অনেক দিন আগে একবার ভোরবেলা সূর্য উদয় হতে গিয়ে পৃথিবীর খুব কাছে চলে এসেছিল। ফলে পৃথিবীর সবচেয়ে লম্বা গাছের ডালে সূর্য ফেঁসে গেল। সে এঁকেবেঁকে, টানাহ্যাঁচড়া করে নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার অনেক চেষ্টা করল।
কিন্তু তাতে লাভ
তো হলই না, বরং গাছের ডালের
সঙ্গে সূর্য আরও বেশি জড়িয়ে পড়ল। এজন্য সেদিন সূর্যোদয় হল না। ভোরের আলো ফুটল না।
প্রথমে সমস্ত পশুপাখি ব্যাপারটা লক্ষ করেনি। তাদের মধ্যে
অনেকেই ঘুম ভেঙে ভোর হয়নি দেখে আবার ঘুমিয়ে পড়ল। মনে ভাবল, ভুল করে উঠে
পড়েছি— আসলে ভোর হয়নি এখনো রাত আছে। আবার কিছু জন্তুরা যেমন অজগর সাপ, প্যাঁচা—এরা রাতের অন্ধকারকে খুব ভালোবাসত।
সেদিন ভোর না হওয়ায় তাদের খুব সুবিধে হল। তারা অন্ধকারে মনের আনন্দে শিকার করে
বেড়াতে লাগল।
কিন্তু এইভাবে বেশ কিছুক্ষণ কেটে যাওয়ার পরে পশুপাখিরা
চিন্তায় পড়ে গেল। এখনও ভোর হচ্ছে না কেন? নিশ্চয়ই কোথাও একটা গোল বেঁধেছে। নইলে সূর্য ওঠেনি কেন? সূর্য না উঠলে
পৃথিবী চলবে কীভাবে?
তখন পশুপাখিদের এক সভা বসল। এই সমস্যার তো একটা বিহিত করতে
হবে। ঈগল বলল, “সূর্য নিশ্চয়ই
হারিয়ে গেছে। তাই আজ ভোর হয়নি।”
ভালুক বলল, “তুমি ঠিকই বলেছ ঈগল। সূর্যকে খুঁজে বের করতে হবে।”
সব পশুপাখি ভালুকের কথায় সায় দিল, “হ্যাঁ, ঠিক ঠিক। সূর্যকে
খুঁজে বের করতেই হবে।”
এই বলে সবাই মিলে সূর্যকে খুঁজতে বেরিয়ে পড়ল। তারা সূর্যকে
বনে খুঁজল, জঙ্গলে খুঁজল, পৃথিবীর সমস্ত
গুহায় খুঁজল। কিন্তু কোথাও সূর্যকে পাওয়া গেল না। তারপর তারা পাহাড়ে-পর্বতে, সাগরে, নদীতে, ঝর্ণাধারায়
সূর্যকে খুঁজল। সেখানেও সূর্যকে দেখা মিলল না।
পৃথিবী তন্ন তন্ন করে খুঁজে, সমস্ত পশুপাখির দল ক্লান্ত হয়ে আবার জঙ্গলে
ফিরে এল। আবার সভা বসল। সূর্যকে আর কোথায় খোঁজা যায়, তা নিয়ে সবাই ভাবতে লাগল। কিন্তু কারও মাথায়
কোনো বুদ্ধি এল না।
এমন সময়ে খয়েরি
রঙের ছোট্ট কাঠবিড়ালি হঠাৎ বলে উঠল, “আচ্ছা, সূর্য কি কোনো লম্বা গাছের ডালে আটকে পড়েনি? আমরা তো সূর্যকে
গাছে খুঁজিনি।”
কাঠবিড়ালির কথা শুনে সবার মনে হল—সত্যিই তো! গাছগাছালিতে তো
খোঁজা হয়নি। তাই সবাই বলল,
“কাঠবিড়ালি, গাছে চড়ায় তোমার
জুড়ি মেলা ভার। তুমিই তাহলে সূর্যকে খুঁজে আন।”
কাঠবিড়ালি রাজি হয়ে গাছে গাছে সূর্যকে খুঁজতে বেরিয়ে পড়ল।
গাছ বেয়ে ডালে-মগডালে উঠে,
পূর্ব দিকে চলতে
লাগল সে। যায় যায় যায় যায়। অনেক দূর যাওয়ার পরে একদিন, এক বিশাল লম্বা
গাছের মগডালে দেখতে পেল একটা আলো জ্বলজ্বল করছে। কাঠবিড়ালির মনে কী হল—তরতর করে
সেই গাছে উঠে পড়ল। আলোর কাছাকাছি পৌঁছে দেখে—এই তো সূর্য!
