akkharbarta

অক্ষরবার্তা - একটি কিশোর বার্তা উদ্যোগ... আমাদের মূল লক্ষ্য উচ্চ মানের বই পাঠকের হাতে পৌঁছে দেওয়া... যোগাযোগ করুন - akkharbarta@gmail.com | www.akkharbarta.in

গল্প ২ । বৈশাখ ১৪৩৩




ছোটকা গাছ











মহুয়া আচার্য

আগরতলা, ত্রিপুরা

অনেকদিন থেকেই টুকাই কথাটা জানে কিন্তু কাউকে তার কথাটা বলতে ইচ্ছে করে নি। কেন ইচ্ছে করে নি তা সে জানে না। কিন্তু সেদিন যখন তার ক্লাস থ্রির ফাইনাল পরীক্ষা শেষ হলো, মা তাকে নিয়ে ছোটকাদের বাসায় বেড়াতে গেলো সেদিন তার হঠাৎ মনে হলো কথাটা সে কাউকে বলে।  কিন্তু কাকে বলবে?

পাশাপাশিই দুটো বাড়ি তাদের আর ছোটকাদের। তাও পরীক্ষার জন্য মা কদিন তাকে আটকে রেখেছিলো। আজ প্রায় দশ বারো দিন পর সে ছোটকাদের বাসায় গেলো।

রাত্তিরে খাবার পর মা তার ছোট্ট পিঠটা চুলকে চুলকে ঘুম পাড়াচ্ছিলো আর তখনই টুকাইর হঠাৎ ইচ্ছে হলো যে কথাটা সে মাকে বলে। তার হাতটা মায়ের গায়ের উপর আলতো ফেলে মার বুকের একদম কাছে ঘেঁষে সে বলে - ‘মা জানো আমার ছোটকা কিন্তু একটা পাখি।’ মা একটুও না চমকিয়ে একটুও না হেসে, একটুও অবাক না হয়ে বলে - ‘জানি তো বাবা তোমার ছোটকা একটা এত্ত বড়ো পাখি নাও এবার ঘুমাও তো সোনা।’

মা আর কিছু বলে না। কিন্তু কেন জানি টুকাইর মনে হয় মা কথাটা বিশ্বাস করে নি। টুকাই বুঝে সে যাতে কথা না বাড়িয়ে চটপট ঘুমিয়ে পড়ে তাই মা কথাটা বলেছে। ছোট হলে কি হবে ক্লাস থ্রি হলে কি হবে টুকাই অনেক কিছু বুঝে কোনটা মিথ্যে করে মিছিমিছি বলা আর কোনটা সত্যি টুকাই ঠিকই বুঝতে পারে। কিন্তু একবার এতদিনে তার এই অমূল্য গোপন কথাটা যখন বলার ইচ্ছে হয়েছে, এখন আর তাকে আটকে রাখতে তার ইচ্ছে করছে না। বাবাকে বলবে? বাবার তো ছোট ভাই। বাবা হিরু বলতে অজ্ঞান। প্রচন্ড ভালোবাসে ছোটকাকে। বিশ্বাসই করবে না বলবে - ‘হিরু পাখি? তাহলে আমরা কি? এতো বড়ো হাত পা ওয়ালা মানুষ পাখি কোথায় পেলি বাবা? পাখা গুলো তবে কোথায় রাখে?’ বা হয়তো বলবে- ‘কি রে হারুকে কবে পোকা খেতে দেখলি?’ যেন পাখি হওয়ার আসল প্রমাণ পোকা খাওয়া, উড়তে পারা নয়।

