সর্পিল ধূপের ধোঁয়া উঁচুতে উঠে সিলিংয়ে আটকে ধীরে ধীরে ঘুরপাক খেতে খেতে নামছে, তারপর ছড়িয়ে যাচ্ছে নানা স্তরে, যেন কোনো অদৃশ্য হাত পথ দেখাচ্ছে। রবীন্দ্র শতবার্ষিকী ভবনের এই রিহার্সাল রুমে ভোর পাঁচটায় একা নাচছে ঋতা পাল। আটাশ বছরের এই ধুনুচি নাচের শিল্পী জানে আজ অষ্টমী, কাল নবমীতেই তার জীবনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা—দুর্গাপুজোর লাইভ টেলিকাস্ট, লাখো দর্শক দেখবে তাকে।
কাঠের মেঝেতে তার পায়ের তালে ঘুঙুর বাজছে রুনু ঝুনু, মায়ের শেষ নিদর্শন এই ঘুঙুর, পাঁচ বছর আগে মা চলে যাওয়ার পর থেকে এটাই তার একমাত্র সারাক্ষণের সঙ্গী। নাচ শেষ করে যখন ঘুঙুর খুলতে যাচ্ছে, হঠাৎ টিং করে একটা শব্দ—টিনের ট্রাঙ্কের গায়ে লেগে একটা ছোট্ট রোল করা কাগজ গড়িয়ে পড়ল মেঝেতে। ঋতা অবাক হয়ে হাতে তুলে নিল কাগজটা, এটা কোথা থেকে এল? রুম তো তালাবন্ধ ছিল সারারাত।
কাগজ খুলতেই চমকে উঠল ঋতা। হাতের লেখা অপরিচিত কিন্তু স্পষ্ট, কালি দেখে বোঝা যাচ্ছে বহু দিনের পুরোনো, অথচ কাগজটা ফটোকপি কাগজের মতন একদম নতুন। কাগজটায় লেখা আছে তিনটি লাইন—“কাল রাত ৮:১৪ মিনিটে হালকা বৃষ্টি শুরু হবে। ৮:৫৭ মিনিটে কমলার টফির দোকানে ভিড় জমবে। ৯:০৭ মিনিটে বিদ্যুৎ যাবে ঠিক ৪৫ সেকেন্ডের জন্য।” কাগজটা থেকে হালকা শিউলি ফুলের গন্ধ আসছে। ঋতার হাত কাঁপছে, এটা কী ধরনের রসিকতা? কে এমন সুনির্দিষ্ট সময় লিখে রাখে? সে চারদিক দেখল—জানালার পর্দা দুলছে হালকা বাতাসে, ঢাকে বোল তুলেছে কোনো ঢাকি, আওয়াজ ভেসে আসছে প্যান্ডেল থেকে। হঠাৎ মনে পড়ল মায়ের কথা, মা বলতেন ঘুঙুর কখনো কখনো গোপন বার্তাও বহন করে। কিন্তু সেসব তো শুধু গল্প। ছোটবেলায় এমন পুজোর দিনে মায়ের কোলে বসে এমন গল্প সে কত শুনেছে।
দুপুরে দুর্গাবাড়ি মন্দিরে উপচে পড়ছে মানুষে। সারাবছর তো বন্ধ থাকে এই দুর্গা বাড়ি, পুজোর সময় শুধু খোলে, আর দুই হাতের মা দুর্গা যে কত প্রাচীন ঘটনার সাক্ষী তা তো সবাই জানে না। ত্রিপুরা রাজপরিবারের দুর্গা পূজার ইতিহাস ৫০০ বছরেরও পুরনো, যা প্রথম শুরু হয়েছিল উদয়পুরে। পরবর্তীতে এই পূজা অমরপুর হয়ে স্থানান্তরিত হয় এবং অবশেষে ১৮ শতকের প্রথমদিকে মহারাজা কৃষ্ণ কিশোর মাণিক্য বাহাদুর এটি আগরতলায় নিয়ে আসেন। বর্তমান দুর্গাবাড়ী মন্দিরে এই পূজা ১৪৮ বছর ধরে (প্রায় ১৮৭৬ সাল থেকে) অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। এই মন্দিরের সবচেয়ে অনন্য বৈশিষ্ট্য হলো দুই হাত বিশিষ্ট দুর্গা প্রতিমা। কথিত আছে, মহারানী