তখন মানুষ আগুন সৃষ্টি করতে না পারলেও, তারা বুঝতে পারে যে এই জিনিসটির উষ্ণতা তাদের শীত থেকে
রক্ষা করে, তার আলো রাতের অন্ধকার দূর করে এবং তাতে পুড়লে বন্য পশুরা
ভয় পেয়ে পালিয়ে যায়। ক্রমে তারা শিখে নেয় কীভাবে বজ্রপাত বা প্রাকৃতিক
বনাগ্নি থেকে পাওয়া আগুনকে সংরক্ষণ করে রাখতে হয়।
বহুবছর ধরে ইতিহাসবিদ ও প্রত্নতাত্ত্বিকেরা মনে করতেন, ‘পিকিং ম্যান’ (Peking Man)—যিনি প্রায় ৫,০০,০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে বাস করতেন, তিনিই সর্বপ্রথম আগুন ব্যবহারকারী মানুষ। কিন্তু ১৯৮১ সালে
কেনিয়ায় এবং ১৯৮৮ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায় আবিষ্কৃত প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ এই
ধারণাকে বদলে দেয়।
কেনিয়ার চেসওয়ানজা (Chesowanja) ও দক্ষিণ
আফ্রিকার সোয়ার্টক্রান্স (Swartkrans)
অঞ্চলে আবিষ্কৃত পুড়ে যাওয়া অস্থি, কাঠ ও পাথরের নিদর্শন থেকে জানা যায় যে প্রায় ১৪,২০,০০০ বছর আগে প্রাচীন হোমিনিডরা আগুন ব্যবহার করত। আর শুধু
ব্যবহারই নয়, আগুনকে নিয়ন্ত্রণও করত তারা। এটি ছিল মানব ইতিহাসের প্রথম ‘নিয়ন্ত্রিত আগুন’ বা controlled fire ব্যবহারের দৃষ্টান্ত।
প্রথম দিকের মানুষ যেহেতু আগুন জ্বালাতে পারত না, তাই একবার আগুন পেলে সেটিকে সযত্নে রক্ষা করত। তারা আগুনকে ‘জীবিত’ রাখার জন্য দিনে আগুন
জ্বলতে দিত, আর রাতে তাকে কিছুটা নিভিয়ে রেখে তার উষ্ণ ছাইয়ের নীচে
জ্বালানি কাঠ লুকিয়ে রাখত,
যাতে সকালে আবার সহজেই আগুন জ্বেলে তোলা যায়। আগুন একবার
নিভে গেলে নতুন করে জ্বালানো ছিল অত্যন্ত কষ্টকর কাজ, কারণ তখনও তারা ঘর্ষণ বা চকমকি দিয়ে স্ফুলিঙ্গ সৃষ্টির
কৌশল আয়ত্ত করতে পারেনি।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তারা চকমকিও আবিষ্কার করে ফেলে।
দুটি চকমকি পাথর পরস্পরের সঙ্গে ঘষে স্ফুলিঙ্গ উৎপন্ন করা সম্ভব হয়। ফলে শুকনো
পাতায় বা কাঠে লাগিয়ে আগুন জ্বালানো যেত। এই আবিষ্কার মানুষের হাতে আগুন সৃষ্টির
ক্ষমতা এনে দেয় এবং মানুষ প্রকৃত অর্থেই প্রকৃতির নিয়ন্ত্রণ করায়ত্ত করতে শুরু
করে।
আগুন শুধু উষ্ণতা বা আলোর উৎসই নয়, বরং এটি ছিল সভ্যতার এক সূচনা বিন্দু। আগুনের সাহায্যেই
মানুষ প্রথম রান্না শিখেছিল। কাঁচা মাংস রান্না করে খাওয়া শুধু সহজপাচ্যই হয়নি, বরং পুষ্টিগুণও বাড়িয়ে দিয়েছিল, যা মস্তিষ্কের বিকাশে বিশেষ ভূমিকা রাখে। আর আগুন ব্যবহার করে রান্না
করা খাবার খেয়েই আদিম জাতি কোটি কোটি বছরের বিবর্তনের পর বর্তমান হোমো সেপিয়েন্স-এ
রূপান্তরিত হয়েছে। তাছাড়া আগুনের চারপাশে বসে মানুষ একত্রে সময় কাটাতে শুরু করে।
এভাবেই সামাজিক বন্ধন ও ভাষার প্রাথমিক বিকাশ ঘটে।
আগুন মানুষকে রাতের অন্ধকারে আলো দিল, হিংস্র পশুদের হাত থেকে রক্ষা করল এবং শীতের কামড় থেকে
বাঁচাল। ক্রমে মানুষ বুঝতে পারে আগুন পাথর গলাতে পারে, মাটি পুড়িয়ে মৃৎপাত্র তৈরি করতে পারে এবং পরে ধাতু গলিয়ে
অস্ত্র বা যন্ত্র বানাতে সাহায্য করতে পারে।
সুতরাং আগুন শুধু এক প্রাকৃতিক উপাদান নয়, বরং এটি ছিল মানব চিন্তা, প্রযুক্তি ও
সমাজ গঠনের প্রথম দ্যুতি।
আগুন মানুষের মধ্যে জ্ঞানের, শক্তির এবং
আত্মজাগরণের প্রতীক হয়ে ওঠে। বিশ্বজুড়ে নানা সংস্কৃতিতে আগুনের এই প্রতীকী
তাৎপর্য প্রতিফলিত হয়েছে—ভারতের অগ্নিদেবতা, গ্রিসের প্রমিথিউস, কিংবা আফ্রিকার সূর্যপূজা—সবই আগুনের এই প্রাচীন মানবিক
সম্পর্কের সাক্ষ্য বহন করে।
মানবসভ্যতার ইতিহাসে ‘নিয়ন্ত্রিত আগুন’ একটি অনন্য মাইলফলক। এর সাহায্যেই মানুষ ক্রমে প্রকৃতি
নিয়ন্ত্রণ করতে শেখে; বন্য পশুর ভয়, রাতের অন্ধকার ও মারণ শীতকে
অগ্রাহ্য করে এগিয়ে যায় উন্নতির পথে। হোমো ইরেকটাসের সেই প্রথম স্ফুলিঙ্গ থেকেই
শুরু হয়েছিল সভ্যতার আলোকযাত্রা, যার ফলশ্রুতিতে আজকের মানুষ
বাস করছে প্রযুক্তির জগতে।
আফ্রিকায় প্রবাদ আছে: ‘যে কাঠ একবার আগুনে
ছুঁয়েছে, তাকে আবার জ্বালানো কঠিন কাজ নয়।’
এই প্রবাদটি যেন মানব ইতিহাসের প্রতিচ্ছবি—একবার জ্ঞানের
আগুন জ্বললে, তার আলো চিরকাল উজ্জ্বল হয়ে থাকে। (চলবে)
<<
সূ চি প ত্র