বা হয়তো হা হা করে হাসবে যেন টুকাই একটা যা তা কথা বলে ফেলেছে। নাহ সে বাবাকে কথাটা বলবে না। বাবার হাসিটা তার বড় ভালো লাগে। হাসলে বাবাকে খুব ভালো দেখায়। এই হাসিটার উপর টুকাই রাগ করতে চায় না। চোখ বন্ধ করে সে মনে মনে ভাবে এমন কে আছে যাকে এতো বড়ো একটা গোপন কথাটা বলা যায়, যে মন দিয়ে শুনবে, হাসবে না, তাকে বিশ্বাস করবে। হঠাৎই তার মনে হয় - হ্যাঁ শেফাম্মাকে কথাটা বলা যায়। স্কুল থেকে ফিরে টুকাই শেফাম্মার সাথেই তো থাকে সারা দিন। তাকে মায়ের থেকে কোনোও কম ভালোবাসে না শেফাম্মা। মাঝে মাঝে তো তার মনে হয় শেফাম্মাই তাকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে। স্কুল ফেরত সব তাজা গল্পের ভাগাভাগি ও তার শেফাম্মার সাথেই হয়। এই কথাটা শুনে শেফাম্মা কেমন চমকিত হবে, তার মুখের ভাবটা কেমন হবে, তা ভেবে টুকাই নিজেই চমকিত হয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। পরদিন স্কুল থেকে ফিরে দিব্যি লক্ষীছানা হয়ে সে হাত মুখ ধোয়। ভাত খেতেও সময় নেয় না। তারপর মুখ ধুয়ে শেফাম্মার একদম গা ঘেঁষে বসে ঘোর লাগা গলায় বলে -’জানিস শেফাম্মা আমার ছোটকা না আসলে একটা পাখি।’

ছোটবেলা মার্ মুখে ‘শেফালী মাসি’ ডাকটা সে শুনে শুনে সেও ডাকার চেষ্টা করত আর সেই থেকেই ‘শেফাম্মা’।  এই সম্বোধন শেফালীর খুব পছন্দের মায় তার ‘তুই তুই’ করে বলাও।

টুকাই এবার কিছুটা বিশদ হয়। ‘ওই যে ঐদিন সন্ধ্যায় আধখানা পাঁপড়ের মতো চাঁদ উঠেছিল ঐদিন আমি নিজে (নিজে কথাতার উপর খুব জোর দেয় সে) দেখেছি ছোটকা পাখি হয়ে উড়ছে।’ ‘ওমা তে আমারে এদ্দিন কইলা না?’ শেফালী যেন একটু অসন্তুষ্টই হয়। টুকাই তাও বলে- ‘সত্যি রে শেফাম্মা আমার ছোটকা আসলে পাখি।’ শেফালী এবার চোখ সরু করে রহস্যময় গলায় বলে- ‘তা কি আর আমি জানিনে গো টুকুবাবা? আমি তো আগেই জানি। আমি যে নিজের চক্ষে দেকেছি। তুমার কাছে কমু কমু কইরা কওয়া হইছে না গো।’

এতক্ষণ টুকাই চাইছিলো তার কথাটা কেউ বিশ্বাস করুক। কিন্তু শেফালীর এহেন দাবি তার ভালো লাগে না। ছোটকার উড়ে বেড়ানো অন্য কেউ কেন দেখবে? এটা তো তার একান্ত নিজের আবিষ্কার। সে বলবে, অন্যরা অবাক হবে আশ্চর্য হয়ে শুনবে, বিশ্বাস অবিশ্বাসের দোলায় দুলে দুলে বিশ্বাস করবে। এর আর কোনো দাবিদার তার পছন্দ হয় না। সে কথা ঘুরিয়ে বলে- ’চল শেফাম্মা আমরা লুডো খেলি। তুই সবুজ আর আমি লাল।’ বলতে বলতে সে আনমনা হয়।

তার মনে হয় ছোটকার পাখাগুলো যেন ছিল ঘন নীলে হলুদ ঢেউ খেলানো।

টুকাই ঠিক করে ফেলে কথাটা আর কাউকে বলবে না। চোখ বন্ধ করে টুকাই ভাবে কত্ত ছোটবেলা সে দেখেছে তার ছোট কাকু হলুদ নীল ডানায় আকাশের নীল কেটে ঘুরে বেড়াত। হওয়ার বিছানায় ঘুম ছিল তার ছোটকার খুবই প্রিয়। তারপর কি যে হলো। কি করে ছোটকা ডানা হারালো টুকাই জানে না। ডানা হারানো যে কি কষ্টের। ছোটকা তো ফিরতেই পারত না। দয়ালু পাখিরা পথ চিনে ঘর চিনে ফিরিয়ে দিয়ে গেলো। সেই থেকে তার ছোটকা শুধু মানুষ হয়েই আছে। তাকে ছোটকাকু নিজে বলেছে, ‘ডানা হারানো খুব কষ্টের রে টুকাই। আমি তো পথই হারিয়ে ফেলেছিলাম। ভাগ্যিস ওরা আমাকে ঘরে ফিরিয়ে দিয়ে গেলো।’

