স্কুল ছুটির পর বাড়ি ফিরছিল মুন্না আর সুমি। দুজনেই দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্রী। একে অপরের প্রাণের বন্ধু। এক পাড়াতে বাড়ি না হলেও খুব বেশি দূরেও নয়, আবার একেবারে কাছেও নয় দুজনের বাড়ি। মুন্নাদের বাড়ির পাশ দিয়েই সুমিদের বাড়ি যেতে হয়। স্কুলে যাবার পথে সুমি মুন্নাকে ডেকে নেয়। মুন্না তৈরি হয়ে অপেক্ষা করে থাকে। দুজনে একসঙ্গে স্কুলে যায়, আসে। এর ব্যত্যয় খুব একটা ঘটে না।
তিন চার দিন বন্ধ থাকার পর স্কুল খুলেছে। স্কুলে যাবার জন্য তৈরি হয়ে মুন্না উন্মুখ হয়ে অপেক্ষা করছিল সুমির জন্য। ভেবেছিল স্কুলে যাবার পথে সুমিকে খবরটা দিয়ে চমকে দেবে। যতক্ষণ মনের কথা একজন আরেকজনকে বলতে না পারছে ততক্ষণ অস্হির থাকে, পেটের ভাত হজম হয় না।
কিন্তুু সুমির ডাক শুনে সেদিন তড়িঘড়ি ঘর থেকে বেরোতেই দীপা দিদিমনির সঙ্গে দেখা হয়ে গেল বাড়ির মুখে। তিনিও স্কুলে যাচ্ছেন। ফলে বাধ্য হয়ে তিন জনকে একসঙ্গেই স্কুলে যেতে হল। সুমিকে খবরটা দেওয়া গেল না।
ক্লাশে বসে মুন্না সারাক্ষণ উসখুস করে কাটিয়েছে। কখন ছুটি হবে! কখন দু’বান্ধবী একসঙ্গে বাড়ি ফিরবে! সুমি কে খুশির খবরটা দেবে! ছুটির ঘণ্টা বাজতেই আর দেরি নেই! স্কুলের গেট পেরিয়ে উচ্ছ্বসিত মুন্না দৌড়ে ছুটে আসে সুমির পাশে।
বলে --- এবার পুজোয় তোরা কোথাও যাচ্ছিসরে সুমি?
--- না রে মুন্না। এবার বাবার এক পুরানো বন্ধু পুজোর ছুটিতে আমাদের বাড়িতে বেড়াতে আসবে। বাবার ছোটোবেলার স্কুলের বন্ধু। বাবা বলে দিয়েছেন, বাড়ি থেকে কারো এবার এক পা’ও নট নড়নচড়ন।
উপছে-পড়া খুশিতে ডগমগ হয়ে মুন্না উচ্ছ্বসিতভাবে বলে ওঠে --- জানিস, আমরা এবার পুরী যাচ্ছি সুমি!
খবরটা শুনে হঠাৎ খুশির ছোঁয়া লাগে সুমির মনেও। বলে --- বলিস কি! পু্রী! বাহ্, তোর কি মজারে মুন্না।
সুমির খুশির ঢেউ এসে মেশে মুন্নার উচ্ছ্বল খুশির ধারায়।
দ্বিগুণ বেগবান খুশির অভিব্যক্তি ভিতরে চেপে রাখতে পারেনা মুন্না।। প্রগলভ উচ্ছ্বাসে সে বলে ওঠে --- জানিস সুমি, অনেকদিন থেকেই মনে মনে আমার না সমুদ্র দেখার খুব ইচ্ছে! টিভিতে, সিনেমায় যখন সমুদ্র দেখি, কি যে ভালো লাগে দেখতে! কি সুন্দর নাচতে নাচতে উথাল পাথাল ঢেউগুলো দূর সমুদ্র থেকে ছুটে আসে কিনারে! সৈকতে বালির বুকে সাদা ফেনার বুদবুদ হয়ে ছড়িয়ে পড়ে রুমঝুম রুমঝুম শব্দ করে। যেন ঘাঘরা পরে নুপূর পায়ে কারা যেন একটানা নেচেই চলেছে!
মুন্না নিমেষে হারিয়ে যায় কল্পলোকে। যেন চোখের সামনেই দেখতে পাচ্ছে সমুদ্র।
সুমি বলে --- ও! তুই তো আবার নাচও শিখিস! তাই সব কিছুতেই নাচ দেখিস, তাই না! তা কবে যাবি?