সুলক্ষণা দেবী প্রথাগত দশভুজা দুর্গা প্রতিমা দেখে অজ্ঞান হয়ে পড়েছিলেন। সেই রাতে স্বপ্নে তিনি দৈবী নির্দেশ পান যে দেবীকে দুই হাতের মূর্তি রূপে পূজা করতে হবে। তখন থেকেই এই বিশেষ রীতি প্রচলিত। ১৯৪৯ সালে ত্রিপুরা ভারতের সাথে যুক্ত হওয়ার পর থেকে, গত সাড়ে সাত দশক ধরে রাজ্য সরকার এই ঐতিহ্যবাহী পূজার সমস্ত ব্যয়ভার বহন করে আসছে।
মাইকে একের পর এক অ্যানাউন্সমেন্ট চলছে, লোকের ভিড়ের জন্য পুরোহিত মাইকে মন্ত্র উচ্চারণ করছেন যেন সবাই পুষ্পাঞ্জলির মন্ত্র ঠিকঠাক শুনতে পায়।
আর্যদীপ সেন, বত্রিশ বছরের ইভেন্ট ম্যানেজার, হেডফোন কানে নিয়ে ক্যামেরা পজিশন ঠিক করছে। কলকাতার বড় প্রোডাকশন হাউস থেকে এসেছে সে, এবারের লাইভ টেলিকাস্টের পুরো দায়িত্ব তার কাঁধে। ত্রিপুরার পুজো এবারে কোলকাতার বাঙালি মিডিয়ার সুনজরে পড়েছে, অবশ্য তার কারণ এই যে ইভেন্ট ম্যানেজার যার উপর এই চ্যানেলটা ভরসা করে সবচেয়ে বেশি সে ত্রিপুরার ছেলে আর তার নাম আর্যদীপ সেন। “ঠিক দুই মিনিট ক্লোজ আপ নেবে নাচের, তারপর ক্রেন আপ”, আর্যদীপ টিমকে নির্দেশ দিচ্ছে। “ঋতা, তোমার সোলো পার্ট ঠিক নয় মিনিট সাত সেকেন্ড, একটা বিটও এদিক-ওদিক হলে পুরো সেগমেন্ট ভেঙে পড়বে। গট মাই পয়েন্ট?” ঋতা মাথা নাড়ল, কিন্তু মন পড়ে আছে সকালের সেই অদ্ভুত চিঠিতে। পকেটে হাত দিলেই কাগজটা খসখস করে, যেন মনে করিয়ে দিচ্ছে নিজের অস্তিত্ব।
সন্ধ্যায় ঋতা উজ্জয়ন্ত প্রাসাদের লেকের ধারে ঘুরতে গেল মন হালকা করতে। প্রাসাদের গেটের সামনে ফুচকা, ঝালমুড়ি, বেলুনের দোকান, ফাস্ট ফুডের দোকানগুলোর ঝলমলে আলো—সব মিলিয়ে পুজোর আমেজ। মন্দির চত্বরে ফিরে এসে হঠাৎ সে থমকে দাঁড়াল একটা দোকানের সামনে। কমলার টফি বিক্রি হচ্ছে, কাচের জারে সাজানো কমলা রঙের জেলির প্যাকেট, লজেন্স। মনে পড়ল চিঠির দ্বিতীয় লাইন—৮:৫৭, কমলার টফির দোকান। এটা কি শুধুই কাকতালীয়? নাকি সত্যিই কিছু ঘটতে চলেছে? একটা ছোট্ট মেয়ে বাবার হাত ধরে টফি কিনছে, হাসিমুখ, পাঁচ-ছয় বছর বয়স। বাবা একজন ঢাকি, হাতে ধরা কাঠি দুটো দেখেই বোঝা যাচ্ছে সেগুলো ঢাকের কাঠি। যে দিকটা ধরে ঢাকি তার বাদ্যযন্ত্রে বোল তোলে, সেই দিকটা মোটা। মেয়েটার মুখ ভরে গেছে কমলা রঙে, কিন্তু খুশিতে লাফাচ্ছে। ঋতার মনে হলো এই দৃশ্য সে আগেও কোথায় যেন দেখেছে।
