ডাইনোসরের ১৬৫ মিলিয়ন
বছরের অস্তিত্বের সময়ে এই মহাদেশটি ধীরে ধীরে ভেঙে যায়, জন্ম হয় একাধিক মহাদেশের। প্যানজিয়ার ভাঙন ও নতুন নতুন
মহাদেশ গঠনের সাথে সাথে ডাইনোসরেরাও বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েছিল।
আজ থেকে প্রায় সাড়ে ছয় কোটি বছর আগে এক ভয়ংকর ঘটনার
পরিণতিতে তারা সবাই মারা গেছে বলে মনে করা হয়। আজ আর এই ডাইনোসরদের ফসিল ছাড়া কোনো অস্তিত্ব নেই।
গবেষকরা বলেছেন, পৃথিবীতে এক বিরাট আকারের গ্রহাণুর আঘাতে একটি বিস্ফোরণ ও পরিবেশগত এক পরিবর্তন
হয়েছিল। এই পরিবর্তনেই ডাইনোসরেরা পৃথিবী থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছিল। যদিও, যুক্তরাজ্যের
ইউনিভার্সিটি অফ রিডিং এর বিজ্ঞানীরা ডাইনোসরের ফসিলের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে বলছেন, এর অনেক আগে থেকেই এই বিলুপ্তির প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল।
গ্রহাণুর আঘাতে সেটি শেষ হয় মাত্র। তারা মনে করেন, পরিবর্তিত
পৃথিবীর সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে না পারার কারণেই ডাইনোসর বিলুপ্ত হতে শুরু করে এবং ডাইনোসরের বিলুপ্তির এই প্রক্রিয়া শুরু হয় প্রায় ১২লক্ষ
বছর আগেই।
পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে
ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা এই অতিকায় প্রাণীর ফসিল বা জীবাশ্ম থেকে বিজ্ঞানীরা বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ
করেছেন আর পাওয়া গেছে বিভিন্ন তথ্য। ডাইনোসর নিয়ে অনুসন্ধান যেমন আজও শেষ হয়নি, তেমন শেষ হয়নি জীবাশ্ম উদ্ধারের কাজও।
সম্প্রতি, বারো কোটি বছরেরও বেশি পুরোনো দুই মাথাওয়ালা ডাইনোসরের একটি জীবাশ্ম আবিষ্কার করেছেন
বিজ্ঞানীরা। হাইফালোসরাস নামের এই ডাইনোসরটির গলা অন্য ডাইনোসরেদের মতো লম্বা ছিল
না, কিন্তু আকৃতিতে এরা বেশ বড় ছিল। প্রাগৈতিহাসিক যুগের
একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ে ক্রিটেসিয়াস যুগে বাস করত এই হাইফালোসরাসেরা। এরা ছিল মাংসাশী এবং শক্তিশালী প্রাণী। ছোট
ছোট শিকার ধরার মতো ক্ষিপ্র ছিল এরা।
ডাইনোসরদের ইতিহাসে এই ক্রিটেসিয়াস যুগ ছিল সবচেয়ে বড় যুগ, যেটি আজ থেকে ১৪ কোটি ৫০ লক্ষ বছর থেকে শুরু হয়ে চলেছিল প্রায়
সাড়ে ৬ কোটি বছর পর্যন্ত।
জীবাশ্মের নমুনায় দুই
মাথাওয়ালা ডাইনোসরের লক্ষণ থাকায় বিজ্ঞানীরা একে বিরল বিকাশগত অসংগতি বলে আখ্যা
দিয়েছেন। ভ্রূণ যমজ প্রাণীতে বিভক্ত হতে শুরু করার সময় যখন প্রক্রিয়া ব্যর্থ হয়, তখন দুটি মাথাওয়ালা একটি জীব তৈরি হয়। সেই কারণেই এই ডাইনোসরের জন্ম হয়েছিল বলে মনে করা হচ্ছে।
উত্তর-পূর্ব চীনের
ইক্সিয়ান ফরমেশন অঞ্চলে এই জীবাশ্মটি আবিষ্কৃত হয়েছে। জীবাশ্মটি বিশদভাবে বিশ্লেষণ করে সম্প্রতি বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, আধুনিক সময়ে সাপ, টিকটিকি ও
কচ্ছপের মতো সরীসৃপে দুটি মাথা দেখা গেলেও অতীতের কোনো প্রাণীতে এমন ত্রুটি পাওয়া
যায়নি। আর তাই জীবাশ্মটিকে মেরুদণ্ডী জীবাশ্মের ইতিহাসে ত্রুটিযুক্ত প্রাণীর
প্রাচীনতম উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। প্রাথমিক সরীসৃপদের জৈবিক ও বিবর্তনের নতুন
তথ্য জানার সুযোগ করে দিয়েছে এই নতুন জীবাশ্মটি।
প্রাণীর মেরুদণ্ড যে সময় অনুদৈর্ঘ্যভাবে বিভক্ত হতে শুরু
করে, তখন ত্রুটির কারণে দুটি সমান্তরাল ঘাড়ও তৈরি হয়েছিল। এতে
দুটি স্বতন্ত্র মাথার খুলির বিকাশ ঘটে। এটি একটি অসম্পূর্ণ যমজ প্রক্রিয়া।
জেনেটিক ত্রুটির কারণে সংযুক্ত মাথার বিকাশ ঘটেছিল। সরীসৃপ ও অন্য মেরুদণ্ডী
প্রাণীদের মধ্যে এমন ত্রুটি অত্যন্ত অস্বাভাবিক। ৭০ মিলিমিটার দৈর্ঘ্যের দুই
মাথাওয়ালা হাইফালোসরাস জীবাশ্মটি সম্ভবত নবজাতক ডাইনোসরের, যা ডিম ফুটে বের হওয়ার পর বেঁচে ছিল না বলে বিজ্ঞানীরা মনে করছেন। সংক্ষিপ্ত আয়ুষ্কালের কারণে বিকাশের অনেক তথ্যই এই
জীবাশ্মটির মধ্যে নেই। তবুও, জন্মগত ত্রুটির প্রাচীন এই
প্রমাণ অনেক বিরল তথ্য জানার সুযোগ করে দেবে বল বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন।
প্যারিসের ন্যাশনাল সেন্টার
ফর সায়েন্টিফিক রিসার্চ- এর প্রধান গবেষক এরিক বুফেটাউ বলেছেন, 'এটা এমন এক আবিষ্কার যা আপনি আগে কল্পনাও করতে পারেননি। কারন, এই ধরনের অদ্ভুত কিছু
জীবাশ্ম পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম থাকে।
এই জীবাশ্মের আবিষ্কার প্রাচীন সরীসৃপের জৈবিক বৈশিষ্ট্য ও বিবর্তন সম্পর্কে নতুন
করে জানার সুযোগ করে দিয়েছে বিজ্ঞানীদের।