--- বাবা বোনাসের টাকাটা হাতে পেলেই টিকিট কাটবেন বলেছেন। ঠিক হয়েছে, মহালয়ার আগের দিন আমরা রওনা দেব।
--- কে কে যাচ্ছিস তোরা?
--- বাবা, মা আর আমি।
--- ও মা! সঞ্জুদা যাবে না ?
--- ভাইএর ব্যাঙ্ক রিক্রুটমেন্টের পরীক্ষা আছে। ভাই, পিসি, দাদু বাড়িতে থাকবেন।
--- সমুদ্র দেখতে আমারো খুব ইচ্ছে করেরে মুন্না।
--- ইচ্ছে করছে এখনি উড়ে চলে যাই। ক’দিন ধরে ঘুরে ফিরে কেবল পুরীর কথাই মনে আসছে! আগরতলা থেকে প্লেনে চড়বো। সাদা মেঘেদের উপর দিয়ে ভাসতে ভাসতে চলে যাব কলকাতা। তারপর হাওড়া থেকে ট্রেনে চাপবো। জানালার পাশে গিয়ে বসবো। ছুটন্ত ট্রেনে বসে দেখবো, কত বাড়ি ঘর গ্রাম গঞ্জ বাজার হাট ফসলের মাঠ পেছনে ফেলে ছুটে চলেছি অবিরাম!
কিছুক্ষণের জন্য আনমনা হয়ে পড়েছিল মুন্না।
সুমি আলতো ধাক্কা দিয়ে বলে, কোথায় হারিয়ে গেছিস! হোঁচট খাবি তো! বাড়ির দরজায় এসে গেছিস সে খবর আছে?
সুমির ডাকে মুন্নার সম্বিত ফেরে। বাড়িতে ঢুকতে ঢুকতে হাঁক দিয়ে সুমিকে বলে --- কালকে স্কুলে যাবার সময় ডেকে নিবি কিন্তু। আচ্ছা বলে সুমি এগিয়ে যায়। মুন্না বাড়ি ঢোকে।
ড্রয়িং রুম ঘেষা করিডর দিয়ে পড়ার ঘরের দিকে ছুটে যাচ্ছিল মুন্না। ড্রয়িং রুমে বসে মা মীরা রায় আর বাবা অসীম রায় নিজেদের মধ্যে কথা বলছিল। মা -বাবার কথোপকথনের দু’একটি টুকরো ছিটকে মুন্নার কানে এল। খোলা দরজার আড়ালে মুন্না চুপ করে থমকে দাঁড়াল এবং কান পেতে রইলো।
অসীম বলছিলো --- বাবার এক্সরে রিপোর্টটা ডাক্তার সেনকে দেখালাম।
--- ডাঃ সেন কি বললেন?
--- বললেন, ইমেডিয়েটলি অপারেশনটা করিয়ে নেওয়া দরকার।
--- বাবা কি জানেন ব্যাপারটা?
--- না, এখনো জানাইনি। কিন্তু অপারশনটা এক্ষুণি না করালে অবস্হাটা আরো জটিল হয়ে পড়বে!
--- তাহলে তো, দেরি না করে অপারেশনটা করিয়ে নেওয়াই ভাল।
অসীম ভাবছিল মুন্নার কথা। গেল দু’বছর ধরে নানা কথায় ভাঁড়িয়ে মেয়েটাকে এবার পুরী নিয়ে যাবো বলে কথা দিয়েছিলাম। বাবার অপারেশন করাতে গেলে পুরী যাওয়া বাতিল করতে হবে। বোনাসের হাতে গোনা টাকাটা দিয়ে দুটো কাজ করা যাবেনা। তাছাড়া, সময়টাওতো একই পড়ে গেছে! মুন্নাকে কি করে বোঝাবো! মেয়েটা ক’দিন ধরে মনের আনন্দে বন্ধুদের বলে বেড়াচ্ছে ‘আমরা এবার পুরী যাবো বেড়াতে’। কত আশা করে আছে। ওর মনটা একেবারে ভেঙে যাবে। অথচ বাবার অপারেশনটা অত্যন্ত জরুরি। কি যে করি?
