akkharbarta

অক্ষরবার্তা - একটি কিশোর বার্তা উদ্যোগ... আমাদের মূল লক্ষ্য উচ্চ মানের বই পাঠকের হাতে পৌঁছে দেওয়া... যোগাযোগ করুন - akkharbarta@gmail.com | www.akkharbarta.in

গল্প ২ । চৈত্র ১৮৩২












জাদুকর












বিমলেন্দ্র

চক্রবর্তী

আগরতলা, ত্রিপুরা



 

একদিকে পাহাড় অন্যদিকে ফসলের মাঠ মাঝখানে শ্যামল সবুজ একটি গ্রাম। এই গ্রামে একটাই স্কুল। বনলতা ফ্রি প্রাইমারী স্কুল। এই স্কুলে ক্লাস থ্রিতে পড়ে পাতা। মা ব্যস্ত থাকেন রান্না ঘরে, বাবা সপ্তাহে একদিন আসেন, ছুটি পেলে, রবিবার। বাড়িতে একা একা সময় কাটেনা পাতার। তার দশ বারোজন বন্ধু, সবই স্কুলের। তাই পাতা স্কুল মিস করে না কোনদিন।

সে দিন স্কুলের প্রেয়ারে হেড মাষ্টার মশাই বললেন এই স্কুলেরই একজন প্রাক্তন ছাত্র এখন স্বনামধন্য ম্যাজিশিয়ান। ম্যাজিক দেখিয়ে এরই মধ্যে গোটা বিশ্বে যথেষ্ট সুনাম অর্জন করেছেন। বিশ্বখ্যাত সেই ম্যাজিশিয়ান বহু বছর পর গ্রামের বাড়িতে আসবেন। হেড স্যারকে তিনি কথা দিয়েছেন গ্রামে এলে একদিন স্কুলের ছাত্রছাত্রী ভাইবোনদের করেকটি ম্যাজিক দেখাবেন, যা খোলা মঞ্চ ও মাঠে দেখানো সম্ভব। ঠিক হলো পুজোর বন্ধ যেদিন পড়বে তার ঠিক একদিন আগে স্কুলের মাঠেই হবে সেই ম্যাজিক শো। এই আনন্দের খবর মুহূর্তে ছড়িয়ে পড়ে চারিদিকে। এখন শুধু অপেক্ষা— স্কুল মাঠের একপাশে ছোট্ট একটা মঞ্চ করা হলো। পেছনে টাঙ্গানো হলো ম্যাজিশিয়ানের সঙ্গে করে আনা একটা কালো কাপড়ে সাদা কালিতে আঁকা হাড় হিম করা কিছু ভুতুড়ে ছবির কোলাজ।

দুপুর থেকেই ছাত্রছাত্রী ও তাদের অভিভাবকগণ আসতে শুরু করলেন। বিকেল তিনটায় শো শুরু হবে। দেখতে দেখতে পুরো মাঠ ভর্তি। পাতাও মা- বাবার সাথে একদম মঞ্চের সামনে।

ঝমঝম করে বাজনা বেজে উঠলো। মাথায় সাহেবী টুপি, কালো পোশাক পরে ম্যাজিশিয়ান এলেন। স্যার ও ম্যাডামদের প্রণাম করে দুহাত নেড়ে হাসতে হাসতে মঞ্চে উঠতেই হঠাৎ দেখা গেল তার দুইহাতে কোত্থেকে যেন হুট করে চলে এলো দুটি টেনিস বল। তারপর বল দুটি এহাত ও হাত যত করছে ততই বলের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে। বল ধরছে, বল ছুঁড়ছে। দুই থেকে বেড়ে তিন, চার, পাঁচ, ছয় বেড়ে বেড়ে একদম দশ।

