের আপত্তি থাকলেও টুবাই শুনলো না কারও কথা। সকলে দ্রুত নৌকায় উঠলো। দাঁড় আর হালের কেরামতিতে নৌকা এগিয়ে চললো। অনেক রাত টুবাই নৌকা চালিয়েছে বাবার সাথে নদীতে। কিন্তু সেই চেনা নদী এখন দানব। খাল পেরিয়ে নৌকা নামলো নদীতে। সকলে ভয়ে সিঁটিয়ে। কি হয় কি হয়! দুটো মানুষ যন্ত্রণায় কষ্ট পাচ্ছে। এদিকে টুবাই, টুবাইয়ের বাবা আর সনাতন কাকা দাঁত চেপে নদীর জলের গতিকে কাজে লাগিয়ে এগিয়ে চলেছে। সকলের দৃষ্টি স্থির। শুধু আকন্দবাড়ির বামদিকের খালে নৌকাকে ফেলার অপেক্ষা। 

দেড়ঘন্টা নৌকা চালিয়ে হাইওয়ের একটু দূরে নৌকা থামলো। হেঁটে হাইওয়ে পৌঁছে একটা গাড়ি ভাড়া করে মিনিট পনেরোর মধ্যে মহকুমা হাসপাতাল

 

দিন তিনেক পর বন্যার জল কমলো। ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হলো বন্যা পরিস্থিতি। ফসল নষ্ট হলো, কিছু কাঁচা ঘরবাড়ি নষ্ট হলো। কিন্তু অঙ্কুরের মা সুস্থ। সুস্থ অঙ্কুরের তিনদিনের ছোট্ট বোন অনন্যা আর সাপের কামড় খাওয়া শ্যামল কাকা

পড়াশোনায় অমনোযোগী, স্কুলে একপ্রকার ঠাট্টার পাত্র টুবাই আজ সকলের খুব প্রিয় হয়ে উঠেছে। চার দেওয়ালের হিজিবিজি লেখাপড়া আকৃষ্ট করতে পারেনি টুবাইকে। কিন্তু বিপদের সময়ে বাবার সাথে এগিয়ে এসেছে সবার আগে। বাঁচিয়ে তুলেছে তিন তিনটি প্রাণ। স্কুলে জানালার ধারে বসে আকাশ, মাঠ দেখা টুবাইয়ের স্বপ্ন অপরিসীম। ব্যাকবেঞ্চার টুবাই এই বয়েসেই অনেকটা টপার