akkharbarta

অক্ষরবার্তা - একটি কিশোর বার্তা উদ্যোগ... আমাদের মূল লক্ষ্য উচ্চ মানের বই পাঠকের হাতে পৌঁছে দেওয়া... যোগাযোগ করুন - akkharbarta@gmail.com | www.akkharbarta.in

গল্প ৫ । শ্রাবণ ১৪৩৩



এ গল্পটা মন্দ নয় 












সৈয়দ রেজাউল

করিম

কলকাতা, পশ্চিমবঙ্গ

যতীন দাদু বললেন-- আজ তোমাদের যে গল্পটা শোনাব, সেটি আর্মেনিয়া দেশের লোককথা। আর্মেনিয়া দেশটা এশিয়া মহাদেশের মধ্যে পড়ে। তার রাজধানী ইয়েরোভান। পাহাড় পর্বতে ঘেরা ইয়েরোভানের আয়তন ৮৮ বর্গমাইল। এখানকার অধিকাংশ মানুষ খ্রীষ্টান ধর্মাবলম্বী। দেশটি আজারবাইজান ও সুদান দেশের কাছে।  

সুদূর প্রাচীনকালে আর্মেনিয়ার এক প্রত্যন্ত অঞ্চলে বাস করত এক কৃষক পরিবার। সেই পরিবারে ছিল তিনজন সদস্য। কৃষক, তার স্ত্রী কৃষাণী, এবং তাদের ছেলে জন

পরিবারটি ছিল খুব দরিদ্র। কৃষাণ উদয় অস্ত খেটে কোনরকমে সংসারটা দাঁড় করিয়েছিল। কিন্তু ছেলে জন ছিল অকর্মন্যের ঢেঁকি। সংসারের উন্নতির পিছনে তার কোন ভূমিকা ছিল না। গায়ে হাওয়া লাগিয়ে সে টইটই করে ঘুরে বেড়াত। বন্ধুবান্ধবদের সাথে আড্ডা মারত। বহুবার বহুকিছু বলেও তার স্বভাব বদলাতে পারেনি কৃষক

দেখতে দেখতে জনের বয়স ১৮ বছর পার হয়ে গেল। জনের বন্ধু বান্ধবদের এক এক করে সব বিয়ে হয়ে গেল। একদিন আড্ডা মারার সময় জনের এক বন্ধু বলল-- কিরে, তোর বিয়েতে আমরা খাব কবে ?

জন খুব দুঃখের সাথে বলল--জানি না। বাবা তো কিছু বলছে না। কোন চেষ্টাচরিত্রও করছে না

বন্ধু বলল-- মা, বাবাকে বল, তোর জন্য মেয়ে দেখতে

জন লজ্জা পেয়ে বলল-- মাকে বলেছিলাম। মা রাজী আছে। কিন্তু বিয়ের কথা কি বাবাকে বলা সম্ভব ?

বন্ধু বলল-- বলতে না পারলে তোর আর বিয়ে হবে না। এটাও বুঝতে পারছি, তোর মা কিছু করতে পারবে না

জনের বাবা ছিল খুব হিসেবি এবং রাসভারি লোক। তাই জন সাহস করে তার সামনে দাঁড়িয়ে কথাটা বলতে পারছিল না। কিন্তু বন্ধুবান্ধবরা ছাড়ার পাত্র নয়। তারা নানাভাবে উদ্বুদ্ধ করে জনকে। অবশেষে অনেকটা সাহস সঞ্চয় করে একদিন বাবার মুখোমুখি দাঁড়াল

কৃষাণ তাকে গম্ভীর কন্ঠে শুধাল-- কিছু বলবে ?

জন উৎসাহিত হয়ে বলল-- হ্যাঁ বাবা !

