বুল্টির ভালো নাম যে দিতিপ্রিয়া, এটা তার মনেই থাকে না। থাকবে কি করে? কেউ তো তাকে দিতিপ্রিয়া নামে ডাকে না। স্কুলেও হিয়া, তিতির, রুষা, কুহু, রাই তাকে বুল্টি বলে ডাকে বলে সবাই তাকে ঐ নামেই চেনে। এমনকি ম্যামেরাও তাকে বুল্টি বলে ডাকেন। শুধুমাত্র সুবর্ণা ম্যাম ছাড়া। একমাত্র সুবর্ণা ম্যাম তাকে দিতিপ্রিয়া বলে ডাকেন।
সুবর্ণা ম্যাম খুব গম্ভীর
প্রকৃতির মানুষ। যখন ক্লাসে আসেন, সম্পূর্ণ ক্লাস একেবারে চুপ
করে যায়। কোয়েলের মতো দুষ্টু মেয়ে, যাকে কোন ম্যাম-ই চুপ
করিয়ে রাখতে পারেন না, সেও পর্যন্ত একেবারে শান্ত হয়ে বসে থাকে। অথচ সুবর্ণা
ম্যাম খুব যে রাগী বা তাদের শাসন করেন, তা নয়। তবুও, সুবর্ণা ম্যাম যখন ক্লাসে ঢুকে বলেন, “গার্লস, টু ডে উই আর গোয়িং টু নো
এ্যাবাউট….” অমনি সকলের চোখগুলো টুপটাপ করে নেমে আসে বইয়ের পাতায়। খুব
ধীর, স্থির, শান্ত ভাবে তিনি বুঝিয়ে
দেন। প্রতিটা শব্দ একেবারে কানের মধ্য দিয়ে মনের ভেতরে প্রবেশ করে। সোস্যাল
সায়েন্সের মতো নীরস সাবজেক্টও যে বুল্টির কাছে জলবৎ তরলং হয়ে যায়, তা সুবর্ণা ম্যামের পড়ানোর গুণেই না। এই জন্যই তো সুবর্ণা
ম্যাম তার ফেভারিট। পরের ক্লাস সুবর্ণা ম্যামের ভাবলেই বুল্টির মুখখানা খুশি খুশি
হয়ে ওঠে।
আজ ফার্স্ট পিরিয়ড ছিল
ম্যাথ, সেকেন্ড পিরিয়ড স্যোশাল সায়েন্স। ক্লাস শেষে ম্যাথের ধকল
সামলে বুল্টির মেজাজ বেশ ফুরফুরে হয়ে গেল। এবার সুবর্ণা ম্যামের ক্লাস।
সুবর্ণা ম্যামের ক্লাসে
আসতে দেরি হয়না। আজও হলো না। ধীর স্থির পায়ে প্রবেশ করেছেন। কিন্তু এ কোন ম্যাম।
চোখে সেই ঝকঝকে ভাব কই! কোথায় সেই মিস্টি অথচ গম্ভীর কমান্ডিং টোন … ‘সিট ডাউন গার্লস’! মুখখানা বিষন্ন। হাতের
ইশারায় বসতে বলে খাতা বের করতে বললেন। চারটে কোশ্চেন বোর্ডে লিখে বললেন, “রাইট দ্য আনসারস।”
তারপর চুপ করে বসে থাকলেন
চেয়ারে। বুল্টি লিখতে লিখতে বারবার তাকাচ্ছিল ম্যামের দিকে। সুবর্ণা ম্যাম
মাঝেমধ্যেই সারপ্রাইজ ক্লাস টেস্ট নেন, কিন্তু সেদিন এমন চুপ করে
চেয়ারে বসে থাকেন না। পুরো ক্লাসরুম ঘুরে ঘুরে দেখেন কে কি লিখছে। যাদের আগে লেখা
হয়ে যায়, তাদের খাতাগুলো ক্লাসেই কারেকশন করে দেন। বাকিগুলো মনিটরকে
দিয়ে স্টাফরুমে নিয়ে যান। কারেকশন করে পরের ক্লাসে ফেরত দেন।
আজ ম্যাম টেবিলের উপর চোখ
রেখে বসে আছেন। একবারও উঠলেন না চেয়ার থেকে। বুল্টি উত্তর লেখা হয়ে গিয়েছিল।
ম্যামকে দেখাবার জন্য হাত তুলতে, ম্যাম তাকে হাতের ইশারায়
বসতে বললেন। ক্লাস শেষের বেল বাজলে চুপচাপ উঠে চলে গেলেন। কারো আনসার দেখলেন না, কারেকশন করলেন না।
ম্যাম বেরিয়ে যাওয়ার পরে
পুরো ক্লাস যেন বিস্ময়ে স্তব্ধ হয়ে গেল। একে অপরের দিকে তাকিয়ে থাকল। এরকম কখনও
হয়নি।
আজ কেন এরকম হল?
এই ব্যতিক্রম কেন?