টুকাই তার ছোট্ট হাত ছোটকার পিঠে বুলিয়ে দিতে দিতে বলেছিল, ‘তোমার এখনও কষ্ট হয় ছোটকা?’ ‘হ্যাঁ রে এখনও হয়। আর সেই থেকেই তো আমি শুধু হিরন্ময়, হিরুদা, হিরন্ময় বাবু হয়েই আছি।’

ছোটকা সকালে বাজার করে ব্যাংক যায়। অফিস করে। সন্ধ্যায় ফেরে। খায় দায়।  গল্প করে, টিভি দেখে। কোনদিন ঘুমায় কোনোদিন দাদুর বিছানায় রাত জাগে। কতদিন হয় দাদুর অসুখ। দাদু বিছানায় শুয়ে থাকে। ছোটকা, কামি, ঠাম্মা আর  দাদু এক বাড়িতে থাকে। সে থাকে মা বাবার সাথে আর একটা বাড়িতে, একই পাড়ায়। বাবা অফিস করে। মা অফিস করে। সপ্তাহে একদিন টুকাইকে নিয়ে ঠাম্মার বাড়ি যায়। চা খায় গল্প করে চলে আসে। বাবা, মা দাদুর বিছানার পাশে বসে ঠাম্মা দাদুর সাথে গল্প করে। টুকাই ছোটকার ঘরে গিয়ে বসে। ছোটকার ঘরের দেওয়ালে কত্ত কত বই। ছোটকা সব বইয়ের গল্প জানে। টুকাই  গেলে তাকে দেখায়। তাকে ছোটকা খুব ভালোবাসে। দেখলেই খুশি হয়ে উঠে। ঠিক যেমন এক পাখি আর একজনকে দেখলে খুশি হয়। কামিও টুকাই কে খুব ভালোবাসে। গেলেই ডিম ভাজা করে দেয়’ গোল পাঁপড় দেয় আইস্ক্রীম দেয়। রবিবার, রবিবার সে বাবা মার সাথে ঘুরতে যায়। এ শহরে ঘোরার জায়গার অভাব নেই। মানুষের বানানো কত ফোয়ারা রাজবাড়ি মন্দির বাগান ঝর্না মিউজিয়াম। তার ছোট্ট জীবনের সবকটা রবিবার খরচ করেও আরো কত জায়গা এখনও দেখার বাকি।  টুকাইর বাবা খুব ঘুরতে আনন্দ করতে ভালোবসে। বাবা মা কে বলে, ‘হঠাৎ  করে কবে দিন ফুরিয়ে যাবে। তাই হতে থাকা দিন গুলোকে সবসময় আনন্দে রাখতে হয়।’ টুকাই মনে মনে ভাবে দিন আবার কি করে ফুরায়। দিনের পর রাত রাতের পর দিন তো আসতেই থাকে আসতেই থাকে। কিন্ত এখন সে বুঝে যে সবকথা বড়দের জিজ্ঞেস করতে নেই। তারা হয়তো ওর সামনেই অন্য কাউকে এই গল্প বলে হাসা হাসি করবে। আবু পিসি, ছোট পিসি বা আকা দিদা হয়তো ছোট্ট করে তার গালটা টিপে দিয়ে বলবে, ‘এমা আমাদের টুকাইটা একটা বুদ্ধু।’ কেউ হয়তো আবার বলবে, ‘আহা বাচ্চাই তো।’

ঠাম্মার বাড়ি টুকাইর খুব পছন্দ। ঠাম্মার পান ঠোঁটের জোছনা হাসি। কামির আলতা পরা পা, কাজল চোখ তার খুব প্রিয়। খালি ছোটকার শুদ্ধু একটা মানুষ হয়ে থাকা তার ভালো লাগে না। ছোটকা আর সব মানুষের মতো বাজার করে, অফিস করে, দাদুকে অষুধ খাওয়ায়, দাদুর সাথে রাত জাগে। দাদু শুধু শুয়েই থাকে। দাদুর অসুখ আর সারে না।