কিন্তু কথাটা বলতে গিয়ে গলাটা শুকিয়ে উঠল তার। কোনরকমে শুকনো ঢোক গিলে গলাটা ভিজিয়ে নিল। ছেলে বলতে ইতস্ততঃ করছে দেখে কৃষাণ তাকে ধমক দিল। জন তখন বলল-- বাবা ! আমার তো বিয়ের বয়স হয়েছে। এখন আমি বিয়ে করতে চাই

-- হ্যাঁ। তোমার মা আমাকে কয়েকবার বলেছে তোমার বিয়ে দেওয়ার কথা। উপযুক্ত পাত্রী সন্ধান করার কথা। কিন্তু তোমার মত নিষ্কর্মা ছেলের সাথে কোন মেয়ের বাবা বিয়ে দিতে চাইবে ? বিয়ে করে এনে বউকে খাওয়াবে কি ? সেসব চিন্তাভাবনা আছে তোমার? তা যদি থাকত তাহলে বাউন্ডুলের মত ঘুরে বেড়াতে না। মন দিয়ে কিছু একটা কাজকাম করতে



 

বাবা একটু নরম হয়েছে দেখে জন বলল-- ওসব তুমি কিছু ভেবনা বাবা! আমি কাজকাম করে টাকাপয়সা উপার্জন করব। সংসারে কোন অভাব হবে না

কৃষক বলল-- আমাকে কিছু বোঝাতে এসো না বাবা। এতদিন তোমাকে খাইয়ে দাইয়ে মানুষ করেছি, তোমার মন, মানসিকতা, স্বভাব, চরিত্র কি আমার বাকি আছে ? ওসব তর্ক বিতর্কে গিয়ে লাভ নেই। কথায় বলে ফেলো কড়ি মাখো তেল। আগে হাতে পাই ষোল আনা, তারপর করব তোমার বিয়ের চিন্তাভাবনা

বাবার কথা শুনে জনের খুব গোঁসা হল। কিন্তু সে গোঁসা বাবাকে দেখাবার সাহস হল না তার। যদি বাবা তাকে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যেতে বলে, তাহলে চোখের জলে, নাকের জলে একাকার হয়ে যাবে। তাই মাথাটা ঠান্ডা করে জন না বোঝার ভান করে বলল-- বাবা! তুমি আমার কাছে ঠিক কি চাইছো বলতো ? আমি তো কিছু বুঝে উঠতে পারছি না

কৃষক একটু চিন্তা ভাবনা করে বলল-- বোঝার তেমন কিছু নেই। আমি তোমার কাছে তেমন কিছু চাইছি না। শুধু একটা সোনার মোহর আমাকে এনে দিলেই হবে। তাহলে তোমাকে বিয়ে দেবার জন্য পাত্রী খুঁজতে বার হব আমি

--ঠিক আছে বাবা! তাই হোক

একথা বলে বুক ফুলিয়ে বাবার সামনে থেকে চলে গেল জন। ভাবখানা, এ কাজটা যেন তার হাতের মুঠোয়। অত্যন্ত সহজ সরল। ছেলের এই অঙ্গভঙ্গি দেখে মনে মনে হাসলো কৃষক। একটা সোনার মোহরের যে কত দাম হতে পারে সে সম্বন্ধে কোন ধারণা নেই জনের। তা অর্জন করতে হলে যে কত পরিশ্রম করতে হবে তা নিশ্চয়ই বুদ্ধিতে কুলায়নি জনের। তা না হলে বুক ফুলিয়ে হাসতে হাসতে তার সামনে দিয়ে বেরিয়ে যেতে পারে?

তার ভাবনা যে অমূলক ছিল না সেকথা পরেরদিন সকালেই বুঝতে পারল কৃষক। উৎফুল্লিত মুখে তার সামনে এসে দাঁড়াল। বীরদর্পে বলল-- এই নাও বাবা! তোমার মোহর

কৃষক হাত পেতে সে মোহর নিল। সোনার মোহর দেখে সত্যি হতবাক হয়ে গেল। কিন্তু এক বিরাট বিস্ময় তার চোখে মুখে ছড়িয়ে পড়ল। মাত্র একটা রাতের মধ্যে কিভাবে তার ছেলে এই মূল্যবান সম্পদ কিনে নিয়ে এলো? নিশ্চয়ই এর মধ্যে কোন যোগসাজশ ছিল। কিন্তু কে সেই ব্যক্তি? ভাবতে গিয়ে কৃষকের মনে পড়ল জনের মায়ের কথা। জনের মা জনের বিয়ের ব্যাপারে তার কাছে ওকালতি করছে বহুদিন ধরে। ছেলে অন্ত প্রাণ তার। সে নিশ্চয়ই তার জমানো গুপ্তধন থেকে এই মোহরটা ছেলেকে দিয়েছে। আর মায়ের দেওয়া মোহর নিয়ে ছেলে বিয়ে করার অনুমতি নিতে এসেছে। খুব রাগ হল কৃষকের। ছেলেকে কোন বকাবকি না করে তার সামনেই হাতে রাখা মোহরটা ছুড়ে ফেলে দিল সামনের ডোবায়

বাবার কান্ডকারখানা দেখে বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে গেল জন। সাথে সাথে প্রতিবাদ করে বলল-- বাবা! তুমি এটা কি করলে তুমি? সোনার মোহরের মত একটা দামি জিনিস তুমি ছুড়ে ফেলে দিলে?

