হায় হায় রে দাদুভাই, সব্বোনাশ হয়ে গেল রে—। তোর দাদানকে আর বাঁচাতে পারবো না রে, দাদুভাই! হায় হায় হায়…
খুব ভয় পেয়ে গেল বুম্বা। ঠাম্মি সবসময়ই তিলকে তাল করে বলে, রং চড়িয়ে বলে, চিল্লামিল্লি করে বলে।
কিন্তু, “তোর দাদানকে আর বাঁচাতে পারবো নারে—” এই কথা কখনও বলেনি ঠাম্মি। দাদানের কি বিরাট বড়ো অসুখ করেছে? না,
দাদানের অ্যাক্সিডেন্টের খবর এল? বুম্বা ভেবে অস্থির। দাদান না-বাঁচলে কে তাকে সকালে
স্কুল-বাসে ওঠাবে, কে তাকে স্কুল-বাস থেকে নামিয়ে আনবে, কে তাকে পার্কে খেলাতে নিয়ে যাবে? মাম্মি-ড্যাডি দু’জনেরই শুধু অফিস আর অফিস।
বুম্বাকে ঘুম-ঘুম চোখে মা রেডি করে দেয়। দাদান আবাসনের ক্যাম্পাসের বাইরে
স্কুল-বাসে উঠিয়ে দিয়ে আসে। বাবা তখনও বিছানায় ঘুমে কাদা। দু’টোয় ফেরে বুম্বা। স্কুল-বাস থেকে রোজ হাত ধরে নামিয়ে আনে
দাদান, একদিনও দেরি হয় না।
স্কুল থেকে এসে ঠাম্মির জিম্বায়। খেয়ে ঘুম। চারটায় ঘুম থেকে
উঠে পাড়াশোনা। পাঁচটায় কফি মগে এনার্জি ড্রিঙ্কস, ঢকঢক তার পর
দাদানের সঙ্গে পার্কে খেলতে। মাঝে মাঝে সাইবার কাফে, ভিডিও গেম।
ভিডিও গেম খেলতে যাওয়াটা সিক্রেট ম্যাটার। শুধু দাদান জানে।
ঠাম্মিও জানে না। ঠাম্মি জানলে কথা চেপে রাখতে পারবে না। অর্ধেক মুখ ফসকে এমন
রহস্যের সৃষ্টি করবে —অমনি অন্যেরা
হ্যাঁচকা টানে ঠাম্মির পেট থেকে বাকি কথাটা টেনে-হিঁচড়ে বের করে নেবে। এমনি করে
বুম্বার কত দুষ্টুমির কথা মাম্মি-ড্যাডির কাছে ফাঁস হয়ে গেছে আর জারি হয়েছে
নতুন-নতুন ফরমান। বিশেষ করে মাম্মি বাড়ি ফিরে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে ঘণ্টা - মিনিট - সেকেন্ড
মেপে ধারাবিবরণী শুনবে —বুম্বা স্কুল
থেকে ফিরে কী কী করেছে।
ছ’টা পনেরো মিনিটে দিদিমণি আসে বুম্বাকে পড়াতে। তাই বুম্বাকে
ছ’টার মধ্যে ফিরে আসতে হয়। ঠিক ছ’টায় মাম্মি ফোন করবে, ফোনে বুম্বাকে চাই-ই চাই।
ফোনে ইন্সট্রাকশান দেবে দিদিমণির কাছে যেন মন দিয়ে সব পড়া বুঝে নেয়। স্কুল থেকে
ফেরার পরেও মাম্মি একবার ফোন করে খোঁজ নেয়। মাম্মি বাড়ি ফেরে সাড়ে সাতটায়, ড্যাডি আটটার আগে নয়।
শনি-রবি মাম্মি-ড্যাডির ছুটি। মাম্মির ইয়া বড় মোবাইল ফোনটার
দখল নিতে চায় বুম্বা। ঘড়ি ধরা আধ ঘণ্টার বেশি মাম্মি অ্যালাও করে না। তার পর আবদার
ড্যাডির কাছে। ড্যাডির ডেস্কটপ। কুড়ি মিনিট হতে না-হতেই ড্যাডি তাগাদা শুরু করে, আমার অনেক কাজ আছে বুম্বা সোনা। কোলে তুলে একটু আদর করে
