সেদিন অফিসে পৌঁছে গোবর্ধনবাবু নিঃসন্দেহ হলেন যে আজকের দিনটা ওনার পক্ষে তেমন সুবিধের নয়।
তবে ইঙ্গিত সকাল থেকেই ছিল।
ঘুম থেকে উঠে চোখ খুলেই মশারির ভেতর বসে থাকা দুটো হৃষ্ট-পুষ্ট মশা দেখে উনি
বুঝেছিলেন যে ব্যাটারা গোটা রাত ধরে ওনার রক্তে ফিষ্টি করেছে। তারপর মুখ ধোওয়ার
জন্যে পেস্ট বের করতে গিয়ে সড়াৎ করে অনেকটা পেস্ট বেসিনে পড়ে গেল। আর হবি তো হ সেটা
ওনার গিন্নি দেখেও ফেলল। তারপর যা হওয়ার তাই হোল – ওনার অকর্মণ্যতার ইতিহাসের
পুনরাবৃত্তি হোল ওনার দুই ছেলে আর কাজের মেয়ে জ্যোৎস্নার সামনেই।
বাজার করতে গিয়েও তেমন
সুবিধে করতে পারেন নি। বাড়িতে ফিরে উনি রিয়ালাইজ করলেন যে দোকানদারেরা ওনাকে ‘আলতামুখি’ শিম, ‘পায়রাটুলির’ বেগুন আর ‘বারুইপুরের’ পেয়ারা বলে যে মালগুলি
গছিয়েছে তা অতিশয় নিম্নমানের। অথচ জিনিসগুলি কেনার সময় ওনার মনে হয়েছিল যে বেশ
কিছু দুষ্প্রাপ্য জিনিস নিয়ে উনি আজ ফিরছেন। শেষে ওনার মা মাথায় আলতো চাঁটি মেরে
বললেন, ‘বুবলুটা এখনও বেয়াক্কেলেই রয়ে গেল। লোকে যা নয় তাই জিনিস
ওকে গছিয়ে দেয় আর সে তাই বেশি দাম দিয়ে সোনামুখ করে নিয়ে আসে।‘
এ ঘটনাটাও সকলের সামনেই
ঘটল।
তারপর স্নান করার সময় দু দু
বার হাত পিছলে সাবান পড়ে যাওয়া না হয় উনি ধর্তব্যের মধ্যে আনছেন না কিন্তু যখন
ওনার মাথাভর্তি শ্যাম্পু আর মুখভর্তি সাবান, সেই মুহূর্তে শাওয়ারের
শুকিয়ে যাওয়ার কী ব্যাখ্যা দেওয়া যায়?
এসবের পর তাড়াহুড়োতে ভাত
খাবার সময়ও প্রায় ফুটন্ত ডাল ঢালতে গিয়ে হাতে ছ্যাঁকা খেলেন। রাস্তায় অটোওয়ালার
কাছে ধমক আর মেট্রোতে চাপতে গিয়ে এক ভদ্রলোকের কাছে কনুইয়ের গোঁত্তা খেয়ে অফিসে
ঢুকতে না ঢুকতেই ওনাকে দেখে সরখেল সাহেব হাঁ হাঁ করে উঠলেন।
‘এত দেরি করলেন গোবর্ধনবাবু? ওদিকে সহায়
সাহেব দু দুবার আপনার খোঁজ করে গেছেন।‘
সহায় সাহেব ওনার চেয়ে চার
কাঠি ওপরের অফিসার, দু মাসে একবার দেখা হয় কি হয় না। সেই সহায় সাহেব সব দিন
ছেড়ে আজকেই ওনার খোঁজে কেন হন্যে হয়ে উঠলেন – এই প্রশ্নের একটাই উত্তর হয় – ওনার
আজকের দিনটা শুভ নয়।
কিছুক্ষন গোঁজ হয়ে বসে সহায়
সাহেবের চেম্বারে গিয়ে গোবর্ধনবাবু জানতে পারলেন যে উনি মিটিঙের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে
গেছেন।
তিনি নিজের চেয়ারে ফিরে এলে
সরখেল সাহেব গম্ভীর গলায় বললেন, ‘বেশ কিছুদিন ধরে শুনছি
আমাদের আন্দামান ব্রাঞ্চে একটা লোক পাঠানো হবে। ভয় হচ্ছে শেষে আপনার নামটা না উঠে
আসে।‘
কথাটা শুনে গলা শুকিয়ে গেল
গোবর্ধনবাবুর। আন্দামান মানে তো দ্বীপান্তর! একসময় বেশ বড় মাপের অপরাধ করলে
অপরাধীদের আন্দামানে শাস্তিস্বরুপ পাঠানো হত। মাত্র একদিন দেরি করে অফিসে আসার
দরুন ওনাকে সেই শাস্তি পেতে হবে?
