akkharbarta

অক্ষরবার্তা - একটি কিশোর বার্তা উদ্যোগ... আমাদের মূল লক্ষ্য উচ্চ মানের বই পাঠকের হাতে পৌঁছে দেওয়া... যোগাযোগ করুন - akkharbarta@gmail.com | www.akkharbarta.in

গল্প - দ্বিতীয় ভাগ । জ্যৈষ্ঠ - আষাঢ় ১৪৩৩

 

সুপ্তকৈলাস গুহার আহ্বানে
এর আগে যা ঘটেছিল— (দেখতে ক্লিক করুন)
চার বন্ধু মনু নদীর চরে ফুটবল খেলার সময় বল খুঁজতে গিয়ে হঠাৎ রহস্যময় পাথরের দরজা আবিষ্কার করে। পাতার নিচে লুকানো সেই পাথর নড়তেই ভেতরে অন্ধকার গুহার মুখ খুলে যায়। গুহার ভেতরে তারা টানেল, সাপের খোলস আর পুরোনো ত্রিশূল দেখতে পায়। ভয় আর কৌতূহলে তারা গুহা থেকে বের হয়ে আসে, রূপমের পায়ে আঘাত লাগে। তারপর ঠিক হয় গোপন রাখবে, পরে আবার পরিকল্পনা করে অনুসন্ধান করবে। স্যারের ফোন আসে, নতুন রহস্যের ইঙ্গিত মেলে। বন্ধুরা সিদ্ধান্ত নেয় কাউকে কিছু না বলে শুধু স্যারের সাথে আলোচনা করবে। গুহার ইতিহাস, রাজবাড়ি বা মন্দিরের সূত্র খুঁজে বের করার সংকল্প নেয় তারা। তারপর—










নন্দিতা দত্ত

আগরতলা, ত্রিপুরা

ফুটবল থাকবে, টুর্নামেন্ট হবে, গুহার রহস্যভেদও করবো, শুধু আপনি আমাদের সাথে থাকবেন।   

পড়াশোনা তাহলে কবে করবি? স্যার সব হবে। টুর্নামেন্ট তো পরের মাসে। প্র্যাকটিসের পার্ট হিসেবে আপনি বাড়তি একঘণ্টা আমাদের চারজনকে সময় দেবেন। খুব বেশি টাফ হলে আমরা এখন গুহা বাদ রাখবো। টুর্নামেন্ট শেষ হয়ে গেলে আমরা এটাও আবিষ্কার করতে চাই। কেউ জানার আগে। এখন কিন্তু ত্রিপুরার কিছু ছেলে মেয়ে পাহাড় পর্বত ঘুরে বেড়ায়। কে কবে এসে যাবে। তাহলে স্যার আমাদের সব ইচ্ছা ভণ্ডুল হয়ে যাবে। খুব একটা বেশি পরিশ্রমের কাজ তো নয় আর পরীক্ষার তো এখনো মাস দুয়েক দেরি আছে সব হবে স্যার। স্যারকে একপ্রকার রাজি করিয়ে তারা কথা দিল টুর্নামেন্ট জিততে যা করা দরকার তারা জান লড়িয়ে খেলবে। সোমনাথ স্যার কোচ নন। টিমের মোটিভেটার।

ঠিক আছে কিন্তু তার আগে কাল থেকে প্র্যাকটিস শুরু। পুরো ডিস্ট্রিক্টের টিম, তোরা ছাড়াও টিমের বাকিদের কথা ভাবতে হবে। প্র্যাকটিস আর প্র্যাকটিস।এটাই এখন মূল লক্ষ।

পরদিন থেকে জোর প্র্যাকটিস শুরু হল। ঊনকোটি ডিস্ট্রিক্টের বিভিন্ন স্কুল থেকে বাছাই করা কিছু ছাত্র নিয়ে ১৫ দিন টানা প্র্যাকটিস চলল।  

দুদিনের ছুটি দিয়ে কোচ আবার ১১ দিন প্র্যাকটিস করালেন ছেলেদের। নক আউট খেলা হবে তাই সারা ত্রিপুরার সমস্ত ডিস্ট্রিক্ট থেকে আটটা টিম এসেছে। কৈলাশহর জুড়ে বেশ উন্মাদনা ছড়িয়ে পড়েছে। ফাইনালে উঠেছে কৈলাশহর আর সোনামুড়া। 