সেদিন টুকাই স্কুল যাবে না। শীতের বন্ধ শুরু হয়েছে। মা অফিস বেরোনোর সময় সে বায়না ধরে, ‘মা শেফাম্মার কাছে থাকব না। কামির বাড়ি যাব।’ মা একবার দুবার না করেও শেষে রাজী হয়ে যায়। সারাদিন কামির কাছে থাকা তার খুব পছন্দের, খুব খুব আনন্দের। ওই বাড়িতে খুব লক্ষ্মীছানা হয়ে থাকে সে। কামির আলতা পা এঘর ওঘর ঘুরে কাজ করে।  কাজল চোখ গল্প শোনায়। টুকাই ছোটকার বিছানায় শুয়ে শুয়ে বই দেখে ছবির অ্যালবাম দেখে। ডেস্কটপে ছোটকার তোলা ছবি দেখে। কত্ত আকাশ, কত্ত পাখি, কত্ত গাছের ছবি। দেখে দেখে শেষ হয় না। দুপুরে কামি আজ খিচুড়ী বানিয়েছে। সাথে ডিমের গুঁড়ো গুঁড়ো ভাজা, আলুর কাঠি ভাজা। তার খুব পছন্দের। খাবার পর রোদে বসে কমলা খেতে খেতে ঠাম্মা আর কামির সাথে সে গল্প করে আর অপেক্ষা করে কখন ছোটকা আসবে। ছোটকার দেরি হলে তার ভালো লাগে না। আজকে ছোটকা দেরি করে নি। ছটার মধ্যেই চলে এসেছে। টুকাই এসেছে জানে তো। কি খুশি হলো ওকে দেখে। তাড়াতাড়ি হাত পা ধুয়ে এলো। আর তখনই টুকাই জিনিসটা দেখলো। দেখে চমকে আতঙ্কে তার হাত পা ঠাণ্ডা হয়ে গেলো। ছোটকা পা মুছছিলো আর তখনই সে দেখে ছোটকার পায়ের নিচে ছোট্ট একটা শিকড়। সেই প্রথম দেখা। তারপর যখনই যায় দেখে শিকড়টা একটু একটু করে বড় হচ্ছে। তার চার পাশে আরো একটা দুটো শিকড় দেখা যায়। টুকাইর ভয় করে। তার মন খারাপ লাগে। খুব মন খারাপ লাগে। কাকে বলবে? মা কে না কামিকে? কেউ বিশ্বাস করবে? সেদিন সে দেখেছে ছোটকার পায়ে শ্যাওলা পড়ছে। পা গুলো কেমন যেনো। কামি জানে কি? ঠাম্মা এসব জানে না। দাদুও না। দাদুতো শুয়েই থাকে। ছোটকা ওষুধ খাওয়ায়, রাত জাগে। দাদু তবু শুয়েই থাকে। দাদুর অসুখ সারে না।

আজ কদিন পরে সে ঠাম্মার বাড়ি গেলো। আজ কামির পায়ে আলতা, চোখে কাজলের সাথে একফোঁটা জল ও আছে। আজকে সে কামিকে বলতে শুনে, এসো তোমার পায়ের শিকড়গুলো কেটে দিই। ছোটকা রাজী হয় না- ‘আমার যা যেমন আছে তেমনি থাক। আমাকে ছুঁয়ো না।’

‘দেখবে এত শিকড় মিলে পায়ের সব ইচ্ছেদের মেরে ফেলবে। তোমার শিরারা জল খুঁজবে মাটির গভীরে। পাখাওয়ালা ইচ্ছেরা সব দেখো মরে যাবে।’

টুকাই ভাবে পাখাওয়ালা ইচ্ছেরা কারা?

‘যায় যাক। আমারই তো যাবে। আমার আর পাখাতে কি কাজ?’

