akkharbarta

অক্ষরবার্তা - একটি কিশোর বার্তা উদ্যোগ... আমাদের মূল লক্ষ্য উচ্চ মানের বই পাঠকের হাতে পৌঁছে দেওয়া... যোগাযোগ করুন - akkharbarta@gmail.com | www.akkharbarta.in

ভ্রমণ । বৈশাখ ১৪৩৩



লাদাখ এক শান্তির উপত্যকা











জবা চৌধুরী

আটলান্টা, যুক্তরাষ্ট্র

এটা আমার দ্বিতীয়বার লাদাখ বেড়াতে যাওয়া। দেশের ওই একটি প্রান্তর যেখানে গেলেই আমার মন ভালো হয়ে যায়। হিমালয় ঘিরে রেখেছে লাদাখকে চারপাশ থেকে। সেখানে পর্বতমালা স্বাগত জানায় পর্যটকদেরকে। এই আতিথেয়তার উষ্ণতা আমাকে মুগ্ধ করে, নীরবতা আমাকে ভালোবাসতে শেখায় আর, নির্জনতা শেখায় হিমালয়ের বিশালত্বকে অনুভব করতে। এই শান্তির বাতাবরণ নিজেকে যেন চিনতে শেখায় নতুন করে।

প্রথমবার আমি লাদাখ যাই ২০১৮ সালে তখনও সেটি ছিল জম্মু কাশ্মীর রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত জম্মু কাশ্মীরের পুনর্গঠন আইন পাস করার পর ২০১৯ সালের ৩১ অক্টোবর লাদাখ একটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয় সে যাইহোক, যখন বেড়ানো নিয়েই কথা বলছি, তখন দ্বিতীয়বার লাদাখ যাচ্ছি

এই কথাটুকু উচ্চারণের মধ্যে অবশ্যই একটা  অজানা টান লুকিয়ে আছেতা বলতেই হবে! সত্যি বলতে কি সেখানে আকাশ ছোঁয়া পর্বত আর ঠান্ডা হাওয়ার স্পর্শ মিলেমিশে তৈরি করে এক অদ্ভুত শান্তি পৃথিবীর বুকে এমন কিছু জায়গা আছে, যেখানে পৌঁছে মনে হয়এটাই হয়তো জীবনের আসল সংজ্ঞা আমার কাছে লাদাখ ঠিক তেমনই

ভ্রমণপিপাসুদের কাছে পছন্দের তালিকায় লাদাখ থাকবে না, হতে পারে না কিন্তু লাদাখের উচ্চতা বয়স্ক পর্যটকদের কাছে চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়ায় অনেক সময় সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে লাদাখের উচ্চতা ১০ হাজার ফুটেরও বেশি তাছাড়া লাদাখে বেশ কিছু পর্যটন কেন্দ্র রয়েছে, যেগুলির উচ্চতা ১৮ হাজার ফুটের কাছাকাছি শুধু বয়স্ক কেন, একেবারেই সুস্থ কম বয়সি মানুষজনও বেশি উচ্চতায় গিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়তে পারেন একে বলা হয়অ্যাকিউট মাউন্টেন সিকনেস উচ্চতার কারণে আচমকা অক্সিজেনের মাত্রা কমে গেলে কী করা প্রয়োজন তা আগে থেকেই ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে জেনে রাখা উচিত আমার হাজব্যান্ড স্বপন নিজে একজন ডাক্তার বলে ব্যাপারে ওর উপদেশ মতো চলেছি জার্নির কয়েকদিন আগে থেকেই



 

এবছরের সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি, আমি, স্বপন, স্বপনের বন্ধু অসিত্দা এবং ওর স্ত্রী শর্মিষ্ঠা এই চারজন মিলে পা বাড়ালাম লাদাখের পথে বারোদিনের এই সফর

লেহ শহরের শান্তি স্তুপ (Shanti Stupa) থেকে মাত্র দেড় কিলোমিটার দূরে ছিল আমাদের থাকার ঠিকানা পাঁচদিন আমরা ছিলাম ওখানে প্রতিদিন ভোরে সূর্য ওঠার আগেই আমি আর স্বপন চলে যেতাম শান্তি স্তূপের সেই বিশাল চত্বরে যেখানে রয়েছে লাদাখি বৌদ্ধদের শান্তির বার্তা ছড়ানোর একটি ধ্যান এবং শ্রদ্ধা নিবেদনের স্থান এটি লেহ শহর থেকে পাঁচ কিলোমিটার দূরে এবং সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে এর উচ্চতা ১১,৮৪১ ফুট ওখানে দাঁড়িয়ে প্রত্যেক সকালে আমরা দেখতাম লেহ শহরটিকে সেই দৃশ্য দেখে মনে হতো যেন প্রকৃতি নিজেই নিজের বুকে এঁকে রেখেছে এক নিঃশব্দ চিত্র পাহাড়গুলো কথা বলে না, অথচ তাদের নীরবতাতেই লুকিয়ে থাকে জীবনের গভীর অর্থ এখানকার মানুষজনের মুখে থাকে এক অনন্ত হাসি, চোখে এক সহজ উজ্জ্বলতা ওদের  আতিথেয়তার উষ্ণতায় মুগ্ধ না হয়ে উপায় নেই