কিন্তু একি চেহারা হয়েছে সূর্যের! এতদিন গাছের ডালের ফাঁকে
আটকে পড়ে থেকে সূর্যের জৌলুস কমে গিয়েছিল। খুব দুর্বল দেখাচ্ছিল তাকে। কাঠবিড়ালিকে
দেখে সূর্য বলে উঠল,
“ছোট্ট কাঠবিড়ালি
বন্ধু আমার! আমাকে বাঁচাও।”
কাঠবিড়ালি সঙ্গে সঙ্গে সূর্য যে ডালপালায় আটকে পড়েছিল, সেই ডালটা নিজের
ধারালো দাঁত দিয়ে কাটতে শুরু করল। কিন্তু যতই সে সূর্যের কাছাকাছি গেল, ততই সূর্যের
উত্তাপ তার শরীরে লাগতে লাগল। ডাল যতই কাটে, সূর্যের আলো ততই তীব্র হয়। কাঠবিড়ালির বেশ কষ্ট হতে লাগল। তখন কাঠবিড়ালি
সূর্যকে বলল,
“তোমার তাপে আমার
লোম পুড়ে কালো হয়ে যাচ্ছে। খুব কষ্ট হচ্ছে। আর এগুলে তো আমি মরে যাব।”
সূর্য মিনতি করে বলল, “ছোট্ট বন্ধু আমার, থেমো না তুমি। আমাকে গাছের ডাল থেকে উদ্ধার কর।”
সূর্যের কথায় কাঠবিড়ালি আবার ডাল কাটতে শুরু করল। কিন্তু
উত্তাপ বাড়তে লাগল। কাঠবিড়ালি এবার আর্তনাদ করে উঠল,
“আমার ল্যাজ
জ্বলতে শুরু করেছে। আর এগোতে পারব না আমি।”
“ছোট্ট কাঠবিড়ালি, পায়ে পড়ি
তোমার—থেমো না। বাঁচাও আমাকে।”
আবার দাঁত দিয়ে
গাছের ডাল কাটতে থাকল কাঠবিড়ালি। কিন্তু সূর্যের উজ্জ্বল আলোতে এবার তার চোখ
ধাঁধিয়ে যেতে লাগল।
“আমি অন্ধ হয়ে
যাচ্ছি। দেখতে পাচ্ছি না।”
“প্রায় হয়ে এসেছে।
আর একটু সহ্য কর। এখুনি আমি মুক্তি পেয়ে যাব,” সূর্য বলল।
অত্যন্ত কষ্টে, ওই উত্তাপের মধ্যেই কোনোমতে কাঠবিড়ালি গাছের ডালটা চিবিয়ে
কেটে ফেলল। ব্যস! সঙ্গে সঙ্গে সূর্য বন্দী দশা থেকে মুক্তি পেয়ে আকাশে ফিরে গেল।
সূর্য উদয় হতেই ভোরের আলো সারা জগতে ছড়িয়ে পড়ল। রাতের অন্ধকার কেটে গিয়ে দিনের আলো
আসতেই পৃথিবীর পশুপাখিরা প্রাণ ফিরে পেল। আনন্দ-উৎসব শুরু হয়ে গেল।
ছোট্ট খয়েরি কাঠবিড়ালি কিন্তু খুশি হল না। সূর্যকে বাঁচাতে
গিয়ে সে অন্ধ হয়ে গিয়েছিল। তার গর্বের মোটা লোমশ লেজ পুড়ে গিয়েছিল। শরীরের বেশির
ভাগ লোমও পুড়ে কালো হয়ে গিয়েছিল। গরমে গায়ের চামড়া আধপোড়া হয়ে ঝুলে গিয়েছিল। ওই
গাছের ডাল আঁকড়ে কোনোমতে টিকে ছিল সে। নিচে নামার ক্ষমতা তার ছিল না।
আকাশ থেকে কাঠবিড়ালির অবস্থা দেখে সূর্যের খুব কষ্ট হল।
তাকে বাঁচাতে গিয়ে কী কষ্টটাই না সহ্য করতে হয়েছে বেচারিকে। সূর্য তাই কাঠবিড়ালিকে
ডেকে বলল,
“কাঠবিড়ালি, ছোট্ট বন্ধু আমার, তুমি আমার প্রাণ
বাঁচিয়েছ। এখন আমার পালা। আচ্ছা, এমন কী কিছু আছে যা তুমি জীবনে পেতে চেয়েছ কিন্তু পাওনি?”
কাঠবিড়ালি বলল, “আমার খুব ইচ্ছা হত—আমারও পাখিদের মতো ডানা থাকবে। ডানা মেলে
আমি আকাশে উড়ব। কিন্তু এখন তো আমি অন্ধ হয়েগেছি। আমার লেজও
পুড়ে গেছে। এখন কীভাবে উড়ব আমি?”
সূর্য একটু হেসে
বলল,
“আজ থেকে তুমি
পাখিদের থেকেও ভালো উড়তে পারবে। আমার এত কাছাকাছি এসেছিলে বলে তোমার চোখ ধাঁধিয়ে
গেছে। আমার আলো সবসময়ই তোমার চোখে লাগবে। দিনের বেলা তুমি দেখতে পাবে না। কিন্তু
অন্ধকারে তুমি দেখতে পাবে। আর উড়তে গিয়ে আশেপাশের সবার কথা শুনতে পাবে।”
কাঠবিড়ালি বলল, “তা কীভাবে হবে?”
সূর্য বলল, “এখন থেকে সারাদিন যখন আমি আকাশে থাকব, তখন তুমি ঘুমাবে।
আর সন্ধ্যেবেলা আমি অস্ত গেলে তুমি জেগে উঠবে।”
একথা বলতে বলতেই পুড়ে যাওয়া কাঠবিড়ালির পিঠে সুন্দর চামড়ার
ছুঁচোলো ডানা গজিয়ে উঠল। ডানা মেলে সে গাছের ডাল থেকে আকাশে উড়ে গেল। লোমশ লেজটা
নেই বলে আর তার মনে দুঃখ রইল না। খয়েরি রঙের সুন্দর লোমগুলো নেই বলেও তার কষ্ট হল
না। রাতের বেলায় সে উড়ে বেড়াতে পারবে ভেবেই তার খুব আনন্দ হল। সূর্যের আলো সে দেখতে পাবেনা ঠিকই
তবে সূর্যের ভালবাসা তার মনে থাকবে।
এইভাবে সূর্য কাঠবিড়ালির বন্ধুত্বের মান রাখল তবে এরপর থেকে
ছোট্ট খয়েরী কাঠবিড়ালি আর কাঠবিড়ালি রইল না। সে হয়ে গেল বাদুড়। সেই থেকে বাদুড়েরা
পৃথিবীতে আছে।