রাত আটটা চৌদ্দ মিনিট। ঋতা মঞ্চের পাশে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। মেঘ জমেছে কিছু, কিন্তু বৃষ্টির কোনো লক্ষণ নেই। হঠাৎ একটা ঠান্ডা ফোঁটা পড়ল তার কপালে, তারপর আরেকটা, আরেকটা। হালকা বৃষ্টি শুরু হলো ঠিক চিঠিতে লেখা সময়ে। ঋতার শিরদাঁড়া যেন ঠান্ডা হয়ে গেল। “শিট! বৃষ্টি!” আর্যদীপ চিৎকার করে উঠল। “প্লাস্টিক কভার আনো ক্যামেরার জন্য, কুইক!” টেকনিশিয়ানরা ছুটোছুটি শুরু করল। ঋতা স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। প্রথম ভবিষ্যদ্বাণী সত্যি হলো।
আট পঞ্চান্ন। ঋতা এখন নিশ্চিত যে কিছু একটা অস্বাভাবিক ঘটতে চলেছে। সে মঞ্চের পাশ থেকে লক্ষ করছে কমলার টফির দোকানটা। ঠিক আটটা সাতান্নয় সেখানে হঠাৎ ভিড় জমে গেল, যেন সবাই একসঙ্গে টফি কিনতে এসেছে। সেই ছোট্ট মেয়েটা আবার দেখা গেল, বাবার হাত ধরে দাঁড়িয়ে। বাবা বোধহয় অন্য প্যান্ডেলে ঢাক বাজাতে যাবে, তাড়াহুড়ো করছে। মেয়েটা টফির দিকে আঙুল দেখাচ্ছে, “বাবা, আরেকটা!” ঋতার বুক ধড়ফড় করছে। মূল মন্দিরের সামনের ঘড়িতে দেখা যাচ্ছে নয়টা সাত মিনিট বাজতে চলেছে। যদি বিদ্যুৎ সত্যিই চলে যায়? তাহলে চিঠির বাকি কথাগুলোও কি সত্যি?
নয়টা সাত। মন্দিরের সব আলো একসঙ্গে নিভে গেল। চারদিক অন্ধকার। বিদ্যুত দপ্তর ছয় মাস আগে থেকে প্রস্তুতি নেয়, তারপরও এমনটা হবার তো কথাই নয়। মানুষের চিৎকার, বাচ্চাদের কান্না, “জেনারেটর! জেনারেটর কোথায়?” কর্মকর্তাদের গলা শোনা যাচ্ছে অন্ধকারে। ঋতা মনে মনে গুনছে—এক, দুই, তিন... পঁয়তাল্লিশ। ঠিক পঁয়তাল্লিশ সেকেন্ডে আলো ফিরে এল। ঋতার সমস্ত শরীর কাঁপছে। তিনটি ভবিষ্যদ্বাণীই মিলে গেল একদম নিখুঁতভাবে। এবার সে জানে, এই চিঠি কোনো রসিকতা নয়। কিন্তু তাহলে এটা কী? কে পাঠাচ্ছে এই বার্তা? আর তাকেই কেন পাঠাচ্ছে?
রাতে হোটেলে ফেরার পথে ঋতা আবার রিহার্সাল রুমে ঢুকল। এবার সে খুব সতর্ক। ঘুঙুর খোলার আগে ভালো করে প্রত্যেকটা দানা দেখে নিল—ভেতরে কিছু নেই, একদম খালি। তারপর ঘুঙুর টিনের ট্রাঙ্কে রাখল। কিন্তু রাখামাত্রই আবার সেই টিং শব্দ। আরেকটা রোল করা কাগজ যেন শূন্য থেকে এসে পড়ল। ঋতার হাত কাঁপছে কাগজ খুলতে গিয়ে। এবার লেখা দীর্ঘ—“নবমীর রাতে তোমার নাচের সময় একটা পাঁচ বছরের মেয়ে হারিয়ে যাবে। সে কমলার টফি খেতে গিয়ে বাবার হাত ছাড়বে। ভিড়ের ধাক্কায় পড়ে যাবে, গড়িয়ে যাবে ড্রেনের দিকে। লোড শেডিং হবে। ঢাকনা খোলা থাকবে। তুমি যদি নাচ না থামাও, সে...” বাক্য অসম্পূর্ণ। কিন্তু ইঙ্গিত পরিষ্কার।
ঋতা ফোন করল মৌমিতা সেনগুপ্তকে, মায়ের পুরোনো গুরুভগিনী। ছাপ্পান্ন বছর বয়স, এখনো নাচ শেখান। “মাসিমনি, মায়ের ঘুঙুরের কোনো বিশেষ ইতিহাস আছে?” প্রশ্ন করল সে। ”মানে, কোনো অলৌকিক গল্প?”