গত সন্ধের ঘটনাটা মনে পড়ে
গেল গোবর্ধনবাবুর। ওনার পাড়ার বন্ধু অনিমেষ প্রায় জোর করেই গতকাল বিকেলে ওনাকে এক
আশ্রমে নিয়ে যায় ভোমরাবাবা নামের কোন এক অত্যাধিক ক্ষমতাশালী বাবাকে দেখাতে।
গোবর্ধনবাবু এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন কিন্তু অনিমেষের কাছে উনি কিছুতেই প্রমান
করতে পারলেন না যে ওনার অন্য কোনো জরুরী কাজ আছে।
এইসব বাবা-টাবাদের উনি
বরাবরই এড়িয়ে চলেন। শুকনো জ্ঞান ওনার সহ্য হয় না কারণ ও বস্তু উনি রোজই ওনার মা আর
গিন্নির কাছ থেকে ভুরি ভুরি পান। ওনার নিজের অতীত উনি জানেন, আর ভবিষ্যৎ জানার তেমন ইচ্ছে নেই। তাছাড়া পাথর-টাথর পরে যে
কোনো সমস্যার সুরাহা হয়, সেই ব্যাপারেও ওনার তেমন আস্থা নেই। তবে গোবর্ধনবাবু নাস্তিক নন, ভগবানকে উনি
মানেন। ভালো কাজের ফল ভালো হয় আর খারাপ কাজের ফল খারাপ – এ বিশ্বাসও ওনার আছে। কিন্তু যখন তিনি দেখেন কিছু ধান্দাবাজ লোক আংটি বা যজ্ঞের
বিনিময়ে বড়সড় অপকর্ম থেকে মানুষকে উদ্ধার করার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে, তখন তার গা পিত্তি জ্বলে ওঠে।
তাই গতকাল যখন ভোমরাবাবা
ওনাকে দেখে চিন্তিত হয়ে বলেছিলেন, ‘গ্রহরাজের কোপে পড়েছিস; কঠিন সময় শুরু হতে চলল। একটু সাবধানে থাকিস!‘, গোবর্ধনবাবু তেমন উদ্বিগ্ন হননি। বরং ওনার চিমটিকে উপেক্ষা
করে অনিমেষটাই করুন মুখ করে জিজ্ঞেস করেছিল, ‘তাহলে উপায় বাবা?’
বাবা মুচকি হেসে নিজের ঝোলা থেকে একটা তামার আংটি বের করে
বলেছিলেন, ‘একে
‘কল্যাণী আংটি’ বলে রে বেটা।
এটা ধারন করার কিছুদিন পর থেকেই দেখবি সব ফাঁড়া কেটে যাচ্ছে।‘
বস্তুটির দাম শুনে গোবর্ধন
বাবু জোর বিষম খেয়েছিলেন – সাত হাজার সাতশো! ভোমরাবাবা ওনাকে আশ্বস্ত করে বলেছিলেন, ‘সঙ্গে ক্যাশ না থাকলেও চিন্তা নেই, আমাদের কাছে ক্রেডিট কার্ডের মেশিন আছে।‘
কোনোরকমে আশ্রম থেকে পালিয়ে বেঁচেছিলেন গোবর্ধনবাবু।
কিন্তু আজকে দ্বীপান্তরের
সম্ভাবনার কথা মাথায় আসতেই সব সঙ্কল্প ফুস করে উবে গেল। গ্রহের ফের তো ছিলই, তার সঙ্গে ভোমরাবাবার কোপেরও প্রভাবও কি পড়ছে ওনার ওপর?