কলকাতা থেকে প্লেনে শুরু হয়েছিল আমাদের যাত্রা তারপর  দিল্লি থেকে লেহ শহর দিল্লি থেকে লেহ শহরের আকাশপথ মুহূর্তে মনকে খুশিতে ভরে দিয়েছিল জানলার বাইরে মেঘের আস্তরণ পেরিয়ে যখন বরফে ঢাকা পাহাড়ের চূড়াগুলো দেখা দিল, মনে হল যেন স্বপ্নের রাজ্যে উড়ে যাচ্ছি

লেহ বিমানবন্দরে নামতেই শীতল হাওয়া মুখে লাগলতীক্ষ্ণ, অথচ কোমল মনে হলো বাতাসে এমন কিছু আছে, যা এক মুহূর্তেই আমার ক্লান্তি কেড়ে নিলো লেহ-তে আমাদের থাকার জায়গাটা অনেক বছর ধরেই এক তাই কোনোরকম চিন্তা ছাড়াই এয়ারপোর্টের বাইরে পা বাড়ালাম আমি আর স্বপন দেখলাম সামনে হাসিমুখে দাঁড়িয়ে মিস্টার পং লেহ শহর থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে রিওয়াঙ রেসিডেন্স নামে সুন্দর একটি হোটেলের মালিক পং গত দশ বছরে স্বপন লাদাখে গেছে পাঁচবার এতগুলো বছরে মিস্টার পং হয়ে উঠেছে আমাদের আত্মীয়তুল্য আমাদের থাকা, খাওয়ার সব পছন্দ ওর নখদর্পণে আমরা যখন এয়ারপোর্ট থেকে পং-এর হোটেলে এসে পৌঁছলাম তখন গোধূলির আলো দিনশেষে বিদায়ের পথে হোটেলের লবিতে বসে গরম কফির কাপে চুমুক দিতে দিতে কাঁচের জানালা দিয়ে দেখছিলাম সূর্যাস্তের সোনালি আলো কীভাবে পাহাড়ের গায়ে মিশে যাচ্ছে মনে হচ্ছিল, প্রকৃতি যেন প্রতিদিন নিজের এক নতুন ছবি আঁকে এখানে

সেদিন সন্ধ্যায় একবার ঘুরে এলাম আমরা শান্তি স্তূপে শান্তি স্তূপে পৌঁছে সত্যি মনে হল, এর নামের মধ্যেই লুকিয়ে আছে এর সারাংশ সাদা স্তূপের গায়ে বাতাস বয়ে যায়, প্রার্থনার পতাকা উড়তে থাকেপ্রতিটি রঙ যেন জীবনের পাঁচ উপাদানের প্রতীক দূর থেকে তুষারাচ্ছন্ন শৃঙ্গের দিকে তাকিয়ে নিজের মধ্যেকার অস্থিরতাগুলো যেন মুছে গেল পরের দিন সকাল থেকে শুরু হলো আমাদের লাদাখ ভ্রমণ আমরা দেখলাম পাহাড়ের উপর অবস্থিত লেহ প্যালেসএটি একটি প্রাচীন রাজকীয় স্থাপত্যের নিদর্শন দেখলাম শে মনাস্ট্রি, থিকসে মনাস্ট্রি প্রত্যেকটি বৌদ্ধ মঠ থেকেই দেখা যাচ্ছিলো চারপাশে হিমালয়ের সারি বাঁধা পর্বতমালা আর মাঝখানে ছড়িয়ে থাকা লেহ শহর অপূর্ব সেই দৃশ্য!

প্রথমবার এসে লামায়ারু মোনাস্ট্রিতে গিয়ে আমার খুব ভালো লেগেছিলো এবার আমরা আবারো গেলাম লেহ শহর থেকে বেশ কয়েক ঘণ্টা দূরে লামায়ারুতে গিয়ে একরাত আমরা ওখানে থাকলাম

যারা লাদাখ বেড়াতে আসে, নুব্রা ভ্যালি তাদের কাছে এক বিশেষ আকর্ষণের নাম ওটা হলো  মরু বরফের মিলনক্ষেত্র আমরা গেলাম খারদুং লা এর উচ্চতা ১৭,৯৮২ ফুট আর এটি হলো বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু গাড়ি চলাচলকারী রাস্তা ওই পাহাড়ের গা বেয়ে ওঠা ওই আঁকাবাঁকা রাস্তায় গাড়ি চালানো অবশ্যই একটা চ্যালেঞ্জ কিন্তু মিস্টার পং খুব অভিজ্ঞ এবং পারদর্শী একজন ড্রাইভার আমাদেরকে দিয়েছিলো বলে অনেকটা নির্ভয়ে আমরা সেই উচ্চতায় অনায়াসে গিয়ে সেই সৌন্দর্য উপভোগ করতে পেরেছি