কৈশাসহর টিমে তন্ময় গোলকিপার। সেন্টার ব্যাকে সঞ্জীব। একটু আলসে হলেও ফুটবল মাঠে তার অন্যরূপ। 

ফুল ব্যাকে রূপম আর শিবম। 

এদের চারজনকে বাদ দিয়ে আর সাতজন হলো ভিন্ন স্কুলের। কিন্তু মাঠে নামলে কে কোন স্কুল সেটা কেউ মনে রাখেনা সোলেমান, জাহির, বিশ্র, ফিলিপ, রত্নমনি। ফাইনাল খেলাকে ঘিরে সকাল থেকেই উত্তেজনার পারদ চড়ছে। সোনামুড়া স্কুল টিম স্কিল নিয়ে একটু বেশি এগিয়ে। প্রতিপক্ষ কৈলাসহরের তুলনায় আগের ম্যাচগুলোতে গোলের সংখ্যা বেশি। অন্যদিকে কৈলাসহর নিজের মাঠে খেলছে। খেলা শুরু হতেই কৈলাসহরের সমর্থকদের হৈহৈ চিৎকার। টিমকে চিয়ার আপ করা সবই চলছিল। সতেরো মিনিটের মাথায় সোনামুড়ার রবীনের তীব্রগতিতে  লং পাস সরাসরি কৈলাসহরের গোলে বল জড়িয়ে গেলো তন্ময় কিছু বোঝার আগেই গোওওওল। সঞ্জীব হতভম্ব। মাঠের দর্শকের চিৎকার থেমে গেল। কৈলাসহরের ছেলেরা দাপিয়ে মাঝমাঠ দখল করলেও বিরতি অবদি গোল করতে পারলোনা। বিরতির পর প্রচন্ড গতিতে কৈলাসহরের ছেলেরা ছোট ছোট পাসে সোনামুড়ার ছেলেদের পায়ে বল আসার আগেই ঝাঁপিয়ে পরে কেড়ে নিচ্ছে। গোওওওল। সারা মাঠ কেঁপে উঠলো দর্শকের চিৎকারে। এক এক গোল দুইদলের সোনামুড়ার ছেলেরা কেউ কেউ পায়ে বল নিয়ে এগুচ্ছে, পাস মিস হলে বিপক্ষের কাছে যেতেই হাড্ডাহাড্ডি লড়াই খেলা শেষের পথে। কয়েকমিনিট বাকি কৈলাসহরের ছেলেদের নাম ধরে ধরে দর্শক উৎসাহ যোগাচ্ছে। ড্রিবলিং বড় পাস ছোট পাসে দুদলের উপরের পজিশনে থাকা খেলোয়ার যা বল পেলেই গোলবারের কাছে যাচ্ছে, আবার মাঝমাঠে চলে আসছে। ছোট একটা পাসে সোনামুড়ার দীপকেরটা থেকে গোলপোস্টের কোনা দিয়ে গোলে বল ঢুকতেই রেফারি খেলা শেষের বাঁশি বাজায়।  কয়েকমুহূর্ত থমকে গিয়েই দর্শকরা ভালো খেলার কদর করে সোনামুড়ার ছেলেদের অভিনন্দন জানায়। মন খারাপ হলেও দুদলের খেলোয়ারদের করমর্দন, পুরস্কার বিতরনের মধ্য দিয়ে আন্ত রাজ্য অনুর্ধ ১৯ ফুটবল ম্যাচ শেষ হয়। 

ফুটবলে হেরে গিয়ে মন খারাপ প্রত্যেকের। তবুও মাঠ ছেড়ে ঘরে ফেরা। পরের দিন স্যারের কাছে যাবে কি করে? জান লড়িয়ে খেললেও হেরে গেছে এ দুঃখের চাইতেও লজ্জায় স্যারের কাছে গুহার কথা বলবে কি করে। চার বন্ধু প্ল্যান করে একাই যাবে। পরদিন সবাইকে অবাক করে স্যার নদীর চরে তাদেরকে ডেকে নেয়। সোমনাথ স্যার পুরনো বই থেকে একটা মানচিত্র বের করলেন। তাতে দেখা গেল কৈলাসহরের নিচে একসময় এক জলপথ ছিল, যা নাকি ১৭শ শতকে জলদস্যুদের আসা-যাওয়ার পথ ছিল। এই পাহাড়ের নাম ছিল তখন তপ্তকৈলাস। এখানে জলদস্যুরা লুটের মাল লুকিয়ে রাখত; স্যার বললেন। রূপম অবাক হয়ে বলেই ফেলে, মানে আমাদের বল খুঁজতে গিয়ে আমরা আসলে এক জলদস্যুর গুহা আবিষ্কার করেছি?