বাকি দিনটাও খুবই চিন্তায়
কাটল ওনার। বারবার মনে হতে লাগল হয়ত এই মুহূর্তেই ওনার আন্দামানে বদলির চিঠি টাইপ
করা হচ্ছে। অথবা ওনার নামে নালিশ করে সহায় সাহেবের মন আরও বিষিয়ে দিচ্ছে ওনার
সহকর্মীরা।
অফিস থেকে বেরিয়েই সোজা
ট্যাক্সি ধরে আশ্রমের উদ্দেশ্যে রওনা দিলেন গোবর্ধনবাবু। আশ্রমে পৌঁছেই বুকটা ধক
করে উঠল ওনার – চারদিকে এত নিঃশব্দতা কেন? গতকাল তো মানুষের মেলা
বসেছিল এই সময়ে। তবে কি বাবা অলরেডি সদলবলে হিমালয়ের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়েছেন?
‘বাবা আছেন কিন্তু আজকে আর দেখা হবে না। কয়েকজন বিশেষ বিশেষ
ভক্তদের সঙ্গে ওনার এপয়েন্টমেন্ট করা আছে – তাদেরই শুধু দর্শন দেবেন।‘
‘কিন্তু আমার ওনাকে আজ বিশেষ দরকার প্রভু! সেই কল্যাণকারী
আংটিটি না পেলে একেবারে মারা পড়ে যাব।‘ কাঁদো কাঁদো গলায় বলে
উঠেছিলেন গোবর্ধনবাবু।
লোকটি যে পরোপকারী তার
প্রমান হাতেনাতেই পেয়েছিলেন। ওনাকে সেখানেই বসতে বলে সে কয়েক মিনিটের জন্যে ভেতরে
ঢুকে হাসি মুখে সেই অমুল্য আংটি হাতে ফিরে এসেছিল। কিন্তু গোবর্ধনবাবুকে বেশ কিছু
টাকা বেশি দিতে হোল। গতকাল বাবার বলা দামটা নাকি ট্যাক্স বাদ দিয়ে, তার সঙ্গে ১৮% জিএসটি যোগ হবে।
দাম মিটিয়ে গোবর্ধনবাবু
জিজ্ঞেস করলেন, ‘প্রভু, বাবার সঙ্গে কি একবার
শেষবারের মত দেখা হবে না?’
শান্ত গলায় লোকটি বুঝিয়ে
দিয়েছিল যে বাবার সমস্ত আশীর্বাদ এই আংটির ভেতরেই ঢুকে রয়েছে, এরপরও বাবাকে দেখতে চাওয়া এই দিব্য আংটির অপমান। শেষে একটা
কার্ড ওনার হাতে ধরিয়ে লোকটি বলেছিল, ‘প্রয়োজন হলে ফোন করবেন। এটা
আমারই নাম্বার।‘
আর কথা বাড়ান নি
গোবর্ধনবাবু।
পরের দিন সকালেই সহায়
সাহেবের কাছে আবার তলব পড়ল গোবর্ধনবাবুর। আংটিটিকে কপালে ঠেকিয়ে দুরু দুরু বুকে
সাহেবের ঘরে ঢুকলেন গোবর্ধনবাবু।
‘গতকাল কয়েকটা ইনফরমেশনের জন্যে আপনাকে খুঁজছিলাম, ছুটিতে ছিলেন?’ রাশভারী গলায় জিজ্ঞেস করলেন
সহায় সাহেব।
‘আজ্ঞে না স্যার, একটু দেরি হয়ে গেছিল।
অন্যদিন হয় না স্যার, শুধু কালকেই……’
একটা চিরকুট এগিয়ে সাহায়
সাহেব বললেন, ‘আধ ঘণ্টার মধ্যে এই ইনফরমেশনগুলি নিয়ে আসুন।‘
‘সিওর স্যার!’ বলে কাঁপতে কাঁপতে রুম থেকে
বেরিয়ে এসে দু গেলাস ঠাণ্ডা জল খেয়ে ফাইল ঘেঁটে ইনফরমেশনগুলি খুঁজতে লেগে পড়লেন
গোবর্ধনবাবু। সবগুলি খুঁজে না পেলেও মোটামুটি একটা ফাইল দাঁড় করালেন। কিন্তু ফাইল
