সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি। তবু হঠাৎ বৃষ্টি শুরু। সঙ্গে উল্টোপাল্টা হাওয়া। নিম্নচাপ সৃষ্টি হয়েছে বোধহয়। সন্ধের মুখে জোরে বৃষ্টি নামল। নিজের ঘরের জানালাদুটো বন্ধ করে বিকাশবাবু লেখার টেবিলে এসে বসলেন।
পুজো সংখ্যার লেখা পাঠানো
প্রায় শেষ। দু'একজন সম্পাদক হোয়াটসঅ্যাপে প্রুফ পাঠাচ্ছেন। সেগুলো দেখে
দিতে হচ্ছে। পাশের স্টাডিতে দুই নাতি-নাতনি অস্কার আর এমি বোধহয় খেলছে। ওদের
হই-হট্টগোল হাসি ঝগড়া সব এঘরে ভেসে আসছে। একমাত্র ছেলে সমর এখনো অফিস থেকে
ফেরেনি। বিকাশবাবু রেলের চাকরি থেকে অবসর নিয়ে এখন লেখালেখি নিয়ে থাকেন।
আজ এই অকাল বৃষ্টির আবহে
কিছু পড়তে বা লিখতে ইচ্ছে করছে না। ইজিচেয়ারে গা এলিয়ে চুপচাপ শুয়ে ছিলেন। এমন
সময় দুই নাতি-নাতনি হৈ হৈ করে ঘরে ঢুকল। বিকাশবাবু সোজা
হয়ে বসলেন। —কী ব্যাপার দাদু-দিদান, তোমরা কেন এ সময়? পড়াশোনা নেই?
—পড়াশোনা করতেই তো তোমার ঘরে এলুম। এমি বলল। তারপর সে ও
অস্কার দাদুর বিছানার একপাশে বসে পড়ল।
—জানো দাদু, আজ আমাদের বাংলার মিস
ক্লাসে বলেছেন, আগামীকাল সবাইকে ডাকাত নিয়ে কিছু বলতে হবে। ডাকাত কী দাদু? মা বলেছে, ইয়া বড় গোঁফ, লম্বা লম্বা ঝাঁকড়া চুল, মাথায় পাগড়ি, কপালে লাল টিপ আর হাতে লাঠি। তারাই নাকি ডাকাত!
—ঠিক বলেছে তোমার মা। আগে ওই রকমই দেখতে ছিল ডাকাতদের। ওরা
লাঠির ঘায়ে পথচারী মানুষ,
ব্যাবসায়ীদের আঘাত করে সর্বস্ব কেড়ে নিত। এমনকি শাবল
দিয়ে দরজা ভেঙে ঘুমন্ত মানুষদের ঘরে ঢুকে লুটপাট চালাত। বাধা দিলে এরা মানুষ
পর্যন্ত খুন করত।
দুই ভাইবোনের চোখ ততক্ষণে
বড় বড় হয়ে গেছে। তারা প্রায় একই সঙ্গে জিজ্ঞেস করল, আচ্ছা দাদু, তুমি ডাকাত দেখেছ?
—দেখেছি বইকি। তবে এখনকার ডাকাত আর আগের দিনের মতো না। তাদের
হাতে থাকত, লাঠি রামদা। আর এখন ডাকাতদের হাতে থাকে বন্দুক, পিস্তল।
ছোট অস্কার বিছানা থেকে
নেমে দাদুর পাশে আসে। তারপর চোখে বিস্ময় নিয়ে জিজ্ঞেস করে, তুমি সত্যিকার ডেকয়েট দেখেছ, দাদু?