অসীমের চিন্তান্বিত মুখমণ্ডল দেখেই মীরা বুঝতে পারছিল যে সে মুন্নার কথাই ভাবছে! ভাবাটাই স্বাভাবিক। মীরাও মুন্নার কথাই ভাবছিল। মুন্নাতো দাদুকে সঙ্গে নিয়েই পুরী যেতে বায়না ধরেছিল। গোঁ ধরেছিল কিছুতেই দাদুকে ছাড়া যাবেনা। ঠাকুরমা মারা যাবার পর মুন্না আর সঞ্জুই বাবার জীবনের অবলম্বন হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ছেলে মেয়ে দুটোও দাদু বলতে অজ্ঞান। শেষপর্যন্ত দাদুই মুন্নাকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে রাজি করিয়েছে --- ‘দাদুভাই, আমিতো পুরী গিয়েছি অনেকবার। তাছাড়া, এখন জার্নির ধকল সইতে পারবোনা। মাত্রতো ছ’সাতটা দিন! তারপরইতো আবার ফিরে আসছো। যাও, মা - বাবার সঙ্গে বেড়িয়ে এসো’।
মীরা স্বামীর চিন্তান্বিত মুখমণ্ডল দেখে নীরবতা ভঙ্গ করে বলল, --- এখন অন্য কিছু ভাবার উপায় নেই অসীম। আমি বুঝতে পারছি তুমি মুন্নার কথা ভাবছো! আপাতত মুন্নার ভাবনা ছেড়ে দাও।
অসীম অসহায় দৃষ্টিতে মীরার পানে তাকায়।
ওদিকে সব শুনে মুন্না কোনো শব্দ না করে আবার ঘর থেকে বেরিয়ে আসে। অসীম, মীরা কিছুই টের পায়না। রাস্তায় নেমে সুমিকে মোবাইলে ফোন করে।
বলে --- সুমি তুই ঘরে আছিসতো? আমি এক্ষুণি তোর ওখানে আসছি! খুব আর্জেন্ট!
--- কেন? কি হয়েছে রে মুন্না? তোর গলা কাঁপছে কেন?
--- আমাদের পুরী যাওয়াটা... ! বলতে গিয়ে কান্না আসে !
--- তুই কাঁদছিস কেন বোকা? তোদের পুরী যাওয়া কেউ আটকাতে পারবে না! তুই আয় না! এমন প্ল্যান করবো না!
--- আমি আসছি!
কাঁদো কাঁদো স্বরে কথা কটি বলেই মুন্না ফোন কেটে দেয়। গা থেকে স্কুলের পোশাক না খুলেই ছুটে যায় সুমির কাছে। আধঘণ্টা পরে সুমিকে নিয়ে ফিরে আসে বাড়িতে। তখন দুপুর মাত্র গড়িয়েছে। অসীম, মীরা ড্রয়িং রুমেই বসা ছিল। অসীম ফোনে কারো সঙ্গে কথা বলছিলো। চোখে মুখে প্রবল দুঃশ্চিন্তার ছাপ।
সামনে এসে দাঁড়ায় মুন্না আর সুমি। যেন কিছুই শোনেনি ওরা। অসীম জিজ্ঞেস করে, ‘আজকে স্কুলে পুরো ক্লাস হয়েছে তাই না? এ-জন্যেই দেরি হল আসতে? তুই মুখটা গোমড়া করে আছিস কেন রে মা?’ মুন্নাকে উদ্দেশ্য করে বলে।
--- ওর পুরী যাওয়াটা হচ্ছে না আঙ্কল! তাই মনটা খারাপ! আমাকে টেনে নিয়ে এসেছে এখানে --- সুমি বলে।
অসীম, মীরা পরস্পরের চোখাচোখি হয়! অবাক হয়ে প্রশ্ন করে মীরা।
--- পুরী যাওয়া হচ্ছেনা কে বলেছে!