মৌমিতা হেসে বললেন, “তোর মা বলতেন ওই ঘুঙুরে নাকি তার মায়ের আশীর্বাদ আছে। তোর দিদিমা নাকি বলে গেছিলেন—সময় এলে ঘুঙুর পথ দেখাবে। ওই বড়রা যেভাবে জ্ঞান দেয় আর কি।” স্পষ্ট কোন তথ্য পাওয়া গেলোনা। তবু ঋতা ফোন রেখে ভাবল, সময় এলে পথ দেখাবে? এই চিঠিগুলোই কি সেই পথনির্দেশ? কিন্তু পাঁচ বছরের মেয়ে, কমলার টফি, ড্রেন—সবকিছু এত সুনির্দিষ্ট কেন? যেন কেউ ভবিষ্যৎ দেখে ফিরে এসে সতর্ক করছে।
পরদিন সকালে ঋতা তৃতীয় চিঠি পেল। এবার তথ্য আরও বিস্তারিত—“মেয়েটির নাম ইশা। বাবা সংশপ্তক দাস, পেশায় ঢাকি। কমলার টফি মেয়েটির সবচেয়ে প্রিয়। তোমার নাচ যখন শুরু হবে, ঠিক সেই মুহূর্তে সে হারিয়ে যাবে। ড্রেনের ঢাকনা সরে যাবে ভিড়ের চাপে। তুমি যদি থামো, তোমার ক্যারিয়ার শেষ। না থামলে, একটা জীবন শেষ। সিদ্ধান্ত তোমার।” ঋতা বুঝতে পারল এটা কোনো সাধারণ পরীক্ষা নয়। একদিকে তার স্বপ্ন, বছরের পর বছরের সাধনা, লাইভ টেলিকাস্টে লাখো মানুষের সামনে নাচের সুযোগ। অন্যদিকে একটা নিষ্পাপ শিশুর জীবন। কিন্তু এই চিঠি কি সত্যিই বিশ্বাসযোগ্য? নাকি কেউ তার সাফল্যে বাধা দিতে চাইছে?
বিকেলে ঋতা ইশাকে খুঁজে পেল মেলায়। কালকের দেখা সেই ছোট্ট মেয়েটাই তো। ঠিক চিঠির বর্ণনার মতোই—পাঁচ বছর বয়স, হাসিখুশি, কমলার টফি হাতে। বাবা কাছে-ধারে নেই। জানা গেল তিনি ঢাক বাজাতে গেছেন। “রাতে আমার নাচ দেখবে তো?” ঋতা ইশাকে জিজ্ঞেস করল মিষ্টি গলায়। ইশা জোরে মাথা নাড়ল, “হ্যাঁ বাবা বলেছে ধুনুচি নাচ! আগুনের নাচ!” তার চোখ চকচক করছে উত্তেজনায়। ঋতার বুক মোচড় দিয়ে উঠল। এই নিষ্পাপ শিশুটা জানে না তার জন্য কী অপেক্ষা করছে। ঋতা অপেক্ষা করল তার বাবার জন্য। ততক্ষণে ঋতা দেখা পেল রুমি দেববর্মার। ত্রিশ বছরের এই পুলিশ অফিসার আজকের ক্রাউড কন্ট্রোলের দায়িত্বে আছে। ঠান্ডা মাথার সংবেদনশীল মানুষ। “রুমিদা, ধাপের বাঁ দিকে একটা ড্রেনের ঢাকনা আছে না?” যতটা সম্ভব স্বাভাবিক গলায় ঋতা জিজ্ঞেস করল। “একটু ঢিলে মনে হচ্ছে, রাতে তো প্রচণ্ড ভিড় হবে।” রুমি ভ্রু কুঁচকে তাকাল, “ড্রেনের ঢাকনা? হঠাৎ এমন খেয়াল কেন হলো বলুন তো?” তবু সঙ্গী কনস্টেবলকে ডেকে বলল চেক করতে। ঋতা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল, অন্তত একটা সতর্কতা নেওয়া গেল। কিন্তু মনের ভেতর প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে—এই চিঠি কে লিখল, কেন লিখল, আর সবচেয়ে বড় কথা, এগুলো কি সত্যিই ঘটবে?