—দেখেছি বইকি। একেবারে সামনা সামনি। শুধু দেখা নয়, লড়েছি তাদের সাথে। ধরিয়ে দিয়েছি পুলিশের হাতে।
—বাব্বা! কী সাহস তোমার। এমি বলে, বল না দাদু, তোমার সেই ডাকাত ধরার গল্প।
বিকাশবাবু বুঝলেন, আজ আর ছাড় নেই। বলতেই হবে ডাকাত ধরার গল্প। ইজিচেয়ার
ছেড়ে সোফায় গিয়ে বসলেন। তারপর গলা ঝেড়ে বললেন, গল্প তো বলব।
কিন্তু আগে কেউ একজন কিচেনে গিয়ে তোমাদের ঠাম্মাকে বলে এসো, কড়া করে আমাকে এক কাপ চা দিতে।
নাতনি এমি বড়, সে ছুটল চায়ের কথা বলতে। ফিরে এসে দুই ভাইবোন সোফায় দাদুর
গা-ঘেঁষে দু’পাশে বসল।
বিকাশবাবু গল্প শুরু করলেন।
—শোন তোমরা। আমি যে ডাকাতের গল্প বলব, তারা কিন্তু ওই আগে বলা ডাকাতরা না। এরা রেল ডাকাত। চলন্ত
ট্রেনে উঠে এরা যাত্রীদের কাছ থেকে টাকাপয়সা, মেয়েদের গা থেকে সোনার
গয়না, ব্যাবসায়ীদের মালগস্তের টাকা সব লুট করত। আমি তখন সবে
রেলের চাকরিতে ঢুকেছি। প্রথম পোস্টিং শিয়ালদহ দক্ষিণ শাখার লক্ষ্মীকান্তপুর
স্টেশন। ওটাই শেষ স্টেশন ছিল তখন। এখন অবশ্য ওই লাইন নামখানা পর্যন্ত চলে গেছে। আর
তারপরেই হাতানিয়া-দোয়ানিয়া নদী। পার হয়ে বেশ কিছুটা গেলেই ট্যুরিস্ট স্পট
বকখালি। তখন শিয়ালদহ দক্ষিণ শাখায় ক্যানিং, ডায়মণ্ড হারবার, লক্ষ্মীকান্তপুর এই তিন শাখাতেই রাতের দিকে চলন্ত ট্রেনে
খুব ডাকাতি হত। আর প্রান্তিক স্টেশনে দাঁড়িয়ে থাকা মালগাড়ি ভেঙে ডাকাতরা মাল
বের করে নিয়ে যেত। দক্ষিণ ২৪ পরগনা একটা অনুন্নত জেলা। শিক্ষার হার খুব কম। গরিব
নিম্নবর্গের মানুষের বাস বেশি। এক ফসলী জমি, চাষের কাজ দু' মাস করে মাত্র চার মাস। কিছু মানুষ মাছ ধরে জীবন চালায়।
কিন্তু জলাজমি কমে আসছে, নদী-খাড়ি সব বুঁজে আসছে। তাই নিরুপায় হয়ে বাঁচার তাগিদে
তাদের অনেকেই তখন ডাকাতিকে পেশা করত। একজন সর্দারের আন্ডারে ১০/১২ জনের এক একটা দল
হত। দোলনা বন্দুক, পাইপগান, হাতে তৈরি বোমা, লাঠি, বড় রামদা, এই সব তাদের অস্ত্র ছিল। যারা বেশি লোকজন জড়ো করতে পারত না, বা অস্ত্রসস্ত্র জোগাড় হত না তখন তারা ট্রেনে ডাকাতি করত।
লোকে বলত 'রেল ডাকাত'।
লোকাল ট্রেনে তেমন কোন
পুলিশি পাহারা থাকত না। তার সুযোগ রেল ডাকাতরা নিত। আমি ছিলুম অ্যাসিস্ট্যান্ট
স্টেশন মাষ্টার। সেই সুবাদে স্টেশনের নিরাপত্তা নিয়ে প্রায়ই জিআরপির অফিসারদের
সঙ্গে কথা বলতে হত। তাদের থেকে জানি লক্ষ্মীকান্তপুর লাইনে লালু ডাকাত, সূর্য, ভোলা ডাকাত এরা রাজ করত।
কয়েকবার ধরাও পড়েছে। কয়েক মাস জেল খেটে জামিনে ছাড়া পেয়ে আবার বাইরে এসে
ডাকাতি করত।
সেদিনটা ছিল শনিবার। আমার
ডিউটি শেষ হতে, সন্ধের দিকের ট্রেন ধরে বাড়ি ফিরছিলুম। কামরায় খুব একটা
ভিড় ছিল না। ২০/২২ জনের মতো প্যাসেঞ্জার ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসে ছিল। তার মধ্যে কয়েকজন মহিলাও ছিল। বোধহয় কোন অনুষ্ঠানবাড়ি যাচ্ছে।
গায়ে গয়না। গোচারণ স্টেশন থেকে ট্রেন ছাড়তেই আচমকা অন্ধকার ফুঁড়ে ৬/৭ জনের
একটা দল উঠে পড়ল। মাথায় লাল ফেট্টি বাঁধা, গায়ে গেঞ্জি, পরনে লুঙ্গি। মুখ গামছা দিয়ে ঢাকা। একজনের হাতে একটা
পাইপগান। অন্যদের হাতে ছুরি, লোহার রড। বন্দুক হাতে
লোকটি এবার হুঙ্কার ছাড়ল,
—কেউ উঠবি না। নড়বি না। যার কাছে যা আছে সব
দিয়ে দে। না হলে গুলি করব। তারপর দলের একজনের দিকে ইশারা করল। তখন দু'জন ডাকাত দু'দিক দিয়ে লোকজনের কাছ থেকে