স্যার হেসে বললেন, সম্ভবত। তবে সাবধানে যেতে হবে। তোরা তো কিছুটা গিয়েছিলি টের পেয়েছিস পুরনো গুহায় ঢোকা বিপজ্জনক।

গুহা অভিযানের পরিকল্পনা নিয়ে বন্ধুদের মধ্যে কিছুটা মনোমালিন্য কে আগে যাবে। সোমনাথ স্যার এবার গম্ভীর হয়ে বলেন, তোরা নিজেরাই সব ঠিক করবি? তাহলে আমি চলে যাই তোরা যা খুশি কর।

চার বন্ধু লজ্জা পায়। না স্যার আপনি যেভাবে বলবেন সেটাই হবে। 

তখন জিজ্ঞেস করছিলি না এই মোটা দড়ি কেন এনেছি, এবার দড়ির কাজ দেখবি। বলেই স্যার নিজের কোমরে দড়িটা বেঁধে বললেন, আমি নামছি, দড়ির এদিকটা সঞ্জীব ধরবি। আমি নেমে দড়ি খুলে দেবো। তারপর দড়িটা কোমরে  বেঁধে তুই নামবি। এরপর শিবম, তন্ময় সবার পরে রূপম। স্যার এগিয়ে গেলেন, ওহ বড় পাথর আগে ধাক্কা দিয়ে সরাতে হবে, আয় হাত লাগা সবাই‌। পাথর সরাতেই ঠান্ডা হাওয়া গায়ে লাগলো। তারপর স্যার নেমে যাওয়ার কিছুক্ষণ পরে দড়িটা টেনে তুলে নিয়ে একে একে সবাই নামলো। গা ঘেঁষাঘেঁষি করে হাঁটু মুড়ে পাঁচজন।        স্যার ম্যাপটা খুলে দেখার চেষ্টা করলেন কোন নির্দেশে এগুবেন। সেদিন ওরা যে ভাবে এগিয়ে ছিল তার উল্টোদিকে তিনটে ছোট মতো পথ। স্যার কিছু একটা ভেবে এদিকে মোবাইলের আলো ফেলতেই বলে উঠলেন উড়ি বাবা। হাঁটু মুড়ে সামনে স্যার বাকিরা কিছুই দেখতে পাচ্ছে না। স্যার এগিয়ে যাচ্ছেন একটু হামাগুড়ি দিয়েই দেখলেন এর পর আর কিছু দেখা যাচ্ছে না। এটা এখানেই শেষ। এখানে এমন আরো দুটো আছে বলেই একটু বাঁদিকে ঘেঁষে ঘুরতেই হাঁটুতে ঠান্ডা লাগায় বললেন এখানে জল আছে। কতটা জল বুঝছিনা। দেখি একটু এগিয়ে, তোরা সবাই সাবধানে এগুবি। রূপম তোকে যে বড় টর্চটা দিয়েছিলাম, সেটা জ্বালিয়ে তুই সামনে আয়, বাকিরা ওকে লক্ষ করে এগুবি। স্যার হাঁটু মুড়ে এগুচ্ছেন। ওদেরও কথা বন্ধ। হঠাৎ মাথায় উপর দিয়ে চামচিকির লাফালাফি। আলোটা বন্ধ কর। এগুলো শান্ত হোক। আমি এগুচ্ছি।  রূপম টর্চ নিভিয়ে ফেললেও একহাত তুলে পকেটে মোবাইল খুঁজে। মোবাইলটা না পেয়ে বিরক্ত হয়ে বলে আমার মোবাইল কোথাও পড়ে গেছে। এখন এই হাঁটু মুড়ে কোথায় মোবাইল পাই?  আমরা যেখানে লাফিয়ে নেমেছিলাম, ওখানেই হয়তো পাবো, আপাতত আমরা এগিয়ে যাই। 