প্রত্যুত্তরে অত্যন্ত শান্ত গলায় বাবা বলল-- এতে তোর গায়ে জ্বালা ধরছে কেন? মোহরটা ফেলে দিয়েছি, ঠিক করেছি। মোহরটা তো আর তোর নয়, তোর মায়ের। তোর মা কিছু বললে আমি বুঝে নেব

কৃষকের এই কথায় জন আর কিছু কথা বলতে পারলো না। ভয়ে মাও কিছু জিজ্ঞাসা করল না কৃষককে। কৃষক তখন ছেলেকে বলল-- পারলে মোহর কিনে এনে হাতে দে। তখন তোর বিয়ের কথা চিন্তাভাবনা করব

এভাবে কয়েকটা দিন অতিবাহিত হল। বন্ধুবান্ধবরা জনকে জিজ্ঞেস করল-- কিরে তোর বিয়ের খবর কি?

জন পুরো ঘটনাটা বন্ধুবান্ধবের কাছে শেয়ার করল। বন্ধুবন্ধবরা বলল-- কিছু চিন্তা করিসনা জন! আমরা একটা কিছু ব্যবস্থা করে দেব

সত্যই বন্ধুবান্ধবরা ব্যবস্থা করে দিল। তারা সকলে মিলে চাঁদা তুলে জনের জন্য একটা মোহর কিনে এনে দিল। জন সেই মোহটা নিয়ে পরদিনই বাবার সামনে হাজির হল। অত্যন্ত প্রফুল্ল চিত্তে তার হাতে তুলে দিল। কিন্তু বাবা সেই একই রকম কান্ড ঘটালো। মোহর খানা নিয়ে ছুড়ে ফেলে দিলো সেই ডোবায়

জন সাথে সাথে প্রতিবাদ করে বলল ওটা মায়ের দেওয়া মোহর নয়। তুমি ওটা ছুঁড়ে ফেলে দিলে কেন?

কৃষক বলল-- আমি জানি, ওটা তোমার মায়ের নয়। এটাও জানি, ওটা ধার করা। আমি তোমাকে বলেছিলাম তোমার নিজের উপার্জিত পয়সায় মোহর কিনে আনতে। তুমি তা করোনি। ফাঁকিমারা কাজ করে আমাকে ঠকাতে চাইছ। তাই আমি মোহরটা ফেলে দিয়েছি। হিম্মৎ থাকলে নিজের উপার্জিত পয়সায় মোহর কিনে এনে আমার হাতে দাও। তাহলে আমি তোমার জন্য মেয়ে দেখতে যাব

বাবার কথায় এতদিন পরে টনক নড়ল জনের। পরদিন সে মা-বাবাকে বলে কাজের সন্ধানে বার হল। কপালটা ভালো ছিল তার। সে একটা জনমজুরি কাজ জোগাড় করে ফেলল এক কারখানাতে। সেখানে সে দিনরাত পরিশ্রম করতে থাকল। কয়েক মাস অমানবিক পরিশ্রম করে সে কিছু টাকা জমালো। সেই টাকাপয়সা দিয়ে সোনার দোকান থেকে একটা সোনার মোহর কিনল। কিছু টাকাপয়সা দিয়ে বাড়ির প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনল। শহরে যাতায়াত করার তরে বাবার জন্য একটা স্যুট এবং মায়ের জন্য একটা দামি জামদানি শাড়ি কিনল। কিছু শুকনো খাবারও কিনল সকলে খাবার জন্য। পড়াপ্রতিবেশীদের দেবার জন্যহাতেও রাখল কিছু টাকা, প্রয়োজনীয় জিনিস পত্র কেনার জন্য। তারপর সেগুলো নিয়ে ফিরে এল বাড়িতে। তাকে দেখে মা খুব খুশি হল। বুকে জড়িয়ে ধরে আদর করল। কপালে চুমো খেল। শরীর স্বাস্থ্য অনেকটা ঝরে যাওয়ায় আক্ষেপ করল। বাবা সবকিছু দেখেও না দেখার ভান করল