ছোটকা বেরিয়ে যায়। কামির কথা সে শুনে ফেলেছে। জল আসে চোখে। বুকে কষ্ট হয়। যদি কামির কথাই ঠিক হয়। যদি সত্যি পায়ের শিকড়রা ছোটকাকে মাটিতে আটকে দেয়! যদি ছোটকা সত্যি সত্যিই গাছ হয়ে যায়?? কদিন হয় টুকাইর পিটি টু এক্সাম চলছে। আগামীকাল তার এক্সাম শেষ হবে। কাল সে যাবে ছোটকাদের বাড়ি। ছোটকার পা কেমন আছে কে জানে। সে কাউকে কিছু বলে নি। ওর মনটা খুশি। পরীক্ষা শেষ হওয়ায় আজ পড়া নেই। কদিন পরেই সে ফোরে হবে। বসে বসে তার ছবিতে রামায়ণ পড়ছে। হঠাৎ বাবা এসে ঘরে ঢোকেন। বাবা তো এত তাড়াতাড়ি আসে না। কি হলো। আজ মা ঘরে থাকায় কি তাড়াতাড়ি চলে এলো?  আর তখনই সে শুনে বাবা মাকে বলছে, ‘রুমি হারুকে পাওয়া যাচ্ছে না।’  মা শুনে অস্থির হয়ে উঠে। বাবা অফিসের ব্যাগ রেখে বেরিয়ে যাচ্ছে। মা ঘরের জামার উপর হাউস কোট পরে পায়ে চটি গলাচ্ছে। ‘দাঁড়াও আমিও আসছি। ‘মায়ের গলায় অস্থিরতা। এসব নিমেষে টুকাইর চোখের সামনে ঘটে চলেছে। মা’রা বেরিয়ে যাচ্ছে। সে দৌড়ে গিয়ে মায়ের হাত চেপে ধরে- ‘মা আমিও যাবো।’

ছোট পিসিও এসেছে। ঠাম্মা কাদঁছে। বাবা আর পনু কাকা বাইক নিয়ে বেরিয়েছে। মা টুনি পিসী বুলি পিসী সবাই মিলে চারদিকে ফোন করছে। একমাত্র কামিই চুপচাপ বসে আছে। মা জিজ্ঞেস করে- ‘অলি, হারু তোকে কিছু বলে গেছে?’ এতক্ষণ কামি কোনো কথাই বলে নি। এবার মাথা নাড়ে তারপর খুব আস্তে করে বলে- ‘দিদি ও হারায় নি। ও গাছ হয়ে গেছে।’ মা, টুনিপিসী, বুলিপিসী এমন ভাবে তাকাচ্ছে যেন পাগলের কথা শুনছে। কামি শান্ত ভাবে টুকাইর হাত ধরে উঠানের ওপারে গিয়ে দাড়ায়। টুকাই দেখে উঠানের ওপারে দাড়িয়ে আছে নাম না জানা এক নুতন গাছ। কামি বলে, ‘দেখো টুকুবাবা এই তোমার ছোটকা। আগে কখনো এমন গাছ ছিল বলো?’ কামি কেমন অদ্ভুত সুরে কথা বলছে। কামি কেন এমন করে বলছে। টুকাইর গলার ভেতর কেমন ব্যথা ব্যথা করে। এমন কষ্ট তার আগে কোন দিন হয় নি। পেছনে পেছনে কখন সবাই এসে দাঁড়িয়েছে। মা, টুনিপিসী, বুলিপিসী, আকাদিদা, ঠাম্মা। দাদু শুয়েই আছে। দাদুর অসুখ সারেনি। অবাক চোখে সবাই হাজার পাতার গাছটিকে দেখতে থাকে। পিসীরা কাঁদে। ঠাম্মা গাছ জড়িয়ে ধরে কাঁদেন। মা অবিশ্বাস মাখা চোখে তাকিয়ে আছেন। কামির পায়ে আজ আলতা নেই। চোখে কাজল আছে। কামির চোখেরা কাজল ছাড়া থাকে না। ঝিরি ঝিরি বাতাস এসে গাছটির পাতা দুলিয়ে যায়। টুকাইর বুকের ভেতর কোনদিন না হওয়া এক নুতন রকম কষ্ট হয়। মনে হয় সে কেন আগে সবাইকে বলে দেয় নি, যে ছোটকার পায়ের নীচে শিকড় আসছে। ধীরে ধীরে ছোটকা গাছের পেছনে সূর্য মামা অস্ত যান। কিচির মিচির করে যেতে যেতে কিছু পাখি ছোটকা গাছে বসে পড়ে। ওদের কেউ কেউ নুতন ঘর পেয়ে যায়। অনেক রাতে বাবারা ফিরে আসে। সারা শহর তছনছ করে ছোটকাকে কোথাও পাওয়া যায় নি।