স্যার সবার আগে, সামনে জায়গাটা একটু চওড়া মনে হচ্ছে। একটু সোজা হয়ে হামাগুড়ি থেকে উঠে কোমর বেঁকিয়ে দাঁড়াতে পারবো মনে হয়। কেমন একটা গন্ধ। এবার চামচিকে গুলো বোধহয় লোকজনের আওয়াজে থেমে পড়েছে। টর্চটা জ্বালা। টর্চ জ্বালাতেই আবার চামচিকের নৃত্য শুরু হলো। 

দেয়াল থেকে হালকা টুপটাপ শব্দ। হঠাৎ রূপম পা পিছলে নিচে পড়ে যায়! ইশ এখানটায় জল। সোমনাথ স্যার  রূপমকে টেনে তোলেন। স্যার এগিয়ে যান। এই গুহার ভেতরে যাওয়ার পথটা দেখা যাচ্ছে না। স্যার হঠাৎ হোঁচট খেয়ে দাঁড়িয়ে পড়লেন। এখানটায় কিছু একটা আছে। থামতে হবে। বেশ বড় লোহার কিছু আছে। স্যার আমরা সেদিন আগের গুহায় ত্রিশূল দেখেছিলাম। ত্রিশূলটা কোথায়? সেদিন তো এদিকে আসিনি। আরেকটু এগিয়ে গেলে বোঝা যাবে কোন দিকে আমরা গিয়েছিলাম।  

ঠিক আছে। এগিয়ে দেখি। সাবধানে এগোতে হবে। এদিকটায় কিন্তু জল একটু বেশি। কি ঠান্ডা রে বাবা। যতটা সম্ভব এগিয়ে যাই। এরকম একটা গন্ধ। এটা কি ভূতের গায়ের গন্ধ? তন্ময়ের প্রশ্নে স্যার বলে ভূতের গায়ে গন্ধ আছে তো কে কে বলেছে? না গুহার ভেতরে তো মানুষ নেই ভূত থাকতে পারে।  

চল এগোই। দেখা যাক কি আছে?  

মাথাটা ঠুকে গেল‌। শিবম মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়তেই তিনজন শিবমকে ঘিরে দাঁড়ালো। খুব লেগেছে? না সামলে নিয়েছি। স্যার এগিয়ে যাচ্ছেন। ডানদিকে একটা বাঁক। ঘুটঘুটে অন্ধকার। হিসহিস কিছু একটা শব্দ। থমকে দাঁড়িয়ে পা দিয়ে শব্দ করার চেষ্টা করলেও শব্দটা আওয়াজ হলোনা। 

গুহার ভেতরটা প্রথম থেকেই ছিল থমথমে দেয়ালে শ্যাওলা, বাতাসে স্যাঁতসেঁতে দুর্গন্ধ, আর পায়ের নিচে কেবল ঠান্ডা জল। সেই জল হাঁটু পর্যন্ত উঠে গেছে, প্রতিটা পদক্ষেপে গা শিরশির করে ওঠে। খুব ধীরে এগোচ্ছিলেন সোমনাথ স্যার। ওরা চারজন অনেকটা পেছনে। সামান্য শব্দেই গুহার ভিতর অদ্ভুত প্রতিধ্বনি উঠছে। হঠাৎ ওপরে কোথাও থেকে টুপ টুপ করে ফোঁটা পড়ার শব্দ। চোখ তুলে দেখতেই স্যার দেখলেন গুহার ছাদের এক কোণে ছোট্ট একটা ফাঁক সেই ফাঁক দিয়ে আসছে অল্প কিন্তু কেমন ধারালো একটা আলোর রেখা। অন্ধকারের ভেতর সেই আলোটা যেন ছুরি হয়ে কেটে যাচ্ছে। 

আরও দু’পা এগোতেই আলোটা গিয়ে পড়ল গুহার জলের উপর। আর ঠিক তখনই জলের উপরে কিছু নড়ল। 

সেটা প্রথমে মনে হলো ছায়া। তারপর ধীরে ধীরে স্পষ্ট হতে শুরু করল। আলোটা যখন পুরোপুরি তার উপর পড়ল, তখন বুকের ভেতরটা যেন বরফ হয়ে গেল। 