ব্যস। অন্য সময় বুম্বা কম্পিউটার খুলতে পারে না, পাসওয়ার্ড দিয়ে
লক করা থাকে। তাই মন ভরে ভিডিও গেম খেলতে পারে না বুম্বা। তার এই দুঃখ বোঝে শুধু
একজন—দাদান। সেই দাদানের কী হল কে জানে! বুম্বা খুব ভয় পেয়ে গেল।
*
সেদিন বুম্বার স্কুল ছুটি, কিন্তু
মাম্মি-ড্যাডির অফিস ছুটি নেই। দাদান মর্নিং ওয়াকে বেরিয়েছে এখনও ফেরেনি —আসলে ফেরার সময়ই হয়নি। বুম্বার স্কুল না-থাকলে দাদান
বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিয়ে দেরি করে ফেরে। স্কুল থাকলে তাড়াতাড়ি ফিরে আসে। মাম্মি
ঘুম থেকে উঠে পড়েছে। বুম্বাকেও টেনে তুলে ড্রয়িং–এর কাজ শেষ করতে বলেছে। বুম্বা
হাই তুলতে-তুলতে কাঠঠোকরা পাখিতে রং করছিল। ঠাম্মির চ্যাঁচানিতে হাই উধাও, হাউমাউ হাজির।
তোর দাদানকে নিয়ে আর পারবো না রে আমি—
আহা,
কী হয়েছে বলো না—
তোর দাদান হাঁটতে বেরিয়ে বন্ধুদের পাল্লায় পড়ে মিষ্টি
বিস্কুট আর চিনি দেওয়া চা খেয়েছে রে। কী সব্বোনেশে কাণ্ড আর বলবো কী রে, দাদুভাই!
মাম্মি বাথরুম থেকে বেরিয়ে জানতে চাইল, কে বলেছে?
ঠাম্মি বলল, বাসন্তী।
বাসন্তী বাড়ির কাজের সহায়িকা। আসার পথে দেখেছে বুড়োরা চা
দোকানে বসে খোশ-গল্পে মশগুল। চা–দোকানি বাদল মোটা-মোটা বিস্কুট আর চা দিচ্ছে। এক
জায়গা থেকে গড়িয়ে চা দিচ্ছে, মানে চিনি মেশানো চা।
বুম্বা বলল, দাদান চিনি দেওয়া চা খায় না
কেন?
জানিস না —তোর দাদানের ডায়াবেটিস আছে। তাই মিষ্টি খাবার খাওয়া বারণ।
ডায়াবেটিস কি খুব পাজি অসুখ?
হ্যাঁ। খুব পাজি। রক্তে সুগারের মাত্রা বেড়ে গেলে এ রোগ হয়।
নিয়ম মেনে খাওয়াদাওয়া করতে হয়। রোজ এক ঘণ্টা জোরে জোরে হাঁটতে হয়। নইলে
হার্ট-কিডনি-চোখ খারাপ হতে থাকে। বুঝলি দাদুভাই। একমাত্র তুই পারিস তোর দাদানকে
বাঁচাতে।
আমি! দাদান তো ডাক্তার দেখায়, ওষুধ খায়, মর্নিংওয়াকে যায়, তবে?
তবে আর কী! আমার পোড়া কপাল। শুনলি তো সব। আমি তো বাতের
ব্যামোয় মরছি—বলে চোখের ইশারায় বুম্বাকে অন্য ঘরে নিয়ে ঠাম্মি ফিসফিস করে বলল, তুই দাদানের বডি গার্ড হয়ে যাবি। জোরে জোরে না হাঁটলে আমায়
রিপোর্ট করবি। লুকিয়ে চা-বিস্কুট খায় কিনা দেখবি।
দাদান তো আমার আগে উঠে হাঁটতে চলে যায়। আর আমি তো ঘুম থেকে
উঠতেই স্কুলে যাবার জন্য রেডি হই।
তুই তো ছ’টায় উঠিস, কাল থেকে সাড়ে পাঁচটায় উঠবি। দাদানের জন্য আধ ঘণ্টা আগে
উঠতে পারবি না সোনা ভাই আমার। নাহলে তোর দাদানকে বেশিদিন বাঁচানো যাবে নারে—হায়
ভগবান!
