এই নীলগ্রহের আদিম মানবেরা যে-জিনিসটা সর্বপ্রথম সফলভাবে
ব্যবহার করতে শিখেছিল, সে হচ্ছে একটুকরো পাথর। সে কি, একটা সাধারণ পাথর! সে তো হামেশাই আমরা রাস্তাঘাটে পড়ে থাকতে
দেখি!
হ্যাঁ, মানব ইতিহাসের সবচেয়ে প্রাচীন অধ্যায়টি শুরু হয়েছিল একটুকরো
ধারালো পাথর দিয়ে। আজকের পৃথিবীর চোখে যে সাধারণ, সেই পাথরই
একসময় ছিল মানবজাতির সর্বপ্রথম হাতিয়ার, প্রথম প্রযুক্তি, প্রথম সৃষ্টিশক্তির চিহ্ন। মানবসভ্যতার এই প্রাথমিক পর্যায়ে
মানুষ প্রকৃতির বুকে বেঁচে থাকার জন্য নিজের বুদ্ধি ও সৃজনশীলতা কাজে লাগাতে শুরু
করেছিল, আর সেই প্রক্রিয়ার প্রথম সাক্ষ্যই হল এই পাথরের সরঞ্জাম।
প্রাচীনতম মানুষের হাতে
প্রথম উদ্ভাবন ছিল পাথর। প্রাচীন মানুষরা নদীর ধারে, পাহাড়ের ঢালে
বা শুষ্ক সমতলে প্রাকৃতিকভাবে পাওয়া ধারালো চকমকি পাথর (flint) সংগ্রহ করত এবং সেগুলো ব্যবহার করত প্রাণীর ছাল ছাড়ানো, ফলমূল কাটা বা প্রতিরক্ষার কাজে। ধীরে ধীরে তারা দেখতে পেল, এই পাথরগুলোকে পিটিয়ে আরও ধারালো, আরও কার্যকর করা যায়। এভাবেই তারা প্রথমবারের মতো প্রযুক্তি
ব্যবহার করতে শিখল।
১৯৬৯ সালে কেনিয়ার ওল্ডুভাই
গর্জ (Olduvai Gorge) এলাকায় যে পাথরের সরঞ্জাম পাওয়া গিয়েছিল, তা আজও মানব ইতিহাসের সবচেয়ে প্রাচীন প্রযুক্তি হিসেবে
বিবেচিত হয়। বিজ্ঞানীরা অনুমান করেন, এই সরঞ্জামগুলোর বয়স প্রায়
২৬ লক্ষ বছর। অর্থাৎ, সভ্যতার ইতিহাস শুরুর বহু আগেই মানুষ নিজের হাতে তার প্রথম
অস্ত্র ও যন্ত্র তৈরি করে ফেলেছিল।
পাথরের যুগের সূচনালগ্নকে
বলা হয় প্যালিওলিথিক যুগ (Paleolithic
Age)। এই যুগে মানুষ
মূলত পাথরকেই জীবনের প্রধান উপকরণ হিসেবে বেছে নিয়েছিল। যন্ত্রের ধরন ও ব্যবহার
অনুযায়ী এগুলোকে তিনটি প্রধান শ্রেণিতে ভাগ করা হয়— কোর টুল (Core tools), ফ্লেক টুল (Flake tools) ও ব্লেড টুল (Blade tools)।
কোর টুল ছিল সবচেয়ে প্রাচীন
এবং সাধারণ ধরনের সরঞ্জাম। বড়ো পাথরের টুকরো (core) থেকে অন্য একটি
পাথর (hammerstone) দিয়ে আঘাত করে ধারালো প্রান্ত তৈরি করা হত। এই প্রক্রিয়ায়
তৈরি যন্ত্রগুলো হত এবড়োখেবড়ো, কিন্তু যথেষ্ট কার্যকর। এসব
দিয়ে মানুষ গাছের ডাল কাটত,
হাড় ভাঙত বা পশুর ছাল ছাড়াত।
ফ্লেক টুল তৈরি হয় পরের
ধাপে। ওগুলো ছোটো আকারের হলেও অনেক বেশি ধারালো ছিল। ফ্লেক বা পাথরের খণ্ডের ধার
এত সূক্ষ্ম ছিল যে তা দিয়ে মাংস কাটা, হাড় ছিদ্র করা কিংবা কাঠও
খোদাই করা যেত।
ব্লেড টুল ছিল প্রযুক্তিগত
অগ্রগতির প্রতীক। এগুলোর ধার লম্বা ও পাতলা ছিল, অনেকটা ছুরির
মতো। এর ব্যবহার ছিল আরও সূক্ষ্ম কাজে—শিকার করা, পশুর চামড়া
প্রক্রিয়াজাত করা বা কাঠে নকশা করা।
সময় যত এগোতে লাগল, মানুষ তার যন্ত্র তৈরির কৌশল আরও নিখুঁত করে তুলল। প্রস্তর
যুগের শেষ ১০,০০০ বছরে যন্ত্র তৈরিতে ঘষা (grinding), পেষা (pecking), ছিদ্র করা (boring) ইত্যাদি উন্নত পদ্ধতির উদ্ভাবন ঘটে। এর ফলে পাথরের