জলের নিচে মুখ। মানুষের মুখের মতো কিন্তু মানুষের নয়। চোখ দুটো অস্বাভাবিক বড়, চকচক করছে যেন জোড়া পাথর। নাক প্রায় নেই বললেই চলে, আর ঠোঁট ফাঁক হয়ে আছে ভেতর থেকে লম্বা, পাতলা দাঁতগুলো ভেসে উঠছে ডুবে থাকা জলের উপর। মুখটা যেন আস্তে আস্তে স্যারের দিকে ঘুরছে কিন্তু জলের ভেতর কোনো ঢেউ উঠছে না। যেন কেউ তাকে ধরে রেখেছে অথচ কেউ নেই। আরও ভয়ের হলো মুখটা স্যারের নিজের প্রতিচ্ছবি বলে মনে হচ্ছে। কিন্তু বিকৃত। ছেঁড়া। অর্ধেকটা যেন কেটে নেওয়া। গুহার অন্ধকারে দাঁড়িয়ে থাকা নিজের আরেকটা রূপ, আলোতে ধরা পড়ে মাংসহীন একটা হাসি নিয়ে তাকিয়ে আছে। জলের ঠিক নিচে।  নড়ছে না। কিন্তু দেখছে নিঃশব্দে। 

গুহার ফাঁক দিয়ে আসা আলোটা হঠাৎ যেন আরও তীব্র মনে হল কেউ উপর থেকে আলোর দরজাটা আরও একটু খুলে দিয়েছে যেন। সেই আলো জলের উপর পড়তেই প্রতিচ্ছবির মতো মুখটা আরেকটু উজ্জ্বল হয়ে উঠল আর ঠিক তখনই স্যার বুঝলেন এটা প্রতিচ্ছবি নয়। এটা নিঃসন্দেহে কিছু একটা। নিঃশ্বাস দ্রুত হয়ে উঠল, আর গুহার বাতাসে সেই নিঃশ্বাসের শব্দও ভয়ানক প্রতিধ্বনি তুলল হুঁঁউঁমম যেন গুহার অন্ধকার নিজেই  ভয়কে গিলে খেতে চাইছে। স্যার ধীরে ধীরে পা তুললেন জলে ছোট্ট ঢেউ উঠল। চোখ নামাতেই দেখলেন, জলের ভেতরের সেই মুখটাও ঢেউয়ের সঙ্গে নড়ল না। যেন তার উপর জলের নড়াচড়ার কোনো প্রভাবই নেই। বরং এবার সে সরাসরি স্যারকে দেখছে। 

হঠাৎ কোথা থেকে যেন হালকা একটা  পাথরের টুকরো ছিটকে পড়লো। ঘুরে তাকাতেই স্যারের মনে হল কিছু একটা ঠিক পিছন দিয়ে জলে পড়ল। স্যার ঘুরে দাঁড়ালেন। অন্ধকার নরম ঢেউ দেয়ালে শ্যাওলা কিন্তু কাউকে দেখা গেল না। 

আবার সামনে তাকাতেই বুকের ভেতরটা থমকে গেল। জলের ভেতরের মুখটা এবার আর একটাই নয়। আরও তিনটা না, চারটা মুখ উঠে এসেছে অন্ধকারের নিচ থেকে। সব কটা মুখ একই রকম চওড়া চোখ, দাঁত-ভরা অস্বাভাবিক মুখ, ছেঁড়া-ফাটার মতো গাল কিন্তু প্রতিটা মুখই যেন নিজের ভিন্ন ভিন্ন ভঙ্গি। 

একটার চোখে আতঙ্ক, আরেকটার চোখে রাগ, তৃতীয়টার ঠোঁটে বিকৃত হাসি যেন সে কোনো গভীর, অজানা দুঃস্বপ্ন জানে। আর তখন ধীরে ধীরে জলের ভিতর থেকে শব্দ উঠল। একসঙ্গে বহু গলা, কিন্তু সবগুলোই মনে হলো নিজের কণ্ঠস্বর। 