নুব্রায় দেখলাম বরফঘেরা পর্বতের মাঝখানে এক বিস্তীর্ণ মরুভূমি! সাদা বালির উপর দিয়ে দুই কুঁজওয়ালা ব্যাক্ট্রিয়ান উটের দল চলেছে ধীরে ধীরে তাদের পায়ের শব্দও যেন এই নীরবতার মধ্যে সুর তোলে উটের পিঠে চড়ে ঘুরে বেড়ালাম অনেকটা সময় স্বপন সেখানে প্রচুর ছবি তুললো সন্ধ্যায় সূর্যাস্তের আলো যখন বালির ওপর ঝরে পড়ল, মনে হল যেন সোনার নদী বইছে

২০১৮ সালে প্রথমবার প্যাংগং লেক দেখে মনে হয়েছিল যেন  আকাশের প্রতিবিম্ব এর জলের  নীলের এত শেড একসঙ্গে আগে কখনও দেখিনি কখনও গাঢ় নীল, কখনও সবুজাভ নীলরোদ্দুরের সঙ্গে সঙ্গে বদলে যায় এর রঙ, যেন লেকটি নিজেই এক জীবন্ত ক্যানভাস ওখানে আমরা থাকলাম দুরাত জলের ধারে বসে দীর্ঘ সময় চুপচাপ তাকিয়ে ছিলাম কোনো কথা ছিল না, শুধু বাতাস, জলের মৃদু ঢেউ আর পাহাড়ের গা ঘেঁষে বয়ে যাওয়া মেঘের দল স্বপন ছবি তুললো প্রাণ ভরে, কিন্তু আমার মন তখন এক অন্য জগতে মনে হচ্ছিল, জায়গাটা শব্দহীন প্রার্থনার মতোযেখানে হৃদয় নিজেই নিজের সঙ্গে কথা বলে

 

 

এবার আমরা গেলাম Tso Moriri লেক দেখতে, যা আগে আমার দেখা হয়নি কিন্তু স্বপন একবার এখানে এসেছিলো কয়েক বছর আগে লাদাখের শেষ কয়েকদিন কাটালাম Tso Moriri লেকের কাছে রাস্তা লম্বা, কষ্টকর, কিন্তু প্রতিটি মুহূর্তে পুরস্কারও বটে পথের দুধারে নির্জনতা, মাঝে মাঝে দেখা মেলে যাযাবর পশুপালকদের তাঁবু তাদের হাসিতে যে সহজতা, তা শহরের আলোয় হারিয়ে গেছে অনেক আগেই

ভ্যাকেশনের দিনগুলো প্রায় যখন শেষের দিকে তখন আরও কিছু সুন্দর জায়গা দেখলাম এর মধ্যে একটি হলো  Nyoma নামে একটি ছোট্ট সুন্দর গ্রামে এছাড়া গেলাম কারাকোরাম এবং হিমালয় পর্বতমালার মাঝখানে, ভারতের সবচেয়ে উত্তরের একটি গ্রাম, তুরতুক (Turtuk). এই গ্রামটি  ভারত পাকিস্তানের লাইন অফ কন্ট্রোলের খুব কাছাকাছি এবং নানারকম ফলমূলের জন্য, বিশেষ করে এপ্রিকটের জন্য বিশেষভাবে পরিচিত

বারোদিনের এই সফরের শেষে যখন ফিরে আসছিলাম, মনটা ভার হয়ে ছিল যেন কিছু ফেলে যাচ্ছি এখানেনিজের এক টুকরো অস্তিত্ব লাদাখ শুধু পাহাড় বা হ্রদের জায়গা নয়, এটা এক আত্মিক অভিজ্ঞতা এখানে সময়ের গতি ধীর হয়ে যায়, আর মানুষ নিজের ভেতরে ফিরে যায়

ফিরে এসে যখন শহরের কোলাহল শুনলাম, তখন বুঝলামলাদাখের নীরবতা কত অমূল্য ছিল সেখানে গিয়ে শিখেছি, শান্তি আসলে বাইরে নয়, ভিতরে আর সেই শান্তিকে ছুঁতে হলে, কখনও কখনও দূর পাহাড়ের ডাকে সাড়া দিতে হয়

দ্বিতীয়বারের সফর হয়েও লাদাখ আমার কাছে নতুনই রয়ে গেল প্রতিবারই এই জায়গা আমাকে নতুন কিছু শেখায়সহজতা, স্থিরতা, ভালোবাসা আর কৃতজ্ঞতা হয়তো এটাই লাদাখের আসল জাদুপ্রকৃতির নিস্তব্ধতার মধ্য দিয়ে মানুষকে তার নিজস্ব সুরে ফিরিয়ে আনে

আমি জানি, আবারও ফিরে যাব সেখানেযখনই জীবনের ভিড়ে একটু থামতে চাইব, যখনই মনে হবে নিজেকে আবার চিনতে হবে নতুন করে কারণ, লাদাখ মানে কেবল ভ্রমণ নয়লাদাখ মানে আত্মার এক যাত্রা, যেন এক জীবনের ছোট্ট পুনর্জন্ম