বাবাকে সন্তুষ্ট করার জন্য ব্যাগ থেকে সোনার মোহরটা বার করে বাবার সামনে গিয়ে দাঁড়াল জন। অত্যন্ত বিনয়ের সাথে বলল-- বাবা ! এই নিন আপনার সোনার মোহর

কৃষাণ কোন কথা না বলে গম্ভীরতার সাথে হাত পেতে সোনার মোহারটা নিল। উল্টে পাল্টে সেটা ভালো করে দেখল। তারপর কি মনে করে সেই সোনার মোহরটা ডোবায় ফেলে দেবার জন্য হাতটা উপরে তুলল। আর তা বুঝতে পেরে সাথে সাথে বাবার সামনে গিয়ে দাঁড়াল জন। ক্ষিপ্ততার সাথে বাবার হাতটা ধরে বলল--ওটা তুমি ফেলোনা। আমার রক্ত জল করা পয়সা দিয়ে মোহরটা কিনে নিয়ে এসেছি। তার রসিদও আমার কাছে আছে

কৃষাণ বলল-- আমি তা জানি। আমি শুধু দেখছিলাম, রক্ত জল করা পয়সায় কেনা জিনিসের প্রতি তোমার কতটা মায়া মমতা আছে?

লোককথার এই গল্পটি বলে উঠে যেতে চাইছিলেন যতীন দাদু! কিন্তু নাতিনাতনীর দল তাকে ছাড়ল না। জোর করে দাদুকে টেনে বসাল সন্ধ্যা। আদুরে গলায় জিজ্ঞেস করল দাদু! তারপর কি হল ?

দাদু বললেন-- অর্ক! তুমি বলো, এরপর কি হতে পারে?

অর্ক বলল-- তারপর আশীর্বাদ নিতে জন তার পায়ে হাত দিয়ে প্রনাম করল। খুশী হয়ে কৃষাণ সেই সোনার মোহরটা ছেলের হাতে তুলে দিয়ে বললেন-- এটা তোমার সম্পদ। তুমি তোমার কাছে রাখো। কোন কিছু গড়তে হলে, কিংবা কোন বিপদ আপদে পড়লে তখন ওটা কাজে লাগিও

'তাই হবে' বলে বাবার কাছ থেকে উঠে যেতে চাইছিল জন। সেইসময় কৃষক তার পকেট থেকে আরো দুটো সোনার মোহর বার করে ছেলের হাতে দিয়ে বলল-- রাগের বশবর্তী হয়ে মোহর দুটো আমি ডোবার জলে ফেলে দিইনি। তোমাকে শিক্ষা দিতে তোমার সামনে শুধু অভিনয় করেছিলাম মাত্র। এ জিনিসগুলো যাদের, তাদের তুমি ফেরৎ দিও। শুধু একটা কথা মনে রেখো, কোনকিছু সম্পদ নষ্ট করা অতি সহজ। মুহূর্তের ব্যাপার। কিন্তু সম্পদ আহরণ করতে গিয়ে তুমি নিশ্চয়ই টের পেয়ছ, কতটা গায়ের রক্ত জল করতে হয়। তাই কোনকিছু নষ্ট করার আগে ভেবেচিন্তে দেখো, কাজটা করা তোমার ঠিক হচ্ছে কিনা !

জন মাথা নেড়ে বলল-- আমি বুঝতে পেরেছি বাবা!

যতীন দাদু বললেন-- সত্যি অর্ক! তোমার তুলনা হয় না

সন্ধ্যা বলল-- অর্কদা কিছুই জানে না। তারপর কৃষক তার ছেলের জন্য মেয়ে খুঁজতে বার হল। অনেক খুঁজে একটা সুন্দরী মেয়ের সন্ধান পেল। তার সাথে ধূমধাম করে ছেলের বিয়ে দিল

যতীন দাদু বললেন-- এ গল্পটাও মন্দ নয়