টাকাপয়সা, সোনাদানা সব নিতে শুরু করতেই গণ্ডগোল শুরু হয়ে গেল।
মেয়েরা চিৎকার করে কাঁদতে লাগল। গয়না তারা দেবে না। বন্দুক হাতে সর্দার ডাকাত
কোণের দিকে এক বয়স্ক
ব্যাবসাদারের দিকে এগিয়ে গেল। সে তখন তার হাতের ব্যাগ জোরে
বুকে চেপে ধরল। বুঝতে পারলুম সর্দার ডাকাত পাকা খবর নিয়েই এসেছে। ওঁনার ব্যাগে
টাকা আছে। এবার হুঙ্কার ছাড়ল, মাল ছাড়, না হলি জানে মেরে দেব।
আমি তখন যুবক। ব্যায়াম
করি। শক্ত সমর্থ চেহারা। তার উপর রেলে চাকরি। আমার সামনে রেলে ডাকাতি হবে! অসহায় মানুষের সর্বস্ব লুটে নেবে। মুহূর্তে
সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম। আমার ব্যাগে একটা পাঁচ ব্যাটারির পিতলের টর্চ ছিল। আমি
ত্বরিতে উঠে দাঁড়িয়ে এক লাফে ডাকাত সর্দারের পিছনে গিয়ে তার ঘাড়ে জোরে আঘাত
করলাম। সে পড়ে যেতেই আমি চিৎকার করলুম, সবাই মিলে আক্রমণ করুন। এক
ডাকাত এগিয়ে আসতে তার মাথায় টর্চের ঘা মারলাম। আমার দেখে যারা জোয়ান ছিল তারা
কামরার বাকি ডাকাতদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। ডাকাত সর্দার তো অজ্ঞান। বাকিরা সর্দারের
এই দশা দেখে হতচকিত হয়ে গেল। কী করতে হবে বুঝে ওঠার আগেই তারা লোক জনের হাতে মার
খেয়ে বন্দী হয়ে গেল। হট্টগোলের মধ্যে দু'ই ডাকাত ছোরা চালিয়ে চলন্ত
ট্রেন থেকে ঝাঁপিয়ে পালিয়ে গেল। ইতিমধ্যে ট্রেন পরের স্টেশন ধবধবি এসে পড়ল।
গণ্ডগোল ও 'ডাকাত পড়েছে' শুনে পাশের কামরা থেকে আরও
অনেক যাত্রী ছুটে এল। স্টেশন মাষ্টার খবর পেয়ে ছুটে এলেন। গার্ড ড্রাইভারও নেমে
এল। ট্রেন দাঁড়িয়ে পড়ল। দড়ি এনে ধরাপড়া চার ডাকাতকে পিছমোড়া করে বাঁধা হল।
সর্দারের জ্ঞান আসতে তাকেও বাঁধা হল। স্টেশন মাষ্টার অনেক দিন চাকরি করছেন। কী করতে হবে সব জানেন। ডাকাত
সর্দারের পাইপগান আমার হাতে দিয়ে বললেন, এ সূর্য ডাকাত। এর ছবি এখানে আছে। ভয়ানক। আপনাকে এখন
বারুইপুর জংশন স্টেশনে নেমে জিআরপিতে এদের হ্যান্ড ওভার করতে হবে। তারপর সব ঘটনা
জানিয়ে কেস লেখাতে হবে। যারা আহত হয়েছে তাদের চিকিৎসা ওখানে হবে। আর একটা কথা, আহত যারা তাদের সাক্ষী হিসেবে নাম নথিভুক্ত করাবেন। আমার
নামও দেবেন। এবার যেন ব্যাটারা বড় ধরনের শাস্তি পায়। আমি সিগন্যাল দিয়ে দিচ্ছি।
তবে আপনার সাহসের প্রশংসা করি।
স্টেশন মাষ্টার নেমে গেলেন।
সিগন্যাল পেয়ে ট্রেন
আবার চলতে শুরু করল। কামরার সব যাত্রীরা ততক্ষণে কিছুটা
স্বস্তি পেয়েছে। ভিড়ও বেড়েছে। কিন্তু সেই বয়স্ক ব্যাবসাদার তখনও কাঁপছে চোখে
ভয় নিয়ে। আর বাঁধাপড়া ডাকাত পাঁচজন লাল চোখ নিয়ে মেঝেতে শুয়ে
শুয়ে রাগে ফুঁসছে।
এবার একটু দম নিলেন
বিকাশবাবু। অস্কার উৎকণ্ঠিত হয়ে প্রশ্ন করল, দাদু, তারপর ডাকাতদের কী হল?
—কী আর হবে। বারুইপুর স্টেশন আসতেই পুলিশ এসে ডাকাতদের নিয়ে
গিয়ে হাতে পায়ের বাঁধন খুলে লোহার হাজতে ভরে দিল। আমি কেস লিখিয়ে বাড়ি চলে
এলুম। পরে ওদের জেল হয়েছিল।
এবার এমি বলল, তোমার কি সাহস দাদু! একটা টর্চ দিয়ে ডাকাত ঘায়েল করলে!
ওরা যদি তোমাকে মারত?
—তা তো পারত। কিন্তু ওই যে আগেই বলেছি, তখন জোয়ান ছিলাম, রক্ত গরম। তবে কামরার
অন্যরাও সাহস না দেখালে আমার বিপদ ছিল।
অস্কার দাদুর সামনে
দাঁড়িয়ে পড়ল। তারপর হাততালি দিয়ে বলল, আমার দাদু হিরো, আমার দাদু জিন্দাবাদ !
এমি বলল, দাদু, তোমার এই রেলডাকাত ধরার
গল্পটাই আমি কাল ক্লাসে বলব।