প্রথম খেলাতেই যেন বাজিমাৎ। সমস্ত দর্শক ও ছাত্রছাত্রীরা হাততালি দিতেই ম্যাজিশিয়ান একটু ঝুঁকে মাথা নিচু করে প্রণাম জানালো বড়োদের, ছোটোদের দুহাত নেড়ে জানালো অভিনন্দন। তারপরই বলগুলোকে হাওয়ায় উড়িয়ে দিয়ে কি যেন ডান হাত দিয়ে খপ করে ধরে মুখে পুরে চাকুম চুকুম করে একটু হেসে দু’হাত দিয়ে মুখ থেকে টেনে বের করতে লাগলেন লাল, নীল, হালুদ, সবুজ ফিতার মতো কাগজ। বেরুচ্ছে তো বেরুচ্ছেই। দুই পাশ থেকে তারই দুই সহযোগী সেই ফিতের মতো কাগজের স্তূপ মস্ত দুটি ব্যাগ ভর্তি করে মুখগুলো বেঁধে ম্যাজিশিয়ানের পাশে দাঁড়াতেই ম্যাজিশিয়ান তার কালো কাপড়ের পোশাক থেকে পাখির ডানার মতো দু’হাত নাড়াতেই ফুস করে ওরা দু’জনই অদৃশ্য হয়ে যায়। তাই দেখে ছোটোরা কেমন যেন চুপ হয়ে যায়। বড়োরা অবাক বিস্ময়ে হাততালি দিতেই দু’পাশের দুটো ব্যাগ হঠাৎ নড়তে থাকে। কি অবাক কান্ড, ম্যাজিশিয়ান তার জাদু কাঠি ছুঁইয়ে ব্যাগ দুটো খুলতেই তার ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো তারই দুই সঙ্গী যারা এতোক্ষণ তার মুখ থেকে রঙিন কাগজ টেনে টেনে বের করেছিলো। ব্যাগদুটি এবার উপুড় করে দেখালেন, কিছু নেই একদম খালি, কোথায় গোল এতো এতো কাগজ আর কিভাবে ব্যাগের ভিতর ঢুকে গিয়েছিল ম্যাজিশিয়ানের দুই সঙ্গী। এ যেন এক অবাক বিস্ময়।

এদিকে ম্যাজিশিয়ান স্কুলে ম্যাজিক দেখাবে শুনে। পাতা’র বাবা পাতাকে বিশ্ববিখ্যাত জাদুকর জাদুসম্মাট পি.সি. সরকারের অনেক মজার মজার ম্যাজিকের কথা শুনিয়েছিলেন। পাতা আজ স্বচক্ষে দেখছে আর অবাক হচ্ছে। ম্যাজিক দেখতে দেখতে মাঠজুড়ে ছোটোরা আনন্দে চিৎকার করছে আবার কখনও ভয়ে ওরা জড়িয়ে ধরছে ওদের মা-বাবাকে।

একটা ছোট বাক্স এনে রাখা হলো মঞ্চে। ম্যাজিশিয়ান বাক্সটা উল্টে পাল্টে সব্বাইকে দেখালেন খালি বাক্স, ভেতরে কিচ্ছুটি নেই। এবার এই খালি বাক্স থেকে হাত ঢুকিয়ে টেনে বের করলেন একটা সাদা খরগোশ। তারপর ফের খরগোশটি বাক্সের ভেতর রেখে একটু হাতটা নেড়ে বের করে আনলেন একটি ফুরফুরে করতর। কবুতরটাকে আকাশে উড়িয়ে দিয়ে হাততালি দিতেই বাক্স থেকে বেরিয়ে এলো একটি ছাগলছানা। ছাগলছানাটাকে জাদুকাঠি ছোঁয়াতেই কোকর ক্ব করে ডেকে উঠলো একটা লাল ঝুঁটি মোরগ। মোরগটাকে কালো কাপড়ে ঢেকে জাদুকর হিং টিং ছট বলে কাপড়টা সরাতেই মোরগটা হঠাৎ হয়ে গেল কী সুন্দর একটা পরীর মতো মেয়ে, এ অনেকটা যেন পাতা’র মতো উজ্জ্বল-ফুরফুরে। এবার মঞ্চে আসার জন্য ম্যাজিশিয়ান একে ডাকছে ওকে ডাকছে কিন্তু ভয়ে কেউ মঞ্চে উঠতে চাইছেনা। বলা তো যায় না ম্যাজিশিয়ান মন্ত্র বলে আর জাদু কাঠি ছুঁইয়ে কাকে কি বানিয়ে ফেলেন। ভাবতে ভাবতে পাতা বাবা ও মায়ের হাত চেপে ধরে। মনে মনে ভাবে ইস বাড়ি থেকে তার সখের পুতুলটাকে সঙ্গে করে নিয়ে এলে খুব ভাল ছিল। ম্যাজিশিয়ান দু’হাত নেড়ে মন্ত্র বলে ঠিক একটা ফুটফুটে ছোটবোন এনে দিতে পারতো। তাহলে কিযে মজা হতো। সারাদিন আমি আর বোন একসাথে খেলতাম, পড়তাম, ঘুমাতাম, গল্প করতাম।