জিনিসগুলো হয়ে উঠল আরও মজবুত, সুন্দর ও কার্যকর।
এই প্রযুক্তিগত অগ্রগতির
ফলে মানুষের কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি পেল বহুগুণ। আগে যেসব কাজ অসম্ভব বা অত্যন্ত
কষ্টসাধ্য ছিল, সেগুলো এখন সহজ হল। উদাহরণস্বরূপ— পশুর চামড়া ছাড়িয়ে পোশাক
তৈরির উপকরণ তৈরি করা, পাথরের ছুরি বা কুড়ুল দিয়ে মাংস ও কাঠ কাটা, আশ্রয় তৈরির জন্যে কাঠ বা পাথর খোদাই করা, শিকারের জন্যে বর্শা, তির বা মাছ ধরার বড়শি তৈরি
করা।
প্রস্তর যুগের মানুষের জীবন
ছিল প্রকৃতিনির্ভর। তাদের আশ্রয়, খাদ্য ও বেঁচে থাকার
উপায়—সবকিছুই নির্ভর করত পাথরের এই সরঞ্জামগুলোর ওপর। পশুর চামড়া ঘষে পরিষ্কার করা
হত পাথরের স্ক্র্যাপার দিয়ে, পরে তাতে ছিদ্র করা হত মোটা
পাথরের খোঁচা (awl) দিয়ে। তবেই এতে পোশাক তৈরি সম্ভব হত।
শিকারের ক্ষেত্রেও পাথরের
অস্ত্র বিপ্লব নিয়ে এল। ধারালো ফ্লেক দিয়ে তৈরি বর্শার মাথা শিকারে সাফল্যের হার
বাড়িয়ে দিল বহুগুণ। পশু শিকারের মাধ্যমে খাদ্য ও চামড়া মিলল। সে-সবই তখন হয়ে উঠল
জীবনের অপরিহার্য অঙ্গ।
তারপর ধীরে ধীরে মানুষ
বুঝতে শিখল—পাথর শুধু হাতিয়ার নয়, ক্ষমতারও প্রতীক বটে। একটা
ধারালো যন্ত্র মানে টিকে থাকার নিশ্চয়তা, শিকারে সাফল্য, আশ্রয়ের নিরাপত্তা। এই উপলব্ধিই মানবসভ্যতার প্রথম
সাংস্কৃতিক পরিবর্তন নিয়ে আসে। মানুষ গোষ্ঠীতে বসবাস শুরু করে, একসঙ্গে শিকার করে, সরঞ্জাম ভাগাভাগি করে নেয়। এভাবেই পাথর
শুধু যন্ত্র নয়, হয়ে ওঠে সমাজবদ্ধ জীবনের সূচনা বিন্দু।
পাথরের সরঞ্জাম তৈরিতে তখন
ব্যবহার করা হত শক্ত অথচ ভঙ্গুর এবং সহজে ধারালো করা যায় এমনসব উপকরণ। এর মধ্যে
উল্লেখযোগ্য হল অবসিডিয়ান (Obsidian): প্রাকৃতিক আগ্নেয় কাচ, যার ধার খুবই সূক্ষ্ম; চের্ট (Chert) এবং ফ্লিন্ট (Flint): কঠিন পাথর, ধারালো ধার তৈরি করা যায় সহজে; ক্যালসেডনি (Chalcedony): সূক্ষ্ম
কণাযুক্ত রঙিন পাথর, অলংকার ও অস্ত্র উভয়ের জন্য ব্যবহৃত।
পাথরের এই সরঞ্জামগুলো
মানবসভ্যতার ইতিহাসে এক অনন্য মাইলফলক। এগুলো কেবল বস্তু নয়; মানুষের চিন্তা, পরিকল্পনা ও সৃষ্টিশীলতার
প্রথম নিদর্শন। এর মাধ্যমেই মানুষ প্রকৃতিকে ব্যবহার করতে, নিয়ন্ত্রণ করতে ও পরিবর্তন করতে শিখেছিল।
আগুন আবিষ্কার, আশ্রয় নির্মাণ, কৃষির সূচনা—সবকিছুর ভিত্তি
ছিল এই প্রস্তর যুগের উদ্ভাবন। তাই পাথরের সরঞ্জাম শুধু প্রযুক্তির নয়, মানুষের বিবর্তনেরই প্রতীক।
পাথরের যুগ ছিল মানবসভ্যতার
ঊষাকাল। এক মুঠো পাথর থেকে জন্ম নিয়েছিল কৌশল, প্রযুক্তি ও সংস্কৃতির
সূচনার বীজ। এই যুগেই মানুষ শিখেছিল, প্রকৃতির সীমাবদ্ধতাকে
বুদ্ধি দিয়ে জয় করা যায়। তাই বলা যায়, মানবজাতির ইতিহাসে প্রথম
সৃষ্টিশক্তির প্রতীক হল স্রেফ একটা ধারালো পাথর—যা কেবল একটি যন্ত্র নয়, বরং মানব মেধার প্রথম স্ফুলিঙ্গ। (চলবে)
<<
সূ চি প ত্র