একটু থতমত খেয়ে সুমি বলে--- না না, কেউ বলেনি আন্টি! বড় দিদিমনি আজকে প্রেয়ারের সময় বলে দিয়েছেন, এবার পুজোর আগে এবং পরে স্পেশাল ক্লাস নেবেন স্যারেরা, দিদিমনিরা। কোর্স অনেক পড়ে আছে, তাই! আমাদের সবাইকে ক্লাস এটেন্ড করতে হবে। কোর্স শেষ করবে এই সময়টাতে।
বলতে গিয়ে একটুখানি হোঁচট খাচ্ছিল। মুন্না এগিয়ে আসে। বলে---’ যারা এটেন্ড করবেনা তাদের নম্বর কাটা যাবে। পুজোর পরেইতো টেস্ট পরীক্ষা। কেমিস্ট্রি, ফিজিক্সের স্পেশাল ক্লাস না করলেতো আমি ডাব্বা মারবো! আমার কোথাও যাওয়া হবে না।
হঠাৎ যেন তালাবন্ধ ঘরের চাবি আকাশ থেকে ছিটকে এসে অসীমের হাতে পড়ে। আগুপিছু না ভেবে অসীম লুফে নেয়। বলে --- ‘ঠিক আছে, ঠিক আছে মামনি, আমরা না হয় পরীক্ষার পরেই ঘুরতে যাবো। সুমিদেরও সঙ্গে নিয়ে নেবো। কি বলো মীরা?’
খুশি ঝরে পড়ে মীরার গলা থেকেও। --- ‘হ্যাঁ হ্যাঁ, তাহলেতো খুব ভালো হবে!’
সবাই যার যার মতো করে যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচে! বড় পাথর যেন সরে গেছে বুকের উপর থেকে! সুমি কিছুক্ষণ মুন্নার ঘরে কাটিয়ে বাড়ির পথে চলে যায়। অসীম মীরাকে চা করতে বলে চেয়ারে গা এলিয়ে দেয়।
মুন্নার দাদু অলকেশবাবু এ-সবের কোনো কিছু ঘুণাক্ষরেও জানতে পারেননি। দুপুরের ঘুম ভাঙতেই নিত্যদিনের মতো গ্রীল দেওয়া বারান্দার এক প্রান্তে বসে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেন বিকেলের অস্তাচলগামী সূর্যের পানে। হয়তো ভাবছিলেন, ‘অপরাহ্নের আকাশে অস্তাচলগামী সূর্যের মতো মানুষওতো একদিন নিষ্প্রভ হয়ে পড়ে জীবনের আকাশে, আমারই মতো’। সূর্যের ম্লান রক্তিম আভা ছড়িয়ে আছে তাঁর মুখমন্ডলে। মুন্না ছুটে এসে দাদুর সামনে দাঁড়ায়। চোখের কোনায় টলমল দু’ফোটা জল। মুন্নার চোখের পানে তাকাতেই অলকেশবাবু বুকের ভিতরে একটা চিন চিন ব্যথা অনুভূত হয়। জিজ্ঞেস করে ---কি হয়েছে দিদি ভাই! তোমার চোখে জল কেন? বাবা বকেছে? মা কিছু বলেছে?
--- না দাদু, কেউ আমায় বকেনি।
‘তাহলে তোমার এত সুন্দর চোখ দুটোতে জল কেন দিদিভাই’ বলে মুন্নার হাত ধরে কাছে টেনে নেয়। আবেগে উদ্বেলিত মুন্না আর স্হির থাকতে পারেনা। দাদুর বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ে মুখ লুকিয়ে কাঁদতে থাকে। অলকেশ কিছুই বুঝে উঠতে পারেনা! বিহ্বল অন্তরে স্নেহমাখা হাত দুটি শুধু মুন্নার পিঠে বুলোতে থাকে। মুন্না নিঃশব্দে কেঁদেই চলে। অলকেশবাবু আর কিছু বুঝুক আর না বুঝুক, এটুকু অন্তত বুঝেছে যে, কোনো এক অবোধ্য কারণে কিশোরী নাতনির কোমল অন্তরের অতল থেকে মেঘ-ভাঙা বৃষ্টির মতো অবাধ্য আবেগের স্রোত নেমে আসছে ধেয়ে। তারই কোমল স্পর্শে অলকেশের বুকের ভিতরেও অপত্য স্নেহের সমুদ্রে উথলে ওঠে তরঙ্গরাশি। যেন উত্তাল পুরীর সমুদ্র! ছুটে আসছে ঢেউয়ের পর ঢেউ। ওই অবারিত তরঙ্গরাশির মাঝে পাল তুলে আনন্দে দুলে দুলে ভেসে চলে মুন্না!
অসীম আর মীরা যে কখন এসে পেছনে দাঁড়িয়েছে কেউ টের পায়নি। দীপা দিদিমনির মুখে মাত্র শুনে এসেছে, স্পেশাল ক্লাসের আসল রহস্য-কথা! তাদের চোখ বেয়েও নেমে আসে নীরব অশ্রুধারা।