নীরবে সবার চোখে এই
কথাগুলোই ঘুরে বেড়াতে লাগল। অনুচ্চারিত ভাবে। চোখে চোখে।
বুল্টির পাশে আজ কুহু
বসেছে। কুহুর বাড়ির কাছাকাছি ম্যাম থাকেন একটা আবাসনে। বুল্টি কুহুর দিকে তাকিয়ে
ইশারায় ‘কি ব্যাপার?’ জানতে চাইল। কুহুও মাথা
নেড়ে জানালো সে জানেনা।
বুল্টির মনে জেগে উঠল তীব্র
কৌতূহল, সেই সঙ্গে সে টের পেল তার মন ছেয়ে গেছে এক অদ্ভুত বিষাদে।
পরের ক্লাসে সবাই ব্যাপারটা ভুলে গেল। মন দিল লেকচারে। নোট লিখে নিল। বুল্টিও
ব্যস্ত ছিল, তবুও ঘুরে ফিরে সুবর্ণা ম্যামের মুখটাই ভাসছিল মনের মধ্যে।
কিছু একটা হয়েছে ম্যামের। কিন্তু কি হয়েছে? ম্যাম তাকে খুব ভালোবাসে।
সেও। সে কি কিছুই করতে পারে না ম্যামের জন্য!
পরের ক্লাস গেমের। এই
ক্লাসে নিজেদের মধ্যে গল্প করার, কথা বলার অবসর পাওয়া যায়।
বুল্টি কুহুকে পাকড়াও করল, “সুবর্ণা ম্যামের কি হয়েছে বলতো?”
“জানি না রে।”
“কিছু তো হয়েইছে। ম্যামকে এত আপসেট কখনও দেখিনি।”
ওদের ফিসফিস করতে দেখে
তিতির আর রাই ঘনিয়ে এসেছে।
তিতির বলল, “মনে হয় শরীর খারাপ।”
বুল্টি বলল, “তাহলে দেখে বোঝা যেত। আর শরীর খারাপ হলে ম্যাম নিশ্চয়ই
ছুটি নিতেন। ম্যম তো এ্যাবসেন্ট করেই না।”
“হয়তো খারাপ কিছু। হয়তো কোন টেস্ট রিপোর্ট বাজে এসেছে।”
কুহু বলল, “মে বি। কিন্তু তাতেও মনে হয়না ম্যাম এত আপসেট হতেন না।
অন্তত আমাদের সামনে হতেন না।”
বুল্টি বলল, “হ্যাঁরে, ম্যামের বাড়িতে কে কে আছে
রে?”
“ম্যাম তো উইডো। একটাই ছেলে, সৌরীশদা। জানিস
সৌরীশদা দারুন ব্রাইট। এই তো কয়েকমাস হল স্টেটসে গেছে, কি যেন কোর্স করতে। সৌরীশদা চলে যাওয়ার পরে ম্যাম একাই
থাকেন।”
রাই বলল, “তাহলে নির্ঘাত ছেলের জন্য মনখারাপ।”
কুহু বলল, “মে বি। কিন্তু তাহলে সৌরীশদা চলে যাওয়ার দিন, বা তার পরে পরে বেশি হতেন না?”
এই হচ্ছে কুহু। কিছুতেই
সন্তূষ্ট হয়না। অন্য সময় হলে বুল্টি বলেও ফেলত কথাটা। এখন মনে হল, কুহু হয়তো ঠিক বলছে।
হিয়া এসে শুনছিল। সে বলল, “ছাড় না বাবা, এসব। চল খেলি।”
সবাই রিয়ার তালে তাল
মিলিয়ে “চল,
চল”
বলে মাঠের দিকে হাঁটতে শুরু করল। মাঠে ততক্ষণে খো খো খেলা
শুরু হয়েছে। বুল্টিও যাচ্ছিল। হঠাৎ চোখে পড়ল, সুবর্ণা ম্যাম স্টাফ রুম
থেকে বেরিয়ে একটু সরে এসে ফোনে কথা বলছেন।
“আসছি।” বলে সোজা সেদিকে হাঁটতে শুরু করল। গ্রাউন্ড ফ্লোরের
ওয়াশরুমটা ওদিকেই পড়ে। চলতে চলতে ম্যামের কাছাকাছি গিয়ে বুল্টির জুতোয় কি যেন
একটা সমস্যা শুরু হল। সে এক হাঁটু মুড়ে বসে জুতো ঠিক করতে লাগল। সুবর্ণা ম্যাম ওর
দিকে পিছন ফিরে কথা বলছিলেন। খেয়াল করলেন না।
জুতো খুলে মোজা ঠিক করতে
করতে বুল্টি শুনতে পেল ম্যাম বলছেন, “কিসের বিশেষ দিন? একটা উইশ করার কেউ নেই পর্যন্ত। …. তার সময় কোথায়? ভীষণ ব্যস্ত সে।”
বলতে বলতে বুল্টির দিকে নজর
পড়েছে। বুল্টির জুতো পরা ততক্ষণে হয়ে গেছে।
ম্যামের দিকে তাকিয়ে সে
হেসে বলল, “গুড আফটারনুন ম্যাম।”
সুবর্ণা ম্যাম কিছু বললেন
না। মাথা নাড়লেন কেবল।
বুল্টি সামনে এগিয়ে
ওয়াশরুম পেরিয়ে ডানদিকে ঘুরে চলে এল রিসেপশনে। তিন নম্বর কাউন্টারে একটা মনিটরের
সামনে বসে আছে তন্ময়।
তন্ময়ের বয়স বেশি নয়।
ত্রিশ বত্রিশ হবে। খুব ভালো মানুষ, আর সুন্দর ব্যবহার।
মেয়েদের সবাইকে সিস্টার বলে ডাকে।
বুল্টি তন্ময়ের কাউন্টারের
সামনে গিয়ে বলল, “তন্ময়দা, একটা হেল্প করে দেবে, প্লিজ।”
তন্ময় একমনে কিছু ডাটা
এন্ট্রি করছিল।
বুল্টির কথা শুনে অবাক হয়ে
বলল, “কি হয়েছে সিস্টার?”