আর এদিকে সংশপ্তক মানে ওই মেয়েটির বাবা ফিরতেই ঋতা তাকে বলল, “ইশাকে শক্ত করে ধরে রাখবেন কিন্তু, ভিড়ে হারিয়ে যেতে পারে।” সংশপ্তক হাসল, “চিন্তা করবেন না দিদি, ওকে চোখের আড়াল করি না।”
নবমীর সন্ধ্যা নেমে এল দ্রুত। মঞ্চের চারপাশে প্রচণ্ড ভিড়, মানুষ ঠেলাঠেলি করে সামনে আসার চেষ্টা করছে। সদর মহকুমা প্রশাসনের ভলান্টিয়াররা একে অপরের হাত ধরে মানব প্রাচীর গড়ে উপচে পড়া ভিড় সামলাচ্ছে। টিভি ক্যামেরা সেট হয়ে গেছে, আর্যদীপ শেষ মুহূর্তের চেক সেরে নিচ্ছে। স্পনসররা বিশেষ চেয়ারে বসেছেন, তাদের চোখে প্রত্যাশা। “রিমেম্বার ঋতা”, আর্যদীপ শেষবার মনে করিয়ে দিল, “নয় মিনিট সাত সেকেন্ড। একটা সেকেন্ড এদিক-ওদিক হলে পুরো প্রোগ্রামের ছন্দ নষ্ট হয়ে যাবে। এটা তোমার মেক অর ব্রেক মোমেন্ট। আমি তোমায় সিগন্যাল দেব সময়ের।” ঋতা মাথা নাড়ল কিন্তু চোখ খুঁজছে ইশাকে। আটটা পঞ্চান্ন—সে দেখতে পেল সংশপ্তক মেয়ের হাত ধরে দাঁড়িয়ে আছে ঠিক কমলার টফির দোকানের কাছে। ভিড় বাড়ছে প্রতি মুহূর্তে।
ধুনুচি জ্বলে উঠল ঋতার হাতে। ধোঁয়া কুণ্ডলী পাকিয়ে উঠছে, ঢাকের তাল বাড়ছে ক্রমশ। ঋতা নাচ শুরু করল, তার শরীর ছন্দে দুলছে, ঘুঙুরের শব্দ মিশে যাচ্ছে ঢাকের তালে। ক্যামেরা ঘুরছে তার চারপাশে, লাইট ফোকাস করছে তার প্রতিটি মুদ্রায়। আটটা সাতান্ন—চোখের কোণ দিয়ে সে দেখল ইশা বাবার হাত ছাড়িয়ে টফির দোকানের দিকে এগোচ্ছে। সংশপ্তক অন্য দিকে তাকিয়ে কারও সঙ্গে কথা বলছে, খেয়াল নেই। নয়টা বাজল, ক্রেসেন্ডো শুরু হলো, মানে সেই চূড়ান্ত মুহূর্ত যখন নর্তকী সবচেয়ে দ্রুত ঘুরতে থাকে, পা সবচেয়ে তীব্র গতিতে চলে, ঘুঙুরের আওয়াজ সর্বোচ্চ হয়। এটা পুরো পারফরম্যান্সের সবচেয়ে নাটকীয় আর উত্তেজনাপূর্ণ অংশ। দর্শকরা এই মুহূর্তের জন্যই অপেক্ষা করে। ঋতার পা দ্রুত ঘুরছে, ধুনুচির আগুন বৃত্ত তৈরি করছে বাতাসে। নয়টা পাঁচ—আর্যদীপের ইশারা, ফাইনাল স্পিন। ঋতা ঘুরতে শুরু করল তীব্র গতিতে। ঠিক তখনই সে দেখল—ইশা হোঁচট খেয়ে পড়ে গেছে, ভিড়ের ধাক্কায় গড়িয়ে যাচ্ছে ড্রেনের দিকে!