টুকাই ক্যালেন্ডার দেখে। আজ উনিশ নভেম্বর। ছোটকা গাছের প্রথম জন্মদিন। কত্ত কষ্টে যে এই একটা বছর গেছে তা কে জানে। সবার আলাদা আলাদা কষ্ট। কি আকুল অপেক্ষা। প্রথম প্রথম ফোন বাজলে, বেল বাজলে সবাই ছুটে আসত। পায়ের শব্দ শুনলে কান পেতে থাকত। ধীরে ধীরে সব অপেক্ষাকে অবহেলায় হারিয়ে ছোটকা আর এলো না। সত্যি কি তাহলে গাছটা ছোটকাই? মানুষ সত্যি গাছ হতে পারে? মানুষ আর কি কি হতে পারে? তবে গাছ ও কি মানুষ হতে পারে? কত কথা টুকাইর মনে। মা বাবা এখন খুব কম কথা বলে। বেশীর ভাগ কথাই যেন বসে না। কেমন বাতাসে উড়ে চলে যায়। টুকাই তাদের ধরতে পারে না। প্রত্যেকদিন স্কুল থেকে এসে ক্যালেন্ডারে একটা করে দিন কেটে দিয়েছে সে। বাবা মাঝে মাঝে ঘুরতে নিয়ে যান। মাও কমিকস কিনে আনে। কিন্তু আনন্দ আর তার খুশিরা আর আসে না। তারা যে কোথায় গিয়ে লুকিয়েছে কে জানে। সেদিন ও স্কুল থেকে আসছিল। সাথে অভি। হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ অভি মট করে স্কুলের সামনে থাকা কাঠ গোলাপের ডালটা ভেঙে দেয়। টুকাই চেঁচিয়ে উঠেছিল, ‘এই গাছের ডাল ভাঙলি কেন রে?’ অভি অবাক, ‘ওমা এটা তো কারো গাছ নয়।  স্কুলের গাছ ও নয়। তাহলে ভাঙলে কি হলো?’

‘ওমা সব গাছ মানুষের হতে যাবে কেন? ওরা নিজেরাই নিজেদের। জানিস না, না বলে করো কিছু নিতে নেই?’

          অভি হাসতে হাসতে নীলকে বলেছিল, ‘টুকাইটা বড্ড বোকা। কিছু জানে না। বলে গাছ বুঝি গাছদেরই হয়।’

টুকাই এটাই বুঝেনা, সব গাছকে কেন মানুষের হতে হবে? এই পৃথিবী তো গাছেদেরও। এখন সব গাছকে তার আরো আপন মনে হয়। মনে হয় সব গাছেরই একটা গল্প আছে। মনে হয় কোন না কোন মানুষই গাছ হয়ে পথে প্রান্তরে ছড়িয়ে আছে। ইদানীং প্রায়ই বিকেলে শেফাম্মা কামিদের বাসায় নিয়ে যায়। কামি রাঁধে ঘর গোছায়, ঠাম্মাকে খাবার দেয় দাদুকে অষুধ দেয় দাদুর কাছে বসে ছোটকার মত রাত জাগে। দাদুর অসুখ সারে না।