নিয়ে সহায় সাহেবের চেম্বারে গিয়ে দেখলেন উনি আবার বেরিয়েছেন। গোবর্ধনবাবু কাগজগুলি
ওনার সেক্রেটারিকে দিয়ে বলে রাখলেন সহায় সাহেব এলেই যেন ওনাকে ডেকে পাঠানো হয়।
সেদিন আর ডাক এলো না বটে কিন্তু গোটা দিনটাই টেনশনে কাটল।
বাড়ি ফেরার পথে অটো থেকে নামতে গিয়ে জোর হোঁচটও খেলেন তিনি। বাড়িতে ঢুকে শুনলেন
ওনার বড় ছেলে চিরন্তন অঙ্কের টেস্টে একশোতে একচল্লিশ পেয়েছে। কিন্তু তাকে যে বকবেন
সেই কনফিডেন্সও তিনি হারিয়ে ফেলেছেন। শুধু হাতের আংটিটার দিকে তাকিয়ে একবার
দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন।
একটু রাতের দিকে কার্ডে
লেখা নাম্বারে ফোন করলেন গোবর্ধনবাবু। সব শুনে লোকটা বলল, ‘শুনুন, গ্রহরাজের কোপে পড়লে একটা
মানুষের যে কী হাল হতে পারে সেটা সম্বন্ধে আপনার কোনো ধারনাই নেই। আপনি বাবার
কৃপায় রাজার হালে আছেন। আংটিটা সব বিপদ থেকে আপনাকে ক্রমাগত প্রোটেক্ট করে চলেছে।
ছেলে তো আর ফেল করে নি। আর কার অফিসের বসই বা সবসময় খুশি থাকে? ওসব নিয়ে মাথা না ঘামিয়ে একটু মন দিয়ে লক্ষ্য করলেই দেখতে
পাবেন যে এরপর থেকে কতকিছু পজিটিভ ঘটনা ঘটবে আপনার জীবনে।‘
লোকটার কথাটা ভুল নয়। আংটির
কল্যাণকারী শক্তির কিছু কিছু আঁচ গোবর্ধনবাবু পাচ্ছেন ইদানিং। সেদিন হাড় কিপটে
গোবিন্দ তাকে নিজে ডেকে চা-বিস্কুট কিনে খাইয়েছে। তারপর খাটের তলায় রাখা
ট্রাঙ্কটার চাবি যেটা বেশ কয়েকদিন ধরে খুঁজে পাচ্ছিলেন না সেটা আচমকাই খুঁজে পেয়ে
গেলেন। একদিন গোবর্ধনবাবুর আনা ফুলকপির প্রশংসা করেছে ওনার স্ত্রী। উনি দু দিন
অল্প দেরি করে অফিসে যাওয়া সত্বেও সেই দিনগুলোয় সহায় সাহেব ওনার খোঁজ করেন নি। আর
সবচেয়ে বড় কথা, এখনও তাঁর আন্দামানে বদলি হয় নি।
অবশ্য মাঝে মাঝে যে বাড়িতে, পথে বা অফিসে হেনস্থা সহ্য করতে হয় না সেটা নয়। এখনও ওনার
কেনা শশা প্রায়ই তেতো আর বেগুন বুড়ো বেরোয়। খুচরো না থাকলে অটোওয়ালারা ধমক দেয়।
গতমাসে বাথরুমে জোর আছাড় খেয়ে তিনদিন শয্যাশায়ী ছিলেন। এ বছর ওনাকে টপকে ওনার চেয়ে
তিন বছরের জুনিয়র বড়াল প্রমোশন পেয়ে গেল। সেদিন তাড়াহুড়ো করে খেতে গিয়ে নিজের জিভ
কামড়ে ফেলে বেশ যন্ত্রণা পেয়েছেন। আর ওনার ছেলেরও পড়াশোনায় তেমন কিছু উন্নতি হয়
নি।
তবে এসব ছোটখাটো ব্যাপার।
এতসবের মধ্যেও ভোমরাবাবার আংটির কৃপায় যে উনি আর ওনার পরিবার মোটামুটি নিরাপদেই এই
পৃথিবীতে টিকে আছে সেটাই কি কম?