নয়টা সাত। বিদ্যুৎ নিভে গেল। অন্ধকারে চিৎকার উঠল চারদিক থেকে—“লাইট! লাইট!” “বাচ্চাটা কোথায় গেলো?” “পা দেখে চলুন!” ঋতা ধুনুচি ছুঁড়ে ফেলে দিল নিরাপদ দিকে। আর্যদীপের হেডফোনে প্রায় আর্তনাদ—“What the hell! Don’t stop! Keep
going!” কিন্তু ঋতা শুনল না। সে ঝাঁপ দিল ভিড়ের মধ্যে, অন্ধকারে হাতড়াতে লাগল। হঠাৎ তার নাকে এল একটা পরিচিত গন্ধ—কমলার টফির মিষ্টি গন্ধ। এই গন্ধ অনুসরণ করে সে এগিয়ে গেল। “রুমিদা!” সে চিৎকার করল। “ড্রেনের কাছে! কুইক!” রুমি কাছেই ছিল, তার টর্চলাইট জ্বলে উঠল তৎক্ষণাৎ। “সবাই সরুন! পুলিশ! জায়গা দিন প্লিজ!”
টর্চের আলোয় দৃশ্যটা স্পষ্ট হলো—ড্রেনের ঢাকনা সত্যিই অর্ধেক সরে গেছে মানুষের পায়ে পায়ে, আর ঠিক কিনারায় ইশা! তার একটা পা ড্রেনের ভেতর ঝুলছে, ছোট্ট হাত দিয়ে লোহার রড আঁকড়ে ধরে আছে। ঋতা লাফ দিয়ে এগিয়ে গিয়ে মেয়েটাকে টেনে তুলল। ইশা কাঁপছে ভয়ে, কিন্তু বেঁচে আছে। পঁয়তাল্লিশ সেকেন্ড পরে আলো ফিরে এল। প্রথমে গুঞ্জন, তারপর কাছের লোক যারা দেখতে পেয়েছেন ঘটনাটা করতালি দিয়ে স্বাগত জানালো, তারপর মঞ্চে ফিরতেই সকল জনতা তুমুল করতালিতে অভিনন্দন জানালো ঋতাকে। জনতা দেখেছে—মঞ্চের নর্তকী নাচ ছেড়ে একটা শিশুকে বাঁচিয়েছে। সংশপ্তক ছুটে এসে মেয়েকে বুকে জড়িয়ে ধরল, “ইশা! ইশা! তুই ঠিক আছিস মা?” তার চোখে জল, ঘটনার আকস্মিকতায় তার শরীর কাঁপছে। ইশা বাবার ময়লা গেঞ্জিতে মুখ ঘসতে ঘসতে বলল “এই দিদিটা বাঁচিয়েছে।”
আর্যদীপ কড়া মুখে এগিয়ে এল ঋতার দিকে। ঋতা জানে এবার বকা খাবে, হয়তো কাজও হারাবে। মুখ নিচু করে শুধু বলল “সরি”, সে তার ভুল বুঝতে পেরেছে, কিন্তু সে নিরুপায়। আর্যদীপ বলল, “তুমি আমার পুরো সিকোয়েন্স নষ্ট করেছ। টিভিতে ব্ল্যাক স্ক্রিন গেছে পুরো এক মিনিট। কালকে ব্ল্যাক আউট থেকে শিক্ষা নিয়ে আজ মঞ্চের প্রোগ্রাম পুরো জেনারেটর দিয়ে চালিয়েছি” একটু থেমে যোগ করল, “কিন্তু তুমি যা করেছ, তা নাচের চেয়ে অনেক বড়। This will go
viral, trust me. একটা মেয়ে পারফরম্যান্স ছেড়ে বাচ্চা বাঁচাল—এটা হেডলাইন হবে কাল। তোমার ক্যারিয়ার শেষ হয়নি, বরং নতুন করে শুরু হলো।” ততক্ষণে রুমি পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। “ম্যাডাম আপনি কি করে জানলেন যে ঠিক ড্রেনের কাছেই পাবে ওকে?” ঋতা একটু ইতস্তত করল, তারপর বলল, “অনুমান করলাম... ভিড়ের ধাক্কার দিকটা দেখে।” রুমি সন্দেহের চোখে তাকাল, সে পুলিশ, এমনি এমনি কোন কিছু সে বিশ্বাস করেনা, তবে এত ভিড় চারিদিকে যে সে আর কথা বাড়ালোনা।