খুব নিচু, ভাঙা, একটা ফিসফিস আওয়াজ। জল কেঁপে উঠতে লাগল। মুখগুলো ওপরে উঠতে লাগল। আর গুহার সেই ছোটো ফুটো দিয়ে আসা আলোর রেখাটা হঠাৎ এদিক-ওদিক নড়ল, যেন উপরে কেউ চলাফেরা করছে। তারপর টুপ টুপ গুহার ছাদ থেকে আলোর সঙ্গে বরফঠান্ডা জল নয় লালচে, ঘন, উষ্ণ কিছু পড়তে শুরু করল। মাথার পাশে ফোঁটা পড়তেই গন্ধে বুঝলেন এটা জল নয়। আর তখনই উপরের ফুটো থেকে একটা ছায়া নড়ল। মনে হল মাথা গলিয়ে কেউ নিচে তাকিয়ে আছে অন্ধকার গুহার জলে দাঁড়িয়ে, চারদিক থেকে নিজেরই বিকৃত মুখগুলো উঠে আসছে গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। তবু একমুহূর্তের জন্য স্যার পিছনে তাকালেন। রূপম, তন্ময়, সঞ্জীব, শিবম কোথায়? ওদের ডাকতে চাইলেন গলার স্বর বেরোতে চাইলো না। নিজেকেই বললেন জলে ঢেউ তুলবোনা। 

ওরা ঢেউ পেলে এগোয়। শব্দ পেলে জেগে ওঠে। রূপম, শিবম, তন্ময় আর সঞ্জীব চারজনের হাঁটু পর্যন্ত ঠান্ডা জলে ডুবে আছে। গুহার ভেতর প্রতিটি শব্দ প্রতিধ্বনিতে বাড়ছে, তবু তারা আরো নিচু হয়ে হামাগুড়ি দিতে দিতে এগিয়ে গেল কারণ হাটলে জল বেশি নড়ে যাবে, আর স্যার আগেই বলেছিলেন ঢেউ তুলবে না। এগিয়ে যেতেই ওরা বুঝল এখানে জল অনেকটা কম। অন্ধকারের ভেতর একটা অস্পষ্ট ছায়া দেখা যাচ্ছিল। তারা কাছে যেতেই বুঝল স্যার মুখ থুবড়ে পড়ে আছেন।  দুটো হাত জলে ডুবে আছে, শরীর কাঁপছে, আর গলা থেকে মরণভীতির মতো কাঁপা-কাঁপা শব্দ বেরোচ্ছে। স্যারের মুখের ঠিক পাশে জলের ওপর আলো পড়ছে। চারজন থেমে গেল। 

তন্ময় ফিসফিস করে বলল দেখেছিস? স্যারের চোখ উল্টে গেছে যেন। 

স্যার তখনও বিড়বিড় করছেন। আওয়াজ বের হচ্ছিল না। তার গলা শুকনো, আর শব্দগুলো অর্ধেক গিলে ফেলা। মনে হচ্ছিল কেউ তাঁকে চেপে ধরেছে। 

রূপম প্রথমে সাহস করল। গলা শুকিয়ে এলেও সে হাত বাড়িয়ে স্যারের কাঁধে আলতো করে ধরল। স্যার, স্যার শুনতে পাচ্ছেন? আমরা এসেছি। কিছু হবে না। ছেলেরা এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। তারা বুঝে উঠতে পারছিলনা স্যার এমন কি কিছু দেখেছেন আর সেই ভয়ের আঘাতে তিনি জলে পড়ে গিয়েছিলেন। শিবম ফিসফিস করে বলল স্যারকে দাঁড় করাতে হবে। গুহার ধারে নিয়ে গেলে একটু আলো পাবে হয়তো স্যার স্বাভাবিক হবেন।

সঞ্জীবের গলা শুকিয়ে গেছে কোনক্রমে বলল হ্যাঁ, কিন্তু শব্দ করবি না। চারজন সতর্কভাবে স্যারকে দু’পাশ থেকে ধরল। রূপম আর শিবম হাত দিল কাঁধে, তন্ময় আর সঞ্জীব পেছন থেকে ঠেস দিয়ে তুলল। 

তখন তন্ময় খুব আস্তে বলল স্যার, কেউ নেই এখানে। আপনার ছাত্ররা আছে। আপনি আমাদের কথা শুনুন। 