দুজনে ষড়যন্ত্রের ভঙ্গিতে
কি যেন ফিসফাস করল খানিকক্ষণ। কম্পিউটারে কিসব দেখল। তারপর খুব দ্রুত হেঁটে বুল্টি
সটান চলে এল প্রিন্সিপাল রুমের সামনে।
দরজার পর্দা সরিয়ে
উদ্বিগ্ন স্বরে বলল, “মে আই কাম ইন ম্যাম?”
স্কুল ছুটির ঠিক আধঘন্টা
আগে প্রিন্সিপালের রুম থেকে এ্যানাউন্স করা হল, “সমস্ত ছাত্রী এবং স্টাফকে
অডিটোরিয়ামে উপস্থিত হতে বলা হচ্ছে।” ঘোষণা শুনে সকলে গুটি গুটি রওনা দিল অডিটোরিয়ামের দিকে। কি
ব্যাপার? ফিসফিস করছে সবাই, কিন্তু কেউ কিছু বলতে পারছে
না। প্রিন্সিপাল ম্যাম ডেকেছেন, এটুকুই সবাই জানে।
কয়েক মিনিটের মধ্যে
অডিটোরিয়াম টইটম্বুর। সকল ম্যামও উপস্থিত। একটু পরেই প্রিন্সিপাল ম্যাম এসে
গেলেন। তিনি সোজা উঠে গেলেন স্টেজে। অন্যান্য ম্যামেদেরও ডেকে নিলেন স্টেজে।
সবাইকে বসতে বললেন তিনি।
সবাই শান্ত হলে তিনি বললেন, “আজ তোমাদের প্রিয় সুবর্ণা ম্যামের জন্মদিন।”
এটূকু বলে তিনি একটু
থামলেন। উপস্থিত ছাত্রীরা তো বটেই, অন্য অন্য ম্যামেরাও চমকে
উঠল। বর্তমান সময়ে ফেসবুকের কল্যাণে সবাই মোটামুটি সবার জন্মদিন বা অন্য কোন
বিশেষ দিনের খবর জেনে যায়। সুবর্ণা ম্যাম সোস্যাল মিডিয়ায় নেই। তাই তাঁর
জন্মদিনের খবর কেউই জানতেন না।
সুবর্ণা ম্যাম মাথা নিচু
করে চুপচাপ বসে আছেন।
তাঁর দিকে তাকিয়ে
প্রিন্সিপাল ম্যাম আবার বললেন, “আমরা আজ এখন সবাই মিলে তাঁর
জন্মদিন সেলিব্রেট করব।”
শোনার সঙ্গে সঙ্গে
অডিটোরিয়াম জুড়ে উল্লাসধ্বনি শোনা গেল। কিন্তু সুবর্ণা ম্যাম উঠে দাঁড়িয়ে
বললেন, “না,
না,
সেকি?”
তাঁকে থামিয়ে প্রিন্সিপাল
ম্যাম বললেন, “আমি ঠিক করেছি, এবার থেকে তোমাদের প্রত্যেক
ম্যামের বার্থ ডে আমরা এভাবে সেলিব্রেট করব। কি সুবর্ণা এবার ঠিক আছে।”
“তাহলে ঠিক আছে। কিন্তু আপনি জানলেন কি করে?”
“যার জন্য এটা সম্ভব হয়েছে, এবার সে-ই কেক
নিয়ে আসছে স্টেজে।”
বলার সঙ্গে সঙ্গে দেখা গেল, মঞ্চে উঠে এল বুল্টি। তার হাতে ধরা সুন্দর একটি কেক।
তুমুল করতালি আর হ্যাপি
বার্থডে গানের মধ্যে কেক কাটলেন সুবর্ণা। তিনি ভাবতেই পারেন নি এবছর তাঁর জন্মদিন
এভাবে পালিত হবে। তাঁর একমাত্র সন্তান বিদেশে। কাজের ব্যস্ততায় সে ভুলে গেছে
মায়ের জন্মদিন। একটা উইশ করার সময়ও সে পায়নি। সারাদিনের বিষাদ ভুলে হাসছিলেন তিনি।