রাত গভীর হলে ঋতা তার ব্যাগ গুছিয়ে নিতে ফিরে এল রিহার্সাল রুমে। ঘুঙুর খুলতেই শেষ চিঠি পড়ল মেঝেতে। একই হাতের লেখা—শিশুসুলভ, কিন্তু স্পষ্ট।
“প্রিয় মা,
তুমি হয়তো বিশ্বাস করবে না। আমি ইশা, তোমার ইশা। এখন আমার বারো বছর বয়স। মৌমিতা দিদা শিখিয়েছিলেন কীভাবে ঘুঙুরের মাধ্যমে সময়ের ভাঁজ পেরিয়ে বার্তা পাঠাতে হয়। এটা আমাদের পরিবারের গোপন বিদ্যা। তুমি আমাকে বাঁচিয়েছিলে সেদিন। তারপর বাবা আর তুমি মিলে আমাকে বড় করেছ। না, তুমি আমার জন্মদাত্রী মা নও, কিন্তু তুমিই আমার সত্যিকারের মা। তুমি আমায় নাচ শিখিয়েছ, পড়াশোনা করাচ্ছো, ভালোবাসতে শিখিয়েছ। এই চিঠিগুলো না পাঠালে তুমি থামতে না, আর আমারও কোনো ভবিষ্যৎ থাকত না। তাই আমাকে পাঠাতে হলো। তুমিই আমার ভবিষ্যৎ মা। ভালোবাসা নিও- তোমার ইশা।”
নিচে ছোট্ট করে আঁকা একটা ধুনুচি আর কমলার টফি।
ঋতার চোখ ভিজে উঠল। সে বুঝল এটা কোনো জাদু নয়, এটা ভালোবাসার বৃত্ত। ভবিষ্যৎ অতীতকে বাঁচায়, অতীত ভবিষ্যৎকে সৃষ্টি করে। ছয় মাস পরের দৃশ্য তার চোখের সামনে ভেসে উঠল—ইশা তার কাছে নাচ শিখছে, সংশপ্তক মাঝে মাঝে আসছে মেয়েকে দেখতে, তাদের মধ্যে একটা সুন্দর বোঝাপড়া তৈরি হয়েছে। হয়তো একদিন ইশা সত্যিই তাকে মা ডাকবে। হয়তো একদিন সে সত্যিই শিখবে কীভাবে ঘুঙুরের মাধ্যমে সময় পেরিয়ে চিঠি পাঠাতে হয়। আর তখন এই বৃত্ত সম্পূর্ণ হবে—মায়ের ঘুঙুর, মেয়ের চিঠি, সময়ের এক অদ্ভুত নাচ।
পরদিন সকালের খবরের কাগজে বড় হেডিং এলো—“নৃত্যশিল্পী ঋতা পাল: যিনি মঞ্চ ছেড়ে জীবন বাঁচালেন।” আর্যদীপ ঠিকই বলেছিল, ঘটনাটা ভাইরাল হয়ে গেছে। সারা রাজ্য থেকে ফোন আসছে, অভিনন্দনের পাশাপাশি নতুন অনুষ্ঠানের অফার আসছে। কিন্তু ঋতার মন পড়ে আছে অন্য জায়গায়। সে জানে একদিন ইশা বড় হবে, তার কাছে আসবে, বলবে কিছু একটা শেখাতে চায়। আর ঋতা হেসে বলবে, “শেখা।” কারণ সে জানে, কিছু শিক্ষা শুধু গুরু থেকে শিষ্যে যায় না, কখনো কখনো তা ভবিষ্যৎ থেকে অতীতেও ফিরে আসে। তালের সাথে সাথে ঘুঙুরের দানারা আটকে রাখে সময়কেও—যুগ যুগ ধরে বয়ে চলা এক শাশ্বত নৃত্যে, যেখানে অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যৎ একাকার।