কামি আর আলতা পরে না। কিন্তু কাজল পরতে ভুলে না। শুধু কামি আর আগের মত কল কল করে কত কথা বলে না। বিকেল হলে কামি ছোটকা গাছের নীচে গিয়ে বসে। গাছের গায়ে হাত বুলিয়ে দেয়। টুকাই গেলে টুকাই ও বসে। সে ও তার ছোট্ট ছোট্ট হাত বুলিয়ে আদর করে ছোটকাকে। গাছটা কি সত্যি ছোটকা?  টুকাইর স্কুলের পেছনে বিশাল লেক। বছরে দুইবার পাখিরা আসে। পরিযায়ী পাখি। স্কুলের মাঠে তাদের রং বে রঙের পালক পড়ে থাকে। ইদানিং কারা লেকের পারে পার্ক করছে।  প্লাস্টিকের গাছ, অনেক আলো, জেনারেটারের শব্দ।  আর হয়ত পাখিরা আসবে না।  মানুষ একে একে পৃথিবীর সব জল মাটি দুই হাতে মুছে দিচ্ছে।

টুকাই এই একটা বছর ধরে কত্ত কত পালক জমিয়েছে। কেউ জানে না তার স্কুলের পুরনো ব্যাগটা পালকে ভর্তি। মাকে কাল সে বলেছে অনেক বেলুন এনে দিতে। আজ শনিবার। মায়ের অফিস বন্ধ। মাকে নিয়ে আজ তাড়াতাড়িই চলে এসেছে কামিদের বাড়ি। কারো মনে নেই যে আজ ছোটকা গাছের বার্থডে। মা দাদুর ঘরে কথা বলছে। ঠাম্মা বসে আছে। কথা বলছে। কামি চুপচাপ বসে। পায়ে আলতা নেই।  শুধু চোখে কাজল।

টুকাই ধীরে ধীরে ঘরের পেছনে গিয়ে দাঁড়ায়। একটা নীচু ডাল হওয়ায় নড়ে এসে ওর চুলটা নাড়িয়ে দিয়ে যায়। মনে হয় কেউ যেন আদর করে গেল। ছোটকা গাছের ডালে কারা যেন লাল লাল সুতো,  লাল কাপড় আর ফিতে বেঁধে দিয়েছে। আগে ও সে দেখেছে কোন কোন গাছের ডালে লাল সুতো আর কাপড় বাঁধা। মা বলেছিল এগুলো হলো মানুষের ইচ্ছে সুতো। ইচ্ছে সুতো বেঁধে দিল গাছেদের খুব কষ্ট হয়। অন্যের ইচ্ছের বোঝা কাঁধে নিয়ে গাছেরা কষ্ট করে দাঁড়িয়ে থাকে। কামিকে সে বলে, ‘কামি কেন এতদিন ইচ্ছে সুতো গুলো কেটে দাও নি?’

কামিকে সে আপন মনে বলতে শুনে, ‘মানুষ তো সারা জীবন অন্যের ইচ্ছের বোঝ বয়েই বেড়ায়!’

টুকাই তো ছোট্ট। মাত্র ফাইভে পড়ে। পা উঁচু করে তার হাতের নাগালে থাকা ইচ্ছে সুতো গুলোকে সে কেটে দেয়। তারপর সারা বছর ধরে জমানো রঙ বেরঙের পালক সে গুঁজে গুঁজে দেয় তার ছোটকা গাছের গায়ে, ডালে, যতটুকু তার হাত পৌঁছায়। নীচু হয়ে আসা ডাল গুলোতে লাগিয়ে দেয় এত্ত বেলুন। তারপর দুহাতে জড়িয়ে ধরে ছোটকা গাছকে উইশ করে ‘হ্যাপি বার্থডে ছোটকা।’ টুকাই বলে, ‘ছোটকা তুমি আবার পাখি হও, তুমি আবার উড়।’

গাছের কি কান থাকে? গাছ শুনতে পায়?  সে অপেক্ষা করে তার লাগানো বেলুন আর পালক ভর করে ছোটকা আবার উড়বে। পেছনে মা কখন এসে দাঁড়িয়েছেন টুকাই দেখে নি। মা বলেন, ‘বাবা কেউ কাউকে পাখা দিতে পারে না। নিজের পাখা নিজেকেই খুঁজে নিতে হয়। একমাত্র নিজের ইচ্ছেতেই মানুষ পাখা পায়। তুমি শুধু তার জন্য  প্রার্থনা করতে পারো অপেক্ষা করতে পারো।’