ধীরে ধীরে, অনেক কষ্টে স্যারকে তুলে দাঁড় করানো হল। অর্ধেক নুইয়ে থাকা অবস্থায় চারজন তাকে গুহার বাঁকের  দিকে নিয়ে যেতে লাগল। এগোতে এগোতে শিবম দেখল গুহার মাথার ফোঁকর থেকে আসা আলো এবার স্থির। চারজন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে যাচ্ছিল ঠিক তখনই জলের ভেতর থেকে বুদবুদ উঠল। ধীরে, বড় আকারে। চারজনের শিরদাঁড়া যেন বরফে জমে গেল। তবু তারা স্যারকে ধরে এগিয়ে চলল কারণ এখন ফিরে যাওয়ার পথ নেই, আর থামা মানেই অন্ধকারের দিকে আরও এক ধাপ ডুবে যাওয়া। চারজন ছেলেই স্যারকে দু’পাশ থেকে ধরে টেনে নিয়ে চলেছে। হঠাৎ স্যার থরথর করে কাঁপলেন তারপর চোখ উল্টে যেন অন্ধকারের দিকে তাকালেন।  না এরা সত্যি আমার - বাক্যটা অসম্পূর্ণ রেখেই তিনি নিথর হয়ে গেলেন। স্যার অজ্ঞান হয়ে গেছেন।

রূপম আটকে রাখা শ্বাস ছেড়ে বলল, আর পারছি না কিছু একটা দেখেছেন স্যার। ঠিক তখনই সঞ্জীব পিছন ঘুরে দেখতে পেল গুহার বাম পাশে একটু চওড়া একটা খোলা পথ। জল নেই জায়গাটা-ও তুলনামূলক শুকনো। সঞ্জীব ইশারা করে ফিসফিস করে বলল এইদিকে ঘুরে দেখি স্যারকে নিয়ে যাওয়া যাবে কিনা।  চারজন স্যারকে তুলে সেই দিকের পথ ধরে এগোল। জায়গাটা সত্যিই একটু খুলে গেছে গুহার দেয়াল দূরে সরে বিশাল এক প্রকোষ্ঠের মতো মনে হচ্ছে। ওরা স্যারকে একটা শুকনো, সমান জায়গায় শুইয়ে দিল। শিবম স্যারকে চেপে ধরে বলল হাত-পা টান তোরা। তন্ময় স্যারের হাতে চাপ দিল। রূপম শ্বাস পরীক্ষা করল। সঞ্জীব গলা তুলে ধরল। ধীরে ধীরে স্যারের বুক ওঠানামা শুরু হল শ্বাসপ্রশ্বাস এখন পড়ছে। কিছুক্ষণ পর স্যার চোখ মেলে তাকালেন।  চোখে আতঙ্কের ঝিলিক, কিন্তু সচেতনতা ফিরেছে। ঠিক সেই মুহূর্তেই সঞ্জীবের চোখ পড়ল সামনের দিকে।  গুহার ভেতরটা হঠাৎ অস্বাভাবিকভাবে ওপরের দিকে একটা উঁচু প্ল্যাটফর্মের মতো। আর সেখানে একটার পর একটা পাথরের সিঁড়ি। সিঁড়ির উপরে একটা বিশাল পাথর দাঁড়িয়ে আছে পাথরের আকার গোল, পাথরের গায়ে খোদাই করা অস্পষ্ট সব দাগ। সঞ্জীব এগিয়ে গিয়ে টর্চ নেড়েই চিৎকার করে উঠল আরে এগুলো কি! দ্যাখ! তার চিৎকারের প্রতিধ্বনি গুহা কাঁপিয়ে দিল। 

রূপম, শিবম, তন্ময় দৌড়ে ওর পাশে গিয়ে দাঁড়াল। টর্চের আলোয় দেখা গেল সিঁড়ির নিচে ছড়িয়ে আছে ছোট ছোট পাথরের চাঁই। অর্ধেক ডুবে থাকা কিছু ভাঙা মুখোশের মতো কিছু। আর দেয়ালে আঁকা হাতের ছাপ। ছেলেরা ভয় আর বিস্ময়ে একসঙ্গে নিশ্বাস টানল। পিছন থেকে স্যার দুর্বল গলায় বললেন ওগুলো মানুষ নয় রেকর্ড যারা এসেছিল যারা বেরোতে পারেনি তাদের চিহ্ন। 

চারজন আঁতকে তাকাল স্যারের দিকে—

( ক্রমশ )