এবার দর্শক আসন থেকে দুইজন গিয়ে ম্যাজিশিয়ানের দুই চোখ কালো কাপড়ে শক্ত করে বেঁধে দিলেন। চোখ বাঁধা অবস্থায় তিনি বলে দিচ্ছেন কে কেমন জামা পরছে, কার চোখে চশমা। কার হাতে ঘড়ি। পাতা এতোসব দেখছে আর অবাক চোখে বাবা-মায়ের দিকে তাকাচ্ছে। মাঠ জুড়ে হাততালির পর হাততালি। মজাদার সব ম্যাজিক দেখে কেটে গেল দুইঘটা। শেষটায় কি করবেন, কি খেলা দেখাবেন সেটা ম্যাজিশিয়ান খোলাখুলি বললেন না। শুধু বললেন এবার মঞ্চ ছেড়ে আমরা বাইরে যাব। স্কুল ঘরের সামনে আমি দাঁড়াবো আর তোমরা ছোটোরা সব্বাই তোমাদের বাবা-মাকে নিয়ে দাঁড়াবে স্কুলের দিকে মুখ করে আমার সামনে। আমি ধুনুচির ধোঁয়া দিয়ে দেখাবো এক মজার খেলা। এই বলেই ম্যাজিশিয়ান স্কুল ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে ধোঁয়া ওঠা ধুনুচিটি দুইহাতে ধরে নাড়াচ্ছে আর বিড় বিড় করে কিসব মন্ত্র বলছে। সবাই হাঁকরে তাকিয়ে আছে কি হয় কি হয়। ম্যাজিশিয়ান হঠাৎ মাঠ কাঁপিয়ে দুহাত তুলে চিৎকার করে বললেন- ভ্যানিশ-ভ্যানিস-

পাতা তাকিয়ে দেখে তাদের পুরো স্কুলটা আস্তে আস্তে অদৃশ্য হয়ে গেছে। ভয়ে বাবাকে জড়িয়ে ধরে পাতা। দুচোখে জল। স্কুলটাই যদি হারিয়ে যায় তখন কি হবে তাদের, পড়াশুনো, বন্ধুবান্ধব। আর ভাবতে পারে না পাতা। মাঠ জুড়ে সমস্ত ছাত্রছাত্রীরা কান্নায় ভেঙে পড়ে। কান্নার শব্দ ছাড়া আর কিছুই শোনা যাচ্ছে না। এমন সময় দুই হাত তুলে ম্যাজিশিয়ান সব্বাইকে অভয় দিয়ে বলে প্রিয় ভাই ও বোনেরা তোমরা সবাই এবার তোমাদের স্কুলটা ফিরে আসার জন্য প্রার্থনা করো। মনে মনে বলো ম্যাজিশিয়ান আমাদের স্কুলটা ফিরিয়ে দাও।

কারো মুখে কোন শব্দ নেই। সবাই হাতজোড় করে বসে আছে। প্রার্থনা করছে। আমাদের স্কুলটা আমাদের ফিরিয়ে দাও ম্যাজিশিয়ান। আমাদের সুন্দর স্কুলটা ফিরিয়ে দাও।

প্রায় দুই মিনিট পর হঠাৎ স্কুলের ঘণ্টা বেজে উঠলো। পাতা তাকিয়ে দেখে তাদের হারিয়ে যাওয়া স্কুলটা আস্তে আস্তে একদম ঠিকঠাক ফিরে এসেছে। মাঠ জুড়ে তখন সবার কি আনন্দ।

এমন আনন্দ আর কোনদিনই পায়নি পাতা।