ড্যাডিকে বলো না—
তোর বাবা! তাহলেই হয়েছে! ঠাম্মি এবার বুম্বার কানের কাছে
মুখ এনে বলল, তোকে রোজ কুড়ি টাকা দেব। চিপস কিনে খাবি, চকোলেট কিনে খাবি।
বুম্বা ভাবল, টাকাটা পেলে ভিডিও গেম খেলা
যাবে। এক ঘণ্টায় কুড়ি টাকা নেয়। বুম্বা রাজি হল।
**
দাদান ঠাম্মিকে অনেক বোঝাল, আমাকে আগে চিনি
ছাড়া চা আর ক্রিম-ক্র্যাকার বিস্কুট দিয়েছে। তুমি মিছিমিছি উতলা হচ্ছ। আমি কি শিশু
যে লোভ সামলাতে পারি না! এই কথায় কোনও কাজ হল না। পরদিন ভোর সাড়ে-পাঁচটায় দাদানের
সঙ্গে বুম্বাও গেল মর্নিংওয়াকে।
আবাসনের গেট পেরিয়ে বাস-রাস্তার দিকে গেল না দাদান।
উল্টোদিকে গেল। এদিকে আগে কখনও আসেনি বুম্বা। রাস্তার দু’ধারে কত রকমের গাছ, কত রকমের পাখি। দাদানকে
জিজ্ঞেস করে গাছেদের নাম জানল; বকুল, কৃষ্ণচূড়া, ছাতিম, কদম,
জারুল, সোনাঝুরি আরও কত কী! রাস্তা
ঢেকে আছে উজ্জ্বল হলুদ ফুল। দাদান বলল, রাধাচূড়া। চিড়িয়াখানার
খাঁচায় নয়, অ্যানিম্যাল প্ল্যানেটে নয় —খোলা আকাশের নীচে, গাছের ডালে, ঘাসের ওপর কত পাখি! কাছে গেলে ফুরুৎ করে উড়ে সরে যায়। দাদান
চিনিয়ে দেয়; চড়াই, বুলবুলি, ফিঙে, টুনটুনি, দোয়েল, বেনেবউ।
খুশির মাত্রা আরও বহুগুণ বাড়িয়ে ভেসে এল মিষ্টি সুরে, কুহু—। মুহূর্তে চারপাশ মনোরম হয়ে উঠল। দাদান বলল, কীসের ডাক বলতো?
বুম্বা আওয়াজ লক্ষ্য করে অশ্বত্থ গাছে পাখি খোঁজার চেষ্টা
করতে লাগল।
দাদান বলল, কোকিল।
বইয়ে কোকিলের ডাকের কথা পড়েছে। কিন্তু নিজের কানে এই প্রথম
শুনল কোকিলের ডাক। মনটা একেবারে ফ্রেশ হয়ে গেল বুম্বার। উঁকিঝুঁকি মেরে কোকিল
দেখেই বুম্বা চিৎকার করে বলল, দাদান, ওই যে কোকিল! কোকিল!
অমনি কোকিলটা উড়ে গিয়ে ঘন বকুল গাছের ভিতর ঢুকে গেল।
একদিন তো বুম্বা কাঠবেড়ালি ধরবে বলে ছোটা শুরু করল। বুম্বা
ছোটে বাধ্য হয়ে তার দাদানও ছোটে। দাদান ঠাম্মির ওপর রাগে গজরায়, তবু ছুটতে হয় বুম্বাকে সামলাতে হবে যে। বুম্বা পড়ে গেলে
হাত-পা ছড়ে যাবে। তখন সবাই দোষ দেবে। ছুটতে গিয়ে দাদান যেন যৌবন ফিরে পান। দারুণ
চনমনে লাগে নিজেকে।
বুম্বা হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ে। একমনে দেখে একটা কাঠঠোকরা আম
গাছের কাণ্ডে ঠোকরাতে ঠোকরাতে পাকমেরে উপরে উঠছে। বুম্বা একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে।
বুম্বাকে এখন আর আঁকার কথা বলতে হয় না। যখন সময় পায় খাতা, রং পেনসিল নিয়ে বসে যায়। সাদা পাতার ওপর জীবন্ত হয়ে ওঠে
কাঠঠোকরা, মাছরাঙা, শালিক, বক,
প্রজাপতি…।